ঢাকা, মঙ্গলবার,২৩ জানুয়ারি ২০১৮

মতামত

ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল ও শিক্ষা উপকরণ

এম শফীউল্লাহ

০৯ জানুয়ারি ২০১৮,মঙ্গলবার, ১৮:৩৩


প্রিন্ট
ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল ও শিক্ষা উপকরণ

ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল ও শিক্ষা উপকরণ

আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাকে স্বচ্ছ করা এবং শিক্ষার মানোন্নয়নের লক্ষ্যে সরকার কোচিং টিউশন বাণিজ্য বন্ধ করতে প্রাইভেট পড়ানোর নীতিমালা চালু করেছে এবং নোটবই লেখা, বাজারজাতকরণ, বিক্রি ইত্যাদির ওপরও নিষেধাজ্ঞা আরোপসহ বিভিন্ন ব্যবস্থা নিয়েছে ২০১২ সাল থেকে। কিন্তু ‘কোচিং ও প্রাইভেট টিউশনি বন্ধ’ হচ্ছে না। দেশব্যাপী টিউশনিতে জড়িত শিক্ষকদের তালিকা প্রথমবারের মতো তৈরি করার কাজ করছে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতর। এর মহাপরিচালক জানিয়েছেন, ওই তালিকা প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে। দুর্নীতি দমন কমিশনও এ বিষয় কাজ শুরু করেছে। ওই কাজে সাফল্য না আসার কারণের ব্যাপারে নিশ্চয়ই অনুসন্ধান করা হয়েছে। তবে শিক্ষকবেশী ব্যবসায়ীদের শিক্ষাপেশা থেকে উচ্ছেদ করার ব্যবস্থা করা হয়েছে কি না, জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠা করা এবং নিবেদিত শিক্ষকদের উদ্দীপনামূলক কাজের কী ব্যবস্থা করা হয়েছে, তা জানা যায়নি। 

একজন নিবেদিত শিক্ষকের মূল লক্ষ্য তার সৃষ্টির প্রতি। অল্প, স্থায়ী শিল্পতুল্য তার ছাত্র; একে নিপুণভাবে গড়েন শুধু একজন দক্ষ কারিগর। সারা জীবন তার আদর্শ আচার-আচরণ ও মানবিক মূল্যবোধকে শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করে অনুসরণ করতে থাকে। সেটি মানবসমাজকে উন্নত করার জন্য অপরিহার্য। শিক্ষার্থীদের পঠনসামগ্রী উন্নয়ন অল্পস্থায়ী কাজ; কারণ এটি পরিবর্তনীয়। এটি শিক্ষকের সম্পূরক কাজ এবং একে তার সম্পূরক আয়ের উৎসও বলা যায়। শিল্প-সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক জগতেও তিনি তার লেখার মাধ্যমে অবদান রাখতে পারেন। সেটি সৃজনশীল স্থায়ী কাজ এবং সৃজনশীল বলে এ কাজটি তার স্থায়ী সৃষ্টি হতে পারে। শিক্ষকদের এ সুকুমারবৃত্তির চর্চার দিকনির্দেশনা দেয়া আমাদের সামাজিক দায়িত্ব।

