দফতর পুনর্বণ্টনের তিন মন্ত্রীই মহাজোটের শরিক দলের

আশরাফ আলী

মন্ত্রিসভার নতুন মন্ত্রীদের মধ্যে দফতর বণ্টনের পাশাপাশি পুরনো চারজনের দফতরও পুনর্বণ্টন করা হয়েছে। তাদের মধ্যে তিন মন্ত্রী ও একজন প্রতিমন্ত্রী। নতুন দফতর বণ্টনের তিনজন মন্ত্রীই আবার মহাজোটের শরিক দলের।
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে গতকাল নতুন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের দফতর বণ্টন ও অন্যদের দফতর বদল করে বুধবার আদেশ জারি করা হয়েছে। এর আগে সচিবালয়ে মন্ত্রিসভা বৈঠকের ব্রিফিং শেষে মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোহাম্মদ শফিউল আলম দফতর বণ্টন ও দফতর বদলের তথ্য জানান।
দফতর পুনর্বণ্টনের বিষয়টি পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, নতুন দফতর বণ্টনে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোটের শরিক ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেননকে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় থেকে সরিয়ে দেয়া হয়েছে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে। সমাজকল্যাণ মন্ত্রী সৈয়দ মহসিন আলীর মৃত্যুর পর দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে এ মন্ত্রণালয়ে মন্ত্রীর পদে কেউ ছিলেন না। জোটের আরেক শরিক জাতীয় পার্টির (জেপি) সভাপতি আনোয়ার হোসেন মঞ্জুকে পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয় থেকে সরিয়ে দেয়া হয়েছে। তিনি পেয়েছেন পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব। মহাজোটের শরিক ও বিরোধী দল জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদকে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় থেকে সরিয়ে দেয়া হয়েছে পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব। বর্তমান বিরোধী দল জাতীয় পার্টির তিনজন সদস্য সরকারের মন্ত্রিসভায় রয়েছেন। তাদের মধ্যে কেবল আনিসুল ইসলাম মাহমুদই পূর্ণ মন্ত্রী। বাকি দুইজন প্রতিমন্ত্রী।
প্রসঙ্গত, আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোটের শরিক হিসেবে জাতীয় পার্টি ২০০৮ সালের নির্বাচনে অংশ নেয়। পরে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে দলটি এককভাবে নির্বাচন করে।
আকাশ থেকে মাটিতে নামলাম : মেনন
চার বছর দায়িত্ব পালনের পর মন্ত্রিসভার রদবদলে বিমান ও পর্যটন মন্ত্রণালয় হারিয়ে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পাওয়া রাশেদ খান মেনন বলেছেন, আকাশ থেকে তিনি মাটিতে নামলেন।
গতকাল বুধবার দুপুরে রদবদলের ঘোষণা আসার পর বিকেলে সচিবালয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে সরকারের এই শরিক নেতার এই প্রতিক্রিয়া আসে।
ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি মেনন খানিকটা হেসেই বলেন, ‘আমার জন্য সুখকর এই কারণে বলতে পারেন- আমি আকাশ থেকে একটু মাটিতে নামলাম। একেবারে সাধারণ মানুষের কাছে।’
২০১৪ সালের জানুয়ারিতে আওয়ামী লীগ টানা দ্বিতীয়বার সরকার গঠন করলে মেননকে বেসামরিক বিমান ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। গতকাল মেননকে সরিয়ে সেই জায়গায় তিনি এনেছেন নতুন মন্ত্রী এ কে এম শাহজাহান কামালকে। মেননের চার বছরে দেশের প্রধান বিমানবন্দর শাহজালালের নিরাপত্তা প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে একাধিক ঘটনায়। নিরাপত্তা শঙ্কার কারণ দেখিয়ে যুক্তরাজ্য ২০১৬ সালের মার্চে ঢাকা থেকে আকাশপথে কার্গো বহনে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে, যা এখনো ওঠেনি। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের মুনাফা এ বছর কমে আসার পেছনে ওই নিষেধাজ্ঞাও ভূমিকা রেখেছে।
