ads

ঢাকা, শনিবার,২১ এপ্রিল ২০১৮

মতামত

প্রসঙ্গ : সিরাজ সিকদারের ভূমিকা

তানভীর আহমেদ

০৮ জানুয়ারি ২০১৮,সোমবার, ১৯:৫৪


প্রিন্ট
প্রসঙ্গ : সিরাজ সিকদারের ভূমিকা

প্রসঙ্গ : সিরাজ সিকদারের ভূমিকা

প্রত্যেক জাতির ইতিহাসে একটা উত্থানপর্ব যে পর্বে অনেক ধরনের নেতার আবির্ভাব হয়। তাদের সবার মত ও পথ এক হয় না। ১৯৪৭-৭১ পর্বে বাংলাদেশের উত্থানপর্বের যে ইতিহাস, সেখানে ডান-বাম-মধ্যপন্থী, অর্থাৎ বিভিন্ন ধরনের নেতৃত্বের পদচারণা দেখা যায়। এ সময়ের অন্যতম আলোচিত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব সিরাজ সিকদার একজন ব্যতিক্রমধর্মী নেতা। তার চিন্তাধারা, মতাদর্শ ও কর্মপদ্ধতি নিয়ে আমরা একমত না হতে পারি। কিন্তু তৎকালীন পাকিস্তানবিরোধী আন্দোলন এবং স্বাধীন বাংলাদেশে তিনি যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন তা অনস্বীকার্য। বিশেষ করে আধিপত্যবাদ ও সম্প্রসারণবাদবিরোধী লড়াইয়ে তিনি আরো অনেক বছর ধরে অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবেন। অধিকারহীন জনগণ তাদের ন্যায়সঙ্গত অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে এমন কাউকে অনুপ্রেরণা হিসেবে নেবে।

১৯৬৬ সালে সিরাজ সিকদার ‘পূর্ব বাংলার শ্রমিক আন্দোলন’ প্রতিষ্ঠা করেছিলেনন। সে সময় পূর্ব বাংলার জনগণের ‘পাঁচটি শত্রু’কে চিহ্নিত করে এদের ‘পাঁচ পাহাড়’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন। এই পাঁচটি পাহাড় বা বাধা অতিক্রম করতে পারলে জনগণ তাদের আকাক্সিক্ষত মুক্তি অর্জন করতে পারবে বলে তিনি বিশ্বাস করতেন। তার উল্লিখিত প্রতিপক্ষ হলো- ১. তদানীন্তন পাকিস্তানি উপনিবেশবাদ, ২. ভারতীয় আধিপত্যবাদ ও সম্প্রসারণবাদ, ৩. মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ, ৪. তদানীন্তন সোভিয়েত সামাজিক সাম্রাজ্যবাদ ও ৫. দেশীয় দালাল পুঁজিবাদ ও সামন্তবাদ।

সিরাজ সিকদার পূর্ববাংলার সমাজ কাঠামো বিশ্লেষণ করে বলেছিলেন, যখন পাকিস্তানি ঔপনিবেশিক শক্তি দৃশ্যপট থেকে সরে যাবে, তখন জনগণের সামনে প্রধান ও মূল শত্রু হিসেবে আবির্ভূত হবে আধিপত্যবাদ ও সম্প্রসারণবাদী শক্তি। সম্প্রতি একটি টকশোতে বিশিষ্ট সাংবাদিক ও ডেইলি নিউ এজ সম্পাদক নূরুল কবীর বলেছেন- প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরে আমাদের সবচেয়ে বড় অর্জন হলো, ভারত যে আমাদের সবচাইতে বড় শত্রু, বিষয়টি জনগণ বুঝতে পেরেছে।’

