ads

ঢাকা, শনিবার,২১ এপ্রিল ২০১৮

আমার ঢাকা

কনকনে শীতে : জমজমাট বাণিজ্যমেলা

মাহমুদুল হাসান

০৯ জানুয়ারি ২০১৮,মঙ্গলবার, ০০:০০ | আপডেট: ০৯ জানুয়ারি ২০১৮,মঙ্গলবার, ০৬:৪৯


প্রিন্ট

ঢাকা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যমেলা গত শুক্রবার থেকে ক্রেতা-দর্শনার্থীদের সমাগমে মুখরিত হয়ে উঠেছে। অন্য বছরের তুলনায় এবারের মেলার অভ্যন্তরীণ সাজসজ্জা বেশ সুগঠিত। মেলায় চলাফেরার স্থান প্রশস্ত করায় দর্শনার্থীরা অনায়াসে চলাফেরা করতে পারছেন। কনকনে শীত উপেক্ষা করে ক্রেতা-দর্শনার্থীদের ঢলে জমে উঠেছে ২৩তম ঢাকা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যমেলা। গতকাল সরেজমিন মেলাপ্রাঙ্গণ ঘুরে লিখেছেন মাহমুদুল হাসান

গতকাল দর্শনার্থীদের জন্য বাণিজ্যমেলার গেট খুলে দেয়ার পর দুপুর ১২টার মধ্যে প্রায় ভরে যায় মেলাপ্রাঙ্গণ। বিকেল হতেই মেলাপ্রাঙ্গণ ঘুরে দেখা যায়, কিছু কিছু স্টলে ক্রেতা-দর্শনার্থীদের উপস্থিতি বেশ ভালো। নানা বয়সী বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষের উপস্থিতিতে মুখর হয়ে ওঠে মেলাপ্রাঙ্গণ। ক্রেতাদের ভিড়ে হিমশিম খেতে হয় প্যাভিলিয়ন ও স্টলে দায়িত্বরতদের।
কয়েক দিন ধরে সারা দেশের পাশাপাশি রাজধানীতেও দেখা দিয়েছে কনকনে শীত। সে শীত উপেক্ষা করে সকালের মিষ্টি রোদ গায়ে মেখে বাণিজ্যমেলায় হাজির সবাই। আর এ কারণেই হয়তো মেলায় শীতের পোশাকের দোকানে ভিড় ছিল লক্ষণীয়। পাশাপাশি গৃহস্থালি এবং নারী-শিশুদের পণ্যের স্টলগুলোতেও ছিল প্রচণ্ড ভিড়। ইলেকট্রনিক পণ্য, রান্নার সামগ্রী ও প্লাস্টিকপণ্যের দোকানেও প্রচুর ক্রেতা-দর্শনার্থীর উপস্থিতি ছিল।
