ঢাকা, বুধবার,১৭ জানুয়ারি ২০১৮

আলোচনা

সৈয়দ মুজতবা আলী : রম্যরচনার প্রবাদপুরুষ

ফারুক মোহাম্মদ ওমর

১১ জানুয়ারি ২০১৮,বৃহস্পতিবার, ১৬:০৫


প্রিন্ট

বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ রম্যলেখক মুজতবা আলী (১৯০৪-১৯৭৪)। তিনি ভাষায় ছিলেন পারদর্শী। তিনি ছিলেন স্বাধীন সত্তার অধিকারি। তার ভ্রমণের অভিজ্ঞতায় আমাদের সাহিত্যে এক নতুন দিকের সূচনা ঘটিয়েছে। সৈয়দ মুজতবা আলী রম্যরচনার জগতে এক স্মরণীয় বরণীয় ব্যক্তিত্ব।

রম্যসাহিত্য রচনায় বাংলা সাহিত্যে এই প্রবাদপুরুষ সাহিত্যের মাধ্যমে যে দায়িত্ব নিয়েছেন তা হলো মানুষকে হাসানো, যদিও তিনি জানতেন মানুষকে হাসানো সহজ কাজ নয়। অতি সহজে যে কোনো বক্তব্যকে নিয়ে তিনি হাস্যরস করেছেন। অত্যন্ত গম্ভীর বিষয়কে তিনি রম্য কায়দায় উপস্থাপন করেছেন। তাতে বিষয়টি হালকা হয়নি বরং আরো উপভোগ্য, হৃদয়গ্রাহী হয়েছে। রম্যরচনায় গভীরের রস পাঠক যাতে সহজে আস্বাদন কারতে পারে, একটু হলেও হাসির খোরাক জোগায় সে চেষ্টাই তিনি করে গেছেন আমরণ। বর্তমান ডিজিটাল জমানায় বিজ্ঞাননির্ভর ব্যস্ত সময়ে আমরা বড় একঘেয়েমি হয়ে যাচ্ছি দিন দিন। এই একঘেয়েমিকে দূরে সরাতে হাস্যরসের প্রয়োজন। বুদ্ধির চমৎকার ব্যবহারে একটি তুচ্ছ বিষয় মুজতবার আলীর হাতে পড়ে চরম উপভোগ্য হয়ে ওঠে। বক্তব্যেও রয়েছে গভীর জীবনবোধ। একঘেয়েমি জীবনে তাঁর রচনা পড়লে হাসির রোল উঠতে বাধ্য বলেই সর্বজন স্বীকৃত।
‘রসগোল্লা’ রম্য রচনা পড়ে কে না হাস্যরসে হাবুডুবু খেয়েছে? রসগোল্লা রম্যগল্পের পাঠক তা মাত্রই স্বীকার করবেন। কাহিনীটাও বেশ চমৎকার। গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র ঝান্ডুদা বন্ধুর মেয়ের জন্য এক টিন ভ্যাকুম প্যাকেটজাত মিষ্টি নিয়ে যাচ্ছে। ইতালির কাস্টমস ঘরে কাস্টমস অফিসারের সাথে তা নিয়ে বাকবিতণ্ডা হয়। কাস্টমস কর্মকর্তাকে তিনি বোঝাতে ব্যর্থ হন যে, প্যাকেট খুললে মিষ্টি নষ্ট হয়ে যাবে। কাস্টমস অফিসারের ভাঙাচোরা চেহারার বর্ণনা আমাদের রসগোল্লা খাওয়ার আগেই রসে মজায়ে ফেলে। তা ছাড়া ঝাণ্ডুদার পোশাক ব্যাগের উপরে বিভিন্ন দেশের কাস্টমস হাউজের সিল সব কিছুতেই রয়েছে রসের অগাধ প্রাচুর্য। সেখানে নানা হাস্যরসাত্মক দৃশ্য ঘটানোর পরেও ঝাণ্ডুদাকে মিষ্টান্নর প্যাকেট খুলতে হয়। আর প্যাকেট খোলার পরে ঘটে সেই আসল ঘটনা। পাঠকমাত্রই সে ঘটনায় হেসে ফেলবেন। একগুঁয়েমি কর্মকর্তার একগুঁয়েমিতার কারণে ঝাণ্ডুদা প্যাকেট খোলে। কিছু বুজে ওঠার আগেই ঝাণ্ডুদা ক্ষেপে রসগোল্লা নিয়ে চুঙ্গিওয়ালার নাকে-মুখে লেপে দেয়। আর সবাইকে রসগোল্লা দেয়। রসগোল্লার রসে মজে ফরাসি উকিল আড়াই মিনিট চোখ বন্ধ করে রেখেছিলেন। সবাই রসগোল্লার রসে মজে আবার রসগোল্লা খেতে চায় খেতে চায় কিন্তু ততক্ষণে রসগোল্লা শেষ। এই রম্যরচনার প্রতিটি চরিত্র হাস্যরসের উদ্রেগ করে। কাহিনীটা সাধারণ হলেও পাঠক পড়লে হাসতে বাধ্য থাকবে। রসগোল্লার রসে মজে ঝাণ্ডুদাকে ক্ষমা করে দেন কর্তৃপক্ষ। এই যাত্রায় ঝাণ্ডুদা বেঁচে যান।
পৃথিবীতে মানুষ যে কোনো কাজ করুক তার পেছনে উদ্দেশ্যে থাকে- সুখ। সুখের জন্য সৃষ্টির শুরু থেকে মানুষ নিরন্তন ছুটে চললেও সুখ যে কিসে তা এখনো কেউ নির্দিষ্ট করে বলতে পারেনি। কিন্তু সুখ পাগলা ঘোড়ার মতো ছুটিয়ে নিয়ে চলছে মানুষকে। কেউ হয়তো সাময়িক সুখকে বশ করতে পারলেও স্থায়ী রূপ দিতে ব্যর্থ

