ঢাকা, মঙ্গলবার,১৬ জানুয়ারি ২০১৮

প্রশাসন

মশা মারতে দুই সিটির কামান দাগা

মশায় অস্থির নগরবাসী

খালিদ সাইফুল্লাহ

০৩ জানুয়ারি ২০১৮,বুধবার, ১৬:৫৮


প্রিন্ট
দুই সিটির ৫ বছরে ব্যয় ১৩১ কোটি টাকা

দুই সিটির ৫ বছরে ব্যয় ১৩১ কোটি টাকা

রাজধানীতে আবারো মশার উৎপাত বেড়েছে। গত বছরের মাঝামাঝি সময়ে মশাবাহিত রোগ চিকুনগুনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে অসংখ্য নগরবাসী দীর্ঘ রোগভোগ করেছেন। নতুন করে আবার মশার উপদ্রব বৃদ্ধি পাওয়ায় নগরবাসীর মনে আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। তবে সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তারা বলছেন, আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। মশার বংশ বিস্তার যাতে আশঙ্কাজনক হারে না বাড়ে সে জন্য ইতোমধ্যেই বিশেষ কর্মসূচি হাতে নেয়া হয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, পুরো রাজধানীতেই মশার ভয়াবহ উপদ্রব চলছে। এর মধ্যে বনশ্রী, খিলগাঁও, মতিঝিল, মিরপুর, ধোলাইখাল, মীর হাজিরবাগ, যাত্রাবাড়ী, ধলপুর, শ্যামপুর, কামরাঙ্গীরচর, সূত্রাপুর, মোহাম্মদপুর, মগবাজার, ফকিরেরপুল, মানিকনগর, বাসাবো, কমলাপুর, মুগদা, সায়েদাবাদ, রামপুরা, বাড্ডা, মহাখালী, কুড়িল, হাজারীবাগ, রায়েরবাজার এলাকায় মশার উপদ্রব বেশি। এ ছাড়া নগরীর অভিজাত এলাকা গুলশান, বনানী, বারিধারা, উত্তরা, ধানমন্ডিতেও বেড়েছে মশার ভয়াবহ উপদ্রব। অভিজাত এলাকাগুলোর বেশির ভাগ ফ্ল্যাট বাড়িতেই জানালা-দরজায় মসকিউটো নেট লাগানো আছে। কিন্তু তাতেও রেহাই নেই। নিচতলা থেকে শুরু করে ২০ তলা পর্যন্ত সর্বত্রই মশার সমান উপদ্রব চলছে।

রাজধানীর মশা নিয়ন্ত্রণে দুই সিটি করপোরেশন গত পাঁচ বছরে ১৩১ কোটি টাকা ব্যয় করেছে। দক্ষিণ সিটি করপোরেশন গত পাঁচ বছরে মশা নিয়ন্ত্রণে ব্যয় করেছে ৬৬ কোটি ৭৬ লাখ টাকা। এর মধ্যে বর্তমান অর্থবছরে (২০১৭-১৮) মশা নিয়ন্ত্রণে মোট ২৫ কোটি ৬০ লাখ টাকা বাজেট রেখেছে। গত বছর (২০১৬-১৭) ব্যয় হয় ১৭ কোটি ১৮ লাখ টাকা। এর আগের বছর (২০১৫-১৬) ব্যয় করে ৯ কোটি ৯০ লাখ। ২০১৪-১৫ বছরে ব্যয় হয় ১১ কোটি ৯৫ লাখ টাকা। তার আগের বছর (২০১৩-১৪) ব্যয় হয় মাত্র ২ কোটি ১৩ লাখ টাকা।

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে গত পাঁচ বছরে মশা নিয়ন্ত্রণে মোট ব্যয় করেছে ৬৪ কোটি ৪০ লাখ টাকা। এর মধ্যে বর্তমান অর্থবছরে (২০১৭-১৮) মশা নিয়ন্ত্রণে ২০ কোটি টাকা বাজেট রেখেছে। গত বছর (২০১৬-১৭) ব্যয় হয় ১৬ কোটি ৮৫ লাখ টাকা। এর আগের বছর (২০১৫-১৬) ১১ কোটি ৯৫ লাখ টাকা ব্যয় হয়। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ব্যয় হয় সাত কোটি ৮০ লাখ টাকা। তার আগের বছরও (২০১৩-১৪) ব্যয় হয় সাত কোটি ৮০ লাখ টাকা। মশা নিধনে সরকারেরই যে শুধু কোটি কোটি টাকা ব্যয় হচ্ছে তা নয়। মশার কয়েল ও এরোসল ক্রয়ে নগরবাসীর ব্যয়ও কোটি কোটি টাকা।
এভাবে শতাধিক কোটি টাকা ব্যয়ের পরও কোনোভাবেই মশা নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না; বরং কয়েক বছরে এডিস মশা বাহিত ডেঙ্গু রোগে আক্রান্তের সংখ্যা বেড়েছে। গত বছরের মাঝামাঝিতে ডেঙ্গুর পাশাপাশি নতুন করে ভাইরাসজনিত চিকুনগুনিয়া রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়। এডিস মশা থেকেই এ রোগ ছড়ায়। কোনো কোনো পরিবারের সবাই একসাথে এ রোগে আক্রান্ত হয়ে চরম বিপাকে পড়েন। এ রোগে আক্রান্তদের প্রচণ্ড জ্বরের সাথে সারা শরীরে ব্যথা অনুভূত হয়। বিশেষ করে হাড়ের গিরায় প্রচণ্ড ব্যথা হয়। ব্যথার কারণে হাঁটাচলা বন্ধ হয়ে যায়। এ রোগে আক্রান্তরা তিন থেকে চার মাস পর্যন্ত ভুগেছেন। চিকুনগুনিয়ার প্রাদুর্ভাবের কারণে শেষ পর্যন্ত ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন কলসেন্টার চালু করে নিজস্ব ডাক্তার দিয়ে বাড়িতে বাড়িতে গিয়ে চিকিৎসা দেয়ার ব্যবস্থা করেন। পরে তাদের ফিজিওথেরাপিও দেয়া হয়।