সিরাজ সিকদার বিষয়টি ১৯৬৭ সালেই জনগণের সামনে উপস্থাপন করেছিলেন। আধিপত্যবাদ ও সম্প্রসারণবাদ সম্পর্কে তার রচনাবলিতে বলেছেন, ভারতের হাতে যেহেতু আমেরিকা বা ইউরোপীয় ইউনিয়নের মতো বিনিয়োগযোগ্য পুঁজি নেই এবং পর্যাপ্ত পুঁজি বা মূলধন নেই, তাই আশপাশের অঞ্চলের ওপর সম্প্রসারণবাদ ও আধিপত্য বিস্তারের মাধ্যমে সে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে চায়।
এ কারণে ভারত দক্ষিণ এশিয়ার একের পর একটি অঞ্চলে তাদের আধিপত্য সম্প্রসারণ ঘটিয়ে চলেছে। ব্রিটিশদের ‘আদরের সন্তান’ হিসেবে সে দখল করেছে গোয়া, দমন, দিউ, পণ্ডিচেরি, হায়দরাবাদ, সিকিম ও কাশ্মির অঞ্চল। এখন সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ার দিকে তার দৃষ্টি প্রভাব বিস্তারের লক্ষ্যে।

ভারত দক্ষিণ এশিয়াতে মূলত যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের শূন্যস্থান পূরণ করতে চায়। আকাক্সক্ষা খুবই প্রবল; কিন্তু তার সামর্থ্যরে অভাব আছে। এ ক্ষেত্রে পৃথিবীর নতুন অর্থনৈতিক শক্তি চীনের হিসেবে আবির্ভাব ভারতের আকাক্সক্ষা বাস্তবায়নের পথে প্রধান অন্তরায়।

দেশটি নিজের স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য দক্ষিণ এশিয়ার দেশে দেশে অনুগত নেতৃত্ব তৈরি করতে বদ্ধপরিকর। ২০১৫ সালে শ্রীলঙ্কার নির্বাচনে সে দেশের প্রেসিডেন্ট মাহিন্দা রাজপাকসেকে পরাজিত করার জন্য ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে বলে নির্বাচনে পরাজয়ের পর রাজপাকসে অভিযোগ করেন। মালদ্বীপে প্রেসিডেন্ট নাশিদকে সমর্থন দেয় ভারত। কিন্তু নাশিদ আবদুল্লাহ ইয়ামিনের কাছে হেরে যান। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশে ভারত তার ‘মিত্র দল’কে জিতিয়ে আনার জন্য সমর্থন দিয়েছে। ভোটারবিহীন নির্বাচনটি কার্যত প্রহসনে পর্যবসিত হয়।

যা হোক, অনেকের মতে, সিরাজ সিকদার বাংলাদেশের প্রথম বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বা ক্রস ফায়ারের শিকার তিনি নিহত হন ১৯৭৫ সালে ২ জানুয়ারি। চট্টগ্রামে থেকে ১ জানুয়ারি গ্রেফতারের পর তাকে ঢাকায় আনা হয়। এর আগে, মুক্তিযুদ্ধের প্রাক্কালে ১৯৭১ সালের ২ মার্চ পূর্ববাংলা সর্বহারা পার্টি সিরাজ সিকদারের নেতৃত্বে স্বাধীনতা ঘোষণা করেছিল। এরপরই পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে সশস্ত্র যুদ্ধ শুরু করেন তিনি। ১৯৭১ সালে সিরাজ সিকদার ভারতে না গিয়ে বৃহত্তর বরিশালের পেয়ারা বাগান থেকে মুক্তিযুদ্ধকে সঙ্ঘটিত করেন। ১৯৭২ সাল থেকে ১৯৭৫ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত তিনি সরকারের বিরুদ্ধে প্রধানত সশস্ত্র সংগ্রাম পরিচালনা করেন। ১৯৭৩ সালের ১৭ নভেম্বর সর্বহারা পার্টির ডাকে দেশের তখনকার ১৯টি জেলার মধ্যে ১৭টি জেলায় সফল হরতাল পালিত হয়।