হয়েছে। আসলে সুখ কী? এর পরিচয় কী? এর সংজ্ঞা ব্যক্তি বিশেষে ভিন্ন ভিন্ন পরিচয়। সুখ হচ্ছে একান্ত অনুভবের বিষয়। জগতের সব কিছুর মধ্যে সুখ আছে। আমাদের সেটা উপলব্ধি করে নিতে হয়। সুখ আপেক্ষিক বিষয়। কেউ খেলে আনন্দ পায়। কেউ খেয়ে, কেউ গল্প করে। কেউ অন্যকে ভালোবেসে। যে যেভাবে পারে সুখে থাকতে চেষ্টা করে। এক জন যার মধ্যে সুখ পায় অন্যজন তার মধ্যে সুখ নাও পেতে পারে। এই বিষয়ে সৈয়দ মুজতবা আলী তাঁর ‘সুখী হবার পন্থা’ শীর্ষক রম্যপ্রবন্ধে লিখেছেন। বিভিন্ন মনীষীর সুখ সম্পর্কে অনুভূতিগুলোকে প্রসঙ্গক্রমে তিনি উল্লেখ করেছেন। যেখানে রয়েছে লালন, কালিদাস, চণ্ডীদাস, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ওমর খৈয়াম, চার্বাক, জার্মানের হাইনে, গ্যাটো প্রমুখ। গ্যাটের কথা উদ্ধৃতি দিয়েছেন তিনি এভাবে- সুখ হাতের কাছেই থাকে; তবে তাকে ধরার কৌশলটি শিখতে হয়। চার্বক বলেছেন- ঋণ করে হলেও ঘি খাও; কারণ দেহ ভস্মীভূত হবে। শীতের রাতে কম্বল (কাঁথা বা লেপ) সরে গেলে আবার তা টেনে শরীরে দিলে সুখ লাগে। খৈয়ামের পাশে বসে কেউ সঙ্গীত পরিবেশন করলে তা বিজন প্রান্ত হলেও তার সুখ লাগে। এমন অনেক রকম সুখের কথা তিনি উল্লেখ করেছেন রচনাটিতে। আসলে দুঃখকে জয় করাই সুখ। একাধারে কেউ সুখ পায় না, আবার কেউ একাধারে দুঃখও পায় না। সুখ-দুঃখ একই মুদ্র্রার এপিঠ-ওপিঠ। সুখ অনুভূতির ব্যাপার। দুঃখকে কঠোর সাধনার মাধ্যমে জয় করে সুখের সোপানে আরোহণ করাই হচ্ছে প্রকৃত সুখ। যে যেখানে আছে সেখান থেকে আত্মতুষ্টি হচ্ছে প্রকৃত সুখ। সুখ খোঁজার জন্য লালন দিল্লি গিয়েছিলেন। আসলে সুখ কি তিনি পেয়েছিলেন? পাননি। সুখÑ যার যে জায়গা আছে, সেখানে থেকে আত্মতুষ্টি অর্জন করতে পারলে সুখের দেখা পাওয়া সম্ভব।
