ঢাকা, বুধবার,২৪ জানুয়ারি ২০১৮

উপসম্পাদকীয়

জবাবদিহিতাই গণতন্ত্রের চালিকাশক্তি

সময়-অসময়

তৈমূর আলম খন্দকার

১৩ জানুয়ারি ২০১৮,শনিবার, ০০:০০


প্রিন্ট

গত ৫ জানুয়ারি বিএনপি পালন করেছে গণতন্ত্র হত্যা দিবস এবং সরকারি দল পালন করেছে গণতন্ত্র সুরক্ষা দিবস। সুরক্ষা ও হত্যা এ দু’টি বিষয়ই ‘গণতন্ত্র’ নিয়ে। কবিদের মতো গণতন্ত্রকে যদি রূপক অর্থে একজন সুন্দরী ‘নারীর’ সাথে তুলনা করি, তবে দেখা যাক সে নারী বর্তমানে কোন অবস্থায় আছে? সে কি রোমান্টিক অবস্থায় আছে, না ধর্ষিতা হয়ে মুমূর্ষু অবস্থায় স্বৈরতন্ত্রের কবরখানায় যাওয়ার দিন গুনছে? নাকি লাইফ সাপোর্টে কৃত্রিম উপায়ে বেঁচে থেকে মিডিয়ার খোরাক হচ্ছে?
গণতন্ত্রের সংজ্ঞা যদি আমরা পর্যালোচনা করি, তবে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে, ভিন্নমত বা সমালোচনাকে সহ্য করাই গণতন্ত্রের প্রধান উপাদান। কিন্তু গণতন্ত্র রক্ষার নামেই গণতন্ত্রের ওপর হামলা হয়, গণতন্ত্রের মায়াকান্না গণতন্ত্র হত্যাকারীরাই করে আসছে, যেমনটি খুনি শোক মিছিলের আগে থাকে। রাজনীতি যেমন অবৈধ টাকাওয়ালাদের কাছে জিম্মি, অনুরূপ হত্যাকারীদের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছে গণতন্ত্র। সংবিধানের ৩৯ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রত্যেক নাগরিকের বাক ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হলেও এ নিশ্চয়তা ভূলুণ্ঠিত হচ্ছে বারবার। সংবিধানের ৩৫(২) ধারায় বলা হয়েছে, ‘এক অপরাধের জন্য কোনো ব্যক্তিকে একাধিক ফৌজদারিতে সোপর্দ ও দণ্ডিত করা যাইবে না।’
অথচ দৈনিক আমার দেশ সম্পাদক মাহমুদুর রহমানের এক বক্তব্যকে কেন্দ্র করে ২২টি মামলা করা হয়েছে বিভিন্ন জেলায়। বেশির ভাগ মামলার বাদি আইনজীবী। মামলা হওয়ার সংবাদ প্রায় প্রতিদিনই সংবাদপত্রে প্রকাশ হয়েছে। মিডিয়াতে ফলাও হওয়া বা দলীয় নেতাদের গুডবুকে থাকার জন্য সংবিধানের ৩৫(২) অনুচ্ছেদের বরখেলাপ করে একই অপরাধের ওপর একাধিক মামলা করতে পারে। কিন্তু যে ম্যাজিস্ট্র্রেট একই অপরাধের জন্য বিভিন্ন জেলায় ২২টি মামলা আমলে নেন, তখন কি সংবিধান লঙ্ঘিত হয় না? এ অবস্থার মূল কারণ রাষ্ট্রে আইনের শাসন টেলিস্কোপ দিয়ে খুঁজতে হয়। গণতন্ত্র নেই বলেই আইনের শাসন আজ বিলুপ্ত প্রজাতিতে পরিণত হতে যাচ্ছে। নি¤œ আদালতের দলীয় ক্যাডারের মতো আচরণ বা আইন ও বিচার মন্ত্রণালয়ের প্রতি অধিক আনুগত্য জনগণের কাছে এখন দৃশ্যমান। এসব কর্মকাণ্ডের মূল কারণ জবাবদিহিতা।
জবাবদিহিতা ও গণতন্ত্র সমান্তরাল গতিতে চলে। যেখানে গণতন্ত্র বিলীন হতে থাকে, সেখানে জবাবদিহিতা দিন দিন সঙ্কটাপন্ন প্রদীপের মতো নিভে যায়। জবাবদিহিতার চালিকাশক্তি হচ্ছে গণতন্ত্র। যেখানে গণতন্ত্র নেই, সেখানে জবাবদিহিতা থাকে না এবং সে কারণেই গণতন্ত্র বা আইনের শাসন রক্ষায় নিয়োজিত কর্মকর্তাই আজকাল আইনের অপপ্রয়োগের মহোৎসব পালন করছেন। উল্লেখ্য, গত ৮ জানুয়ারি ২০১৮ ‘দ্বিতীয় বিয়ে লুকাতে ডিআইজির কাণ্ড’ শিরোনামে একটি বহুলপ্রচারিত পত্রিকায় সংবাদ পরিবেশিত হয়েছে। সংবাদটিতে দেখা যায়, ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত কমিশনার মিজানুর রহমান দ্বিতীয় বিয়ে গোপন না করায় তার স্ত্রী মরিয়ম আক্তারকে গ্রেফতার করে জেলে পাঠিয়েছেন। তিন সপ্তাহ কারাভোগের পর মরিয়ম আক্তার জামিন পেয়েছেন। পুলিশি ক্ষমতায় এ চিত্র গোটা বাংলাদেশের চিত্র। ক্ষমতাসীন ও তাদের রক্ষাকর্তা পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলাবাহিনী এত বেপরোয়া হওয়ায় একমাত্র কারণ জবাবদিহিতাবিহীন এই রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনা। দেশের বোদ্ধা মহল মনে করে, রাজনৈতিক অপব্যবহারে পুলিশের প্রতি জনগণের আস্থা কমছে। তবে আমি মনে করি, ক্ষমতাসীনেরা পুলিশকে বিরোধী দল বিলীন করার কাজে আইনের অপপ্রয়োগের মধ্যে পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলাবাহিনীকে ব্যবহার করছে বলে পুলিশ এখন লাগামহীন। পুলিশ সরকারের দুর্বলতা জানে। তাই সরকারকে দুর্বল ভেবে নিজেরা নিজেদের ক্ষমতাবান মনে করে তাদের ‘বেপরোয়া’র আয়তন দিন দিন বাড়িয়ে তুলছে। জবাবদিহিতা নেই বলে তাদের নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। নিজ স্ত্রীকে হত্যার অভিযোগ রয়েছে এসপি বাবুল আখতারের বিরুদ্ধে। অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার পুলিশ দিয়ে নিজ স্ত্রীকে জেল খাটিয়েছেন। ওসিরা তো শুধু স্থানীয় সংসদ সদস্যের মনোরঞ্জন করে সংশ্লিষ্ট থানার রাজা বনে যান। ফলে তারা ‘কিং ক্যান নট ডু রং’ থিওরিতেই চলছেন। পুলিশ প্রধান শহিদুল হক অকপটে স্বীকার করেছেন, মাদক ও জঙ্গিবাদ নির্মূল করতে তারা ব্যর্থ হয়েছেন। সরকারবিরোধীদের দমন করতে পুলিশকে এত ব্যস্ত থাকতে হলে রাষ্ট্রের মূল সমস্যা দূর করতে তাদের ফুরসত (সময়) কোথায়?
৮ জানুয়ারি ২০১৮ নিজ কার্যালয়ে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে দুদক চেয়ারম্যান বলেছেন, ‘এমপিদের সম্পদের হিসাব জনগণ জানতে চায়’। প্রশ্ন হলো, জনগণ যা জানতে চায়; সেটা দুদক চেয়ারম্যান জানতে চান না কেন? দুদক আইন ২০০৪-এ তাকে এ ক্ষমতা দেয়া হলেও তিনি এমপিদের ক্ষেত্রে আইনগত ক্ষমতা প্রয়োগ করছেন না কেন?
দুদক আইনের ২৬ ধারা অনুযায়ী কেরানিদের সম্পদের হিসাব চেয়ে নোটিশ পাঠান, স্কুলশিক্ষকদের দুর্নীতি খোঁজার জন্য কোচিং সেন্টারে হানা দেয়ার ঘোষণা দেন, কিন্তু এমপিদের দুর্নীতি প্রশ্নে আইন প্রয়োগ না করে জনগণের কাঁধে বন্দুক রাখছেন কেন? কারণ এমপিরা সরকারি ঘরানার লোক। তারা দুদক চেয়ারম্যানের নিয়োগদাতা, পালনকর্তা। তাই দুদক আইন এমপিদের দিকে চোখ তুলে তাকাবে না। জবাবদিহিতা নেই বলে দুদক চেয়ারম্যানের এই অসহায়ত্ব।
