ঢাকা, মঙ্গলবার,২৩ জানুয়ারি ২০১৮

বরিশাল

উজিরপুরে অবৈধ ইটভাটা

জহির খান উজিরপুর (বরিশাল)

১০ জানুয়ারি ২০১৮,বুধবার, ১১:৩৪


প্রিন্ট

বরিশালের উজিরপুর পৌর এলাকায় নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে দীর্ঘদিন ধরে চলছে অবৈধভাবে গড়ে ওঠা তিন ইটভাটার কার্যক্রম। পৌর নগরীর প্রান কেন্দ্রের প্রায় দুই বর্গকিলোমিটারের মধ্যে এসব ইট ভাটাগুলো ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। ঘনবসতিপূর্ণ পৌর এলাকার ফসলি জমিতে অবৈধভাবে গড়ে তোলা ইটভাটাগুলোতে দেদারসে পোড়ানো হচ্ছে কয়লার পরিবর্তে কাঠ। সরকারি নিয়মনীতি উপেক্ষা করে এসব ইটভাটা স্থাপনে দেখা দিয়েছে পরিবেশ দূষণ ও জনদুর্ভোগ।
২০১৩ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারী সরকারী গেজেট আকারে আনুষ্ঠানিকভাবে উজিরপুর পৌরসভার কার্যক্রম শুরু হলে ইট ভাটাগুলো পৌর এলাকার মধ্যে পড়ে। সেই থেকে অদ্যবধি পর্যন্ত ভাটাগুলো আগের মতো চলে আসছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, পরিবেশ আইন অনুযায়ী জনবসতি এলাকার তিন কিলোমিটারের মধ্যে (যেখানে আনুমানিক ৫০টি পরিবার বাস করে) ইটভাটা করার নিয়ম নেই। পৌর এলাকার মধ্যে কোনো ইটভাটা করা যাবে না। এছাড়া সংরক্ষিত আবাসিক ও বাণিজ্যিক এলাকা, সিটি কর্পোরেশন, পৌরসভা, উপজেলা সদর, সরকারি বা ব্যক্তি মালিকানাধীন বনভূমি, অভয়ারণ্য, জলাভূমি ও কৃষি প্রধান এলাকাসহ পরিবেশ সঙ্কাটাপন্ন এলাকায় ইটভাটা স্থাপন করা যাবে না। অমান্য করলে ৫ বছরের জেল ও জরিমানার বিধান রেখে জাতীয় সংসদে ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন বিল ২০১৩ পাশ হয়েছে। তারপরও এ আইন অমান্য করে উজিরপুর পৌরসভার ফসলি জমি ও ঘনবসতিপূর্ন আবাসিক এলাকায় অবৈধভাবে ইট ভাটা তৈরি করে চালাচ্ছে কার্যক্রম। সরেজমিনে দেখা গেছে, পৌরসভা নগরীর ৮নং ওয়ার্ডের পরমানন্দসাহা গ্রামে শনিবার সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, ঘনবসতিপূর্ণ ওই এলাকার মাত্র এক’শ গজের মধ্যে (যেখানে কমপক্ষে ৫০টি পরিবার বাস করছে) অবৈধভাবে গড়ে ওঠা মেসার্স হাজী ব্রিকস নামের ইটভাটায় জ্বালানি হিসেবে স্তূপাকারে রাখা হয়েছে ২০০ থেকে ৩০০ মণ করে কাঠ। জ্বালানি হিসেবে এসব কাঠ দিয়েই পোড়ানো হচ্ছে ইট। পৌর এলাকার সবচেয়ে বড় ফসলি জমিতে গড়ে ওঠেছে ওই ভাটা। ইটভাটার ধোঁয়ার কারনে এলাকার গাছপালা ও লতাপাতা কালো-বিবর্ণ হয়ে গেছে। অনেক গাছপালার পাতা মরা মরা বা পুড়ে গেছে। ওই গ্রামের দিনমজুর আবুল হোসেন বলেন, ‘ইট ভাটার কারনে গত কয়েক বছর ধরে গ্রামের ফলজ গাছগুলোতে ফল ধরা বন্ধ হয়ে গেছে। একইভাবে জনদূর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে পৌর নগরীর ৫নং ওয়ার্ডের কালিরবাজার গ্রামের কয়েক শতাধিক বাসিন্দাদের। সেখানে জনবসতি এলাকার ২০০ গজের মধ্যে (যেখানে