ঢাকা, বুধবার,২৪ জানুয়ারি ২০১৮

উপসম্পাদকীয়

একজন নাগরিকের নিবেদন

মুহাম্মদ শাহজাহান সামিরী

১৩ জানুয়ারি ২০১৮,শনিবার, ০০:০০


প্রিন্ট

ব্রিটিশ শাসন দেখিনি। তাদের রেখে যাওয়া অপশাসন-কুশাসনের নিদর্শন দেখেছি। অত্যাচার-নিপীড়নের কথা লোকমুখে যেমন শুনেছি, বইপুস্তকে পড়েছি।
পাকিস্তানি তথা পশ্চিম পাকিস্তানিদের সুশাসন নামের আড়ালে অপশাসন-কুশাসনও দেখেছি। তাদের প্রবঞ্চনার বিরুদ্ধে উত্তাল জনবিস্ফোরণও দেখেছি। মুক্তিযুদ্ধ দেখেছি। প্রাণভয়ে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে গ্রাম-গ্রামান্তরে পালিয়ে বেড়িয়েছি। এরপর দেখে আসছি দেশীয় শাসন-অপশাসন, সব।
১৯৭২ সাল থেকে আজ অবধি কোনো শাসক দলই নিজেদের গুণকীর্তন করতে কার্পণ্য করেনি, বরং বেশিই করে। অথচ জনগণ সুশাসন, কুশাসন ও অপশাসনও দেখল। জনগণের এসব দেখাদেখির কোনো তোয়াক্কা করে না ওইসব দল। তারা অহরহ খই ফুটায় নিজ নিজ আমলের সুশাসন নামের জাদুকরী শব্দটির।
গগনছোঁয়া জনপ্রিয় নেতার স্খলন দেখার দুর্ভাগ্য হয়েছে এ দেশবাসীর। ১৯৭৩ সালে সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সংসদ নির্বাচন। যেখানে-সেখানে, মাঠঘাটে, জলাশয়ে, ক্ষেতখামারে পড়ে থাকতে দেখেছে ব্যালট পেপার। হেলিকপ্টারে করে ব্যালট বাক্স বঙ্গভবনে এনে ভোট গণনার কীর্তি প্রত্যক্ষ করতে হয়েছে করুণ অসহায় ও অবাকদৃষ্টিতে। দুর্ভাগ্যই এ দেশবাসীর।
১৯৭৭ সালে আজব হ্যাঁ-না ভোট দেখেছে জনগণ। দেখেছে ১৯৮৬ সালের পাতানো আর ১৯৮৮ সালের প্রহসনের নির্বাচন। ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি হয়েছে একতরফা নির্বাচন। ২০০৮ সালের কিম্ভূতকিমাকার তত্ত্বাবধায়ক সরকারের নামে সামরিক সরকারের আঁতাতের নির্বাচন দেখার দুর্ভাগ্য হলো অধিকারবঞ্চিত জনতার। সর্বশেষ দেখল অবাকবিস্ময়ে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারিতে। ১৫৪ জন প্রার্থী সংসদ সদস্য হয়ে গেলেন জনগণের ভোট ছাড়াই। বাকিরা সংসদ সদস্য হয়েছেন মাত্র ৫ শতাংশ ভোটারের ভোটে। স্থানীয় সরকার নির্বাচন হয়েছে কেন্দ্র দখল ও জালিয়াতির মাধ্যমে। রাষ্ট্রপ্রধান, সরকারপ্রধান ও নির্বাচনসংশ্লিষ্টরা এবং প্রশাসনযন্ত্র তা জানে শতভাগ। শুধু ভাসুরের নাম মুখে আনে না কেউ।
বাংলাদেশের নির্বাচনী ইতিহাসে প্রত্যেক সরকারপ্রধানের ললাটে নির্বাচনী কলঙ্কতিলক ঠাঁই করে নিয়েছে। এটা স্থায়ী ও অমোছনীয়।