মেলায় পরিবার নিয়ে ঘুরতে আসা মিরপুরের আয়মান বলেন, ছুটির দিনে ভিড় থাকায় আজ মেলায় এসেছি। বাসার জন্য একটি রাইস কুকার ও কিছু প্লাস্টিকের সামগ্রী আর কিছু বিস্কুট কিনেছি। প্রতিবারের তুলনায় এবারের মেলার পরিবেশ আশাব্যঞ্জক নয়। মেলা ঘুরে হকারদের দৌরাত্ম্য, ভিক্ষুকদের উৎপাত সর্বপোরি ধুলা-বালুর কারণে অতিষ্ঠ দর্শনার্থীরা।
ধানমন্ডি থেকে মেলায় বন্ধুর সঙ্গে দলবেঁধে ঘুরতে এসেছেন কলেজশিক্ষার্থী রোমেল। তিনি বলেন, বন্ধুরা মিলে মেলায় ঘুরতে এসেছি। কোনো কিছু কেনার উদ্দেশ্য নেই। মেলার মাঠ ও বিভিন্ন স্টল ঘুরে ঘুরে দেখছি। যতক্ষণ ভালো লাগে বন্ধুরা মিলে আড্ডা দেবো, আনন্দ করব।
মেলা শুরুর কয়েক দিন হলেও কাক্সিক্ষত ক্রেতা-দর্শনার্থী পাওয়ায় খুশি বিক্রেতারাও। গৃহস্থালিসামগ্রী বিক্রেতা রকিবুল বলেন, বাণিজ্যমেলায় আস্তে আস্তে ক্রেতা-দর্শনার্থীর ভিড় বাড়বে এটাই স্বাভাবিক। ভিড়ের কারণে আমাদের বিক্রিও কিছুটা বেড়েছে। সকালের দিকে ভিড় কিছুটা কম থাকলেও বিকেলের পর দেখতে দেখতে জনসমুদ্রে পরিণত হচ্ছে মেলাপ্রাঙ্গণ।
মেলার মধ্যমাঠে ফোয়ারার কাছে কথা হয় পুরান ঢাকার মাজেদা আক্তারের সঙ্গে। বহু বছর ধরেই বাণিজ্যমেলার নিয়মিত দর্শনার্থী তিনি। তবে এবার মেলা মাঠে ঘুরে অন্য বছরের তুলনায় স্বস্তিকর মনে হয়েছে তার কাছে। কারণ এবার স্টল ও অলিগলির সংখ্যা কমিয়ে খোলামেলা জায়গা রাখা হয়েছে বেশি। অন্য বছরের তুলনায় এবারের প্যাভিলিয়নগুলো একটু বেশি আকর্ষণীয় মনে হলো। এ ছাড়া ময়লা-আবর্জনা অন্য বছরের তুলনায় কম।
মেলার মধ্যভাগেই আখতার, হাতিল, ব্রাদার্স, রিগেলসহ অন্য ফার্নিচারগুলোর বহুতল প্যাভিলিয়ন। এখানেই রয়েছে ভিশন, অলিম্পিক, ওয়ালটনসহ বড় কোম্পানিগুলোর প্যাভিলিয়ন। পশ্চিমে ইন্ডিয়া, ইরান, থাইল্যান্ডের প্যাভিলিয়ন রয়েছে। কিছু বিদেশী প্যাভিলিয়ন রয়েছে পূর্ব দিকেও। দেশীয় ফেব্রিক্স, গৃহস্থালি, খেলনা, হার্বালপণ্য, অলঙ্কার, প্লাস্টিকসহ অন্যান্য পণ্যের স্টলগুলো রয়েছে মাঝমাঠ থেকে পূর্ব ও পশ্চিম ও দক্ষিণ দিকের গলির দুই পাশজুড়ে।

