জেরুসালেম ইস্যুতে একঘরে যুক্তরাষ্ট্র
জেরুসালেম ইস্যুতে একঘরে যুক্তরাষ্ট্র

জেরুসালেম ইস্যুতে একঘরে যুক্তরাষ্ট্র

আহমেদ বায়েজীদ

আরো একটি নৈতিক পরাজয় হলো ডোনাল্ড ট্রাম্পের। জেরুসালেম ইস্যুতে তার একগুঁয়েমিকে সমর্থন দেয়নি বিশ্বসম্প্রদায়। জাতিসঙ্ঘের দু’টি পরিষদেই ব্যাপক সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করেছে ফিলিস্তিনের পক্ষে উত্থাপিত প্রস্তাব। বহু হুমকি-ধমকি দিয়েও নিজের পক্ষে সমর্থন টানতে পারেননি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট। বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে পরিচিত দেশগুলোও স্রেফ মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে এ ইস্যুতে। নামমাত্র যে কয়েকটা দেশ ট্রাম্প তথা ইসরাইলকে সমর্থন দিয়েছে, তারা নিতান্তই যুক্তরাষ্ট্রের দয়াদাক্ষিণ্যের ওপর নির্ভরশীল। সামনের দিনগুলোতে কী ঘটবে সেটি সময়ই বলে দেবে, কিন্তু অন্যায়ের বিরুদ্ধে বিশ্বসম্প্রদায়ের এ অবস্থান নির্যাতিত ফিলিস্তিনিদের জন্য নিঃসন্দেহে একটি বড় বিজয়। আর যুক্তরাষ্ট্রের একঘরে হয়ে পড়ার প্রামাণ্য দলিল এই জাতিসঙ্ঘ ভোটের ফলাফল।

দুই দফায় দখলকৃত ফিলিস্তিনি নগরী জেরুসালেমকে ইসরাইলের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতির বিষয়টি শুরুতেই বিশ্বসম্প্রদায়ের নিন্দা কুড়িয়েছে। এরপর বিষয়টি তোলা হয় জাতিসঙ্ঘে। জেরুসালেমকে ইসরাইলের রাজধানী হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের স্বীকৃতি প্রত্যাখ্যান ও জাতিসঙ্ঘ সনদ অনুযায়ী জেরুসালেমের নিরপেক্ষ নগরীর মর্যাদা বহালের ওই প্রস্তাব প্রথম উত্থাপন করা হয় জাতিসঙ্ঘের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম নিরাপত্তা পরিষদে। সেখানে ভোটাভুটিতে যুক্তরাষ্ট্র ছাড়া অন্য ১৪টি স্থায়ী ও অস্থায়ী সদস্যদেশ প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দেয়; কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র ভেটো দেয় প্রস্তাবটিতে। নিরাপত্তা পরিষদের নিয়ম অনুযায়ী পাঁচ স্থায়ী সদস্যদেশÑ যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন, রাশিয়া, ফ্রান্স ও চীনের কোনো একটি ভেটো দিলে সেই প্রস্তাব বাতিল হয়ে যাবে। তাই ১৪ সদস্যরাষ্ট্রের সমর্থন সত্ত্বেও প্রস্তাবটি বাতিল হয়ে যায়। এরপর প্রস্তাবটিকে নিয়ে যাওয়া হয় জাতিসঙ্ঘ সাধারণ পরিষদে। এই পরিষদের সদস্য বিশ্বের প্রায় সব স্বাধীন রাষ্ট্র। সাধারণ পরিষদের ভোটাভুটিতে ভেটো ক্ষমতার কোনো প্রয়োগ নেই। এখানে সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যরাষ্ট্রগুলো যে দিকে ভোট দেবে সেটিই পাস হবে।

নিরাপত্তা পরিষদে ভোটাভুটির চিত্র দেখেই যুক্তরাষ্ট্র বুঝতে পারে পরিস্থিতি তাদের অনুকূলে নেই। সাধারণ পরিষদেও ব্যাপক ব্যবধানে হারবে সেটি বুঝতে পেরেই শুরু করে বিকল্প পন্থা। ভোটাভুটির আগে ব্যাপক কূটনৈতিক তৎপরতা চালায় সমর্থন আদায়ের; কিন্তু তাতে সাড়া না পেয়ে শুরু করে হুমকি দেয়া। যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে ভোট না দিলে বিভিন্ন দেশকে অর্থসাহায্য বন্ধ করে দেয়াসহ অন্যান্য বিষয়ে হুমকি দেয়া হয়। জাতিসঙ্ঘে নিযুক্ত ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রদূত রিয়াদ এইচ মনসুর ভোটের পরে এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘ট্রাম্প প্রশাসন জাতিসঙ্ঘের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে। তারা ইস্যুটি তৈরি করার পর থেকে অভূতপূর্ব কৌশল ব্যবহার করছে। জাতিসঙ্ঘে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা বাদ দিয়ে তারা হুমকি ও জোরজবরদস্তি করেছে। পুরো আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে ক্ষেপিয়ে তুলেছে যুক্তরাষ্ট্র।’