নির্বাচন নিয়ে তাই কারো বড়গলায় কথা বলার যুক্তি নেই। তৃপ্তির সন্তোষে ঢেঁকুর তোলার উপায় নেই। জনগণ দেখে আসছে সেই ১৯৭৩ সাল থেকে, দলীয় সরকারের অধীনে ভোটের নামে অভোট বা কুভোট। নির্দ্বিধায় বলা যায়, দলীয় সরকারের অধীনে বিশেষত জাতীয় সংসদদের সুষ্ঠু অবাধ নিরপেক্ষ প্রভাবহীন ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হওয়া সম্ভব নয়। প্রায় প্রত্যেক সরকারের আমলে (১৯৭২ থেকে বর্তমান) হয়েছে গুম, অপহরণ, হত্যা, বিচারবহির্ভূতসহ নারকীয় তাণ্ডব। কারো হাত পরিচ্ছন্ন নয়। কাজেই পরস্পরের প্রতি এ নিয়ে কাদা ছোড়াছুড়ি করা অনুচিত। নির্বাচন ও খুনখারাবি নিয়ে বড় দলগুলোর কথা বলা আত্মপ্রবঞ্চনা মাত্র। দেশের জনগণ খুব ভালো করেই জানে প্রত্যেকের অতীত।
ইদানীং ঝড় উঠেছে, রাজনীতির ময়দানে একাদশ সংসদ নির্বাচন কোন সরকারের অধীনে হবে তা নিয়ে। এ ঝড় প্রবলভাবে উঠেছিল দশম সংসদ নির্বাচনের আগে।
ক্ষমতাসীনদের অটল মনোভাবÑ একাদশ সংসদ নির্বাচন হবে তাদের অধীনেই। ক্ষমতাসীন (১৪ দল) ছাড়া অপরাপর দল (২০ দলীয় জোটসহ) দাবি তুলেছে, নির্বাচন হতে হবে শুধু তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে। তত্ত্বাবধায়ক সরকার, সহায়ক সরকার বা নির্বাচনকালীন সরকার, যে নামেই হোক তাদের অধীনে নির্বাচন হওয়া চাই; কোনো দলীয় সরকারের অধীনে নয়। এ দাবিটি অযৌক্তিক নয়। একদা দাবিটি ছিল বর্তমান ক্ষমতাসীন দলেরও।
নির্বাচন কমিশন আয়োজিত রাজনৈতিক দলের সাথে ইসির সংলাপেও উঠে এসেছে দাবিটিÑ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে সংসদ নির্বাচন হতে হবে। ক্ষমতাসীন জোট ছাড়া সবার দাবি এটা। এ নিয়ে উভয় শিবির মুখোমুখি অবস্থানে। আলামত শুভ দেখছে না দেশবাসী। ঈশান কোণে কালবৈশাখীর আশঙ্কা করছে জনগণ।
এরই পরিপ্রেক্ষিতে দু’টি কথা আরজ করতে চাই রাজনৈতিক ব্যক্তি, দল ও জনগণের কাছে। বিশেষত, ক্ষমতাসীন দল ও প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার কাছে। আমি বয়োবৃদ্ধ অতি সাধারণ নাগরিক। কোনো দলের প্রতি নেই কোনো দুর্বলতা। সুযোগ পেলে আমার বিবেচনায় যিনি সৎ, দক্ষ ও যোগ্য প্রার্থী মনে করি, তাকেই ভোট দেই। এ দেশবাসী বড্ড আশা-প্রত্যাশা ও মনেপ্রাণে কামনা করেÑ দেশটা যেন আর বিশৃঙ্খল ও অরাজকতার নিগড়ে না পড়ে; জানমালের ক্ষতি না হয়।
এটা প্রমাণিত, দলীয় সরকারের অধীনে কোনো নির্বাচন সুষ্ঠু, অবাধ ও প্রভাবহীন হয়নি বা হয় না। ভবিষ্যতে হওয়ার সম্ভাবনাও শূন্য। যদি রাজনীতিকদের মনমানসিকতার পরিবর্তন না হয়, মনের উৎকর্ষ না হয়, ক্ষমতার মোহের ঊর্ধ্বে উঠতে না পারেন; তবে কস্মিনকালেও ভোট সুষ্ঠু হবে না। তাহলে সুষ্ঠু, সুন্দর ও নিরপেক্ষ বাধাহীন প্রভাবহীন গ্রহণীয় নির্বাচন হবে কিভাবে?
