ads

ঢাকা, শনিবার,২১ এপ্রিল ২০১৮

অবকাশ

ঘানি : চারাগল্প

মুহাম্মদ কামাল হোসেন

০৭ জানুয়ারি ২০১৮,রবিবার, ০০:০০


প্রিন্ট

ভ্যানচালক রাজু মিয়া ময়লা, ছেঁড়া দু’খানা এক শ’ টাকার নোট নিয়ে ব্যাগ হাতে দ্রুত বেরিয়ে পড়েন। পেছন থেকে বউ চেঁচিয়ে ডাকেন।
‘আবার কী! ডাকছ কেন?’
‘মেয়েটা গরুর কলিজা খেতে চেয়েছে, পারলে এক-আধপোয়া নিয়ে আসবে’।
‘আচ্ছা নিয়ে আসব’।
বৃদ্ধা রাজু মিয়া আর পেছনে ফিরে তাকান না। দ্রুত বেরিয়ে পড়েন। বাজার করার পর থেকে রাজু মিয়ার ত্রাহি মধুসূদন অবস্থা! মেঘ নেই, বৃষ্টি নেই; ঘোর ঝড়ের আলামত। প্রথমে সোজা গিয়ে ঢুকে মুদি দোকানে। ফর্দ অনুযায়ী জিনিস যেটা ধরতে যায় সেটাতেই আগুন। প্রতিটি পণ্যে প্রায় দ্বিগুণ দাম হাঁকাচ্ছে দোকানিরা। মুদি বাজারে রাজু মিয়া বেশিক্ষণ টিকে না। কোনোমতে জানটা নিয়ে দ্রুত বেরিয়ে আসে। এতদিনকার পরিচিত বাজারটা রাজু মিয়ার কাছে অপরিচিত লাগছে। মানুষগুলোও কেমন জানি অচেনা অচেনা। যেন ভিনগ্রহ থেকে আসা। রাজু মিয়ার মাথা ভোঁ ভোঁ করে ঘুরতে লাগল। তপ্ত আগুনের ধোঁয়া কুণ্ডলি পাকিয়ে মাথা দিয়ে বেরিয়ে আসছে। প্রায় ঘণ্টাব্যাপী বাজারে ঘুরেও টেনেটুনে সে দু-এক পদের বেশি কিছু কিনতে পারেনি। নিজেকে খুব অসহায় লাগছিল। কোনো রকম টলতে টলতে রাজু মিয়া গিয়ে ঢুকে কাঁচাবাজারে।
‘মিয়াসাব, আহেন আহেন’।
কাছে যেতেই দোকানির মুখের উৎকট গন্ধটা নাকে আসতে দেরি করেনি। রাজু মিয়া দ্রুত নিজেকে সটকে নেয়। একটু দূরত্ব বজায় রেখে দাঁড়ায়। এখানেও ফর্দমাফিক কাঁচামরিচ, লাউ, কফি, শিম ও বরবটির দাম শুনে রাজু রীতিমতো হোঁচট খায়! বাজারের এমন করুণ চিত্র হবে, কল্পনাও করতে পারছে না। সব জিনিসপাতির দাম অগ্নিছোঁয়া। মারাত্মক অস্বস্তি লাগছে রাজু মিয়ার। ঠিকমতো দাঁড়াতেও পারছে না। শীতের বাজারে গরমের উত্তাপটা ভালোই টের পাচ্ছে। দোকানদার হাঁফ ছাড়ে।
‘মিয়াসাব, কী ব্যাপার? শরীর টরির খারাপ নাকি?’
‘না না আমি ঠিক আছি’।
‘মিয়াসাব, আজকাল বেবাক জিনিসের দাম একটু বাড়তি, হাহাহা...’
জিনিসপাতির দাম বেড়েছে বলে দোকানি দাঁত কেলিয়ে হাসছে। দোকানির পোয়াবারো। একাদশে বৃহস্পতি!
‘মিয়াসাব, লও একখান টান মারো?’
রাজু মিয়া দোকানির আজাইরা প্যাঁচালে জবাব দেয় না। দোকান থেকে দ্রুত বেরিয়ে পড়ে। হঠাৎ তার মনে পড়ল, মেয়ের জন্য গরুর কলিজা কেনা হয়নি’। রাজু মিয়া পাশের গোশত দোকানে গিয়ে দাঁড়ায়। দোকানিকে প্রশ্ন করে,
‘ভাই, কলিজা কত?’
‘কয় কেজি নেবেন’?
‘বেশি না অল্প একটুই’
‘কেজি প্রতি ৫০০ টাকা করে রাখব’!
‘৫০০ টাকা!!’
‘জ্বি’
বৃদ্ধা রাজু মিয়া করুণ চোখে গোশত দোকানির দিকে চেয়ে থাকে। নিজের হাতের পাঁচখানা আঙুল চোখের সামনে টান টান করে মেলে ধরে। চলে যেতে গিয়েও ঘুরে দাঁড়ায়,
‘ভাই, এক পোয়া হবে?’
‘আজ না, আরেক দিন আইসেন। এখন ভাগেন’।