আজকাল প্রায় শোনা যায় স্ত্রী নির্যাতন মামলা আছে স্বামী নির্যাতন কেচ মামলা নেই! আসলে পুরুষ শাসিত সমাজে স্বামী নারীদের নির্যাতন করে পেশিশক্তির বলে। কিন্তু পেশিশক্তিতে না পারলেও মানসিক শক্তিতে নারীরাও নির্যাতন করতে পারে। আধুনিক যুগে দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন হচ্ছে। অনেক সংসার আছে যেখানে নারীরা কর্তৃত্ব করে। এমনকি স্ত্রীরা মানসিক উৎপীড়নে স্বামীর জীবনকে বিষিয়ে তোলে। এটা বিপরীত ঘটনা বলে হাসির কারণ হতে পারে। এমন কাহিনীর সাথে একটু রঙ চড়িয়ে সৈয়দ মুজতবা আলী লিখেছেন ‘দাম্পত্য জীবন’। যেখানে স্বামীরা স্ত্রীর নির্যাতনে অতিষ্ঠ হয়ে মিছিল-মিটিং করে। এমন একটি সভা চলাকালে শোনা গেল স্ত্রীরা ঝাঁটা নিয়ে সভা ভণ্ডুল করতে আসছে। এ খবর রটার সাথে সাথে সভাস্থল খালি হয়ে গেল। একমাত্র সভাপতি সেখান থেকে নড়ল না। পাঠকের মনে হতে পারেÑ তাহলে কি একমাত্র সভাপতি বীরপুরুষ? না, কেউই বীরপুরুষ নয়। দারোয়ান গিয়ে দেখল সভাপতি মারা গেছে। সভাপতির চিরতরে পালানোটা ট্র্যাজেডি কিন্তু এখানেও না হেসে পারা যায় না। পাঠকের মনের কোণে অদ্ভুত হাসির সুড়সুড়ি দেয়। এই রকম ট্র্যাজেডি আমাদের আবেগের সাগরে ভাসিয়ে দেয়। প্রচণ্ড হাস্যরসে আমরা খিলখিলিয়ে উঠি। স্বামী-স্ত্রীর সুখের সংসারও আছে। আবার পুরুষই স্ত্রীকে দজ্জাল টাইপের হয়ে উঠতে বাধ্য করে। স্বামীর বিভিন্ন মূর্খতার কারণে অধিকাংশ এমন হয়। এ সব বিষয় নিয়ে হাস্যরসের রম্যরচনায় সিদ্ধহস্ত আমাদের প্রবাদপুরুষ সৈয়দ মুজতবা আলী।
তার হাস্যরস কিন্তু বাস্তব বিবর্জিত নয়। বাস্তবকে ধরে সত্য উন্মোচনে তিনি সদা রম্য রচনা সৃষ্টি করেছেন। রম্যরচনার কারণে বাংলা সাহিত্যে তিনি চিরকাল প্রাসঙ্গিক হয়ে থাকবেন। আমরা চাই আমাদের রম্যসাহিত্য আবার জেগে ওঠুক সৈয়দ মুজতবা আলীর দেখানো পথে।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