আলোচনায় দুদক প্রত্যাশা বেড়েছে মানুষের

জিলানী মিলটন

দুর্নীতিবাজ রাঘব-বোয়ালদের গ্রেফতার বা আটকে তেমন সাড়া না ফেললেও বিভিন্ন তৎপরতা আর প্রচার-প্রচারণার মধ্য দিয়ে বছরব্যাপী আলোচনায় ছিল দুর্নীতি দমনে একমাত্র রাষ্ট্রীয় সংস্থা দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। বিশেষ করে ঘুষখোরদের ধরতে দুদকের ফাঁদপাতা অভিযান জনগণের মধ্যে সাড়া ফেলেছে। বছর শেষে রাষ্ট্রায়ত্ত বেসিক ব্যাংকের প্রায় সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকার ঋণ কেলেঙ্কারির ঘটনায় অবশেষে ব্যাংকটির সাবেক চেয়ারম্যান আবদুল হাই বাচ্চুকে দুদকে তলব ও জিজ্ঞাসাবাদের ঘটনা আলোড়ন সৃষ্টি করে দুদক। এ ছাড়া বিতর্কিত ব্যবসায়ী মুসা বিন শমসেরের অবৈধ সম্পদের অনুসন্ধান ও তাকে জিজ্ঞাসাবাদের ঘটনাও আলোচনায় ছিল। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দুর্নীতি রোধে তথা কোচিংবাণিজ্য ও প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা নিয়ে দুদকের তৎপরতা জনগণের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে।
দুদকের প্রতি মানুষের প্রত্যাশা বেড়েছে
বিদায়ী বছরে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) প্রতি মানুষের প্রত্যাশা ও আস্থা বেড়েছে। কার্যক্রম নিয়ে মানুষের মধ্যে থাকা প্রশ্নও কাটিয়ে উঠতে পেরেছে সংস্থাটি। দুদককে নতুন করে ঢেলে সাজানো হয়েছে। সাধারণ মানুষের মধ্যে জনমুখী করতেও নেয়া হয়েছে বিভিন্ন পদপে। দুর্নীতিবিরোধী সচেতনতামূলক প্রচার-প্রচারণায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনকে সম্পৃক্ত করতে পেরেছে প্রতিষ্ঠানটি। এ ছাড়া দুর্নীতি প্রতিরোধে দুদক জোর দেয় গণশুনানির ওপরে। সেবামূলক সরকারি বিভিন্ন খাতের ওপর গণশুনানিতে ভুক্তভোগীরা প্রকাশ্যে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের অনিয়ম, দুর্নীতির কথা তুলে ধরেন। তাই বিদায়ী বছরকে দুদকের জন্য মাইলফলক বলছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
হটলাইন ১০৬
অভিযোগ জানাতে দুর্নীতি দমন কমিশনের হটলাইন খোলার প্রথম সাত-আট কর্মদিবসেই প্রায় এক লাখ ফোনকল এসেছে। এর অর্থ দুদকের প্রতি মানুষের প্রত্যাশা বেড়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। গত ২৭ জুলাই কমিশন হটলাইন ১০৬ চালু করে। উদ্দেশ্য ছিল এর মাধ্যমে দুর্নীতি ঠেকাতে আরো ঘনিষ্ঠভাবে জনগণের সাথে কাজ করা। এতে ব্যাপক সাড়াও মিলেছে। প্রথম দিনেই প্রায় দুই হাজার কল আসে। আর এক সপ্তাহের মাথায় সংখ্যাটি প্রায় পৌনে এক লাখে পৌঁছায়।
তবে বেশির ভাগ অভিযোগই দুদক আইনের আওতার বাইরে বলে জানিয়েছেন কমিশনের মুখপাত্র উপপরিচালক প্রণব কুমার ভট্টাচার্য। তিনি বলেন, অনেকেই পারিবারিক বিষয়ে অভিযোগ করছেন। যৌতুকের অভিযোগও আসছে। কিন্তু এগুলো আমাদের এখতিয়ারে নয়। দুদক আইনের আওতায় যেসব বিষয় আছে তা হলো, সরকারি অফিস ও প্রতিষ্ঠানগুলোতে ঘুষ দেয়া বা নেয়া, রাষ্ট্রীয় সম্পদ ও অর্থের অবৈধ ব্যবহার, রাষ্ট্রীয় অর্থ আত্মসাৎ করা, অবৈধ উপায়ে সম্পদ অর্জন, মানি লন্ডারিং ও ব্যাংক জালিয়াতি। দুদক কর্মকর্তারা মনে করেন, জনগণ আস্তে আস্তে বিষয়টিতে অভ্যস্ত হবেন। তিনি বলেন, যেসব অভিযোগ আমলে নেয়া হয়েছে তার বেশির ভাগই সরকারি ভূমি রেকর্ড অফিস, সেবা খাতের প্রতিষ্ঠান, সরকারি হাসপাতাল ও স্কুল এবং সড়ক পরিবহন কর্তৃপরে বিরুদ্ধে।
