নতুন বছরে নির্বাচনী রাজনীতির চ্যালেঞ্জ
নতুন বছরে নির্বাচনী রাজনীতির চ্যালেঞ্জ

নতুন বছরে নির্বাচনী রাজনীতির চ্যালেঞ্জ

আলফাজ আনাম

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আলোচনাকে সামনে রেখে নতুন বছর শুরু হলো। গণমাধ্যমে ২০১৮ সালকে তুুলে ধরা হয়েছে নির্বাচনের বছর হিসেবে। বছরের শুরু হয়েছে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন কিভাবে অনুষ্ঠিত হবে সে আলোচনা দিয়ে। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের পর বাংলাদেশের ভোটের রাজনীতির ধারণা বদলে গেছে। ভোট ছাড়া সংসদ গঠিত হয়েছে। সে সংসদও মেয়াদ পূরণ করতে যাচ্ছে, অথচ সংসদটি মেয়াদ পূরণ করতে পারবে কি না তা নিয়ে ক্ষমতাসীন দলের মধ্যেও সংশয় ছিল। নির্বাচনের পর অর্থমন্ত্রীসহ একাধিক মন্ত্রী বলেছিলেন, এই নির্বাচন হচ্ছে নিয়ম রক্ষার নির্বাচন এবং শিগগিরই আরেকটি নির্বাচন দেয়া হবে, কিন্তু তা আর হয়নি। অবশ্য বাংলাদেশে মধ্যবর্তী নির্বাচনের নজির নেই বললেই চলে। এমন পরিস্থিতিতে আগামী নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক হবে কি না কিংবা মানুষ ভোট দিতে পারবে কি না, সে শঙ্কা এখন সাধারণ মানুষের মধ্যে কাজ করছে। 

বিদায়ী ২০১৭ সালে রাজনীতি ছিল অনেকটা নিস্তরঙ্গ; কিন্তু নতুন বছরের শুরুতে রাজনীতির মাঠ উত্তপ্ত হয়ে উঠতে পারে। সব কিছু ঠিক থাকলে এ বছরের শেষে হতে পারে জাতীয় সংসদ নির্বাচন। ফলে বছরের শুরু থেকে ক্ষমতাসীন ও বিরোধী দলের নির্বাচনকেন্দ্রিক রাজনৈতিক কৌশলের চূড়ান্ত প্রকাশ ঘটবে। দেশের রাজনীতিতে নানা ধরনের মেরুকরণ ঘটার যেমন সম্ভাবনা রয়েছে, তেমনি সঙ্ঘাতময় পরিস্থিতির শঙ্কাও রয়েছে পুরোপুরি।

সুষ্ঠু নির্বাচনের পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে হলে দেশে মুক্ত রাজনৈতিক পরিবেশ প্রয়োজন। বছরের শুরু থেকে বিরোধী দল রাজপথে কর্মসূচি পালনের কতটা সুযোগ পায়, তা থেকে অনুমান করা যাবে আগামী দিনের রাজনীতি কতটা সরকারি নিয়ন্ত্রণমুক্ত থাকবে। বিদায়ী বছরের শেষ দিকে তিন মাস বিদেশ সফর শেষ করে বিএনপি চেয়ারপারসন রোহিঙ্গা শরণার্থীদের অবস্থা দেখতে কক্সবাজার সফর করেছেন এবং ঢাকায় সমাবেশ করেছেন। এসব সমাবেশে ব্যাপক জনসমাগম বিএনপি নেতাকর্মীদের উজ্জীবিত করেছে। অন্য দিকে প্রধানমন্ত্রী বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকাণ্ড উদ্বোধন করছেন এবং আগামী নির্বাচনের প্রস্তুতি নিতে দলের নেতাকর্মীদের নির্দেশনা দিচ্ছেন।

