ঢাকা, বৃহস্পতিবার,২৬ এপ্রিল ২০১৮

সিলেট

শতভাগ বিদ্যুতায়নের দ্বারপ্রান্তে সিলেট

নয়া দিগন্ত অনলাইন

০৪ জানুয়ারি ২০১৮,বৃহস্পতিবার, ১১:২৬


প্রিন্ট

সরকার ঘোষিত শতভাগ বিদ্যুতায়ন কর্মসূচির আওতায় সিলেট জেলার অধিকাংশ এলাকাই এখন বিদ্যুতের আওতাভুক্ত। ২০১৮ সালের ডিসেম্বরের মধ্যেই বিদ্যুতের আওতায় আসবে সিলেটের ১৩ টি উপজেলার গ্রামীণ জনপদ। ইতোমধ্যেই সিলেটের সদর ও ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলায় শতভাগ বিদ্যুতায়ন সম্পন্ন হয়েছে।

এছাড়া দক্ষিণ সুরমা ও বিয়ানীবাজার উপজেলার শতভাগ বিদ্যুতায়নের কাজ সমাপ্ত করে প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণার অপেক্ষায় রয়েছে। বিশ্বনাথ, বালগঞ্জ, গোলাপগঞ্জ উপজেলার ইতোমধ্যেই শতকরা নব্বই ভাগ এলাকা বিদ্যুতায়নের আওতায় এসেছে। জৈন্তাপুর উপজেলারও প্রায় আশি শতাংশ এলাকা বিদ্যুতের আওতায় এসেছে। বাকি কাজ আগামী ফেব্রুয়ারি মাসের মধ্যে শেষ করে লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা যাবে।

২০১৮ সালের জুন মাসের মধ্যেই অসমাপ্ত কাজ শেষ করে শতভাগ বিদ্যুতায়ন সম্ভব হবে ওসমানীনগর ও জকিগঞ্জ উপজেলায়। গোয়াইনঘাট, কানাইঘাট ও কোম্পনীগঞ্জে শতভাগ বিদ্যুতায়ন সম্পন্ন হবে ২০১৮ সালের ডিসেম্বর মাসের মধ্যেই।

২০০৯ থেকে এ ২০১৭ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত সিলেট পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১ ও ২ এর আওতায় সিলেট জেলার ১৩ টি উপজেলায় নতুনভাবে বিদ্যুৎ সংযোগ পেয়েছেন প্রায় ২ লাখ ১ হাজার ৪৯৬ জন গ্রাহক।
সিলেট পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১ এর তথ্যমতে, গত নয় বছরে প্রায় ৯০ শতাংশ এলাকায় বিদ্যুতায়ন সম্ভব হয়েছে। অবশিষ্ট দশ ভাগ কাজ সরকারের নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার আগেই শেষ হয়ে যাবে।

২০১৭ সালের মার্চ মাসে ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলাকে শতভাগ বিদ্যুতায়িত উপজেলা হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। ঘোষণার অপেক্ষায় আছে দক্ষিণ সুরমা ও বিয়ানীবাজার উপজেলা। ৮৩০ কিলোমিটার সঞ্চালন লাইনের স্থলে ৭৯৫ কিলোমিটার লাইন নির্মাণের কাজ সম্পন্ন হয়েছে বিশ্বনাথ উপজেলায়। বাকি ৩৫ কিলোমিটার সঞ্চালন লাইনের নির্মাণ কাজ চলছে, যা আগামী দু এক সপ্তাহের মধ্যে সম্পন্ন হবে বলে জানান সিলেট পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১ এর সিনিয়র জেনারেল ম্যানেজার প্রকৌশলী মোঃ মাহবুবুল হক।

তিনি আরো জানান, গোলাপগঞ্জ ও ওসমানীনগর উপজেলার সঞ্চালন লাইন নির্মাণের কাজ শেষ পর্যায়ে আছে। একটু ধীরগতি থাকলেও জকিগঞ্জ উপজেলার আওতাভুক্ত এলাকা আগামী জুন মাসের মধ্যেই শতভাগ বিদ্যুতের আওতায় আনা সম্ভব হবে বলে মনে করেন তিনি।