ফাঁদ পাতা অভিযান
দুর্নীতি রোধে কৌশল হিসেবে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) ফাঁদ পাতা অভিযান জনমনে আলোচনার ঝড় তুলেছে। একই সাথে ফাঁদ পাতা অভিযানের কারণে বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানের অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীরা নড়েচড়ে বসেন।
সরকারি প্রতিষ্ঠানে দুর্নীতি প্রতিরোধে চলতি বছর দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) অনুসন্ধান টিম গঠন করে। এর পর থেকে দুদকের অনুসন্ধান টিম সরকারি প্রতিষ্ঠানে অভিযান শুরু করে। কোথাও কোথাও তারা কৌশল হিসেবে ফাঁদ পেতে অভিযান পরিচালনা করছেন। এরই মধ্যে ফাঁদ পেতে বেশ কয়েকজনকে আটক করা হয়েছে।
দুদকের দেয়া তথ্যানুযায়ী, ফাঁদ পাতা অভিযানে এক বছরে (গত ১৪ ডিসেম্বর পর্যন্ত) বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানে ঘুষ গ্রহণকালে হাতেনাতে ৩২ জনকে আটক হয়েছে। মামলাও হয়েছে ৩০টি। ফাঁদ পাতা অভিযান মূলত ঘুষগ্রহণ বা অসৎ কর্মের উদ্দেশ্যে আর্থিক লেনদেনের সময় হাতেনাতে আটক করা। সাধারণত ভুক্তভোগীদের অভিযোগের ভিত্তিতে ফাঁদ পাতা অভিযান চালানো হয়।
প্রশ্নপত্র ফাঁস ও কোচিংবাণিজ্য নিয়ে সক্রিয় দুদক
প্রশ্নপত্র ফাঁস ও কোচিংবাণিজ্যসহ শিাব্যবস্থায় বিভিন্ন অনিয়মের বিরুদ্ধে এ বছর অনেকটা যুদ্ধ ঘোষণা করে দুদক। এর পরিপ্রেক্ষিতে দুদকের প্রাতিষ্ঠানিক টিমসহ কয়েকটি টিম পৃথক অনুসন্ধান করে বেশ কিছু দুর্নীতি ও অনিয়ম চিহ্নিত করে। একই স্কুলে ১০ থেকে ৩৩ বছর পর্যন্ত থেকে কোচিংবাণিজ্যের সাথে সরাসরি যুক্ত হওয়া, কাসে ছাত্রছাত্রীদের যথাযথভাবে পাঠদান না করা এবং বিভিন্ন পাবলিক পরীার প্রশ্নপত্র ফাঁসে শিকদের জড়িত থাকা, নোট বা গাইড, শিাপ্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো নির্মাণ, এমপিওভুক্তি ও নিয়োগসহ দুর্নীতির উৎস বন্ধে বিষয়ভিত্তিক ৩৯টি সুনির্দিষ্ট সুপারিশ গত ১২ ডিসেম্বর মন্ত্রিপরিষদে পাঠিয়েছে দুদক। এখন ওই সুপারিশ বাস্তবায়নের পালা।
বেসিক ব্যাংক কেলেঙ্কারি
বহুল আলোচিত রাষ্ট্রায়ত্ত বেসিক ব্যাংকের প্রায় সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকার ঋণ কেলেঙ্কারির অনুসন্ধান করতে গিয়ে দুদক বছরজুড়ে আলোচনায় ছিল। বাংলাদেশ ব্যাংক, অর্থ মন্ত্রণালয়, সিএজি কার্যালয় এবং সর্বশেষ আদালতের পর্যবেণের পর বছরের শেষ সময়ে নতুন করে আলোচিত বিষয় হচ্ছে বেসিক ব্যাংক কেলেঙ্কারি। আদালতের নির্দেশনার পর ব্যাংকটির সাবেক চেয়ারম্যান আবদুল হাই বাচ্চুকে তিন দফা জিজ্ঞাসাবাদ করে দুদক। এ ছাড়া জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় বাচ্চুর নেতৃত্বাধীন পরিচালনা পর্ষদকে। জিজ্ঞাসাবাদে বাচ্চুর স্বেচ্ছাচারিতাসহ তার সংশ্লিষ্টতার বিষয় বেশ নতুন তথ্য পেয়েছে দুদক। এর পাশাপাশি শুরু হয়েছে তাদের অবৈধ সম্পদের অনুসন্ধান। ফলে এবার প্রত্যাশা অনুযায়ী কেলেঙ্কারির হোতাদের বিচারের মুখোমুখি করতে পারবে বলে মনে করছে তদন্ত সংশ্লিষ্টরা।
