ঢাকা, মঙ্গলবার,২৩ জানুয়ারি ২০১৮

অবকাশ

শীতের বাংলা গীতের বাংলা

হাসান মাহমুদ রিপন

০৭ জানুয়ারি ২০১৮,রবিবার, ০০:০০ | আপডেট: ০৭ জানুয়ারি ২০১৮,রবিবার, ০৬:২৮


প্রিন্ট

প্রকৃতি শীতের কথা বলে। শীতের আগমনে সাড়া পড়েছে প্রকৃতিতে। মানবসমাজে সৃষ্টি হয় নতুন আমেজ ও উৎসব। শীত দারুণ প্রসারিত তার এক একটি বাহু। উঁচু উঁচু গাছের মাথায় তার প্রলেপ কুয়াশার বিস্তার। শহরের ঢ্যাঙা বাড়ি এখন আর সকাল ৮-৯টার আগে স্পষ্ট হয় না। গাছের পাতার গায়ে হলদে রঙ। শোনা যাচ্ছে তাদের ঝরে পড়ার শব্দ। শুধু ভোর বেলায় গুটিকয়েক স্বাস্থ্যসচেতন মানুষ আর শীর্ণদেহী, জীর্ণ পোশাকের পাতা কুড়ানিদের সাথে দেখা হয় তাদের। ওই দিকে সূর্য মামা তড়িঘড়ি টুপ করে ডুব দেয়। রাত বাড়ার সাথে সাথে শুরু হয় হু হু কাঁপন, বাতাসে শীতের গন্ধ। গরম চা আর ধোঁয়া ওঠা ভাপা পিঠা পথে পথে। বদলে যাচ্ছে অনেক কিছু। হামাগুড়ি দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে শীত।
শীতকাল আমাদের জীবন-জীবিকার ক্ষেত্রে যতটা গুরুত্বপূর্ণ, অনুভব উপভোগ্য, যতটা স্বতন্ত্র, ততটা আলোচ্য বিষয় হিসেবে মূল্য পায়নি। গ্রাম জীবনে শীত আসে নানা মাত্রা নিয়ে। এর সাথে একজন কৃষকের স্বপ্ন ও প্রত্যাশা যুক্ত, কষ্টের ভেতরেও তার প্রাপ্তি আছে। ভূমিহীন, প্রান্তিকচাষি বা দরিদ্রক্লিষ্ট মানুষের জন্য সময়টা নিরানন্দময় তার অর্জনের ভাণ্ডার একবারে শূন্য না হলেও চাহিদার তুলনায় প্রাপ্তি নগণ্য। যেখানে শ্রমের বিনিময়ে অর্জন কম, সেখানে ক্লেশের মূল্য কোথায়? শহরে জন্ম নেয়া মানুষ প্রকৃতির এরূপ আর রঙ পরিবর্তনকে ততটা আমলে নেন না। কেননা তার জীবিকা কিংবা বিত্তবেসাতির সাথে বিশেষ কোনো ঋতু সরাসরি যুক্ত হয় না। গায়ে শিকড় রয়ে যাওয়া প্রথম প্রজন্মের শহরবাসী শীতকে বিস্মৃতির আড়ালে চলে যেতে দেন না সত্যি, কিন্তু কর্মব্যস্ত সময়ে এ নিয়ে দু’দণ্ড তার ভাবার অবসর কম। অবশ্য শীতকালে গ্রামে যাওয়ার সুযোগ পেলে সেটা তারা মাঝে মধ্যে কাজে লাগান। কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া আমাদের কবি-সাহিত্যিকদের সৃষ্টিতেও শীত ঋতুটা যেন ‘ব্রাত্যজন’। তাকে নিয়ে লেখালেখি বেশি কিছু নয়, যদিও বাংলাদেশের ছয়টি ঋতুর প্রধান তিনটির একটি শীতকাল। শীত হলোÑ সমৃদ্ধির প্রতীক। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন, শরত-হেমন্ত-শীতে মানুষের ফসলের ভাণ্ডার।
