পুরানা পল্টনে ড্যান্ডি টানছে এক মাদকসেবী :আবদুল্লাহ আল বাপ্পী
পুরানা পল্টনে ড্যান্ডি টানছে এক মাদকসেবী :আবদুল্লাহ আল বাপ্পী

পথশিশুদের জীবন ধ্বংস ড্যান্ডিতে

সেবনে পছন্দের স্থান ট্রাফিক সিগন্যাল
আবু সালেহ আকন

বায়তুল মোকাররম পার হয়ে পল্টন সিগন্যালে যেতে হাতের ডান দিকের রোড ডিভাইডারে বেশ কয়েকটি জটলা। প্রতি জটলার সদস্যসংখ্যা পাঁচ থেকে সাতজন। আনুমানিক বয়সে তারা ছয় বছর থেকে ১২ বছর। প্রায় প্রতিটি শিশুর হাতেই একটি করে পলিথিন। পলিথিনের ভেতরে মুখ গুঁজে একের পর এক ফুঁ দিচ্ছে; আবার বাতাসটুকু মুখ দিয়ে টেনে নিচ্ছে। একে বলে ‘ড্যান্ডি’ সেবন। শিশুদের নেশা এটি। জুতার সলিউশন গাম পলিথিনের ভেতরে ঢুকিয়ে তা নিয়ে নেশা করছে সুবিধাবঞ্চিত পথশিশুরা। মোড় ঘুরে কাকরাইলের দিকে যাওয়ার রাস্তায় এভাবে আরো কিছু জটলা।
রাজধানীতে এভাবে কম হলেও শতাধিক স্পট আছে, যেখানে প্রকাশ্যেই মাদক সেবন চলছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য, প্রশাসনের বড় কর্মকর্তা, মন্ত্রী-এমপিসহ সাধারণ মানুষের চোখের সামনেই ঘটছে মাদক সেবন। অথচ তারা দেখেও না দেখার ভান করছেন। প্রকাশ্যে রেললাইনে, রাস্তায়, পার্কে, খোলা মাঠে মাদক সেবনের এই চিত্র ক্রমেই ভয়াবহ হয়ে উঠছে। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ড্যান্ডি সেবনকারী শিশুদের পছন্দের স্থান ব্যস্ততম রাস্তার আইল্যান্ড ও ট্রাফিক সিগন্যালগুলোয়। এর প্রধান কারণ হচ্ছে, এসব শিশু ড্যান্ডি সেবনের পাশাপাশি সিগন্যাল জটলায় ভিক্ষাবৃত্তি ও ছিনতাইয়ে নিয়োজিত। দামে সস্তা, সহজলভ্য এবং বাধা দেয়ার কেউ না থাকায় প্রকাশ্যেই চলে সেবন। নিষিদ্ধ মাদকদ্রব্যের তালিকায় সলিউশন গামের নাম না থাকায় এর বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থাও নেয়া যাচ্ছে না।
প্রকাশ্যে মাদক সেবন নিয়ে পুলিশের একজন কর্মকর্তা ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়ায় বলেন, সব কিছুর জন্য সব সময় পুলিশকেই দায়ী করা হয়। কিন্তু মাদক সেবন প্রতিরোধের দায়িত্ব মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর ও সমাজসেবা অধিদফতরের ওপরও। কিন্তুমাঝে মধ্যে তাদের দু-একটি অভিযান ছাড়া কোনো কার্যক্রম পরিলক্ষিত হয় না। যেসব শিশু ড্যান্ডির মতো ভয়াবহ মাদক সেবন করছে তারা শারীরিক ও মানসিকভাবে স্থায়ী পঙ্গুত্বের দিকে ধাবিত হচ্ছে। তবে পুলিশের সামনে ঘটে চলা অবৈধ কর্মকাণ্ডে পুলিশ কেন নিশ্চুপ সেই জবাব তিনি দেননি।
মতিঝিল শাপলা চত্বরের উত্তর পাশে ফুটওভার ব্রিজের নিচে, গুলিস্তান ও স্টেডিয়াম এলাকা, বঙ্গভবনের সামনে পার্কের ফুটপাথে, শাহজালাল বিমানবন্দর গোল চত্বরের উত্তর পাশের আইল্যান্ডে ট্রাফিক পুলিশের সামনেই শিশুরা এ কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। আতিকুল ইসলাম একজন পেশাদার ফুটবলার। মাঝে মধ্যেই পুরান ঢাকা থেকে স্টেডিয়াম এলাকায় যান। তিনি জানালেন, রাজউক ভবনের সামনের ফুটপাথ ও রোড ডিভাইডারে প্রকাশ্যে দিনরাত মাদক সেবন চলে। অথচ এই রাস্তায় প্রায়ই ভিআইপিদের মুভমেন্ট। স্থানীয় ব্যবসায়ী ও চাকুরেদের কয়েকজন জানালেন, ভিআইপিদের যখন মুভমেন্ট হয় তখন পুরো এলাকা ফাঁকা। কোনো মাদক সেবীকে খুঁজেও পাওয়া যায় না। পুলিশ সবাইকে অন্যত্র সরিয়ে নেয়। কিন্তু পরক্ষণেই আবার একই চিত্র।
