ঢাকা, বুধবার,২৪ জানুয়ারি ২০১৮

দিগন্ত সাহিত্য

ফজলুল হক তুহিনের কবিতা : বর্ষণের ধারাপাত

রেজাউদ্দিন স্টালিন

১২ জানুয়ারি ২০১৮,শুক্রবার, ০০:০০


প্রিন্ট

ফজলুল হক তুহিন এক প্রাজ্ঞ সৃষ্টিশীল সাহিত্যকর্মী। সব্যসাচী লেখক। কবিতা-গবেষণা-প্রবন্ধ ইত্যাকার মাধ্যমে নিবিড়ভাবে কাজ করার অভিজ্ঞতা আছে তার। তাকে ‘নতুন এক মাত্রা’ পত্রিকার সম্পাদক হিসেবে প্রথমে পাই। পরবর্তীকালে তার লেখার সাথে আমার ঘনিষ্ঠ পরিচয় ঘটে। আমি গভীরভাবে লক্ষ করেছি একজন রুচিবান ও পরিচ্ছন্ন মানুষ তিনি। গবেষণাকর্মে দারুণ নিবেদিত। বাংলাভাষার জীবন্ত কিংবদন্তি আল মাহমুদের কবিতাকর্ম নিয়ে গবেষণা তাকে বাংলা ভাষায় আলোচিত ও সমাদৃত করেছে। আল মাহমুদের কাব্যকর্মের গবেষক ড. ফজলুল হক তুহিন সমকালীন কাব্যভুবনের সাথে ওতপ্রোতভাবে সংশ্লিষ্ট হয়ে আছেন। তার কবিতার প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো আধুনিকতা ও ধ্রুপদী আঙ্গিকের মেলবন্ধন ঘটানো। এ ক্ষেত্রে তিনি সমন্বয়বাদী। তার জীবনবোধ সমকালীন হয়েও ইতিহাসলগ্ন এবং ঐতিহ্যিক সোঁদাগন্ধে ভরা তার অনুভব। আমি পাঠক হিসেবে তার কবিতাকে নানা দৃষ্টিভঙ্গিতে ব্যবচ্ছেদ করে দেখেছি যে, ফজলুল হক তুহিন একটি নিজস্ব ভাষাভঙ্গি তৈরির প্রস্তুতি পর্বে আছেন। সাহসের শিল্পিত রূপই কবিতা। হ্যাঁ, আমরা তার মধ্যে সেই সাহসের সমাচার দেখি।
বর্তমান বিশ্ব প্রবেশ করেছে এক প্রযুক্তির জগতে। সেখানে সবই উন্মোচিত- অবগুণ্ঠন ভেঙে দেয়াই যেন একুশ শতকের সভ্যতায় উদ্দেশ্য। সেখানে শিল্পের অবগুণ্ঠন তৈরি করা কি দুরূহ নয়? পাঠক জানেন নির্মেদ সরাসরি উচ্চারণের মধ্যেও কাব্যিক দ্যোতনা নির্মাণ করা যায়। তার একমাত্র উদাহরণ তিরিশের সমর সেন। ফজলুল হক তুহিনের মধ্যে সমর সেনের হেঁটে যাওয়া পথের সদ্ধান পাই। জীবনানন্দ দাশের রহস্যময় পেঁচা, নবান্নের কাক, হেমন্তের ইঁদুর নেই; আছে বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতি লালন, হাছন, নজরুল, জসীমউদ্দীন আছে বিশাল আকাশ আর নক্ষত্রের আলিঙ্গন।
ফজলুল হক তুহিন কোনো ঘেরাটোপে নিজেকে বন্দী করেননি। বরং একটা স্বাধীন ও স্বকীয় সত্তার উদ্বোধন টের পাই তার মধ্যে। বৈশ্বিক কাব্যান্দোলনের যে অনুররণ বাংলা কবিতায় তিরিশের দশকে আছড়ে পড়ে তার কিছু আভা ও রক্তিম লালিমা আছে তুহিনের উপমা-উৎপ্রেক্ষায়। নজরুল রবি-বলয়ের বাইরে যেতে যে শব্দবদ্ধের হাতুড়ি চালিয়েছিলেনÑ তা ছিল দেশীয় শব্দের পাশাপাশি আরবি, ফারসি এমনকি ইংরেজি। ফজলুল হক তুহিন খুবই ছন্দ সচেতন ও দেশী শব্দ ব্যবহারে প্রতি ঝোঁক যেমন আছে, সে রকম নতুন নতুন বিদেশী অনিবার্য শব্দকেও তিনি করায়ত্ত করেন নিজস্ব পারঙ্গমতা দিয়ে। আমাদের সমকালীন কাব্যধারার একটা প্রবণতা হলো শেকড়ে ফেরাÑ কেউ তাকে উত্তরাধুনিক