বছরের শুরুতে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট ও জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলার রায় হতে পারে। এই মামলায় যদি তিনি দণ্ডিত হন, তাহলে জাতীয় রাজনীতিতে এর বড় ধরনের প্রভাব পড়বে। তার কারাগারে যাওয়া-না-যাওয়ার ওপর নির্ভর করবে বিএনপি এবং দেশের রাজনীতির ভবিষ্যৎ। এর সাথে বিএনপির নির্বাচনকালীন সরকারের দাবি শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়, তা এখনো নিশ্চিত নয়। বিএনপির পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের দাবিতে আন্দোলন ও নির্বাচনÑ উভয় প্রস্তুতি রয়েছে। বর্তমান প্রধানমন্ত্রীকে নিজ পদে বহাল রেখে নির্বাচনের ব্যাপারে সবচেয়ে বড় আপত্তি দলটির। অন্য দিকে ক্ষমতাসীন দল নির্বাচনকে সামনে রেখে কোনো মতেই সংবিধান সংশোধনের ব্যাপারে রাজি নয়। অর্থাৎ প্রধানমন্ত্রীর অধীনে জাতীয় নির্বাচনের পক্ষে, ক্ষমতাসীন দল কোনো ধরনের ছাড় দিতে রাজি নয়।

আন্তর্জাতিক মহল বিশেষ করে উন্নয়নসহযোগী দেশগুলো চায় আগামী নির্বাচন যাতে গ্রহণযোগ্য ও অংশগ্রহণমূলক হয়। এমনকি ভারতের দিক থেকেও এমন ইঙ্গিত পাওয়া গেছে বলে বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতারা আভাস দিয়েছেন। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির মতো একতরফা নির্বাচনের ব্যাপারে আন্তর্জাতিক মহলের জোরালো আপত্তি আছে। এরই মধ্যে পশ্চিমা দেশগুলোর পক্ষ থেকে অংশগ্রহণমূলক ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের ব্যাপারে সরকারকে পরামর্শ দেয়া হয়েছে। একই সাথে বিএনপিকে যেকোনো পরিস্থিতিতে নির্বাচন বর্জন না করার পরামর্শ দেয়া হয়েছে। বিএনপির পক্ষ থেকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে এই বার্তা দেয়া হচ্ছে যে, প্রধানমন্ত্রীকে বহাল রেখে সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠান সম্ভব নয়।

জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে কয়েকটি সিটি করপোরেশন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এই নির্বাচন হবে সরকার ও নির্বাচন কমিশনের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। এরই মধ্যে রংপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচন সম্পন্ন হয়েছে। নির্বাচনে সরকারের শরিক জাতীয় পার্টির প্রার্থী বিজয়ী হয়েছেন। জাতীয় পার্টির এই বিজয় অপ্রত্যাশিত ছিল না। কারণ, জাতীয় পার্টি কার্যত রংপুরকেন্দ্রিক আঞ্চলিক রাজনৈতিক দলে পরিণত হয়েছে। নির্বাচনের আগে থেকে পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ যথেষ্ট সক্রিয় ছিলেন; কিন্তু এই নির্বাচনের তাৎপর্যপূর্ণ দিক হচ্ছে ক্ষমতাসীন দলের ভোট সেখানে প্রায় অর্ধেক কমে গেছে।

অন্য দিকে, রংপুরে বিএনপি প্রার্থী আশানুরূপ ভোট পাননি। বিতর্কিত একজন পীরের মুরিদ হওয়ার কারণে বিরোধী জোটের শরিক ইসলামপন্থী দলের নেতাকর্মীরা বিএনপি প্রার্থীকে ভোট না দিয়ে জাতীয় পার্টির প্রার্থীকে ভোট দিয়েছেন। এ ছাড়া বৃহত্তর রংপুরে বিএনপির সাংগঠনিক অবস্থাও দুর্বল। রংপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচন থেকে প্রমাণ হচ্ছে, আগামী দিনে ক্ষমতাসীন ও বিরোধী দলের প্রার্থী নির্বাচনের ওপর নির্বাচনী সাফল্য অনেকাংশে নির্ভর করবে।

রংপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনের পর ক্ষমতাসীন দলের নেতারা দাবি করছেন, বর্তমান সরকারের অধীনে নির্বাচন কমিশন স্বাধীন ও নিরপেক্ষভাবে নির্বাচন করার স্বাধীনতা পেয়েছে; কিন্তু আগামী দিনে ঢাকা ছাড়াও রাজশাহী, সিলেট, খুলনা ও গাজীপুর সিটি করপোরেশনের নির্বাচন আছে। এসব নির্বাচনে কমিশন কতটা স্বাধীনভাবে নির্বাচন সম্পন্ন করতে পারে, তা দেখার বিষয়। এ ছাড়া ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের আগে সিটি করপোরেশন নির্বাচন সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণভাবে হয়েছে। সব সিটি করপোরেশনে বিএনপি সমর্থিত প্রার্থীরা বিজয়ী হয়েছিলেন; কিন্তু এরপরও জাতীয় সংসদ নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক করার ব্যাপারে সরকার বা নির্বাচন কমিশন আস্থা সৃষ্টি করতে পারেনি। সে সময় ‘রকীব কমিশন’ পুরোপুরিভাবে সরকারের অনুগত প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছিল। ১৫২ আসনে কোনো ধরনের ভোট ছাড়াই সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। ফলে সিটি করপোরেশন নির্বাচন জাতীয় নির্বাচনে প্রভাব ফেললেও তা থেকে ক্ষমতাসীন সরকার বা এই নির্বাচন কমিশনের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন যে সম্পন্ন হবে, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই।

সন্দেহ নেই, ক্ষমতাসীন দল এখন সাংগঠনিকভাবে যথেষ্ট সুসংহত। তবে অভ্যন্তরীণ কোন্দল যে নেই, তা নয়। অন্য দিকে, বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা এবং রাজনৈতিক কর্মসূচি নিয়ন্ত্রণের ফলে তারা অনেকটা কোণঠাসা হয়ে পড়ছেন। সরকার চাইবে বিরোধী দলের দুর্বল অবস্থানের মধ্যে থেকে নির্বাচন সম্পন্ন করতে। এমনকি বিএনপি চেয়ারপারসনকে নির্বাচনের বাইরে রাখার পরিকল্পনাও সরকারের থাকতে পারে। তবে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের গতিধারা সম্পূর্ণ ভিন্ন। বিরোধী রাজনৈতিক দলের ওপর যত বেশি নিপীড়ন চলে, তাদের প্রতি সাধারণ মানুষের তত বেশি সহানুভূতির সৃষ্টি হয়। ফলে সরকারের এমন কর্মকাণ্ড বিরোধী দলের অনুকূল হতে পারে। এ ছাড়া বৈধতার সঙ্কটে থাকা একটি সরকারের পক্ষে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে যে কত ধরনের প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়, তা বর্তমান সরকার বেশ ভালোভাবেই উপলব্ধি করতে পেরেছে। এ কারণে বিরোধী দল যাতে নির্বাচন বর্জনের মতো সিদ্ধান্তের দিকে না যায়, ক্ষমতাসীন দল মুখে যা-ই বলুক না কেন, সে ব্যাপারে সচেতন আছে বলে মনে হয়।