২০১৬ সালের নভেম্বরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে বহনকারী একটি বিমানে যান্ত্রিক ত্রুটির ঘটনাও আলোড়ন তোলে। আওয়ামী লীগের কেউ কেউ সে সময় বিমানমন্ত্রী মেননের পদত্যাগেরও দাবি তোলেন ফেইসবুকে।
দফতর বদলের পর বিকেলে ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে গিয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতিতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান মেনন। বিকেলে সচিবালয়ে বিমান মন্ত্রণালয়ে এসে মুখোমুখি হন সাংবাদিকের। ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি মেননের ভাষায়, শেখ হাসিনা অনেক ‘হিসাব করেই’ মন্ত্রিসভায় রদবদল এনেছেন।
আমার মনে হয় স্বাভাবিকভাবে প্রশাসনে গতিশীলতা আনার জন্য করলেন। এটিই হচ্ছে শেষ বছর আমাদের সরকারের। সুতরাং তিনি চেয়েছেন শেষ বছরের কাজের সমন্বয় আরো ভালোভাবে যেন হয়। মেননের দফতর বদলকে কেউ কেউ ‘অবনমন’ বললেও নতুন সমাজকল্যাণমন্ত্রী বিষয়টি ইতিবাচকভাবেই দেখতে চান। তিনি বলেন, ‘আমি সবচেয়ে কম বাজেটের একটি মন্ত্রণালয়ে (বিমান) ছিলাম। এখন আমি অনেক বড় বাজেটের একটি মন্ত্রণালয়ে যাচ্ছি এখানে প্রান্তিক মানুষের জন্য কাজ করার অনেক জায়গা আছে।’
গত চার বছরের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে মেনন বলেন, ‘আমার প থেকে সিভিল এভিয়েশন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ে কাজ করা খুব চ্যালেঞ্জিং ছিল। যখন আমি দায়িত্ব নিয়েছিলাম, তখন অনেকে তাচ্ছিল্য করেছিল। বন্ধুরা বলত, ‘তোমাকে একটি ডুবন্ত জাহাজ তুলতে দিয়েছে।’ তার সময়ে সিভিল এভিয়েশনে কী কী অগ্রগতি হয়েছে, তার একটি বিবরণও সাংবাদিকদের সামনে তুলে ধরেন মেনন।
‘আমি দায়িত্ব নেয়ার পর বিমান পরপর তিনবার লাভ করেছে। অভ্যন্তরীণ রুটে যাত্রীদের যাতায়াত বেড়েছে।’ এই দফতর বদলের পেছনে প্রধানমন্ত্রীর বিমানে ত্রুটির বিষয়টি কোনো ভূমিকা রেখেছে কি না- এমন প্রশ্নে মেনন বলেন, ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর বিমানের যে ঘটনা ছিল, আমরা তিনটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছিলাম। কিছু অবহেলার কারণে এটি হয়েছিল। পুলিশ তদন্ত করে যাদের গ্রেফতার করেছিল, তাদের পরে খালাস দেয়া হয়েছে। পুলিশের তদন্তে বলা হয়েছে, তারা নাশকতার সাথে যুক্ত নয়।’
মন্ত্রিসভার রদবদলে কেবল তিন শরিকের পরিবর্তনে জোটে বিরূপ প্রভাব পড়বে কি না- এ প্রশ্নে ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি বলেন, তেমন কোনো শঙ্কা তিনি দেখছেন না। এই পরিবর্তনের আভাস আগেই পেয়েছিলেন কি না, এই পরিবর্তনে খুশি কি না- এমন প্রশ্নও রাখা হয় মেননের সামনে।
জবাবে তিনি বলেন, ‘দেখেন, আমি এক কথায় প্রশ্নটা হলো, আমি রাজনীতি করি। আমরা সব বিষয়ের জন্য সব সময় প্রস্তুত থাকি।
প্রধানমন্ত্রী হর্তা কর্তা বিধাতা : পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পাওয়া আনোয়ার হোসেন (মঞ্জু) বলেন, প্রধানমন্ত্রী বলতে পারবেন কেন, কিসের জন্য তিনি পরিবর্তন করেছেন। এ বিষয়ে আমার কোনো ক্রিয়া বা প্রতিক্রিয়া নেই। আমি কুম্ভ রাশির জাতক, কাজের লোক। বদলের কারণ আমি বলতে পারব না। উনি (প্রধানমন্ত্রী) হর্তা কর্তা বিধাতা, উনি সব নির্ধারণ করেন।
সরকারে ছিলাম, আছি : পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় থেকে বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পাওয়ার পর আনিসুল ইসলাম মাহমুদ বলেন, আমি কিছু বলব না। সরকারে ছিলাম, সরকারে আছি। প্রধানমন্ত্রী যে দায়িত্ব দিয়েছেন তা আগেও পালন করেছি, আগামীতেও করব।
