ঢাকা, রবিবার,২২ এপ্রিল ২০১৮

বাংলার দিগন্ত

হুমকির মুখে সুনামগঞ্জের হাওরবাসীর জীবন-জীবিকা

জাহাঙ্গীর আলম ভূঁইয়া তাহিরপুর (সুনামগঞ্জ)

১৪ জানুয়ারি ২০১৮,রবিবার, ০০:০০


প্রিন্ট
অকালবন্যায় তলিয়ে যাওয়া তাহিরপুরের হাওরাঞ্চল   :নয়া দিগন্ত

অকালবন্যায় তলিয়ে যাওয়া তাহিরপুরের হাওরাঞ্চল :নয়া দিগন্ত

সুনামগঞ্জের হাওরবাসীর জীবন-জীবিকা এখন হুমকির মুখে পড়েছে। হাওরে একের পর এক সমস্যা যেন পিছু ছাড়ছে না। এতে করে চরম ক্ষতির শিকার হচ্ছে জেলার তিন লক্ষাধিক অসহায় কৃষক পরিবার। শুষ্ক মওসুমে এক ফসলি বোরো ধান চাষাবাদ আর বর্ষায় মাছ ধরেই জীবন-জীবিকা পরিচালিত হয় জেলার হাওরবেষ্টিত সুনামগঞ্জ জেলার ৮০ শতাংশ মানুষের। এই হাওরের সাথেই জড়িয়ে আছে শহরের ব্যবসায়ী, চাকরিজীবীসহ সর্বস্তরের লোকজন। কয়েক বছর ধরেই জেলার হাওরবাসীর সাথে মানবসৃষ্ট বিপর্যয়ের সাথে যুক্ত হয়েছে প্রকৃতির বৈরী আচরণ। ফলে অকাল বন্যায় চরম ক্ষতির শিকার হয়েছে কৃষক। বর্তমানে হাওরের পানি না কমা ও শৈত্যপ্রবাহসহ প্রকৃতি যেন এখন বিরূপ আচরণ করছে অসহায় হাওরবাসীর সাথে।
জানা যায়, জেলার ছোট বড় ১৫৪টি হাওরে উৎপাদিত এক ফসলি বোরো ধানের ওপর নির্ভরশীল লাখ লাখ হাওর পাড়ের কৃষক। জেলার মোট আবাদি জমির পরিমাণ তিন লাখ ৭৯ হাজার ২১৬ হেক্টর। গত বছর প্রায় দুই লাখ ১৫ হাজারের অধিক হেক্টর জমিতে বোরো ধান চাষ করা হয়েছিল, আর বাকি জমিতে অন্যান্য ফসল। যার মূল্য এক হাজার ৫০০ কোটি টাকার বেশি। এই সম্পূর্ণ ফসলই অকাল বন্যার পানিতে তলিয়ে যায়। ক্ষতিগ্রস্ত হয় সাড়ে তিন লক্ষাধিক কৃষক পরিবার। বোরো ফসল হারিয়ে কৃষকদের মধ্যে এখনো বিষাদের ছায়া বিরাজ করছে। এখন বোরো মওসুমে নতুন করে কৃষকেরা হাওরকে ঘিরে বাঁচার স্বপ্ন দেখলেও ব্যাঘাত ঘটাচ্ছে নানা প্রাকৃতিক সঙ্কট। চলতি বছর জেলায় দুই লাখ ২২ হাজার ৫৫২ হেক্টর জমিতে আমন আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। যার মূল্য এক হাজার ৫০০ কোটি টাকার বেশি। এ ছাড়াও এখানকার হাওরে রয়েছে বিভিন্ন প্রজাতির সুস্বাদু মাছ। বর্ষায় মাছ ধরা আর শুষ্ক মওসুমে বোরো জমি চাষ করাটা এখানকার হাওরবাসীর বংশ পরম্পরায়। এখানকার হাওরে উৎপাদিত মাছ জেলার চাহিদা পূরণ করে দেশের বিভিন্ন জেলায় পাঠানো ছাড়াও দেশের বাইরেও রফতানি করা হয়। আরো জানা যায়, এ জেলায় উৎপাদিত মাছ ও ধান দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে বিরাট অবদান রাখছে। দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে হাওরের এমন গুরুত্বপূর্ণ অবদান থাকার পরও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, কৃষি জমিতে মাত্রাতিরিক্ত সার ও কীটনাশক ব্যবহার, ইঞ্জিনচালিত যানবাহনের দূষণ, অবাধে মৎস্য নিধন, অপরিকল্পিত উন্নয়ন কর্মকাণ্ড প্রভৃতির কারণে হাওরের পরিবেশ এখন বিপন্ন। ফলে নাব্যতা হারাচ্ছে হাওরাঞ্চলের নদ-নদী। ধ্বংস হচ্ছে হাওরের জলজ প্রাণী ও উদ্ভিদের আবাসস্থল ও জীববৈচিত্র্য। এরপরও এখানকার হাওর ও জলাভূমিগুলোর বিপন্নপ্রায় পরিবেশের উন্নয়নে দীর্ঘ দিনেও কোনো ধরনের পদক্ষেপ নেয়া হয়নি। ফলে প্রতি বছর আগাম বন্যা কিংবা সেচের মওসুমে পানির অভাব হাওরের বিস্তীর্ণ এলাকার ফসল উৎপাদনকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করছে। এক ফসলি এই এলাকার একমাত্র ফসলটি সঠিকভাবে ঘরে তুলতে না পারায় ও উৎপাদিত ধানের ন্যায্য মূল্য না পাওয়ায় হাওরের কৃষকেরা প্রতি বছর ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। এ পরিস্থিতিতে গত বছর অকাল বন্যায় বোরো ফসলহানি হাওর পাড়ের কৃষকদের মেরুদণ্ড ভেঙে দিয়েছে।
পরিবেশ ও হাওর উন্নয়ন সংস্থার সাধারণ সম্পাদক পিযুস পুরকায়স্থ টিটু ও ব্যবসায়ী আবুল কালামসহ জেলার সচেতন হাওরবাসী জানান, গত বছর জেলার সব ক’টি হাওরের বোরো ধান হারিয়ে জেলার সাড়ে তিন লক্ষাধিক কৃষক সর্বস্বান্ত হয়ে পড়েন। বিক্রি করে দেন শেষ সম্বল হালের গরু। বোরো ধান অকাল বন্যায় পানিতে ডুবে যাওয়ার পর হাওরের মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করার স্বপ্ন দেখলেও সেখানে দেখা দেয় মহামারি। মাছ মরে ভেসে ওঠে হাওরে। এরপরও এই সঙ্কট কাটিয়ে ওঠে হাওরের মাছ ধরার জন্য গেলেও এর ওপর চলে ইজারাদারদের নানান বাধা। এ ছাড়াও এই জেলায় গড়ে ওঠেনি এখনো কোনো শিল্প-কলকারখানা।
গত কয়েক বছরের ব্যবধানে অকাল বন্যা, বর্ষায় হাওরপাড়ের বাড়িঘরে ভাঙন, মওসুমি বেকারত্ব ও বিভিন্ন সমস্যার কারণে এ জেলার হাওরাঞ্চল থেকে অসহায় কৃষক পরিবারের দুই লক্ষাধিক সদস্য নিজ গ্রাম ছেড়ে ভিন্ন স্থানের বাসিন্দা হয়েছেন। তাহিরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা পুনেন্দ্র দেব বলেন, আমার উপজেলায় হাওরবাসীর স্বার্থে সব কাজ সমাধানে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালাচ্ছি।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