ads

ঢাকা, শনিবার,২১ এপ্রিল ২০১৮

ইসলামী দিগন্ত

বিবেকবর্জিত মানুষ পশুর অধম

ইয়াসমিন নূর

১২ জানুয়ারি ২০১৮,শুক্রবার, ০০:০০


প্রিন্ট

আমরা দোষ-গুণের সমন্বয়ে গড়া মহান স্রষ্টার অতি ুদ্র সৃষ্টি। আমাদের স্বভাবচরিত্রে যেমন আছে প্রেম-ভালোবাসা, দয়া-মমতা; তেমনি আছে হিংসাবিদ্বেষ, ক্রোধ, লোভ, অহঙ্কার প্রভৃতি। সেই সাথে রহস্যময় স্রষ্টা আমাদের আরো দান করেছেন বিচার-বিবেচনা করার ক্ষমতা। দোষ করার ক্ষমতা যেহেতু স্বভাবগত, সেহেতু ফেরেশতাতুল্য বা দেবতাতুল্য হওয়া আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়। কারণ ফেরেশতাদের বা দেবতার স্বভাবে দোষ করার কোনো ক্ষমতাই নেই। অপর দিকে গুণগুলোর কারণে দোষগুলো আমাদেরকে পশুর পর্যায়েও নিয়ে যেতে পারে না। মাঝে রইল বিচার-বিবেচনা করার ক্ষমতা বা ‘বিবেক’ নামক মানুষের অন্তর্নিহিত শক্তি। এ শক্তির সুষ্ঠু ব্যবহারই মানুষকে দিতে পারে তার যথাযোগ্য মর্যাদা। অর্থাৎ স্রষ্টা প্রদত্ত মানুষের সর্বশ্রেষ্ঠত্বের মর্যাদা অুণœ রাখার একমাত্র হাতিয়ারই হলো ‘বিবেক’। সক্রিয় বিবেকই মানুষকে দিয়ে সঠিক কাজ করিয়ে নেয়, সঠিক পথে পরিচালিত করে। আর এ শক্তি বলেই মানুষ অর্জন করতে পারে স্রষ্টার সন্তুষ্টি, মুক্তির পথ, সর্বকালীন কল্যাণকর শান্তিময় জীবন। আমাদের অনেকের ধারণা, অনুক্ষণ উপাসনা-প্রার্থনায় লিপ্ত থাকলেই বুঝি আমরা মুক্তির পথ পেয়ে যাবো। কিন্তু এ ধারণা বোধ হয় পুরোপুরি ঠিক নয়। কারণ কেউ যদি অনুক্ষণ নিজেকে স্রষ্টার আরাধনায় লিপ্ত রাখার পরও ফাঁকে বিবেকবর্জিত এমন কোনো কাজ করে ফেলে, যা নিজের ও অপরের জন্য ক্ষতিকরÑ তা তার আরাধনায় প্রভাব ফেলবে না এমনটি জোর দিয়ে বলা যায় না। কেননা ইসলামে বলা হয়েছেÑ ‘যে নিজের প্রতিপালকের সামনে উপস্থিত হওয়ার ভয় রাখে এবং প্রবৃত্তি হতে নিজেকে বিরত রাখে, জান্নাতই হবে তার আবাস।’ (সূরা নাজিয়াত ৪০-৪৯)।
বলাবাহুল্য, আমাদের সবাইকেই দৈনন্দিন চাহিদা পূরণের জন্য একাধিক কাজ করতে হয়। ফলে কারো পক্ষেই শুধু স্রষ্টার আরাধনায় অনুক্ষণ লিপ্ত থাকা সম্ভব নয়। অবশ্য এমন কোনো ধর্মীয় বিধানও নেই। সে যাই হোক, পার্থিব জীবন যাপন করতে গিয়ে আমরা সবাই জানি নানা সময় নানা কাজে আমাদের ভালো-মন্দ, ন্যায্য-অন্যায্য নানারকম পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হয়। এ পরিস্থিতি মোকাবেলা করে কল্যাণকর ফল লাভের জন্য বিবেককে কাজে লাগানোর প্রতি উৎসাহিত করে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ধর্মগুলো মানুষকে শিক্ষা দিয়েছে, যার মূলে রয়েছে স্রষ্টাভীতি তথা স্রষ্টার নির্দেশ পুঙ্খানুপুঙ্খ অনুসরণ। কেননা স্রষ্টার বিচারের ভয় না থাকলে মানুষ ভালো-মন্দ বিচারের তোয়াক্কাই করত না। আর তাই বলা হয়েছেÑ
