ঢাকা, মঙ্গলবার,২৩ জানুয়ারি ২০১৮

মতামত

ভারতীয় গণতন্ত্রের চূড়ান্ত পছন্দ

তেওমান আর্তুগ্রুল তুলুন

০৯ জানুয়ারি ২০১৮,মঙ্গলবার, ১৭:৫২


প্রিন্ট
ভারতীয় গণতন্ত্রের চূড়ান্ত পছন্দ

ভারতীয় গণতন্ত্রের চূড়ান্ত পছন্দ

ভারতকে বলা হয় পৃথিবীর ‘সর্ববৃহৎ গণতন্ত্রের দেশ’। এখানে ভোটারের সংখ্যা প্রায় ৮১৫ মিলিয়ন বা ৮১ কোটি ৫০ লাখ। ১৯৪৭ সালে স্বাধীন হওয়ার কয়েক বছর পর, সর্বজনীন ভোটাধিকার এবং প্রাপ্তবয়স্ক সব নাগরিকের ভোট দেয়ার অধিকার নিশ্চিত করতে ১৯৫০ সালে দেশটির সংবিধান রচয়িতা খুবই চমৎকার একটি উদ্যোগ নিয়েছিলেন। এই একটি মাত্র আইনের ফলে ভারত গোঁড়া রীতিনীতি থেকে বেরিয়ে বিশ্বের প্রথম বৃহৎ গণতান্ত্রিক স্বাধীন দেশে পরিণত হয়। জনসমর্থনপুষ্ট গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় দেশটিতে বর্তমানে দুটি প্রধান রাজনৈতিক দল কাজ করছে- এর একটি ১৮৮৫ সালে প্রতিষ্ঠিত ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস এবং আরেকটি ভারতীয় জনতা পার্টি, যা গঠিত হয়েছে ১৯৮০ সালে। এর বাইরেও আছে জাতীয় ও আঞ্চলিক অনেক দল, যাদের মধ্যে আবার জাতীয় দলগুলোর উপদলও আছে এবং কোনো কোনো দল সুসংগঠিত।

যা হোক, প্রধান দুটি রাজনৈতিক দলই ভারতের নির্বাচন ও গণতান্ত্রিকব্যবস্থাকে নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। স্বাধীনতার পর দেশটির প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওয়াহের লাল নেহরুর নেতৃত্বাধীন কংগ্রেস, জনসমর্থনভিত্তিক এই গণতান্ত্রিকব্যবস্থাকে বেশ জোরের সাথেই এগিয়ে নেয় এবং বৈচিত্র্যপূর্ণ জনগোষ্ঠীর একতার ওপর জোর দিয়েছে। ১৯৫৩ সালের ১৫ থেকে ১৮ জানুয়ারি পর্যন্ত হায়দরাবাদে কংগ্রেসের যে ৫৮তম সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছিল, সেখানে নেহরুর বক্তব্য এটা প্রমাণ করে। ওই বক্তৃতায় তিনি জোর দিয়ে বলেন, ‘ভারত মৌলিকভাবে একতার দেশ, কিন্তু এখানে ধর্ম, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও জীবনযাত্রার বৈচিত্র্য আছে। এটি হবে শুধুই পারস্পরিক বোঝাপড়া ও সম্মানের ভিত্তিতে, মহামতি অশোক যেমন বলেছিলেন, আমরা পুরো ভারতে একটি শক্তিশালী, স্থিতিশীল ও সহযোগিতাপূর্ণ সম্প্রদায় গড়ে তুলব।’

অন্য দিকে, বিজেপির রাজনৈতিক চেতনা এই আদর্শের পুরোই বিপরীত। এই দল হিন্দুত্ববাদ প্রতিষ্ঠায় দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। এদের প্রণীত ২০০৪ সালের রূপকল্পে ‘সাংস্কৃতিক জাতীয়তা’ শিরোনামে বলা হয়েছে, ‘হিন্দু রীতির অনুপ্রেরণা ভারতের ইতিহাস ও সভ্যতা। ভারতীয় জাতীয়তা মানুষের দৃঢ় সাংস্কৃতিক বন্ধনের বহিঃপ্রকাশ, এখানে ভিন্ন রীতি, অঞ্চল, ধর্ম ও ভাষার কোনো মূল্য নেই। বিজেপির ‘সাংস্কৃতিক জাতীয়তা’র ধারণায় ‘ভারতীয়’ ও ‘হিন্দুত্ব’ একই কথা এবং এটাকেই ধরা হয়েছে ভারতীয় পরিচয়ের মৌল ভিত্তি হিসেবে। বেশির ভাগ প্রাজ্ঞ বিশ্লেষকের মতে, এই ‘হিন্দুত্ববাদী ধারণা’ ভারতকে ‘হিন্দু দেশ’ হিসেবে নতুন করে পরিচিত করানোরই প্রয়াস, যেখানে অন্য ধর্মের মানুষকে বিবেচনায় নেয়া হয়নি। আর এভাবেই বিজেপি একটি হিন্দু জাতীয়তাবাদী দল হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। এখানে আরো লক্ষণীয় যে, বিজেপির যে দলীয় প্রতীক, এর ঠিক নিচেই লেখা ‘একটি অনন্য রাজনৈতিক দল’।

