ads

ঢাকা, শনিবার,২১ এপ্রিল ২০১৮

ইসলামী দিগন্ত

দাওয়াত ও তাবলিগ

মো: আবদুল্লাহ

১২ জানুয়ারি ২০১৮,শুক্রবার, ০০:০০


প্রিন্ট

আরবি ‘ইস্তেমা’ শব্দটির বাংলা অর্থ শ্রবণ-শোনা, মনোযোগসহ শ্রবণ। আর ‘ইজতেমা’ মানে হচ্ছেÑ সম্মিলন, সাক্ষাৎ, বৈঠক, সভা, সমাবেশ, সম্মেলন, সমাজ, সমাজবদ্ধতা, সামাজিকতা, সমাজজীবন।
শব্দ দু’টির অর্থের প্রতি মনোযোগ দিলে ‘বিশ^ ইস্তেমা’ ও ‘বিশ^ ইজতেমা’-বাক্যদ্বয়ের মর্মার্থ বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। অর্থাৎ বিশ^ মুসলিমের মনোযোগসহ শোনার বিষয় বা অনুষ্ঠান; বিশে^র মুসলমানদের সম্মিলন বা সম্মেলন বা সভা-সমাবেশ-বৈঠক। তবে ‘ইস্তেমা’-এর স্থলে ‘ইজতেমা’ শব্দটি অধিক উপযোগী। এ ছাড়া, যেহেতু পরিচিত বিশে^র অনেক বা বেশির ভাগ দেশই এতে অংশগ্রহণ করে, তাই এটিকে ‘বিশ^ ইজতেমা’ বলতে অবাস্তব বা দোষের কিছু নেই।
দাওয়াত : ‘দাওয়াত’ আরবি শব্দটির অর্থ হচ্ছেÑ ডাক, আহ্বান ও প্রচার। ‘তাবলিগ’ শব্দটিও আরবি। এর মানে হচ্ছেÑ প্রচার, ঘোষণা বা পৌঁছে দেয়া, ‘দ্বীনি দাওয়াত’ তথা ধর্মের বাণী প্রচার করা বা পৌঁছে দেয়া। সুতরাং সহজভাবে বলতে পারি, ‘দাওয়াত ও তাবলিগ’ মানে ইসলাম ধর্মের প্রচার-প্রসার এবং ইসলামের বাণী-পয়গাম সারা বিশে^ পৌঁছে দেয়া, ছড়িয়ে দেয়া।’
প্রসঙ্গকথা : ইসলাম ধর্মের মৌলিক ও সেবামূলক যত কাজ আমরা করে থাকি, তার সবগুলোর উদ্দেশ্যই হচ্ছেÑ মুসলমানদের ঈমান-আমল, তাকওয়া-পরিশুদ্ধি, সততা ও যোগ্যতা অর্জিত হয়ে যেন আমরা ইহকাল ও পরকাল উভয় জাহানে সফল ও সোনার মানুষ হতে পারি। আর এ লক্ষ্যে পরিচালিত মসজিদ-মাদরাসা, খানকা, নায়েবে নবী, হাক্কানি আলেম, ওলি-আউলিয়া, পীর-মাশায়েখ, ইমাম-খতিব-বক্তা ও দাঈগণÑ এক কথায় সবার মেহনত, তৎপরতার অবদান ও সফলতা অনস্বীকার্য এবং কমবেশি সবারই প্রশংসারযোগ্য। অবশ্য এটি লক্ষণীয় যে, এদের সবার ঈমান-আমল-তাকওয়া ও খাঁটি মুসলমান বানানোর যৌথ মেহনতের পাশাপাশি মাদরাসা শিক্ষার সাথে জড়িতরা মৌলিক দায়িত্ব পালনের সাথে সাথে শিক্ষাকে যেমন প্রাধান্য দিয়ে থাকেন, তেমনি পীর-মাশায়েখরা আত্মশুদ্ধি ও আল্লাহর পরিচয়-প্রেম-ভালোবাসাকে অগ্রাধিকার দিয়ে থাকেন। একইভাবে তাবলিগ সংশ্লিষ্টরা ‘দাওয়াত’-এর মেহনতের প্রতি অধিক জোর দিয়ে থাকেন। মহান আল্লাহ সবার মেহনত ও সেবাকে কবুল করুন!