কমপক্ষে ৭০টি পরিবার বাস করছে) এবিএস ব্রিকস নামে একটি ইটভাটা রয়েছে। যদিও ওই ভাটায় কয়লা দিয়ে ইট পোড়ানো হচ্ছে। তবুও পরিবেশ দূষণ থেকে শুরু করে জনদূর্ভোগের কমতি নেই। ওই গ্রামের সাইদুল ইসলাম বলেন, ‘এই ভাটার কারণে গাছপালা ও মানুষের বিভিন্ন ধরনের ক্ষতি হচ্ছে। এছাড়া পৌরসভার উত্তর রাখালতলা গ্রামে অবৈধভাবে গড়ে ওঠেছে এসবিআই ব্রিকস। সেখানেও একই অবস্থা। উজিরপুর পৌরসভার মধ্যে অবৈধভাবে গড়ে ওঠা এই তিন ইটভাটার চারপাশে ঘনবসতিপূর্ণ গ্রামগুলোতে রয়েছে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, হাট-বাজার ও সড়ক-মহাসড়ক। এসব ইটভাটার কালো ধোঁয়ার বিরূপ প্রভাবে মরে যাচ্ছে গ্রামগুলির ফলজ ও ঔষধি গাছ-গাছালি। ইতিমধ্যে ওই সব গ্রামের অধিকাংশ ফলদ গাছের ফল ধরাও বন্ধ হয়ে গেছে। এদিকে ওই সকল ভাটায় ইট তৈরির জন্য ফসলি জমির উপরিভাগের মাটি প্রতিনিয়ত তুলে নেওয়া হচ্ছে অথবা নদীর তীরবর্তী কোন চর কেটে মাটি চুরি করছে। এসব মাটি, কাঠ ও ইট আনা নেওয়ার কাজে স্থানীয় সকল রাস্তাঘাট ব্যবহার করে বেপরোয়াভাবে চলছে ট্রলি, ভটভটি, নছিমন, করিমন নামের বিকট শব্দের অবৈধ যানবাহন। এতে একদিকে নষ্ট হচ্ছে পৌর নগরীর রাস্তাঘাট ও ফসলি জমির উর্বরতা শক্তি। অপরদিকে, গাছগাছালি উজাড় হয়ে ধ্বংস হচ্ছে প্রাকৃতিক পরিবেশের ভারসাম্য। এ ছাড়া রাস্তাঘাটে চলাচলকারী বেপরোয়া যানবাহনের বিকট শব্দে অনেকেরই কানের সমস্যা দেখা দিয়েছে। এতে বিনষ্ট হচ্ছে প্রাকৃতিক পরিবেশের ভারসাম্য। ইটভাটা মালিকদের খামখেয়ালিপনায় প্রতিটি ইটের নেই সঠিক মাপ, একেক ইটভাটার ইট একেক মাপের। এতে ভবন নির্মাণ শ্রমিকসহ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলোও তাদের উন্নয়ন কাজ করতে গিয়ে ইটভাটা মালিকদের কাছে প্রতারিত হচ্ছেন বলে একাধিক অভিযোগ রয়েছে। এদিকে পৌর এলাকায় অবৈধভাবে গড়ে ওঠা সবগুলো ভাটা মালিকরা বলছেন তারা ইটভাটার অনুমোদন চেয়ে সংশ্লিষ্ট দফতরে আবেদন করেছেন। এ ব্যাপারে উজিরপুর পৌর মেয়র গিয়াস উদ্দিন বেপারীর কাছে মুঠোফোনে জানতে চাইলে প্রথমে তিনি ব্যস্ত রয়েছেন বলে ফোনটি কেটে দেন এবং পরবর্তীতে একাধিকবার চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি। এ ব্যাপারে পরিবেশ অধিদফতরের বরিশাল বিভাগীয় পরিচালক মোঃ আহসান হাবিব বলেন, বরিশালে নীতিমালার বাইরে গড়ে ওঠা ইটভাটার সংখ্যাই বেশি। পরিবেশ আইন অনুযায়ী জনবসতির এক কিলোমিটারের মধ্যে কোন ইটভাটা স্থাপন করা যাবে না। সে অর্থে পৌর সদরের মধ্যে গড়ে ওঠা সব ইটভাটাই অবৈধ। ওইসব ইটভাটার পরিবেশ বিভাগের কোন ছাড়পত্র নেই। পরিচালক আহসান হাবিব আরও জানান, খুব শীঘ্রই ওই এলাকায় গিয়ে অবৈধ ইটভাটার কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়া হবে।

 

 

অন্যান্য সংবাদ

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