আবারো অশান্ত পাহাড়
আবারো অশান্ত পাহাড়

আবারো অশান্ত পাহাড়

রাঙ্গামাটি সংবাদদাতা

পাহাড়ধসের ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে না উঠতে বছরের শেষ সময়ে এসে ডিসেম্বরে আবারো অশান্ত হয়ে উঠে পাহাড়। দীর্ঘ দিন শান্ত থাকার পর বছরের শেষান্তে এসে রাঙ্গামাটির রাজনৈতিক পরিস্থিতি অশান্ত হয়ে উঠে। একাধিক আঞ্চলিক গ্রুপের মধ্যে আধিপত্য বিস্তার, অভ্যন্তরীণ কোন্দল, চাঁদাবাজিসহ নানা কারণে প্রতিদিন ঘটছে সঙ্ঘাত। প্রতিপক্ষকে হামলা, খুন, অপহরণসহ বন্দুকযুদ্ধ ও চাঁদাবাজি বেড়ে যাওয়ায় রাঙ্গামাটিতে সাধারণ মানুষের মনে দেখা দিয়েছে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা।

শুধু ডিসেম্বরে এক মাসেই রাঙ্গামাটিতে গুলিতে মারা গেছে তিনজন। এ ছাড়া দুর্ঘটনায় সারা বছরে মারা গেছে ১৪ জন। প্রতিপক্ষের হামলায় মারাত্মক আহত আর অপহরণের শিকার হয়েছে অনেকেই।
সর্বশেষ ২১ ডিসেম্বর রাঙ্গামাটির বন্দুকভাঙা ইউনিয়ন থেকে পাঁচ ইউপি মেম্বারসহ ২০ জনকে অপহরণ করা হয়। এক দিন পর তারা নিজ নিজ গ্রামে ফিরে আসে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা ছিল লক্ষণীয়। লংগদুর গোলাছড়িতে ২৯ জুন সন্ত্রাসী আস্তানায় সেনাবাহিনীর অভিযানে একে-৪৭সহ বিপুল অস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধার হয়। ৩ জুলাই বাঘাইছড়িতে অভিযানে অস্ত্রসহ আটক করা হয় দুই সন্ত্রাসীকে।

২০১৭ সালের প্রথম কয়েক মাস রাঙ্গামাটির পরিস্থিতি শান্ত থাকলেও বছরের মাঝামাঝি জুন মাসের শুরুতে প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও মানবসৃষ্ট কারণে রাঙ্গামাটির পরিস্থিতি বিভীষিকাময় হয়ে উঠে। দেশজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রে ছিল রাঙ্গামাটি।

৩০ মে ঘূর্ণিঝড় মোরার তাণ্ডবে লণ্ডভণ্ড হয়ে যায় রাঙ্গামাটির স্বাভাবিক জীবনযাত্রা। প্রাণ হারায় দুইজন। ঘূর্ণিঝড় মোরা তাণ্ডব আর লংগদুর অগ্নিসংযোগের ঘটনার পর ১৩ জুন ঘটে যায় রাঙ্গামাটির ইতিহাসের স্মরণকালের ভয়াবহ পাহাড়ধসের ঘটনা। বিছিন্ন হয়ে যায় যোগাযোগ ব্যবস্থা। গাছপালা ও বৈদ্যুতিক খুঁটি ভেঙে লণ্ডভণ্ড হয়ে যায় পুরো শহর। দেখা দেয় চরম মানবিক সংকট। পাহাড় ধসের চার দিনের মাথায় বিদ্যুৎ সরবরাহ চালু করে এবং রাঙ্গামাটি চট্টগ্রাম সড়কের আট দিন সড়ক যোগাযোগ বিছিন্ন থাকার পর সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে মানিকছড়ি শালবন এলাকায় বিকল্প সড়ক চালু হলে যোগাযোগ পুনঃস্থাপিত হয়। ফলে স্বাভাবিক হয়ে আসে রাঙ্গামাটির জীবনযাত্রা।

ঘূর্ণিঝড়ে তাণ্ডবের ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে না উঠতে সন্ত্রাসী হামলায় খুন হন লংগদুর মোটরবাইক চালক যুবলীগ নেতা নুরুল ইসলাম। তার মৃত্যুকে কেন্দ্র করে ২ জুন অশান্ত হয়ে উঠে লংগদু উপজেলা। অগ্নিসংযোগ করা হয় তিনটি গ্রামে পাহাড়িদের আড়াই শ’ ঘরবাড়িতে। এই ঘটনায় একজন বৃদ্ধের মৃত্যু হয়।

১৩ জুনের ভয়াবহ পাহাড়ধসে সবচেয়ে বেশি মানুষের মৃত্যু ও সম্পদের ক্ষতি হয় রাঙ্গামাটিতে। পাহাড়ধসের ঘটনায় সেনা সদস্যসহ মারা যান ১২০ জন। আর আহত হয়েছেন দেড় হাজারেরও বেশি। ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে প্রায় আড়াই হাজারের মতো।

এক বছরের উল্লেখযোগ্য ঘটনাবলি
৮ মে : রাঙ্গামাটির কাপ্তাই উপজেলার চিৎমরং ঘাট এলাকায় বাসচাপায় অটোরিকশার এক যাত্রী নিহত ও আরো দুই যাত্রী আহত হন।
৩০ মে : সকালে ঝড়ো হাওয়ায় শহরের ভেদভেদীস্থ এলাকার সড়ক ও জনপদ বিভাগের কারখানা বিভাগ এলাকায় একটি বসতঘরের ওপর গাছ ভেঙে পড়লে ঘটনাস্থলেই নিহত হয় স্কুলছাত্রী মাহিমা আক্তার (১৪) এবং একই সময়ে শহরের আসামবস্তী এলাকায় গাছের নীচে চাপা পড়ে নিহত হন হাজেরা বেগম (৪৫)। এ সময় তার শিশু ছেলে জুনায়েদ (৫) আহত হয়।
১ জুন : ভাড়ায় চালিত মোটরসাইকেল চালক লংগদু উপজেলার ইউনিয়ন যুবলীগ নেতা নুরুল ইসলাম নয়নকে হত্যা করা হয়।