সিলেট পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১ এর আওতাভুক্ত ৮টি উপজেলার ২ হাজার ১৪৩টি গ্রামকে বিদ্যুতের আওতায় আনতে মোট ২ হাজার ২৬৫ কিলোমিটার লাইন নির্মাণ করা হয়েছে, এতে ২৯৪ কোটি ৪৫ টাকা ব্যয় হয়েছে। আর এ পর্যন্ত নতুন বিদ্যুৎ সংযোগ পেয়েছেন ১ লাখ ১৩ হাজার গ্রাহক। এতে সিলেট পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১ এর গ্রাহক সংখ্যা ৩ লাখ ১১ হাজারে দাঁড়িয়েছে।
সিলেট পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-২ এর তথ্যমতে, ২০০৯ সালের জানুয়ারি মাস হতে এ পর্যন্ত পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-২ এর আওতাভুক্ত পাঁচটি উপজেলায় প্রায় ২০৪ কোটি টাকা ব্যয়ে ১৭০০ কিলোমিটার সঞ্চালন লাইন নির্মাণ করা হয়েছে। এতে ২৬৩ টি গ্রামে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়েছে, এর আওতায় নতুন গ্রাহক হয়েছেন প্রায় ৮৮ হাজার ৪৯৬ জন।
২০১৭ সালের জুন মাসেই সিলেট সদর উপজেলাকে শতভাগ বিদ্যুতায়িত ঘোষণা করা হয়েছে।