বাংলাদেশে সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থা কর্তৃক পরিচালিত এক লাখ ২২ হাজার ১৭৬টি প্রাথমিক পর্যায়ের বিদ্যালয়ে এক কোটি ৯০ লাখ ৬৭ হাজার ৬৭১ জন শিক্ষার্থী পড়ছে। ২০ হাজার ২৯৭টি মাধ্যমিক স্কুলে ৯ কোটি ৭৪ লাখ তিন হাজার ৭২ জন ছাত্রছাত্রী অধ্যয়নরত। আর বিভিন্ন পর্যায়ের চার হাজার ১১৩টি কলেজে ৩৬ লাখ ৭৮ হাজার ১৬৯ জন ছাত্রছাত্রী আছে। ৩৭টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ও চার লাখ ৯৩ হাজার ১১০ জন এবং ৮৫টি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে তিন লাখ ৭৯ হাজার ৭৮১ জন শিক্ষার্থী রয়েছে। এ ছাড়াও দেশের ও বাইরের কিছু উদ্যোক্তার দ্বারা বড় বড় শহর ছাড়াও উপজেলা পর্যায়ে অনেক ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল গড়ে উঠেছে। এর মধ্যে ২৫টি জুনিয়র স্কুলে পাঁচ লাখ ৫৭ হাজার, ৮৩৮টি ও-লেভেল স্কুলে ১৮ হাজার ৫০৬ এবং ৯৯টি এ-লেভেল স্কুলে এক লাখ এক হাজার ১৪৯ জন ছাত্রছাত্রী রয়েছে। এ তিন স্তরের ইংলিশ মিডিয়াম ১৬২টি স্কুলে মোট এক লাখ ২৫ হাজার ২৩৩ জন শিক্ষার্থী অধ্যয়নরত। এসব বিদ্যালয়ে প্লে-গ্রুপ, কেজি-১ ও কেজি-২তে যেসব শিশু ভর্তি হয়েছে তারা এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে কি না তা জানা যায়নি। এর বাইরে আছে কিন্ডারগার্টেন স্কুল। বিদেশী নামকরণ থেকে এগুলোকেও ইংলিশ মিডিয়াম বা তার প্রস্তুতিমূলক স্কুল বলে অনুমান করা যায়। দেশে এ ধরনের স্কুলের সংখ্যা কত তা সম্প্রতি প্রকাশিত শ্রীপুরের এক চমকপ্রদ খবর থেকে অনুমান করা যায়। ওই খবরে বলা হয়েছে, কেবল এ উপজেলাতেই ৫০০ কিন্ডারগার্টেন রয়েছে এবং কোথাও কোথাও মাত্র ২০০ গজ থেকে এক হাজার ২০০ গজের মধ্যে ১৪টি কিন্ডারগার্টেন রয়েছে। এ তথ্য থেকে সারা দেশের কিন্ডারগার্টেন বা প্রাক-প্রাথমিক ইংলিশ মিডিয়ামের সংখ্যা সম্পর্কে একটা সম্যক ধারণা লাভ করা যায়। এসব স্কুল ইংলিশ টেক্সট বা উপকরণ অনুসরণ করছে। কিন্তু সেটা কোথা থেকে আসছে?

ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলগুলোর নতুন শ্রেণীর ক্লাস শুরু হয়েছে। আমাদের শিশু-কিশোর নতুন নতুন বইখাতা, স্কুলড্রেস কিনে নতুন উদ্যমে স্কুলে যাওয়া শুরু করছে। চিন্তা করি, তাদের ভারী বোঝা বহন করে বেড়াতে কিসে শক্তি জোগায়। তাদের পাঠ্যতালিকাও আমাদের জাতীয় বিদ্যালয়ের তালিকার চেয়ে কিছুটা বড়। দেখা যাক, এ ধরনের কোনো স্কুলের পাঠ্যপুস্তকের চাহিদা কেমন। ঢাকা ম্যাপল লিফ ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের এ বছরের ক্লাস টুর পাঠ্যতালিকা তুলে ধরছি। ইংরেজি মিডিয়াম স্কুলগুলোর মধ্যে এটি অন্যতম উল্লেখযোগ্য এবং এর শাখা-প্রশাখা রয়েছে। আবার একটি শাখার ফুল, ফল ও পাখির নামে অনেক সেকশন রয়েছে।

এক্ষেত্রে মোট পাঁচটি বই ঢাকা থেকে প্রকাশিত হয়েছে। বাদবাকি ১৩টি বইয়ে আমাদের লেখক, প্রকাশক ও সরবরাহকারী কারো ভূমিকা নেই। ইংলিশ মিডিয়াম বলে ইংল্যান্ডের বইয়ের প্রাধান্য থাকা স্বাভাবিক। কিন্তু আমাদের মতোই ভিন্ন ভিন্ন দেশের লেখক, প্রকাশকের পাঠ্যোপকরণ কিভাবে এ দেশের শিক্ষার্থীদের হাতে আসছে? আমাদের দেশ কি লেখক, প্রকাশক, সরবরাহকারী শূন্য হয়ে পড়েছে? বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এর সাথে দেশের শ্রম, শিল্প বিকাশ ও কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা জড়িয়ে আছে। ওই তালিকা থেকে যায়, ১৭টি বইয়ের মধ্যে ১২টি বই দেশের বাইরে থেকে আসা। অনুমোদনপ্রাপ্ত ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলগুলোর প্লে-গ্রুপ থেকে টুয়েলভ ক্লাস পর্যন্ত ১৫টি ক্লাসের সব ছাত্রের বিভিন্ন বিষয়ের মোট কতটি বই আমরা এ বছর এভাবে আমদানি করেছি তা এর থেকে অনুমান করা যায়।