বাস্তবতার নিরিখে বিচার করতে গেলে বলতে হবে, বর্তমানে ‘দাওয়াত ও তাবলিগ’ নামে পরিচিত যে জামাতকে আমরা জানি ও চিনি, এদের মেহনত-তৎপরতার ব্যাপকতার পাশাপাশি, অল্প সময়ে, সব মহলে, এত অধিকসংখ্যক মুসলমানের ঈমান-আমল-তাকওয়ার দিকে পরিবর্তন, সুন্নাত-নফলের প্রতি অনুরাগ সৃষ্টি, সত্যিই আল্লাহ তায়ালার বিশেষ দান।
তার পরও পুরো কুরআন, সুন্নাহ, ইজমা ও কিয়াসকে সামনে রেখে শরিয়তের মাপকাঠিতে ‘তাবলিগ’ বিষয়টিকে আমাদের মূল্যায়ন করতে হবে।
তাবলিগের প্রয়োজনীয়তা : মহাগ্রন্থ আল-কুরআনের বাণী অনুযায়ী যেহেতু মহানবী হজরত মুহাম্মদ সা: সর্বশেষ নবী। তাঁর পরে আর কোনো নবী-রাসূল আসবেন না। অথচ তাঁর প্রতি অবতীর্ণ ‘সর্বশেষ ধর্ম’ এবং এই ধর্মের যাবতীয় বিধিবিধান সম্বলিত সর্বশেষ আসমানি গ্রন্থ ‘আল-কুরআন’ কিয়ামত পর্যন্ত আগত তামাম বিশ^বাসীর হিদায়েতপ্রাপ্তির সর্বশেষ মূল উৎস। তাই এ ধর্ম ও ধর্মগ্রন্থের বাণী, তার আহ্বান বিশ^ মানবতার দ্বারে দ্বারে পৌঁছে দেয়া এবং এর প্রচার-প্রসার একমাত্র ‘দাওয়াত ও তাবলিগ’-এর মাধ্যমেই সম্ভব। এ থেকে দাওয়াত ও তাবলিগের প্রয়োজনীয়তা ও তাৎপর্য সহজেই অনুমেয়।
তাবলিগরতদের জন্য শরিয়তের আবশ্যকীয় আইন : যারা প্রচলিত তাবলিগ ও ধর্মীয় অপরাপর কাজের তাবলিগে আত্মনিয়োগ করবেন, তাদের অবশ্যই নি¤েœাক্ত আইন-বিধান মেনে চলতে হবেÑ
প্রথম আইন : কোনো কল্যাণ-লক্ষ্যের যুক্তিতেই যেকোনো ছোট পাপের কাজেও জড়িয়ে পড়া জায়েজ নেই। এ ক্ষেত্রে মহান আল্লাহর বিধান হচ্ছেÑ ‘তোমরা আমার মনোনিত ধর্মের কাজ করো; কিন্তু ধর্মের সেবার দোহাই দিয়ে কোথাও আমার নির্ধারিত আইন-বিধানের সামান্যতম কাটছাটেরও অনুমতি নেই’। উদাহরণত, এমন বক্তব্য বা যুক্তি যে, ‘তাবলিগ বা দাওয়াতের স্বার্থে আপাতত বিদয়াত কর্মে, পাপের অনুষ্ঠানে, সুদখোর বা ঘুষখোরের বাড়িতে খেয়ে নাও; কল্যাণ চিন্তা মাথায় রেখে অনুরূপ কোনো পাপ কাজে অংশগ্রহণ জায়েজ; বরং তাতেও সওয়াব রয়েছে’!(নাউজুবিল্লাহ)।
দ্বিতীয় আইন : ছোট-বড় যেকোনো পাপকর্ম দেখলে তা সামর্থ্য অনুযায়ী প্রতিহত বা প্রতিরোধ করা ফরজ। এ বিধানটি তাবলিগ কর্মে জড়িত বা অন্য যেকোনো ধর্মীয় কাজে জড়িতদের মনে রাখতে হবে। একইভাবে তাবলিগের দু’টি ডানাÑ ‘সৎকাজে আদেশ’ ও ‘অসৎকাজে নিষেধ’। বিষয়টি খোদ তাবলিগ সংক্রান্ত কুরআনের আয়াতগুলোতেই যেখানে বিদ্যমান, সেখানে ‘অসৎকাজে নিষেধকে এড়িয়ে যাওয়া অথবা নিজের খেয়ালখুশিমতো প্রয়োজনে অসৎকাজে অংশগ্রহণও জায়েজ বলা মারাত্মক শরিয়তবিরোধী বক্তব্য।