সিলেট সদর উপজেলা চেয়ারম্যান আশফাক আহমদ বলেন, আমাদের উপজেলায় আগে বিদ্যুতের অবস্থা ছিলো ভয়াবহ। কিন্তু বর্তমান সরকারের অর্থমন্ত্রীর নির্বাচনী এলাকা হিসেবে এবং তার ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় মাত্র ৮ বছরেই শতভাগ বিদ্যুতায়ন সম্ভব হয়েছে। ফলে আামদের এতদ অঞ্চলে সেচ সুবিধাবৃদ্ধি এবং উৎপাদনমূখী নতুন নতুন কলকারখানা স্থাপনের সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হয়েছে। গ্রামীণ এলাকার শিক্ষার্থীদের লেখাপড়ার মানোন্নয়ন হয়েছে। আগে যেখানে বিদ্যুতের জন্য সন্ধ্যার পর পড়তে বসা যেতোনা, এখন সেখানে ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ সুবিধার কারণে শিক্ষাক্ষেত্রে ব্যাপক উন্নতি হয়েছে।
সিলেট সদর উপজেলার কান্দিগাঁও ইউনিয়নের লামারগাঁও (হাওরবাড়ি) গ্রামের কৃষক আজির উদ্দিন বলেন, আমাদের এলাকায় বিদ্যুতের অভাবে চরম অবহেলিত একটি গ্রাম ছিলো। দৈনন্দিন জীবনে আমরা সবধরণের আধুনিক সুযোগ সুবিধা থেকে বঞ্চিত ছিলাম। মাত্র কিছুদিন আগে আমাদের গ্রামে নতুন বিদ্যুৎ এসেছে। এখন আমরা আগের চেয়ে অনেক ভালো আছি। এখন বিদ্যুৎ আসায় কৃষি ক্ষেতে যথা সময়ে সেচ দেয়া সম্ভব হচ্ছে। ফসলের উৎপাদন ভালো হচ্ছে। ছেলে মেয়রা রাতে পড়ালেখা করতে পারছে। এজন্য তিনি সরকারের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান।
জৈন্তাপুর উপজেলার ৭২৪ কিলোমিটার সঞ্চালন লাইন নির্মাণের প্রয়োজন, ইতিমধ্যেই ৪৮৪ কিলোমিটার সঞ্চালন লাইন নির্মাণ সম্পন্ন হয়েছে। আরো ১২৬ কিলোমিটার সঞ্চালন লাইনের নির্মাণ কাজ চলমান আছে। অবশিষ্ট অংশের দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে, যা আগামী ফেব্রুয়ারির আগেই সম্পন্ন হবে আশা প্রকাশ করছেন সিলেট পল্লী বিদ্যুত সমিতি-২ এর জেনারেল ম্যানেজার আবু হানিফ মিয়া।
তিনি আরো বলেন, গত নয় বছরে সিলেট পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-২ এর আওতায় প্রায় ৭০ শতাংশ কাজ ইতোমধ্যেই সম্পন্ন হয়েছে। গোয়াইনঘাট উপজেলার ৪৯৬ কিলোমিটার সঞ্চালন লাইন নির্মাণ সম্পন্ন হয়েছে চলতি বছরের নভেম্বর মাস পর্যন্ত। এতে ব্যয় হয়েছে ৫৯ কোটি ৫০ লাখ টাকা। ৬৭টি গ্রামে বিদ্যুৎ সংযোগ পেয়েছেন ২৩ হাজার ৯০০ গ্রাহক। অবশিষ্ট অংশের কাজ ২০১৮ সালের ডিসেম্বর মাসের মধ্যেই শেষ হবে।
কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার ২৮৭ কিলোমিটার নতুন লাইন স্থাপনের মাধ্যমে ৪৩টি গ্রামে নতুন করে বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা হয়েছে। আরো ১৬২ কিলোমিটার লাইন স্থাপনের কাজ চলমান আছে। এছাড়া ৩২৪ কিলোমিটার নতুন লাইনের দরপত্র আহ্বান করার অপেক্ষায় আছে। দরপত্র আহবান শেষে ২০১৮ সালের ডিসেম্বরের মধ্যেই শতভাগ বিদ্যুতের সঞ্চালন লাইন নির্মাণ সম্পন্ন করে সরকারের লক্ষমাত্রা অর্জন করা সম্ভব হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন সংশ্লিষ্টরা।
সিলেট-৩ (দক্ষিণ সুরমা-ফেঞ্চুগঞ্জ ও বালগঞ্জ একাংশ) এর সংসদ সদস্য মাহমুদুস সামাদ চৌধুরী কয়েছ বলেন, বর্তমান সরকারের আমলে বিদ্যুৎ খাতের যুগান্তকারী উন্নয়ন সাধিত হয়েছে। ইতোমধ্যে আমার নির্বাচনী এলাকার ফেঞ্চুঘঞ্জ উপজেলা শতভাগ বিদ্যুতায়ন সম্পন্ন হয়েছে। এছাড়া দক্ষিণ সুরমা উপজেলা প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণার জন্য প্রস্তুত রয়েছে, বালগঞ্জ আগামী ছয় মাসের মধ্যেই বিদ্যুতায়ন সম্ভব হবে বলে আমরা আশা করি। এর ফলে এই গ্রামীণ জনপদে মানুষের কর্মঘন্টা বেড়েছে, সেচ ও কৃষিকাজ সহজ হয়েছে, কৃষি ও শিল্পক্ষেত্রে উৎপাদন বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর ফলে দেশের জিডিপি বৃদ্ধিতে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর অবদান বাড়ছে, যা আমাদের জাতীয় অর্থনীতিকে আরো সমৃদ্ধ ও গতিশীল করে তুলবে।
বর্তমান সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গীকার ছিলো সারাদেশে শতভাগ বিদ্যুতায়ন নিশ্চিত করা। বিগত সরকারগুলোর অব্যাহত অবহেলায় যখন বিদ্যুত ব্যবস্থা অত্যন্ত নাজুক হয়ে পড়েছিলো, সেখান থেকেই বর্তমান সরকার বিদ্যুৎ খাতের উন্নয়নে সর্বোচ্চ গুরুত্ব প্রদান করে। স্থাপিত হয় নতুন নতুন বিদ্যুত কেন্দ্র। মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে ফিরতে শুরু করে বিদ্যুতের সুদিন। আলোয় ঝলমল করতে শুরু করে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলসহ নতুন নতুন এলাকা। এর ফলে, কৃষি, শিল্পসহ উৎপাদনমূখী খাতগুলোতে এসেছে গতিশীলতা। বাড়ছে নতুন নতুন সম্ভাবনা। উপজেলা পর্যায়ে শতভাগ বিদ্যুতায়নের ফলে পল্লী এলাকায় কৃষি খাতে নেয়া হয়েছে বিশেষ পরিকল্পনা। এতে অনেক অনাবাদি জমি চাষের আওতায় আসছে। সেচের জন্য বিদ্যুৎ নিশ্চিত করতে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়া হয়েছে।
২০১৮ সালের মধ্যে শতভাগ বিদ্যুতায়ন নিশ্চিত হলে সিলেটের সকল উন্নয়ন ও উৎপাদনশীল সম্ভনাময় খাত দ্রুত সময়ের মধ্যে আরো বিকশিত হবে বলে মনে করেন সিলেটের বিশিষ্টজনেরা। দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে আরো বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখবে বলে প্রত্যাশা সবার। বাসস

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