শরতেই কুয়াশা পড়া শুরু হয়, হেমন্তে তা গ্রাস করে গোটা জনপদকে। সূর্য মকরক্রান্তি বরাবর অবস্থান নেয়ার ফলে দিন ক্রমেই ছোট হয়ে আসে। শীতার্ত উত্তরের বাতাস ধেয়ে এসে মানুষের শরীরে যেন হুল ফোঁটায়। শহরের দালানকোঠার ভিড়ে শীতল হাওয়ার সাথে কুয়াশার জঙ্গল একাকার হয়ে যায়। প্রাণভরে নিঃশ্বাস নিতে গিয়ে বোঝার উপায় থাকে না এতে কতটুকু কুয়াশা আর কতটুকু কার্বনডাই-অক্সাইড, কিন্তু শহর ছাড়িয়ে গাঁয়ে পা রাখলেই যে কুয়াশা আলিঙ্গন জানায় তা বিশুদ্ধ ও তরতাজা। শীতে মাঠ থেকে পানি নেমে যাওয়ার দিগন্তজোড়া মাঠ-গাঁয়ের মানুষের কাছে চলাচলের যোগ্য হয়, যা বর্ষায় ছিল অগম্য। খটখটে পায়েচলা কাঁচা সড়ক ধরে গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে যেতেও বাধা নেই। মানুষের চলাচলও বেড়ে যায় এ সময়। আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে যাওয়া-আসা ও দূর গাঁ থেকে বাপের বাড়িতে বেড়াতে আসা বধূর প্রতীক্ষার অবসান ঘটায় এ শীত ঋতু। গাঁয়ের বাজারগুলোও জমজমাট হয়ে ওঠে। চার দিকে ইচ্ছেমতো বেড়ানোর সুযোগে গ্রামবাংলা প্রকৃতপক্ষেই শীতে উৎসবমুখর হয়ে ওঠে।
বাংলাদেশে যে সবজি উৎপাদিত হয় তার শতাংশ মেলে শীতকালে। হাট বাজারগুলো এখন শীতকালীন শাক-সবজিতে ভরপুর। শিম, মুলা, ফুলকপি, বাঁধাকপি, লাউ, লালশাক, পালংশাক, টমেটো ইত্যাদি। গ্রামীণ হাটে বসেছে সবুজের মেলা। শীতে গ্রামীণ বধূরাও বসে নেই। শীতের পিঠে-পায়েশ তৈরির ধুম পড়েছে তাদের মধ্যে। ধানভানা, আতপ চাল তৈরি করা, ঢেঁকিতে কিংবা মেশিনে চালের গুঁড়া বানানো ইত্যাদি কাজে ব্যস্ত কৃষাণীরা। আবহাওয়ার পরিবর্তনে দেশের উত্তরাঞ্চলে শীতের তীব্রতা প্রতিবছরই বেশি অনুভূত হয়।
শীত উৎসব ও এর আহার্যের সাথে খেজুর রসের সম্পর্ক নিবিড়। একেবারে জলাভূমি এবং কিছু পাহাড়ি ভূমি বাদে বাংলাদেশে এমন কোনো অঞ্চল নেই, যেখানে খেজুর গাছ জন্মে না। তবে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে খেজুর গুড় উৎপাদিত হয় বাণিজ্যিকভাবে। বিস্তর মজুর যুক্ত হন খেজুর গাছ কাটা, রস সংগ্রহ, তা জ্বাল দেয়া ও গুড় তৈরির কাজে। যেকোনো চাষিই খেজুর গাছে কাটতে পারেন রস আহরণের জন্য। এ ক্ষেত্রেও আছে কিছু কৌশল, যা শিখতে সময় নেই। তাই দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে বহুকাল ধরে পেশাদার গাছ কাটিয়ে আছে। স্থানীয় ভাষায় এদের বলা হয় গাছি। কার্তিক মাসের শুরু থেকে চৈত্রের শেষ পর্যন্ত এরা খেজুর গাছ কাটায় নিয়োজিত থাকেন। যেসব চাষির স্বল্পসংখ্যক খেজুর গাছ আছে, তারা নিজেরাই তা কাটেন, রস সংগ্রহ করে বাড়িতে এনে জ্বাল দিয়ে গুড় তৈরি করেন।