২০১৪ সালের মে মাসে ভারতের ১৪তম প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নিয়েছেন বিজেপি সদস্য নরেন্দ্র দামোদর দাস মোদি, যিনি একসময় কট্টরপন্থী হিন্দু জাতীয়তাবাদী ‘রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সঙ্ঘ’Ñ আরএসএস-এর নিবেদিত প্রাণ কর্মী ছিলেন। ১৯২৫ সালে গঠিত আরএসএস এমন একটি সাংস্কৃতিক সংগঠন যার সদস্যরা ভারতের হিন্দু সংস্কৃতি রক্ষায় একাট্টা। মুসলিমবিদ্বেষ এবং ধর্মীয় অসহিঞ্চুতা ছড়িয়ে দেয়ার অভিযোগ আছে আরএসএস-এর বিরুদ্ধে। স্বাধীনতার পর তিনবার আরএসএস-এর কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হয়। বিশেষ করে ১৯৪৮ সালে গান্ধীর হত্যাকাণ্ডে আরএসএস-এর এক সদস্যের জড়িত থাকায় একবার এবং উত্তরপ্রদেশ রাজ্যের অযোধ্যায় বিখ্যাত বাবরি মসজিদ ধ্বংসের জন্য দায়ী করে এই সংগঠনকে আরো একবার নিষিদ্ধ করা হয়। ১৯৯২ সালের ৬ ডিসেম্বর অযোধ্যায় বিজেপি এবং এর উগ্রবাদী দোসররা বিক্ষোভ শুরু করে এবং মাত্র এক ঘণ্টার মধ্যে মুঘল সম্রাট বাবরের পৃষ্ঠপোষকতায় গড়ে তোলা এই ঐতিহাসিক মসজিদ গুঁড়িয়ে দেয়। এই মসজিদ ভাঙার সূত্র ধরে সারা ভারতে হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়ে।

কংগ্রেসের ‘বৈচিত্র্যের একতা’ ধারণার সম্পূর্ণ বিপরীত বিজেপি ও এর উগ্র সমর্থকদের হিন্দু জাতীয়তাবাদী ধারণা। তাদের এই ধারণা হিন্দুত্ববাদের সাথে ভারতীয় জাতীয় পরিচয়কে গুলিয়ে ফেলে। এই ধারণা বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহতম জনসংখ্যার দেশ ভারত থেকে অন্য ধর্মের মানুষের নিশ্চিতভাবেই দূরে ঠেলে দেয়, বিশেষ করে ১৭ কোটি মুসলমানকে। এই বর্জন নীতির ঘটনা ক্রমেই বাড়ছে। উদাহরণস্বরূপ, হিন্দু জাতীয়তাবাদীরা সম্প্রতি সম্রাট শাহজাহানের অমর কীর্তি ও ভারতের অন্যতম সেরা স্থাপনা তাজমহলের বিরুদ্ধেও বিষোদগার করেছে।

খুব সম্প্রতি রাহুল গান্ধী কংগ্রেস সভাপতির দায়িত্ব নিয়েছেন। নেহরু-গান্ধী পরিবারের ষষ্ঠ সদস্য হিসেবে ৪৭ বছর বয়সী এই নেতা তার মায়ের পর আগামী ১০ বছরের জন্য দলের সভাপতি হলেন। দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথম আনুষ্ঠানিক বক্তব্যে তিনি বলেছেন, ‘কংগ্রেস ভারতকে ২১ শতকের বিশ্বে নিয়ে এসেছিল, আর বর্তমান প্রধানমন্ত্রী আমাদের নিয়ে যাচ্ছেন পেছনের দিকে, মধ্যযুগীয় অতীতে, যেখানে মানুষকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হচ্ছে তার পরিচয়ের জন্য, মারধর করা হচ্ছে তার বিশ্বাসের জন্য আর হত্যা করা হচ্ছে তারা কী খাচ্ছে তার জন্য। এ ধরনের নৃশংসতা সারা বিশ্বে আমাদের লজ্জিত করেছে। আমাদের দেশের দর্শন যেখানে একে অপরকে ভালোবাসতে ও শ্রদ্ধা করতে শেখায়, সেখানে এ ধরনের নৃশংসতা আমাদের কলঙ্কিত করছে। যে ক্ষতি দেশের হয়েছে, তা কোনোভাবেই পূরণ করা সম্ভব নয়। কংগ্রেসের রূপকল্প এমন একসময় নেয়া হয়েছিল, যখন মানুষের কোনো অধিকার ছিল না, স্বাধীনতা ছিল না, নিজের কথা বলা বা ভিন্ন মত পোষণ করার কোনো এখতিয়ার ছিল না। সেই রূপকল্পই আমাদের গভীর সত্তায় প্রোথিত।’

এসব উদাহরণই বলে দেয়, ভারতের রাজনীতি ও গণতন্ত্র বর্তমানে নানা ধারায় বিভক্ত। এই বিভক্তি দিন দিনই বাড়ছে। ফলে বাড়ছে ‘সহিষ্ণুতা’ এবং অন্যকে দূরে সরিয়ে দেয়ার প্রবণতা। সাধারণ থেকে ক্ষমতাশালী, সবপর্যায়ের মানুষের মধ্যেই এই বিভক্তির প্রবণতা প্রবল হচ্ছে, ‘জনপ্রিয়’ হচ্ছে। এই প্রক্রিয়ার শেষ স্তরেই অপেক্ষা করছে সাম্প্রদায়িকতা। অদূরভবিষ্যতে পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম জনগোষ্ঠীর দেশ ভারত সম্ভবত ‘বৈচিত্র্যের একতায় গণতন্ত্র’ কিংবা ‘সাম্প্রদায়িক বিভাজন’ এই দুটোর মধ্যে একটি বেছে নিতে বাধ্য হবে।

ডেইলি সাবাহ থেকে অনুবাদ করেছেন মো: সাজেদুল ইসলাম

লেখক : সেন্টার ফর ইউরেশিয়ান স্টাডিজের বিশ্লেষক

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