বলেন। আমি বলি আধুনিক কবিতা। আধুনিক শব্দটি আপেক্ষিক, তার যাত্রার শেষ নেই। সব মানসম্মত কবিতাই সমকালে আধুনিক। কালিদাস, ঈশ্বর গুপ্ত, মাইকেল, রবীন্দ্রনাথ, নজরুল তারা তাদের সমকালে নিঃসন্দেহে আধুনিক। সৃষ্টির চূড়ান্ত উৎকর্ষই হলো শিল্প। এই চূড়ান্তে যে যায় সেই তো আধুনিক। যদিও ১৯২১ সাল থেকে ইয়েটস-ইলিয়টরা রোমান্টিকতাবিরোধী আন্দোলনকেই আধুনিক বললেন। বললেনÑ যেখানে রোমান্টিকতার শেষ সেখানেই আধুনিকতার শুরু। আমি আজ অব্দি এমন কোনো মহৎ কবি পাইনি যিনি রোমান্টিকতায় আচ্ছন্ন থাকেননি। এমনকি বিশ শতকের শ্রেষ্ঠ আধুনিক কবি প্রতিভার অন্যতম জনক পাবলো নেরুদাÑ তিনিও রোমান্টিকতায় সর্বশেষে আক্রান্ত। তার কুড়িটি প্রেমের কবিতাগ্রন্থের কবিতাগুলো তার সাক্ষ্য বহন করছে।
ফজলুল হক তুহিন রোমান্টিক ভাবালুতায় আচ্ছন্ন নন; বরং চল্লিশ দশকের আবুল হোসেন, অরুণ মিত্র; পঞ্চাশের সাইয়িদ অতিকুল্লাহ; ষাটের রবিউল হুসাইন প্রমুখের উত্তরাধিকার স্বল্পমাত্রায় বহন করেন। চূড়ান্ত রোমান্টিকতাবিরোধী তিনি নন। বর্তমান কবিতায় আবেগ হারিয়ে যাচ্ছে, এমনকি কথাসাহিত্যেও। সে কারণে ২০১৭ সালে আবেগী লেখক ইশিগুরোকে নোবেল দেয়া হলো; এমনকি গীতিকবিতার কবি ও গায়ক বব ডিলানকে আগের বছর। আমরা বর্তমান বিশ্বের কাব্যধারার মধ্যে একটা নতুন রোমান্টিকতা, এমনকি আবেগের অনুবর্তন টের পাচ্ছি। ফজলুল হক তুহিন সে ধারাকে অস্বীকার করেননি। তার কয়েকটি কবিতার পঙ্ক্তি উদাহরণ এখানে উপস্থাপন করছিÑ
ক. ফেরা-না-ফেরার কত মানুষের পদচিহ্ন পৃথিবীতে আছে লেগে
আমিও ফেরার যাত্রী। পদচ্ছায়া রেখে যেতে চাই ফেরার বৈভবে।
আত্মার তৃষ্ণায় আমি ফেরার নদীতে আকণ্ঠ সাঁতরে যেতে চাই
আমার আশ্রয়ে
নিজ ঠিকানায়।
খ. বুঝি না বাড়িতে কি আছে
শুধু জানি বাড়িই আমার সূর্য আর আমি নিজ কপথ চলা এক অনুগত গ্রহ,
এর ব্যতিক্রমে রক্তে আমার জাগে অব্যর্থ দ্রোহ।
গ. বর্ষণের ধারাপাতে ধরিত্রীর সবুজ বিপ্লব
বিছিয়ে দিয়েছো তুমি আদিগন্ত শাড়ির আঁচল।
আমি খুলে দিতে চাই সৃজনের ভেজানো আগল
বর্ষণে কর্ষণ হবে আর হবে স্বপ্নের উৎসব।
ঘ. পুঁজির প্রকাশ যেন অন্ধ না করে সবুজ-দিগন্ত-আকাশ
চাঁদসূর্যের আলোয় মেলে দিই এই আত্মা এই মন
সরাও তোমার বিজ্ঞাপন!
ফজলুল হক তুহিনের কবিতায় মেজাজ বুঝতে ওপরের লাইনগুলো যথেষ্ট নয়। বরং একটি সম্যক আন্দাজ তৈরি হতে পারে। আমি লক্ষ করি বৃষ্টিভেজা বাংলার প্রকৃতি, এক অসীম আকাশ আর আদিগন্ত প্রান্তরের আঁচল, পুঁজির অন্ধ প্রকাশ তার কবিতার উপজীব্য। মানুষ এক দার্শনিক সত্তা, যার সামাজিক ক্রিয়াকর্ম কবিতায় ধরা পড়েছে অনুষঙ্গ হিসেবে। মূল অর্থাৎ শেকড় প্রোথিত দেশপ্রেম ও মানবপ্রেমের আবিষ্কারে তার কবিসত্তা বর্ষণের ধারাপাতে পরিকীর্ণ।

 

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