এসব প্রতিষ্ঠানে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীদের পাঠ্যপুস্তক ছাড়াও শিক্ষাউপকরণ রয়েছে, যেমন- খাতাপত্র, কলম, ম্যাপ, ডিকশনারি, রঙতুলিসহ অনেক কিছু। এ তিন শ্রেণীর প্রতিষ্ঠানে নার্সারি, কেজি-১, কেজি-২, ক্লাস-১, ক্লাস-২ থেকে ক্লাস-টুয়েলভে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীর সংখ্যা এক লাখ ২৫ হাজার ২৩৩ (২০১৫ ইং)। এত শিক্ষার্থীর পাঠ্যপুস্তক ও অন্যান্য উপকরণের চাহিদা নিঃসন্দেহে বিপুল। আর এরা সবাই সচ্ছল পরিবারের সন্তান এবং স্কুলের দেয়া তালিকার একটি বইও কেনা বাদ দেয় না। বিদেশী প্রভাবিত বাণিজ্যিক চরিত্রের হলেও এসব প্রতিষ্ঠানের পাঠক্রমের একটি নির্দিষ্ট অংশ আমরা আমাদের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষা পাঠক্রমের মতো লিখন, সঙ্কলন, উৎপাদন ও বাজারজাতকরণের দায়িত্ব পরিকল্পিতভাবে নিলে লেখক তৈরি ও এ বিষয়ে শিল্পোদ্যোক্তা সৃষ্টির ক্ষেত্রে বড় ধরনের সাফল্য অর্জিত হবে। দেশের প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষার যেকোনো স্তরে উচ্চশিক্ষিত ও গুণগত মানসম্পন্ন শিক্ষকের অভাব তেমন নেই। প্রাগ্রসর শিক্ষকেরা তাদের স্বাভাবিকভাবেই লেখা নিয়ে ব্যস্ত হবেন। তারা উন্নতমানের পাঠ্যপুস্তক রচনায় আত্মনিয়োগ করার অনুপ্রেরণা পাবেন। কেউ কেউ সৃজনশীল লেখায়ও সম্পৃক্ত হবেন। প্রকাশকেরা উন্নতমানের প্রকাশনা শিল্পে মনোযোগী হবেন। প্রকাশনা শিল্পকে পৃষ্ঠপোষকতা দেয়া জরুরি।
এ শিল্প বিকাশের ক্ষেত্রে আমাদের সীমাবদ্ধতা হচ্ছে- আমাদের বাজার খুবই ছোট এবং প্রতিদ্বন্দ্বী অত্যন্ত শক্তিশালী। এ সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে উঠতে লেখক ও উদ্যোক্তা সৃষ্টি করতে দূরদৃষ্টিসম্পন্ন হতে হবে।

ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের পাঠক্রমের ওপর আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা অতীব জরুরি। আমাদের জাতীয় জীবনে এর বহুমুখী প্রভাব নিশ্চিত করার জন্য সরকারি অনুমোদনের ক্ষেত্রে এটা করতে হবে। কারিকুলাম-টেক্সট ও গ্রন্থ উন্নয়নে পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব রয়েছে এ ক্ষেত্রে। তবে কোনো স্তরেই ব্যবসার সাথে সম্পৃক্ত হওয়া ঠিক হবে না। প্রকাশনা শিল্প এ কাজে এগিয়ে আসবে। এভাবে উদ্যোক্তারা অগ্রসর হলেই লেখকেরা লেখায় হাত দেবেন। এসব পাঠ্যপুস্তক লেখার মাধ্যমে আমাদের শিক্ষকদের সুকুমারবৃত্তির দিগন্ত প্রসারিত হবে। সার্বক্ষণিকভাবে বুদ্ধিবৃত্তিক কাজের সাথে জড়িত থাকেন বলে তারা সৃজনশীল কিছু সৃষ্টি করার সম্ভাবনা রাখেন। এ সম্ভাবনাকে বাস্তবায়ন করতে সহায়কের ভূমিকা রাখতে হবে সরকারকে। 

লেখক : শিক্ষক, প্রাবন্ধিক ও সাবেক অতিরিক্ত সচিব, বাংলাদেশ সরকার

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