২ জুন : রাঙ্গামাটি জেলার লংগদু উপজেলার মোটরসাইকেল চালক ও যুবলীগ নেতা নূরুল ইসলাম নয়নের হত্যাকে কেন্দ্র করে তিনটি পাহাড়ি গ্রামে ঘরবাড়িতে অগ্নিসংযোগ, নিহত একজন।
৮ জুন : রাঙ্গামাটির লংগদুর মাইনি নদীতে ভাসমান অবস্থায় অজ্ঞাত এক ব্যক্তির লাশ উদ্ধার করে পুলিশ।

১২ জুন : ভারী বর্ষণে রাঙ্গামাটি শহরের রিজার্ভমুখ পুলিশ লাইন হাসপাতাল এলাকায় নাইমা আক্তার (৫) ও কাপ্তাই উপজেলার নতুন বাজার এলাকায় বসতবাড়ির ওপর পাহাড়ধসে পড়ে মো: রমজান আলী (৮) নামে দুই শিশু নিহত হয়।

১৩ জুন : রাঙ্গামাটিতে ভয়াবহ পাহাড়ধস, সেনা সদস্যসহ নিহত ১২০ জন।
২৯ জুন : লংগদুর গোলাছড়িতে সন্ত্রাসী আস্তানায় সেনাবাহিনীর অভিযানে একে-৪৭সহ বিপুল অস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধার।
৩ জুলাই : বাঘাইছড়িতে অস্ত্রসহ দুই ইউপিডিএফ কর্মীকে আটক করা হয়।
৮ জুলাই : রাঙ্গামাটিতে মোটরসাইকেলের ধাক্কায় মো: মনিরুল ইসলাম মজুমদার (৫০) নামের রাঙ্গামাটি সদর উপজেলা কৃষি কার্যালয়ের এক সরকারি কর্মচারী নিহত হন।

২৩ অক্টোবর : লংগদুতে কাপ্তাই হ্রদের পানিতে ডুবে ভাইবোনের মৃত্যু হয়েছে। নিহত দুই শিশুর নাম- আবদুল কাদের (০৬) ও নিপা আক্তার (০৪)। নিহত দুই শিশু লংগদু উপজেলার ভাসাইন্যাদম ইউনিয়নের ১৪ নং মৌজার পুরানবস্তি এলাকার নাছির উদ্দীনের ছেলেমেয়ে।

১৫ নভেম্বর : রাঙ্গামাটি শহরের মানিকছড়িতে যাত্রীবাহী বাস উল্টে এক নারী যাত্রী নিহত ও ২০ জন আহত হয়। নিহতের নাম তপনী বেগম। তিনি চট্টগ্রাম শহরের আতুরার ডিপোর শান্তি নগরের বাসিন্দা।

২৯ নভেম্বর : রাঙ্গামাটি শহরের রিজার্ভ বাজারের মসজিদ মার্কেট পুস্তক ব্যবসায়ী মিতা লাইব্রেরির কর্ণধার মো: ইয়াছিন। কাপ্তাই লেকে গোসল করতে নেমে লেকের পানিতে তলিয়ে যান।
৫ ডিসেম্বর : রাঙ্গামাটির নানিয়ারচরে প্রতিপক্ষের গুলিতে অনাদি রঞ্জন চাকমা নামে সাবেক এক ইউপি মেম্বার নিহত হন।
৫ ডিসেম্বর : রাঙ্গামাটির জুরাছড়িতে দুর্বৃত্তের গুলিতে উপজেলা যুবলীগ নেতা অরবিন্দু চাকমা নিহত হন।
৫ ডিসেম্বর : রাঙ্গমাটিতে শিমুলতলী এলাকায় চলন্ত বাসের ছাদ থেকে পড়ে এক যুবক নিহত হয়।
৫ ডিসেম্বর : বিলাইছড়ি উপজেলা সদরের তিলিক্যাছড়ি এলাকায় উপজেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি রাসেল মারমা আড্ডা দেয়ার সময় একদল দুর্বৃত্ত তার ওপর লাঠি-ক্রিজ নিয়ে হামলা চালিয়ে গুরুতর আহত করে।

৬ ডিসেম্বর : রাঙ্গামাটি শহরের বিজয় নগরের ভালেদি আদামে সন্ত্রাসী হামলা চালিয়ে মহিলা আওয়ামী লীগ নেত্রী ঝর্ণা খীসা নামে এক মহিলাকে কুপিয়ে মারাত্মক আহত করে।
১৫ ডিসেম্বর : রাঙ্গামাটি সদর উপজেলার বন্দুকভাঙা ইউনিয়নের ধামাইছড়া নামক পাহাড়ি গ্রামে প্রতিপক্ষের গুলিতে ইউপিডিএফ নেতা অনল বিকাশ চাকমা প্লটো (৪২) ওরফে লক্ষ্মী নিহত হন।
২১ ডিসেম্বর : রাঙ্গামাটির বন্দুকভাঙা ইউনিয়ন থেকে ৫ ইউপি মেম্বারসহ ২০ জনকে অপহরণ করা হয়। একদিন পর তারা নিজ নিজ গ্রামে ফিরে আসে।

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.