‘হে মানুষ! আমি তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছি এক পুরুষ ও এক নারী হতে, পরে তোমাদেরকে বিভক্ত করেছি বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে, যাতে তোমরা একে অপরের সাথে পরিচিত হতে পারো। তোমাদের মধ্যে আল্লাহর নিকট সেই ব্যক্তিই অধিক মর্যাদাবান, যে তোমাদের মধ্যে অধিক মুত্তাকি (স্রষ্টাভীরু)। নিশ্চয়ই আল্লাহ সব কিছু জানেন, সব খবর রাখেন।’ (সূরা হুজরাত : ১৩)।
অনেকে বিবেকের দংশনের ভয়ে বড় ধরনের ত্যাগ স্বীকার করার আশঙ্কা থাকলেও ছোটখাটো অপরাধ করা থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করে। বৌদ্ধধর্মে যথার্থই বলা হয়েছেÑ ‘মঙ্গল চিত্তাকর্ষক; অমঙ্গল কদর্য। বিবেকের দংশন সর্বাপেক্ষা ভয়ঙ্কর যাতনা, মুক্তিই চরম সুখ।’ [বুদ্ধবাণী; শিক্ষক বুদ্ধ; বুদ্ধ কর্তৃক দেব জিজ্ঞাসিত প্রশ্নের উত্তর দান]। বিবেকের দংশনে দংশিত হওয়ার ভয় যাদের মধ্যে না থাকে তারা অহরহই বিবেকবর্জিত কাজ (চুরি, ডাকাতি, খুনখারাবি, ঘুষ আদান-প্রদান, ঝগড়া-বিবাদ, অত্যাচার প্রভৃতি) করে থাকে। বলার অপেক্ষা রাখে না, চূড়ান্তভাবে সফলতা তাদের দখলেই আসে যারা বিবেকের দংশনের ভয়ে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করে পথ চলে। যদিও সাময়িকভাবে বিবেকবর্জিতদের অধিক লাভবান, ক্ষমতাবান বা প্রভাবশালী বলে মনে হয়। আমরা কে না জানি বুদ্ধিমানমাত্রই চিরস্থায়ী বা দীর্ঘস্থায়ী সুখ-শান্তি, মঙ্গল-কল্যাণের প্রত্যাশী। আর এ আশা পূরণ তখনই সম্ভব যখন কেউ অন্যের শাস্তির ভয়ে নয়, বরং নিজের তথা বিবেকের শাস্তির ভয়ে ভীত হয়ে জেনে-বুঝে মেপে মেপে পথ চলে। এতে যে শুধু মানসিক শান্তিই পাওয়া যায় তা নয়, বরং পরোক্ষভাবে গোটা মানব সমাজই উপকৃত হয়। অর্থাৎ সমাজের বাসিন্দারা বিবেকবর্জিত মানুষের অত্যাচার থেকে মুক্তি লাভ করে বিবেকবান মানুষের কাছ থেকে স্বস্তিদায়ক ও নিরাপদ জীবনের নিশ্চয়তা লাভ করে। আর পৃথিবীর তাবৎ ধর্ম তো নানাভাবে নানা আঙ্গিকে আমাদের মানবকল্যাণের শিক্ষাই দেয়; যেমনÑ ‘তোমরা উত্তম জাতি, মানুষের (কল্যাণের) জন্য তোমাদের আবির্ভাব।’ (সূরা আলে ইমরান : ১১০)।
অতএব, উত্তম জাতির মর্যাদা অুণœ রাখার স্বার্থে বিবেকবান মানুষ হিসেবে মানুষের কল্যাণে নিজেকে নিয়োজিত রাখাই আমাদের প্রধান কর্তব্য হওয়া উচিত।
লেখক : প্রবন্ধকার

 

ads

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