চিনিগুঁড়ার ‘গরম অফার’
মেলার প্রধান ফটক দিয়ে প্রবেশ করে পশ্চিমে একটু এগোলেই দেখ যাবে প্রাণ চিনিগুঁড়া সুগন্ধি চালের প্যাভিলিয়ন। এটি সাজানো হয়েছে একটু ব্যতিক্রমভাবে। গ্রামীণ ঐতিহ্যের আদলে বাঁশ দিয়ে তৈরি করা হয়েছে গেট। এর ওপরে রয়েছে খড়ের চাল। গেট ও চালের চার দিক দিয়ে প্যাভিলিয়নের ওয়াল বেয়ে রয়েছে লাউগাছ, তাতে ধরেছে লাউ। ঢাকা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যমেলায় ‘চরম শীতে গরম অফার’ নিয়ে এসেছে প্রাণ চিনিগুঁড়া সুগন্ধি চাল। মেলার ১০ নম্বর মিনি প্যাভিলিয়ন থেকে ক্রেতারা এ অফার নিতে পারবেন। অফারের আওতায় রয়েছে ১৮টি প্যাকেজ। প্রতিটি প্যাকেজেই রয়েছে নগদ অর্থছাড় অথবা পণ্য ফ্রি।
১১০ টাকা দামের এক কেজি চিনিগুঁড়া চাল ক্রেতারা মেলা থেকে ৯০ টাকা দিয়ে কিনতে পারবেন। আর পাঁচ কেজির প্যাকেট কিনতে পারবেন ৪৪০ টাকায়, যার প্রকৃত মূল্য ৫৩৪ টাকা। ক্রেতারা প্যাভিলিয়নটি থেকে ‘চরম শীতে গরম অফার’-এর আওতায় পাবেন ৫৫৫ টাকা দিয়ে কাচ্চি বিরিয়ানি অফার। এটি নিলে ক্রেতাদের বাঁচবে ১২৫ টাকা। ৪৮০ টাকা দিয়ে শাহি অফার নিলে বাঁচবে ১২৫ টাকা।
নগদ ছাড়ের পাশাপাশি প্যাভিলিয়নটি থেকে কিছু কিছু পণ্যে অন্য পণ্য ফ্রি দেয়া হচ্ছে। এর মধ্যে ২১৫ টাকার দুই কেজি প্রাণ চিনিগুঁড়া চালের সঙ্গে ফ্রি রয়েছে এক কেজি প্রাণ সল্ট। ৩৫৩ টাকার পাঁচ কেজি প্রাণ মিনিকেট চালের সঙ্গে ফ্রি এক কেজি আটা। এক কেজি সল্ট ফ্রি আছে ৩৮৮ টাকার পাঁচ কেজি প্রাণ বাংলামতি চালের সঙ্গে।