তৃতীয় আইন : প্রয়োজনে যুদ্ধ-জিহাদে তাবলিগও ফরজ। আগেই বলা হয়েছে, তাবলিগের বিভিন্ন বিভাগ ও শাখা রয়েছে। যার অন্যতম এটিও যে, নিজ দেশের প্রয়োজনে, দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের প্রয়োজনে, নিজ ঈমান ও ধর্মের প্রয়োজন মুহূর্তে বিধি মোতাবেক যুদ্ধ-জিহাদে তাবলিগ করাও ফরজÑ এটি সংশ্লিষ্ট সবাইকে মনে রাখতে হবে।
চতুর্থ আইন : ধর্মের অপরাপর বিভাগ ও শাখায় কর্মরতদের হেয় বা ছোট মনে করা যাবে না। ধর্মের বহুমুখী ও বিভিন্ন বিভাগে জড়িতরা পরস্পর একে অন্যকে হেয় করা হারাম ও কবিরা গুনাহ। যে কারণে শরীয়তের সীমার ভেতরে যারা আল্লাহর বিধান মোতাবেক মুসলমানদের সমাজ ও রাষ্ট্র পারচালিত হওয়ার লক্ষ্যে রাজনীতি করেন, তাদের এমন বক্তব্য বা দাবি যে, ‘আমরাই কেবল ইসলামের আসল ফরজ আদায় করছি’! কিংবা যারা তাবলিগ করেন, তাদের এমন দাবি যে, ‘খাঁটি ইসলামের কাজ এবং সঠিক তাবলিগের কাজ আমরাই করছি’! কিংবা মাদরাসা সংশ্লিষ্টদের এমন কথা যে, ‘আসল দ্বীনি কাজ তো আমরাই করছি’! এমন সব বক্তব্য বা দাবি মোটেও জায়েজ নেই।
পঞ্চম আইন : অন্যদের তুলনায় নিজের ও ছেলেমেয়েদের ইসলাহ-সংশোধনের চিন্তা-ফিকির অধিক জরুরি ও গুরুত্বপূর্ণ। কেননা, মহান আল্লাহর নির্দেশ, ‘হে মুমিনগণ! তোমরা নিজেদের এবং তোমাদের পরিবার-পরিজনদের অগ্নি হতে রক্ষা করো’ (৬৬ : ০৬)।
ষষ্ঠ আইন : যারা স্বেচ্ছায় দ্বীন-ধর্ম শিখতে আগ্রহ নিয়ে উপস্থিত হয়, অন্যদের চেয়ে তাদের প্রাধান্য দিতে হবে। ধর্মের তাবলিগ ও শিক্ষা সবার কাছেই পৌঁছাতে হবে; সংশ্লিষ্টদের আগ্রহ থাকুক বা না থাকুক। তার পরও যারা আগ্রহী ও উপস্থিত তাদের হক অগ্রগণ্য।
সপ্তম আইন : জিকির ও ফিকিরের অধিক অনুশীলন। কেননা, যে ব্যক্তি অধিক হারে নিজের ইসলাহ ও পরিশুদ্ধির চিন্তা-চেতনা রাখবে এবং নির্জনে আমল-ইবাদত, জিকির-তাসবিহ, মুরাকাবা-মুহাসাবার প্রতি যতœবান থাকবে; তার তাবলিগ, তালিম ও পরিশুদ্ধির মেহনত অধিক কার্যকর ও ফলদায়ক হবে (প্রাগুক্ত; খ-৯,পৃ: ১৪২-১৬২)।
মহান আল্লাহ আমাদের শরিয়তের মাপকাঠি অনুযায়ী ‘দাওয়াত ও তাবলিগ’-এর কাজের গুরুত্ব বোঝার এবং সেই অনুযায়ী আমল করার তাওফিক দান করুন।
লেখক : মুফতি, ইফা

 

ads

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