প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত দলের সবার এককথাÑ সংবিধান থেকে এক চুল নড়া যাবে না। সংবিধান অনুসারে হবে নির্বাচন। বেশ ভালো কথা, কিন্তু সংবিধানের জন্য তো জনগণ নয়, জনগণের জন্যই সংবিধান। তা ছাড়া সংশোধিত বর্তমান সংবিধান তো সর্বসম্মত নয়ই, এমনকি নয় প্রকৃত সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে প্রণীত। সংশোধন হয়েছে একতরফা। যুগ-চাহিদা, জন-চাহিদা ও দেশের কল্যাণের জন্য সংবিধান সংশোধিত হয়। বাংলাদেশে সংবিধান সংশোধন হয়েছে ১৬ বার। তাহলে জনস্বার্থে দেশের মঙ্গলের জন্য জনগণের দাবি অনুযায়ী আরেকবার সংশোধন অবশ্যই করা যায়। বর্তমান সংসদে ক্ষমতাসীন দলের রয়েছে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা। তাই সহজেই জনমতের প্রতিফলন ঘটিয়ে সংবিধান সংশোধন করে তত্ত্বাবধায়ক বা সহায়ক বা নির্বাচনকালীন সরকারÑ যে নামেই হোক পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা যায়। তা করা হলে ক্ষমতাসীন দলের তথা প্রধানমন্ত্রীর অবদান ইতিহাসে থাকবে স্মণীয় হয়ে।
সংবিধান কোনো ধর্মগ্রন্থ নয় যে, তাতে হাত দেয়া যায় না বা যাবে না। হাত তো পড়েছে অনেকবার। ভবিষ্যতে কাঁচি পড়বে, তা নিশ্চিতভাবেই বলা যায়। আরো কতবার পড়বে তা ভবিতব্যই বলবে। তা হলে বর্তমানে সেটা সংশোধন করতে অনীহা পোষণ করা উচিত নয়।
আরেকটি কথা। তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা যদি সংবিধান পরিপন্থী হয়, তবে এটাকে প্রতিষ্ঠা করতে কেন তুমুল আন্দোলন করা হয়েছিল? তখন হরতাল হয়েছিল ১৭৩ দিবস। রেললাইন তুলে ফেলা হয়েছিল। মানুষ পুড়িয়ে মারা হয়েছিল। পেট্রল ঢেলে, গানপাউডার ছিটিয়ে বাস ও মানুষ পোড়ানো হয়েছিল। দিগম্বর করা হয়েছিল অফিসগামী কর্মকর্তাকে। সদ্যনির্মিত দৃষ্টিনন্দন চট্টগ্রাম রেলস্টেশনে দেয়া হয়েছিল আগুন। বন্দর করা হয়েছিল অচল। দেশকে করা হয়েছিল বিভীষিকাময়। জনগণ ও রাষ্ট্রের ক্ষতি হয়েছিল ব্যাপক।
ক্ষমতায় বসে সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে নিজেদের অর্জিত রাজনৈতিক সম্পদকে (তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা) করা হলো সংবিধান থেকে বিদায়। ব্যক্তি, রাষ্ট্রীয় সম্পদ ও মানবরক্তে কেনা তত্ত্বাবধায়ক এই ব্যবস্থা বাতিল করে দেয়া হলো। সুপ্রতিষ্ঠিত ও সব মহলে প্রশংসিত এবং বিশ্বের কাছে সমাদৃত তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা এক ফুৎকারে ‘নাই’ হয়ে গেল!