তবে এই হুমকিতে কাজের কাজ কিছুই হয়নি। সাধারণ পরিষদের ১৯৩ সদস্যরাষ্ট্রের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল ছাড়া মাত্র সাতটি দেশ ট্রাম্পের পক্ষে ভোট দিয়েছে। বিপরীতে আনীত প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দিয়েছে ১২৮টি দেশ। ৩৫টি দেশ ভোট দেয়া থেকে বিরত থেকেছে। ভোটের এই চিত্র থেকেই বোঝা যায় প্রবল পরাক্রমশালী যুক্তরাষ্ট্র কতটা লজ্জাজনক পরাজিত হয়েছে এই লড়াইয়ে। বিশ্বসম্প্রদায়ের মধ্যে তাদের এই অনৈতিক প্রদক্ষেপ কোনোই গ্রহণযোগ্যতা পায়নি। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল বাদে যে সাতটি দেশ সমর্থন দিয়েছে তারা হলো- গুয়েতেমালা, হন্ডুরাস, মার্শাল আইল্যান্ড, মাইক্রোনেশিয়া, নাউরু, পালাউ ও টোগো। নামগুলো দেখে যে-কারো বুঝে নিতে কষ্ট হবে না যে, এগুলো বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ কোনো দেশ নয়। বিশ্বের জনসংখ্যার একটি বড় অংশ আছে যারা হয়তো এই দেশগুলোর নামও শোনেনি। ছোট ও দরিদ্র এসব দেশ অর্থনৈতিক ও সামরিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীল। এর মধ্যে আবার মধ্য আমেরিকার দেশ গুয়েতেমালার দীর্ঘ দিন ধরেই গভীর সম্পর্ক ইসরাইলের সাথে। ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে দেশটির এক কূটনীতিকের। ৭০ বছর আগে জাতিসঙ্ঘে যখন ফিলিস্তিনকে ভাগাভাগি প্রশ্নে ভোট হয়, সে সময় জাতিসঙ্ঘে নিয়োজিত গুয়েতেমালার রাষ্ট্রদূত ড. জর্জ গার্সিয়া গ্রানডোস লাতিন আমেরিকার দেশগুলোকে এর পক্ষে ভোট দিতে ব্যাপক ওকালতি করেন। ইসরাইল সব সময়ই স্বীকার করে জর্জ গার্সিয়ার অবদান ছাড়া ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা সম্ভব হতো না। বর্তমানে দেশটিকে প্রচুর সামরিক সহায়তা দেয় ইসরাইল।

ট্রাম্পের যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় মিত্র হিসেবে পরিচিত ফ্রান্স, জার্মানি ও ব্রিটেন শুরু থেকেই জেরুসালেম ঘোষণার বিরোধিতা করেছে। নিরাপত্তা পরিষদের পর সাধারণ পরিষদেও তারা ভোট দিয়েছে ফিলিস্তিনের পক্ষে। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট পুতিনের প্রতি ট্রাম্পের মুগ্ধতার শেষ নেই। তবে ভোটে পরাজয়ের পরই যুক্তরাষ্ট্রকে একঘরে হিসেবে হিসেবে ঘোষণা দিয়েছে সেই রাশিয়া। চেক রিপাবলিক, হাঙ্গেরি, পোল্যান্ডের মতো ইসরাইলপন্থী দেশগুলো ভোটদানে বিরত থেকেছে। হুমকিতে কাবু হয়নি ট্রাম্পের আরব ও আফ্রিকান মিত্ররাও। যুক্তরাষ্ট্রের সাহায্যনির্ভর আফগানিস্তান, মিসর, নাইজেরিয়া, ইথিওপিয়া, তাঞ্জানিয়ার মতো দেশগুলোও ট্রাম্পের হুমকিতে কাবু হয়নি। সরাসরি ফিলিস্তিনের নির্যাতিত মানুষের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে তারা। তবে ফিলিস্তিনের পক্ষে সমর্থন জোগাড় করতে ব্যাপক কূটনৈতিক তৎপরতা চালিয়েছে তুরস্ক। বিশেষ করে তুর্কি প্রেসিডেন্টের আহ্বানে কয়েক দিন আগে ওআইসির জরুরি সম্মেলন এ ইস্যুতে মুসলিম বিশ্বের অবস্থান নিয়ে স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে বাদ বাকি বিশ্বকে। ইয়েমেন, মিসরও বিষয়টিতে তৎপর ছিল।

যদিও ভোটের পরেও অব্যাহত আছে মার্কিন হুমকি। ইতোমধ্যে জাতিসঙ্ঘে অনুদানের পরিমাণ কমিয়ে দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ‘দেখে নেয়ার’ হুমকি দিয়েছে তাদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়া দেশগুলোকে। কার্যতই জেরুসালেম ইস্যুতে ট্রাম্প তথা তার যুক্তরাষ্ট্র একঘরে হয়ে পড়েছে। ক্ষমতা গ্রহণের এক বছর পূরণ না হতেই এটি ট্রাম্পের আরেকটি নৈতিক পরাজয়। শপথ নেয়ার পর থেকেই এত দিন দেশের নাগরিকদের কাছ থেকে একের পর এক সমালোচনার তীরে বিদ্ধ হয়েছেন। বিতর্কিত অভিবাসন নীতি, মেক্সিকো সীমান্তে দেয়াল নির্মাণ ও ওবামা কেয়ার বাতিলসহ অনেক ইস্যুতে মার্কিন নাগরিকেরা ট্রাম্পের সমালোচনায় মুখর ছিলেন। এবার বিশ্বসম্প্রদায়ের সামনেও নিজের অবস্থানটা টের পেলেন এই ধনকুবের। কূটনীতিতে তার প্রশাসন যে চরমভাবে ব্যর্থ এই ভোটাভুটি তার অকাট্য দলিলও। 

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.