১৯৭৪ সালে নভেম্বর চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে এক কর্মিসভায় সিরাজ সিকদার বলেছিলেন, ‘মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ যদি বুঝতে পারে বামপন্থী মাওবাদী শক্তি দুর্বল হয়ে পড়েছে। তাহলে তারা বাংলাদেশের ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করবে। যতদিন মাওবাদী শক্তি লাল ঝাণ্ডা উড়াবে, ততদিন সাম্রাজ্যবাদ চুপ থাকবে।’ সিরাজ সিকদারের নিহত হওয়ার মাত্র সাত মাসের মাথায় বাংলাদেশে মার্কিন সমর্থিত সেনা অভ্যুত্থান ঘটে, এ থেকে আমরা সিরাজ সিকদারের দূরদৃষ্টি সম্পর্কে ধারণা পাই।

১৯৭০ সালে মরহুম শেখ মুজিবুর রহমান ‘টাইম’ ম্যাগাজিনকে একটি সাক্ষাৎকার দিয়েছিলেন, তখন তিনি বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও পাশ্চাত্য শক্তির বোঝা দরকার- আমিই একমাত্র রাজনীতিক যে পূর্ব পাকিস্তানকে মাওবাদীদের হাত থেকে রক্ষা করতে পারি।’

জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার যখন ভূলুণ্ঠিত এবং ভোটারবিহীন সরকার ক্ষমতায়, তখন সিরাজ সিকদারকে স্মরণ করা প্রয়োজন। আধিপত্যবাদী শক্তির চক্রান্তে আমাদের জনগণ অধিকার বঞ্চিত, তখন তাকে নিয়ে আলোচনা প্রাথমিক বৈকি।

১৯৭২ থেকে ’৭৪ সালে অনেক তরুণ সিরাজ সিকদারের আহ্বানে শোষণমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠা প্রত্যয়ে আধিপত্যবাদ ও সম্প্রসারণবিরোধী তথা সাম্রাজ্যবাদবিরোধী প্রতিরোধ সংগ্রামে অংশ নিয়েছিল। প্রায় ২৫ হাজার কর্মীসহ সিরাজ সিকদার নিহত হন।

আজো দেশে গণতন্ত্র, আইনের শাসন, মানবাধিকার ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে আধিপত্যবাদ ও সম্প্রসারণবাদ এক বড় প্রতিবন্ধক। দেশে গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনতে হলে আধিপত্যবাদবিরোধী লড়াইও এক সাথে চালাতে হবে। ১৯৮২ সাল থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত দেশে যে সামরিক স্বৈরশাসন ছিল, তার পেছনেও ওই শক্তির মদদ ছিল। ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি থেকে যে ছদ্মবেশী সামরিক শাসন এবং ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি থেকে যে নিয়ন্ত্রিত গণতন্ত্র চলছে, তার পেছনেও একই শক্তির ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বিভিন্ন সময়ে অগণতান্ত্রিক শক্তিগুলোকে সমর্থন দিয়ে তারা জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার হরণ করেছে।

২০০৬ সাল থেকে ২০১৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশ থেকে সাড়ে ছয় লাখ হাজার কোটি টাকা পাচার হয়ে গেছে ‘গ্লোবাল ইন্টিগ্রিটি’র রিপোর্ট অনুযায়ী। শেয়ারবাজার থেকে এক লাখ হাজার কোটি টাকা লুটপাট প্রমাণ করে, দেশীয় দালাল মুৎসুদ্দী পুঁজিবাদ আমাদের জাতীয় উন্নতির পথে অন্তরায়। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণায় দেখা গেছেÑ বাংলাদেশ থেকে ৬০ বিলিয়ন ডলার পাচার হয়ে গেছে ২০০৮ সাল থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত।

আধিপত্যবাদ, সম্প্রসারণবাদ, মুৎসুদ্দী পুঁজিবাদ ও সাম্রাজ্যবাদই আমাদের জাতীয় অগ্রগতির পথে বাধা। সিরাজ সিকদার নিপীড়নমূলক ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্রব্যবস্থা এবং আধিপত্যবাদ, সম্প্রসারণবাদ ও সামাজিক সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন। তদানীন্তন রুশ-ভারত অপশক্তির বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন। তার সাফল্য। 

লেখক : সাংবাদিক

 

ads

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