শীতের প্রকোপ যত বেশি পড়ে, রসও হয় তত বেশি। তাই শীতকালে খেজুর গাছ আছে এমন অঞ্চলে গেলে দেখা যায়, তীব্র শীতের মধ্যেও রাতের পরিবেশে একটা পার্থক্য আছে। সকালে গাছ থেকে রস সংগ্রহের পর তা জ্বাল দিয়ে শেষ করা হয়ে যায় দুপুরের মধ্যে। উনুনের পাশে থাকে গাছি আর মজুরদের থাকার জন্য বানানো কুঁড়েঘর, খেজুরের পাতা কিংবা বিচালি দিয়ে ছাওয়া। গাছিয়ারা একাকিত্ব কাটাতে গ্রাম এলাকায় চালু নানা ধরনের ‘দেহতত্ত্ব’ গান গেয়ে চলেছেন। লালন, পাগলা কানাই কিংবা নাম না জানা গ্রাম্য পদকর্তার এসব পদ বিকৃত হয়েছে স্থানীয় উচ্চারণে কিংবা যুগ থেকে যুগে, মুখে মুখে গীত হওয়ার কারণে। কিন্তু সুরে আছে অদ্ভুত প্রাণময়তা ও আবেগ, যা সহজেই হৃদয়ে ছুঁয়ে যায়। যে গাছি কয়েক মাসের জন্য দূর গাঁ থেকে এসেছেন, ঘরে যার আছে বালিকা বধূ তিনি দেহতত্ত্ব গান না গেয়ে পুরনো যাত্রাপালা কিংবা লোকগীতির সেই সঙ্গীতগুলো উচ্চারণ করেন, যাতে আছে বিরহ মেশানো। নৈঃশব্দ, নিঃসঙ্গতা ও বিরহ পরস্পরের সম্পর্কযুক্ত হওয়ায়, প্রাণের গভীর থেকে উঠে আসা ওই সঙ্গীতে শীতের অনঢ় বৃক্ষগুলোও যেন কেঁদে ফেলে। শীতে খেজুর গাছিদের অন্যতম বিনোদন হলো রেডিও। তারা রেডিওতে অন্যের গান শোনেন, কিন্তু নিঃসঙ্গতা ভুলতে স্বকণ্ঠের সঙ্গীতের কোনো বিকল্প আছে কি না তা জানা নেই। গাছিদের জীবনের সুখ-দুঃখের বিরহ গাঁথাও হারিয়ে যাচ্ছে যান্ত্রিক জীবন ও তার হিসাব-নিকাশের আড়ালে।
শীত তার বিচিত্র রূপ ও রস নিয়ে হাজির হয় গ্রামবাংলায়। নবান্ন উৎসব কিংবা শীতের পিঠা পায়েশ তৈরি উৎসব এখন তেমন ঘটা করে হয় না। তার পরেও শীতের যা কিছু চিরায়ত রূপ, তা উপলব্ধি করতে হলে গ্রামে যেতে হবে। গাঁয়ের মেঠোপথের দু’ধারে দূর্বাঘাসের ডগায় জমে থাকা শিশির বিন্দুর ওপর শীতের সূর্যের সোনালি রোদ পড়লে অপূর্ব দৃশ্যের অবতারণা হয়। গ্রামবাংলায় শীত আসে ফসলের সম্ভারের সাথে। যেমন সমৃদ্ধি আনে, তেমনি পাশাপাশি আনে প্রকৃতিতে অসীম শূন্যতা। ফসলবিহীন আমন জমি পড়ে থাকে এক এক দীর্ঘশ্বাস নিয়ে। ঝরা পাতাকে বিদায় জানায় পত্রমোচী বৃক্ষ, সেখানেও তার অব্যক্ত বেদনা যেন মূর্ত হয় সংগোপনে, যা শুধু অনুভবের বিষয়।
শীতের নির্জনতার মধ্যে নীরব অস্তিত্বের প্রকাশও সৌন্দর্যমণ্ডিত। প্রতিটি ঋতুরই নিজস্ব বৈশিষ্ট্য আছে। শীতের কর্মব্যস্ত দিনের সব কোলাহলকে আড়ালে করে যখন রাত গভীর থেকে গভীরতর হয়, তখনই খুঁজে পাওয়া যায় শীতের আসল রূপ। এরূপ তার নিজের চোখ দিয়ে, হৃদয় দিয়ে এঁকে, অনুভবের ব্যাপার।

 

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