ধরা-ছোঁয়ার বাইরে অর্থ পাচারকারীরা
বছরের বিভিন্ন সময় ঘুরেফিরে এসেছে বিদেশে অর্থপাচার নিয়ে বিভিন্ন সংবাদ। ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটি (জিএফআই) কর্তৃক প্রকাশিত তথ্যানুসারে ২০০৫ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ থেকে পাচার হয়েছে প্রায় সাত হাজার ৫৮৫ কোটি ডলার বা ছয় লাখ ছয় হাজার ৮৬৮ কোটি টাকা; যা দিয়ে বাংলাদেশের প্রায় দুই অর্থবছরের বাজেট তৈরি করা সম্ভব। এর মধ্যে ২০১৪ সালেই বাংলাদেশ থেকে প্রায় ৯১১ কোটি ডলার বা প্রায় ৭২ হাজার ৮৭২ কোটি টাকা পাচার হয়েছে। বিভিন্ন সময়ে পাচারকারীদের একটি বড় অংশের নাম বিভিন্ন সময়ে গণমাধ্যমে উঠে এসেছে। সেকেন্ড হোম, পানামা পেপার্সের পর বছরের শেষ সময়ে সরব ছিল প্যারাডাইস পেপার্সে ফাঁসকৃত তথ্যে বেশ কয়েকজন বাংলাদেশীর নাম। সেকেন্ড হোম ও পানামা পেপার্সে উঠে আসা বাংলাদেশীদের বিষয়ে দুদক অনুসন্ধান করলেও এখনো রয়েছে অন্ধকারে।
বেড়েছে সাজার হার
চলতি বছরে দুর্নীতির মামলায় আসামির সাজার হার বৃদ্ধিকে সংস্থাটি সফলতা দাবি করলেও পুরো বছরে দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে মামলা ও চার্জশিটের সংখ্যা কমেছে আশঙ্কাজনক হারে। ২০১৭ সালে নভেম্বর পর্যন্ত কমিশন ও ব্যুরো আমলের মামলা মিলিয়ে সাজার হার দাঁড়িয়েছে ৫৮.৬৮ শতাংশ। তবে ব্যুরো আমলের চেয়ে কমিশন আমলে দায়ের করা মামলায় সাজার হার ছিল বেশি। কমিশনের দায়ের করা মামলায় সাজার হার ৬৪.৯৭ এবং ব্যুরোতে ৩৬.৪৩ শতাংশ। যেখানে ২০১৬ সালে সাজার হার ছিল প্রায় ৫২ শতাংশ। নিষ্পত্তিকৃত মামলার মধ্যে ১৬৯টি মামলার সাজা হয় এবং ১১৯টি মামলায় আসামিরা খালাস পায়। ২০১৭ সালে কমিশন ও ব্যুরো মিলিয়ে মোট তিন হাজার ৪১৮টি মামলার বিচারকাজ শুরু হয়। আর চলমান দুই হাজার ৮৩১টি মামলার বিচার শুরু হয় এবং ৫৮৭ মামলা বিচারকার্য উচ্চ আদালতে স্থগিত রয়েছে।
কমেছে মামলা ও চার্জশিট
২০১৬ সালের চেয়ে এ বছর মামলা ও চার্জশিটের হার তুলনামূলক অনেক কমেছে। ২০১৬ সালের চেয়ে চলতি বছরের নভেম্বর পর্যন্ত মামলা কমেছে ১০৩টি ও চার্জশিট কমেছে ১৩৭টি। চলতি বছরের নভেম্বর পর্যন্ত দুদকে মামলা ও আদালতে চার্জশিট (অভিযোগপত্র) দাখিল হয়েছে যথাক্রমে ২২২টি ও ৩৫৪টি। যেখানে ওই একই সময়ে মামলা ও চার্জশিট দাখিল হয়েছে ৩২৫টি ও ৪৯১টি। মামলা ও চার্জশিটের সাথে কমেছে আসামিদের অব্যাহতির পরিমাণ। চলতি বছরে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল (এফআরটি) বা আসামিদের অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে মোট ২২৫টি মামলায়। যেখানে ২০১৬ সালে ৫০০টি মামলার চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেয়া হয়েছিল। যে হার ২০১৫ সালে ছিল ৫৯৮টি।
গ্রেফতার অভিযান
দুদক সূত্র জানায়, বিদায়ী ২০১৭ সালে (গত ১৪ ডিসেম্বর পর্যন্ত) দুর্নীতির মামলায় গ্রেফতার হয়েছে অন্তত ২০০ জন। গ্রেফতারকৃতদের মধ্যে রয়েছেন ব্যাংক কর্মকর্তা, বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি সেবামূলক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা ও জনপ্রতিনিধি। এ বছর মামলা করা হয় প্রায় ২০০টি।

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.