এভাবে সরিয়ে দেয়া, মানুষ হিসেবে আমার লাগে : ডাক ও টেলিযোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী থেকে তথ্য প্রতিমন্ত্রী হওয়া তারানা হালিম কিছুটা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের কাজ শেষ করে এনেছি। স্যাটেলাইট বিষয়ে মানুষের কোনো ধারণাও ছিল না, থাকলেও ভ্রান্ত ধারণা ছিল। আমি সেই ধারণা সৃষ্টি করেছি এবং ভ্রান্ত ধারণা পাল্টে দিয়েছি। এ রকম পরিস্থিতিতে আমাকে সরিয়ে দেয়াটা মানুষ হিসেবে একটু লাগে। আমি তো ফেরেশতা নই, অন্য কিছুও নই; মানুষ। রক্তে-মাংসে গড়া।
তারানা হালিম প্রশ্ন তুলে বলেন, বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটসহ আমার হাতে সম্পন্ন করা জিনিসগুলো যখন প্রধানমন্ত্রী ব্যতীত অন্য কেউ উদ্বোধন করবেন, সেটি যখন আমি দেখব, আমার লাগাটা কি স্বাভাবিক নয়? নতুন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব বিষয়ে তিনি বলেন, সামনের পথ কী হবে, আমি জানি না। এ নিয়ে আমি কিছু ভাবিনি, পরিকল্পনাও করিনি।
গত দুই বছর সততার সাথে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী যে দায়িত্ব দিয়েছেন, তা পালন করেছি। প্রধানমন্ত্রীর মুখ উজ্জ্বল করার চেষ্টা করেছি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে তিনি বলেন, তারপরও আমি কৃতজ্ঞ আমাদের নেত্রী শেখ হাসিনার ওপর। তিনি আমাকে দুইবার এমপি বানিয়েছেন, প্রতিমন্ত্রী বানিয়েছেন। বপ্রন্ধুর আদর্শকে ধারণ করে তার সেই বিশ্বাস এবং আশ্বাস রাখার চেষ্টা করেছি। তবে নতুন যে দায়িত্ব সেখানে আমার কী কাজ হবে, তা আমি জানি না। এ নিয়ে আমি কোনো পরিকল্পনাও করিনি।
প্রতিমন্ত্রী বদলের কারণ জানালেন মোস্তাফা জব্বার
ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের প্রতিমন্ত্রী তারানা হালিমকে করা হয়েছে তথ্য প্রতিমন্ত্রী। ডাক ও টেলিযোগাযোগ এবং তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন মোস্তাফা জব্বার। তিনিই বলেছেন, ‘ডাক ও টেলিযোগাযোগ এবং আইসিটি বিভাগের মধ্যে ঘুণে ধরা একটি সম্পর্ক ছিল বলেই হয়তো প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এমন একটি দুঃসাহসিক সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।’ গতকাল বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেস (বেসিস) আয়োজিত সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে তিনি এ কথা বলেন।
মোস্তাফা জব্বার আশাবাদ ব্যক্ত করেন, তিনি দায়িত্ব নেয়ার পর এ ধরনের কোনো সমস্যা আর থাকবে না। তবে তার মুখে শোনা গেল, ‘ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগে প্রতিমন্ত্রী ছিলেন। এখন নেই। কেন তিনি নেই জানি। কিন্তু এখানে বলা যাবে না।’
রাজধানীর কাওরান বাজারের বেসিস সম্মেলন কে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে ডাক ও টেলিযোগাযোগ এবং তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের নবনিযুক্ত মন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার প্রায় এক ঘণ্টা বক্তব্য রাখেন। তিনি বলেছেন, ‘আমি সচিবালয়ে বসব। তবে বেশির ভাগ সময় কাটাব আগারগাঁওস্থ আইসিটি টাওয়ারের আইসিটি বিভাগে।’
মোস্তাফা জব্বারের ভাষ্য, ‘টেলিকম বিভাগে অনেক সমস্যা রয়েছে। অনেক জটিলতার মধ্যে রয়েছে খাতটি। এটিকে টেনে তুলতে হবে। ফলে সেখানেও সময় দিতে হলেও আইসিটি বিভাগে আমার সময় কাটবে। আইসিটি বিভাগে সবাই সহজে আমার সাথে দেখা করার সুযোগ পাবে, সচিবালয়ে যা নেই। আমি সুযোগটি কাজে লাগাতে চাই।’

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.