ক্ষমতাসীন দল ও সরকারের আকাক্সক্ষা যদি হয় সুষ্ঠু অবাধ প্রভাবহীন নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন, তাহলে মসনদ থেকে সরে আসতে কিসের ভয়? ক্ষমতা কখনো চিরস্থায়ী হয় না। একদিন-না-একদিন ক্ষমতা ছাড়তেই হয়। স্বেচ্ছায় বিদায় হওয়া সর্বোত্তম, সম্মান ও উদারতার পরিচয়।
ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের হরহামেশা বক্তব্যÑ বাংলাদেশকে করা হয়েছে পৃথিবীর বুকে ‘উন্নয়নের রোল মডেল’। গণতন্ত্রের প্রতীক। উন্নয়নের জোয়ারে সয়লাব সমগ্র বাংলাদেশ। হয়েছে সামাজিক উন্নয়ন। অর্থনৈতিক উন্নয়ন। নি¤œমধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হয়েছে। অচিরেই পৌঁছে যাবে মধ্যম আয়ের দেশের কাতারে। করা হয়েছে আইনশৃঙ্খলার উন্নতি। জনগণ নিশ্চিন্তে নির্বিঘেœ ঘুমাতে পারে। হয়েছে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ। গরিব অভাবীরা দু’বেলা পেটপুরে খেতে পায়। প্রশান্তির সুবাতাস বয়ে চলেছে বাংলাদেশের ওপর দিয়ে।’
এত উন্নয়নের পরও কেন ভোট নিয়ে ক্ষমতাসীনদের এত ভয় সংশয় সন্দেহ আর দুশ্চিন্তা? যে সরকারের অধীনেই নির্বাচন হোক না কেন, তাদের দাবিমাফিক উন্নয়নের রোল মডেলের প্রভাবে এবং উন্নয়নের ধারাবাহিকতা রক্ষার জন্য জনগণ স্বতঃস্ফূর্ত ভোট দিয়ে তাদেরই ক্ষমতায় ফিরিয়ে আনার কথা। সরকারের এখন দায়িত্ব হবে সুষ্ঠু অবাধ নিরপেক্ষ ও প্রভাবহীন নির্বাচন নিশ্চিত করা।
ক্ষমতায় আমাদেরই থাকতে হবে, এ রকম মনোভাব কারো থাকা উচিত নয়। জনগণ একমাত্র নির্ধারকÑ কারা ক্ষমতায় থাকবে বা যাবে। আর এর একমাত্র নির্ধারণ মাপকাঠি সুষ্ঠু নির্বাচন, অন্য কিছু নয়।
এ রকম মনোভাব কারো থাকা সমীচীন নয় যে, আমরা ক্ষমতায় না থাকলে দেশটা হয়ে যাবে পাকিস্তান অথবা ভারত। মনে রাখা উচিত, রক্তে কেনা আমাদের এই প্রিয় বাংলাদেশ থাকবে বাংলাদেশ হয়েই, জনগণই সেটা নিশ্চিত করবে।
প্রধানমন্ত্রী কি পারেন না দেশের স্বার্থে, জনগণের কল্যাণের কথা চিন্তা করে হৃদয়ের বিশালতা প্রদর্শন করতে? সংবিধানের দোহাই না দিয়ে ইতিহাস সৃষ্টি করুন। বিশ্ববাসী দেখুক আপনার কৃতিত্ব। সুযোগ আছে সংবিধান সংশোধন করার। জনগণ চাইলে আপনিই ফিরে আসবেন ক্ষমতার মসনদে স্বমহিমায়। বোঝার চেষ্টা করুন জনগণের আকাক্সক্ষা। একগুঁয়েমি পরিহার করুন। বিশৃঙ্খলা, অরাজকতা ও খুনখারাবি থেকে বাঁচান দেশ ও জনগণকে। আল্লাহ আমাদের সহায় হোন।

 

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