লিনেক্সের ২০ শতাংশ ছাড়
ইলেকট্রনিক প্রতিষ্ঠান লিনেক্স তাদের প্রোডাক্ট ক্যাটাগরি অনুযায়ী বাণিজ্যমেলায় ১০-২০ শতাংশ পর্যন্ত ছাড় দিচ্ছে। এই ছাড় শুধু মেলার জন্য প্রযোজ্য হবে। লিনেক্স প্যাভিলিয়নে পাওয়া যাচ্ছে আকর্ষণীয় ডিজাইন ও সাশ্রয়ী মূল্যের স্মার্টফোন, ফিচার ফোন, এনার্জি সেভিং রেফ্রিজারেটর, স্মার্ট এলইডি টিভি, ইকো ফ্রেন্ডলি এয়ার কন্ডিশনার, অটোমেটিক ওয়াশিং মেশিনসহ লিনেক্স ব্র্যান্ডের সব ধরনের ইলেকট্রনিক পণ্য।

ফার্নিচারে ছাড় ও উপহার
নতুন নতুন ডিজাইনের ফার্নিচার নিয়ে এবারের ঢাকা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যমেলায় হাজির হয়েছে দেশের নামীদামি প্রতিষ্ঠানগুলো। রয়েছে মূলছাড়ের পাশাপাশি দারুণ সব অফার। অনেক পণ্যের সঙ্গে রয়েছে সুদৃশ্য উপহার। মেলা থেকে পণ্য কিনলে রাজধানীর মধ্যে হোম ডেলিভারিরও ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। বিভিন্ন ব্যাংকের ডেবিট বা ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে পণ্য কিনলে রয়েছে আলাদা মূল্যছাড়। মেলাপ্রাঙ্গণ ঘুরে দেখা গেছে, পারটেক্স, হাতিল, নাদিয়া, নাভানা, আখতার, রিগ্যাল, হাইটেক, এথেনাস, লিগ্যাসিসহ ফার্নিচারের সব প্যাভিলিয়নে দেয়া হচ্ছে বিশেষ ছাড়। বিক্রেতারা জানান, কেনার চেয়ে বেশির ভাগ দর্শনার্থী এখনো পণ্য দেখছেন। অনেকে নিকটতম শাখা থেকে পণ্য কিনতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন। আবার কেউ কেউ সব তথ্য নিয়ে যাচ্ছেন, সামনের সপ্তাহে এসে বুকিং দেবেন বলে জানাচ্ছেন তারা।
মেলা উপলক্ষে রিগ্যাল প্যাভিলিয়নে দেয়া হচ্ছে ১০-২০ শতাংশ পর্যন্ত বিশেষ ছাড়। এর বাইরে যেসব পণ্যে ১০ শতাংশের কম মূল্যছাড় রয়েছে তা ছয় মাসের বিনা সুদে কেনার সুযোগ রয়েছে।
মেলা উপলক্ষে নাভানা ফার্নিচার বেডরুম সাজানোর সব ধরনের ব্যবস্থা রেখেছে। নতুন পণ্যের পাশাপাশি সব ধরনের পণ্যে ১৭ শতাংশ পর্যন্ত ছাড় দিচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি। মেলা ও শোরুমে একই সুবিধা দেয়া হচ্ছে। মেলায় তানিন বেস্টওয়ার ফার্নিচার দিচ্ছে বিশেষ ছাড়। এর বাইরে বিমান টিকিট জেতার সুযোগও রয়েছে। তানিনের বিক্রয়কর্মী আরিফ বলেন, মেলায় পণ্য কিনলে নিশ্চিত পুরস্কার রয়েছে। দেয়া হচ্ছে স্ক্র্যাচ কার্ড। মেলার শেষ দিন লটারির মাধ্যমে বিজয়ীদের মধ্যে পুরস্কার বিতরণ করা হবে।
মেলায় নাভানা ফার্নিচার দিচ্ছে পাঁচ থেকে ১৫ শতাংশ ছাড়। মেলায় নাভানার প্রায় ৬৫টি নতুন পণ্য আনা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে বেড, ডাইনিং সেট, অফিস ফার্নিচার ও ডিভান। দামও রিজনেবল।
আখতার ফার্নিচার সব পণ্যে দিচ্ছে ১২ শতাংশ ছাড়। সঙ্গে হোম ডেলিভারির সুযোগ। হাইটেক ফার্নিচার দিচ্ছে লাখ টাকার অফার। এছাড়া সব পণ্যে রয়েছে ৫ থেকে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত মূল্যছাড়। রাজধানীর ভেতরে হোম ডেলিভারির ব্যবস্থাও রয়েছে।

নানা অব্যবস্থাপনায় ভোগান্তি
মেলাপ্রাঙ্গণ ঘুরে দেখা যায়, মেলার ভেতরে শৌচাগারের সংখ্যা অপ্রতুল। যেগুলো আছে তা ঠিকমতো পরিষ্কার করা হয় না। সেখানে যেতে হলে নাকে কাপড় চেপে যাওয়া ছাড়া উপায় নেই। এ ছাড়া মেলাপ্রাঙ্গণে ভিক্ষুকের পাশাপাশি ভাসমান হকারদের উৎপাত রয়েছে। মেলায় উৎপাতের আরেক নাম ধুলো। বালুভরা মাঠে পর্যাপ্ত পানি না দেয়ায়, পাশাপাশি এখনো নির্মাণকাজ চলায় দর্শনার্থীদের নাকে রুমাল দিয়ে হাঁটতে হচ্ছে।
প্রায় ৩২ একর জায়গাজুড়ে আয়োজিত বাণিজ্যমেলায় বসার কোনো ব্যবস্থা রাখা হয়নি। ফলে দীর্ঘক্ষণ হেঁটে ক্লান্ত হয়ে পড়ছেন অনেকে। বিশেষ করে বয়োজ্যেষ্ঠ নারী ও শিশুরা পড়ছেন চরম দুর্ভোগে। মাকে নিয়ে মেলায় আসা মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা ফখরুদ্দিন জুয়েল বলেন, কিছুক্ষণ ঘোরাঘুরির পর চলে যাচ্ছি। এখানে একটু বিশ্রামের জায়গা নেই। মেলা যদি গণমানুষের জন্য হয় তবে তাদের বিশ্রামের কথাটাও মেলা কর্তৃপক্ষের মাথায় রাখা উচিত ছিল। বিশেষ করে বয়স্কদের জন্য।

 

ads

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