পুলিশ বিভাগেও দায়িত্বশীল লোক রয়েছে, যাদের সংখ্যা মাইক্রোস্কোপ দিয়ে দেখতে হবে। ১৯৯৭ সালে ময়মনসিংহ কেন্দ্রীয় কারাগারে এবং ২০০৭-২০০৯ সালে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে অন্তরীণ থাকা অবস্থায় দুইজন কারারক্ষীকে দেখেছি, তারা হাজতি বা কয়েদিদের কাছ থেকে বাড়তি কোনো সুবিধা নেন না। ময়মনসিংহ কেন্দ্রীয় কারাগারে আমার সেলে দায়িত্বপ্রাপ্ত কারারক্ষীর সাথে রাত্রিকালীন ডিউটিতে অনেক কথাবার্তা হয়েছে। তখন তিনি বলেছেন, হালাল রুজি ছাড়া ইবাদত কবুল হবে না। অনুরূপ ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের কারারক্ষীও বলেছেন, আমি আমার বেতনের বাইরে এক টাকাও কারো থেকে নিই না। এ ধরনের কিছু লোক সরকারি চাকরিতে পাওয়া যায়, যারা মনে করেন সৃষ্টিকর্তার কাছে তার জবাবদিহিতা রয়েছে। জবাবদিহিতার অভাবই মানুষকে লাগামহীন করে তোলে। রাষ্ট্রীয় দায়িত্বপ্রাপ্তদের মধ্যে জবাবদিহিতা নেই বলেই মানুষ তাদের অধিকার থেকে বঞ্চিত।
দেশের বা একটি রাষ্ট্রের নিয়ামকশক্তি হচ্ছে রাজনীতি। কিন্তু সেই রাজনীতিও রাজনীতিবিদদের নিয়ন্ত্রণ থেকে লুটেরাদের নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে। ক্যাপিটালিজম বা কমিউনিজম, ধর্মভিত্তিক বা ধর্মবিহীন রাজনীতির একটি নীতি-আদর্শ আছে, যা নিজ নিজ ক্ষেত্রে তারা প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করে। কিন্তু লুটেরাদের কোনো নীতি-আদর্শ নেই। ‘যেখানে যা পাওয়া যাবে, তা গিলে খাওয়াই’ লুটেরাদের আদর্শ। কিন্তু দুঃখের বিষয়, রাজনৈতিক অঙ্গনে লুটেরাদের দিন দিন কদর বাড়ছে। কিন্তু দল যখন ক্র্যাকডাউন হয়, তখন লুটেরারা কোথাও সংস্কারবাদী, কোথাও সুবিধাবাদী, কোথাও চেহারা পরিবর্তন করে নিজ অবস্থানে ঠিক থাকে, বিপদে পড়ে তৃণমূলের নেতাকর্মী।
লুটের আরেকটি অভিজাত খাত হচ্ছে ব্যাংক খাত। লুটেরা বাহিনী দেশকে লুট করার জন্য রাজনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করার পদক্ষেপে সফলতা অর্জন করেছে। তারা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক ব্যাংক লাইসেন্স নিয়ে জনগণের অর্থ কৌশলে লুটে নিয়ে যাচ্ছে। ৯ জানুয়ারি ২০১৮ সালে পত্রিকান্তরে প্রকাশ, বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট তহবিলের ৫০৮ কোটি টাকাসহ বিভিন্ন গ্রাহকের গচ্ছিত অর্থ, অর্থাৎ আমানত ফারমার্স ব্যাংক নয়ছয় করছে। যার জন্য টিআইবি উদ্বেগ প্রকাশ করছে। ফারমার্স ব্যাংক একটি সদ্যপ্রসূত একটি ব্যাংক হওয়া সত্ত্বেও ‘জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্টের’ ৫০৮ কোটি টাকা সেখানে কেন গচ্ছিত রাখা হলো? দেশে আরো অভিজ্ঞ শিডিউল ব্যাংক থাকা সত্ত্বে¡ও ওই ব্যাংকে গচ্ছিত রাখা হলো না কেন? আজকে দেশে যদি গণতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা থাকত, তবে নতুন করে এতগুলো ব্যাংক পরিচালনার লাইসেন্স দেয়ার প্রশ্নে নিশ্চয়ই আলোচনা-সমালোচনা হতো। গণতন্ত্রের অভাবে জবাবদিহিতা নেই এবং জবাবদিহিতার অভাবে দেশকে চিরে খাচ্ছে লুটেরার দল। ‘সম্পদের সুষম বণ্টনের’ দাবিতেই স্বাধীন বাংলাদেশের দাবি স্বোচ্চার হয়। কিন্তু গণতন্ত্র আজ নিয়ন্ত্রিত হয়ে পড়ায় জনগণ সে দাবি আদায় থেকেও বঞ্চিত। মোটা দাগে বলতে হয়, স্বৈরতন্ত্রকেই গণতন্ত্র বলে চালিয়ে দেয়া হচ্ছে গণতন্ত্রের অপমৃত্যু হওয়ার কারণে।
লেখক : বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা
E-mail: taimuralamkhandaker@gmail.com

 

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