যদি শেষ পর্যন্ত ক্ষমতাসীন দল ও বিরোধী দল অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের ব্যাপারে একমত হয় তাহলে দেশের রাজনীতির গতিধারা বদলে যেতে পারে। ক্ষমতাসীন দল যদি বিএনপি নেত্রীকে মাইনাস করে নির্বাচনের পথে এগিয়ে যেতে চায়, তবে তা ফলপ্রসূ হবে না, বরং দেশে বড় ধরনের অস্থিরতার সৃষ্টি হতে পারে। এ রকম সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মহল বিশেষ করে প্রতিবেশী দেশ ভারতের সমর্থন কতটুকু পাওয়া যাবে, তা নিয়ে ক্ষমতাসীন দলের মধ্যেও সংশয় রয়েছে। বাস্তবতা হচ্ছে, ২০১৪ সালের নির্বাচনের আগে ভারতের তৎকালীন পররাষ্ট্র সচিব সুজাতা সিং সরাসরি এ দেশের নির্বাচনে নিজেকে জড়িয়ে ফেলেছিলেন। বাংলাদেশে গণতন্ত্র বা অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের চেয়ে কংগ্রেস সরকার বাংলাদেশের ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগকে আবারো বিজয়ী করাকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছিলেন। প্রতিবেশী দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ভারতের এই পক্ষপাতমূলক প্রকাশ্য ভূমিকা শুধু নিন্দিত হয়নি, আধিপত্যবাদী আঞ্চলিক রাজনীতির বহিঃপ্রকাশ হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। অতীতে বিভিন্ন দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ভারতের এমন ভূমিকা শেষ পর্যন্ত ভালো ফল বয়ে আনেনি। সার্কভুক্ত দেশগুলোতে বিশেষ একটি দলের সাথে বিশেষ সম্পর্ক রাখতে গিয়ে এ অঞ্চলে ভারতের প্রভাব খর্ব হয়েছে। সর্বশেষ, নেপালের নির্বাচনে ভারতপন্থী পুরনো দল নেপালি কংগ্রেসের চরম ভরাডুবি হয়েছে এবং বামপন্থী দলগুলোর জোট ব্যাপক সাফল্য অর্জন করেছে। এমন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের নির্বাচনকে সামনে রেখে ভারত একধরনের ভারসাম্যমূলক অবস্থান নিতে পারে। এর ফলে বিশেষ কোনো দল নয়, বরং দেশের সাথে ভারত সম্পর্ক রাখতে চায়- এমন ধারণা প্রতিষ্ঠিত হতে পারে; যা বাংলাদেশের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় ভারতের ইতিবাচক ভূমিকা হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

ক্ষমতাসীন দল আগামী নির্বাচনকে সামনে রেখে দলের অভ্যন্তরীণ প্রস্তুতির পাশাপাশি প্রশাসনিক ও রাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গে দলীয় প্রভাব নিশ্চিত করার চেষ্টা করছে। এরপরও দলের মধ্যে নানা ধরনের মতবিরোধ রয়েছে এবং বিনাভোটে নতুন যেসব সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন, তাদের অনেকেই বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েছেন। ফলে ক্ষমতাসীন দলের ভেতর একধরনের ক্ষত সৃষ্টি হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে নির্বাচনকে সামনে রেখে প্রার্থী মনোনয়নে বড় ধরনের রদবদল করতে হবে। একইভাবে, বিরোধী জোটের মধ্যে আসন ভাগাভাগি নিয়ে নানা ধরনের টানাপড়েন সৃষ্টি হতে পারে, যার কিছুটা ইঙ্গিত মিলছে। এই সুযোগ ক্ষমতাসীন দল নিতে পারে। আর যদি বিরোধী দলকে নির্বাচনকালীন সরকারের দাবিতে আন্দোলনে নামতে হয়, তাহলে দলের সাংগঠনিক শক্তি যেমন সুসংহত করতে হবে, তেমনি জোটকে আরো সক্রিয় করতে হবে। ফলে ২০১৮ সাল হবে ক্ষমতাসীন ও বিরোধী দলের জন্য নানামুখী চ্যালেঞ্জের বছর। ক্ষমতাসীন ও বিরোধী-উভয় পক্ষ শান্তিপূর্ণভাবে যদি এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে পারে, তা হবে দেশের গণতন্ত্রের জন্য বড় অর্জন। বাস্তবতা হচ্ছে বাংলাদেশের গণতন্ত্র এখন খাদের কিনারায় দাঁড়িয়ে আছে। রাজনৈতিক দলগুলোর সহিষ্ণুতা ও সতর্কতার ওপর এর টিকে থাকা নির্ভর করছে।

alfazanambd@yahoo.com

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.