রাজু মিয়া টলতে টলতে হাঁটে। ডান হাতে নিজের বুক চেপে ধরে। চিন চিন করে ব্যথা হচ্ছে। মেয়েকে কী জবাব দেবে বুঝে উঠতে পারে না। সম্ভব হলে একমাত্র মেয়েটাকে নিজের বুকের কলিজাটাও খাওয়াতে রাজি। আর ভাবতে পারে না রাজু মিয়া। সামলাতে না পেরে মাথা ঘুরে ধড়মড়িয়ে পড়ে যায়। মুহূর্তে জ্ঞান হারিয়ে ফেলে।
একরকম পাঁজাকোলা করে রাজু মিয়াকে দ্রুত ডাক্তারের চেম্বারে প্রবেশ করানো হয়েছে। পরিস্থিতি গুরুতর। নাকের ডগায় মৃদু নিঃশ্বাসটুকু জানান দিচ্ছে এখনো বেঁচে বর্তে আছে। খবর পেয়ে মুহূর্তে বহু মানুষের জটলা গেলে যায়। বাজার বলে কথা। এখানে ঘটনা ঘটতে না ঘটতে রটতে দেরি হয় না। একটু হাতে তালি দিলেই ব্যস, উৎসাহী জনতা হাজির। জটলা বাঁধতে দেরি নেই। এদের মধ্যে সবাই কিন্তু উৎসাহী নয়। কেউ কেউ আরো দুই ধাপ এগিয়ে। এক লাইন নয়, দুই লাইন বেশি বুঝে। তারা অতি উৎসাহী টাইপের মানুষ। ঘটনার পরম্পরা কিছু জানুক আর না বুঝুক, ভ্রƒ কুচকে বিশেষজ্ঞ মতামত দিতে একটুও দেরি করে না। মুহূর্তে চায়ের কাপে ঝড় তোলে। হৃদয়বান কেউ কেউ বলে উঠল, ‘আহ! রাজু মিয়াডার কী যে হলো?’
ভিড় থেকে কেউ একজন চট করে বলে উঠল,
‘রাজু মিয়া মাথা ঘুরে পড়ে জ্ঞান হারিয়েছে’।
‘অ্যাই আপনারা চেম্বারটা একটু খালি করুন তো। এখানে ভিড় করবেন না। রোগীকে ভালো করে দেখতে দিন।’
প্রৌঢ় বয়স্ক ডাক্তারের জোরালো কথাতে লোকজন চেম্বার থেকে বেরিয়ে যেতে বাধ্য হয়। কিন্তু বাইরে থেকেও সবাই উঁকি মেরে পরিস্থিতি আঁচ করতে লাগল। ফিসফিস কানাঘুষা ননস্টপ চলতেই থাকল। অতি উৎসাহীরা ঘটনার শাখা-প্রশাখা ও ডালপালা ক্রমেই বাড়াতে লাগল।
‘হুমম..নিশ্চিত এটা অজ্ঞান পার্টির কাজ!’
‘না না গুরুতর ব্যাপারই হবে!!’
‘ধুর মিয়া, নির্ঘাত নেশা টেশা হতে পারে! তা না হলে কেউ এতটা ফিট হতে পারে!!!’
অতি উৎসাহীদের পাল্টাপাল্টি বিশেষজ্ঞ মতামত বন্ধ নেই। কিছুক্ষণ পর ডাক্তার বেরিয়ে আসে। চেম্বারের সামনে পিনপতন নীরবতা। সবাই তাকিয়ে আছে ডাক্তারের দিকে।
‘শুনুন, রাজু মিয়ার জ্ঞান ফিরেছে। ও এখন পুরোপুরি সুস্থ। তবে কেউ ওকে এখন কোনো প্রকার প্রশ্ন করবেন না।’
অতি উৎসাহীদের একজন ভিড় থেকে প্রশ্ন করে,
‘রাজু মিয়ার কী হয়েছে ডাক্তার সাব’?
ডাক্তার সাব রাজু মিয়ার বাজার খরচের ব্যাগটা সবার সামনে উঁচিয়ে ধরে।
‘রাজু মিয়া বাজারে জিনিসপত্রের দাম শুনে নিজেকে সামলাতে পারেনি, তাই মাথা চক্কর মেরে ঘুরে পড়ে যায়।’
ইতোমধ্যে রাজু মিয়ার বউ কান্নাকাটি করতে করতে চেম্বারে এসে হাজির হয়। তিনি স্বামীকে নিয়ে বাড়ির উদ্দেশে হাঁটা দেয়। নিত্য সংসারের ঘানি টানা ব্যস্ত মানুষটা এখন নিজের সামান্য শরীরটাও টেনে নিয়ে যেতে পারছে না। বউয়ের কাঁধে হাত রেখে বাড়ির পথে একটু একটু করে এগোতে থাকে রাজু মিয়া। এ দিকে অতিউৎসাহী বিশেষজ্ঞরাও ব্যর্থ মনোরথে যে যার পথে হাঁটা দেয়।
শরীফপুর, কুমিল্লা সদর দক্ষিণ

 

ads

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