রাজধানীতে বর্তমানে মশার উপদ্রব বেড়েছে। ফলে নগরবাসীর মনে আবারো চিকুনগুনিয়া ও ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হওয়ার আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। কামরুল ইসলাম নামে উত্তরার জসীমউদ্দীন রোডের এক বাসিন্দা বলেন, রাত-দিন সব সময়ই মশা থাকে। সন্ধ্যায় দরজা-জানালা বন্ধ করে দিতে হয়, না হলে মশার যন্ত্রণায় টেকা যায় না। রাতে মশারি ছাড়া ঘুমানোর উপায় থাকে না। অনেক সময় মশারির মধ্যেও মশা ঢুকে কানের কাছে গান শোনাতে থাকে।

বাসাবোর বাসিন্দা মিজানুর রহমান বলেন, গত মওসুমে আমার পরিবারের সবার চিকুনগুনিয়া হয়। এতে যে দুর্ভোগ পোহাতে হয় তা ভাষায় বর্ণনা করার মতো নয়। এখনো মনে হয় শরীর ব্যথা রয়েছে। এখন আবার মশার উৎপাত বেড়েছে, জানি না এবার কী হয়?
মহাখালীর বাসিন্দা আক্তার হোসেন বলেন, দিনে রাতে সব সময় মশা থাকে। বাসায় থাকলে সব সময় হাতের কাছে ইলেকট্রিক ব্যাট রাখতে হয়। আর আমার অফিস ফার্মগেটে সেখানেও মাঝে মাঝেই ওষুধ স্প্রে করতে হয়। না হলে টেকা যায় না। গত মওসুমে তিনি ও তার মেয়ে চিকুনগুনিয়ায় আক্রান্ত হন বলে জানান।

টিকাটুলির বাসিন্দা আমজাদ হোসেন বলেন, গত বছর চিকুনগুনিয়ায় অনেক ভুগতে হয়েছে। এ কারণে এবার চরম আতঙ্ক লাগছে। এবার আক্রান্ত হলে কী হবে বুঝতে পারছি না।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান ভাণ্ডার ও ক্রয় কর্মকর্তা সাখাওয়াৎ হোসেন নয়া দিগন্তকে বলেন, মশা নিয়ন্ত্রণে বর্তমানে ৫২ হাজার লিটার এডালটিসাইড ওষুধ মজুদ রয়েছে। দু-এক দিনের মধ্যে আরো ৪৮ হাজার লিটার যোগ হবে। এ ছাড়া গত বছরের কেনা চার হাজার লিটার লার্ভিসাইডের মধ্যে বর্তমানে ৪০০ লিটার রয়েছে বলে তিনি জানান। এ বছর আরো চার হাজার লিটার এডালটিসাইড কেনার প্রস্তুতি রয়েছে বলে জানান এ কর্মকর্তা।

ডিএসসিসির প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রি.জেনারেল ডা: সালাহ উদ্দীন নয়া দিগন্তকে বলেন, বর্তমান সময় আবহাওয়ার কারণে মশার উপদ্রব বেড়ে যায়। এ জন্য গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে বিশেষ ক্র্যাশ প্রোগ্রাম চালানো হচ্ছে। গত বছর থেকে এ বছর ৩৩ ভাগ ওষুধ বেশি প্রয়োগ করা হচ্ছে বলে তিনি জানান। মশাবাহিত রোগ থেকে বাঁচতে জনগণকে আরো সচেতন হওয়ার পরামর্শ দেন এ চিকিৎসক। সালাহ উদ্দিন জানান, বর্তমানে ডিএসসিসিতে ২৪৬টি ফগার মেশিন ও ৩৭০টি হস্তচালিত মেশিন রয়েছে। মোট ৩২৮ জন কর্মী এ কাজ তদারকি করেন জানিয়ে তিনি বলেন, আরো জনবল বাড়ানোর চেষ্টা চলছে।

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ডা: জাকির হোসেন নয়া দিগন্তকে বলেন, মশার উপদ্রব বেড়ে যাওয়ায় গত ২৮ ডিসেম্বর থেকে ৪ জানুয়ারি পর্যন্ত বিশেষ ক্র্যাশ প্রোগাম চলছে। এ ছাড়া ডিএনসিসি এলাকায় থাকা দুই হাজার ১৫৩ বিঘা জলাশয়ের মধ্যে ৯০০ বিঘা জলাশয় নতুন করে পরিষ্কার ও অন্যান্য জলাশয় পরিচ্ছন্ন করা হয়েছে। তিনি জানান, ডিএনসিসিতে বর্তমানে ২৫০টি ফগার মেশিন রয়েছে। আরো দেড় শ’টি কেনার প্রক্রিয়া চলছে। এ ছাড়া হস্তচালিত মেশিন রয়েছে তিন শ’। এটিও আরো ১০০ কেনার প্রস্তুতি চলছে বলে তিনি জানান। ডিএনসিসিতে বর্তমানে ২৮৪ জন মশক নিয়ন্ত্রণ কর্মী রয়েছে বলে জানান এ কর্মকর্তা।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