রাজধানীতে এভাবে কম হলেও শতাধিক স্পট আছে যেখানে মাদক সেবন চলে প্রকাশ্যেই। কমলাপুর রেলস্টেশনে প্রকাশ্যেই মাদক সেবন চলছে। শরবত রুবেল নামে এক কিশোর জানাল, কমলাপুর রেলওয়ে থানার পাশেই মাদক সেবন চলছে প্রকাশ্যেই। কমলাপুর স্টেশনের ভেতরেও বিভিন্ন পয়েন্টে মাদক সেবন চলে। মতিঝিলের বিভিন্ন পয়েন্টের মধ্যে নটর ডেম কলেজের সামনের ফুটপাথ, কালভার্ট রোড, শাপলা চত্বর হয়ে কমলাপুর যাওয়ার রাস্তা, টিকাটুলী মোড়, গুলিস্তানের বেশ কয়েকটি পয়েন্ট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদুল্লাহ হলের সামনের ফুটপাথ, কার্জন হলের পূর্ব পাশের রাস্তার ফুটপাথসহ বিভিন্ন স্থানে প্রকাশ্যেই মাদক সেবন চলে। পুলিশ সদর দফতরের সামনে রেলওয়ে বস্তিতে প্রকাশ্যেই মাদক ব্যবসায় করছে খিজা, শাহিন, ফারুক, কানা লিটন ও রানাসহ বেশ কয়েকজন। এই বস্তিতে প্রকাশ্যেই মাদক সেবনের দৃশ্য চোখে পড়ে।
ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের প্রশাসনিক ভবনের গেটের ঠিক উল্টো দিকে ময়লার স্তূপে মেডিক্যাল বর্জ্যরে ভেতর থেকে স্যালাইনের খালি প্যাকেট, সুঁই, পরিত্যক্ত সিরিঞ্জ, ব্লেড ইত্যাদি সংগ্রহ করছে কয়েকটি শিশু। শিশুদের একজন জানাল এখানে যে সিরিঞ্জ তারা কুড়িয়ে পায় সেই সিরিঞ্জ অনেক সময় তাদের কাছ থেকে কিছু মাদকসেবী নিয়ে যায়। কুতুব নামের এমন এক মাদকসেবীর সাথে কথা হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জিমন্যাশিয়ামের পাশের ফুটপাথে। সে জানায়, সে শরীরে পেথিডিন নেয়। তার মতো আরো বেশ কয়েকজন আছে। কুতুব জানায়, তারা প্রকাশ্যেই ফুটপাতে বসে পেথিডিন নিয়ে থাকে। কেউ তাদের বাধা দেয় না। তারা একই সুঁই ব্যবহার করে চার-পাঁচজন মিলে।
মতিঝিল পেট্রলপাম্পের সামনে রোড ডিভাইডারের ছোট্ট ছোট্ট গাছের আড়ালে বসে গাঁজা প্রস্তুত করছে তিন-চার যুবক। তোপখানার মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের পাশেই সন্ধ্যার পরে মাদকসেবীদের আড্ডা বসছে।
রাজধানীর পল্টন এলাকার ব্যবসায়ী মোশাররফ হোসেন বলেন, তার বাসা কমলাপুরে। মতিঝিল শাপলা চত্বর থেকে পল্টন যেতে কম হলেও ১০টি স্থানে প্রকাশ্যে মাদক সেবনের চিত্র চোখে পড়ে। তিনি বলেন, শিশু-কিশোরেরা মাদক সেবন করছে; আর পাশ দিয়েই পুলিশের গাড়ি চলে যাচ্ছে। পুলিশের গাড়ি দেখে তারা মাদকদ্রব্য একটু আড়াল করবে বা নিজেরা আড়ালে যাবে সেই অনুভূতিটুকুও তাদের মধ্যে নেই। নাম প্রকাশ্যে অনিচ্ছুক পুলিশের কয়েকজন কর্মকর্তাও বিষয়টি স্বীকার করলেন। তারা জানালেন, এই শিশু-কিশোরদের আটক করা খুবই বিপত্তির। যে কারণে ঝামেলা এড়াতে পুলিশ ওদেরকে আটক করে না।
একাধিক সূত্র জানায়, এই শিশু-কিশোরদের আটক করলে তাদের দায়দায়িত্ব নেয়ার কেউ থাকে না। ফলে পুলিশ তাদের নিয়ে ঝামেলায় পড়ে। এই মাদকসেবীদের সুস্থ জীবনে ফিরিয়ে আনতে যাদের দায়িত্ব রয়েছে সেসব সংস্থা একেবারেই নির্বিকার বলে অভিযোগ করেন কয়েকজন পুলিশকর্তা। শামীম নামে এক পথচারী বলেন, প্রকাশ্যে এই মাদক সেবনের দৃশ্যে তারা বিব্রত। অনেক সময় শিশুসন্তানেরা প্রশ্ন করে বসে। তখন কোনো জবাব দেয়া যায় না।

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.