আঠারো সালের নির্বাচন এবং বিবিধ কথা

সংবিধান ও রাজনীতি
সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম, বীর প্রতীক

নতুন খ্রিষ্টীয় বছর ২০১৮ শুরু হয়েছে; আজ বুধবার তৃতীয় দিবস। সম্মানিত পাঠকগণকে নতুন বছরের শুভেচ্ছা জানাই। মহাকালের সংরক্ষণ কক্ষে ২০১৭ নামক আরেকটি বছর জমা হয়েছে। মহাকালের ব্যাপ্তি আকৃতি আকার ইত্যাদির সঙ্গে একজন ব্যক্তির কর্মজীবনের দৈর্ঘ্য কোনোমতেই তুলনাযোগ্য নয়; কারণ ব্যক্তির কর্মজীবনের মেয়াদ এতই স্বল্প যে, মহাকালের পৃষ্ঠায় সেটি চিহ্নিত করলেও দেখা যাবে না। কারণ সেটি অনেক ছোট; কত ছোট তার আপেক্ষিক বর্ণনা দেয়াও গণিতশাস্ত্রের পক্ষে অসম্ভব। যা হোক, সুখ-দুঃখ, আশা-নিরাশা সব কিছু নিয়েই মানুষের চিন্তা এবং কল্পনা। ২০১৭ সালকে বিদায় দিতে গিয়ে বিভিন্ন জ্ঞানী ব্যক্তি টেলিভিশনের টকশোতে এবং পত্রিকার কলামে ইতোমধ্যে জ্ঞানগর্ভ ও তাৎপর্যপূর্ণ মতামত ব্যক্ত করেছেন। সে দিক থেকে আমার লেখা এই কলামটি বরং একটু দেরিতেই উপস্থাপন করছি। ১৬ ডিসেম্বর দু’টি পত্রিকায় বিজয় দিবস উপলক্ষে লেখা কলাম ছিল। তার আগের বুধবার ছিল ১৩ ডিসেম্বর। ওই ১৩ তারিখ এবং পরবর্তী বুধবার ২০ ডিসেম্বর ও ২৭ ডিসেম্বর আমার সাপ্তাহিক বা নিয়মত কলাম লিখিনি; ব্যস্ততার জন্য।
সতেরো সালের মোটা দাগের বৈশিষ্ট্যগুলো
২০১৭ সালের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো, দেশের অভ্যন্তরে দু’টি বৃহৎ রাজনৈতিক বলয়ের মধ্যে কোনো রাজনৈতিক রক্তাক্ত সঙ্ঘাত ছিল না বললেই চলে। তবে, এটা বলা কঠিন হয়ে পড়েছে, আগামী বছরটি এ রকম রক্তাক্তবিহীন হবে কি না। রক্তাক্তবিহীন হলেই ভালো, অন্যথা হলে দুর্ভাগ্য। ২০১৭ সালের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল নির্বাচন কমিশনের তৎপরতা। তারা নিবন্ধিত সব রাজনৈতিক দলের সাথে এবং বুদ্ধিজীবী ও জ্ঞানী-গুণী অভিজ্ঞ নাগরিকদের সাথে সংলাপ করেছে। ফলাফল যা-ই হোক না কেন, সংলাপ করাটাই ছিল একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ। ২০১৭ সালের আরেকটি বৈশিষ্ট্য ছিল উত্তরবঙ্গে বন্যা। এই বন্যায় বিরাট ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে এবং বন্যার সময় তিস্তা নদীর পানি প্রসঙ্গটি বারবার উঠে এসেছে। ২০১৭ সালের আরেকটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের সাতজন বিচারপতির সর্বসম্মতিতে সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী বাতিল করে দেয়া রায়। এর থেকেও বড় তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা ছিল, ওই রায়ের পরপরই ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় সরকারি মহলের সর্বাঙ্গ থেকে প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহার প্রতি সর্বাত্মক আক্রমণ; যে আক্রমণের পরিপ্রেক্ষিতে প্রধান বিচারপতি একপর্যায়ে পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। ২০১৭ সালের বৈশিষ্ট্যগুলোর অন্যতম হলো, অতীতের ৪৫ বছরের তুলনায় সবচেয়ে বড় বাজেট। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ২০১৭ সালের বৈশিষ্ট্যের মধ্যে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ইভেন্ট আছে। যেমন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প কর্তৃক কয়েকটি মুসলিম দেশের মানুষের আসা-যাওয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা, ৩৭ বছরের একটানা শাসনের পর জিম্বাবুয়ের প্রেসিডেন্ট রবার্ট মুগাবেকে সামরিক শক্তি ও জনগণের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় পদত্যাগে বাধ্য করা, আমেরিকার জেরুসালেমকে ইসরাইলের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া ইত্যাদি। আন্তর্জাতিক অঙ্গনের বাংলাদেশ প্রসঙ্গের ঘটনাবলির মধ্যে অন্যতম উল্লেখযোগ্য হলো, খ্রিষ্টধর্মের ক্যাথলিক সম্প্রদায় সর্বোচ্চ ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব বা ধর্মগুরু পোপের বাংলাদেশ সফর।
সতেরো সাল ও অপহরণ-গুম
২০১৭ সালের আরেকটি বৈশিষ্ট্য ছিল অপহরণ ও গুম ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পাওয়া, তথা রাজনৈতিক দমন-পীড়নের অন্যতম হাতিয়ার হিসেবে অপহরণ ও গুমকে ব্যবহার করা। প্রক্রিয়াটি এতটা ভয়ানক ও ভীতিপ্রদ হয়ে উঠেছিল যে, বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টির মহাসচিব এম এম আমিনুর রহমানকেও অপহরণ করা হয়েছিল ২০১৭ সালের আগস্ট মাসের শেষ সপ্তাহে। আমি নিঃসন্দেহ ও নিশ্চিত যে, আমিনুর রহমানের অপহরণটি ছিল রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অপহরণ। ডিসেম্বর মাসের শেষ সপ্তাহে এম এম আমিনুর রহমানের জীবন ফেরত দেয়া হয়; কিন্তু আইনের প্যাঁচে আসামি বানিয়ে রাখা হয়। আরো বহু ব্যক্তি এবং তাদের মধ্যে অনেকেই গণ্যমান্য পেশাজীবী, এখনো অপহরণ বা গুম অবস্থায় আছেন। ২০১৭ সালজুড়ে তথা সারা বছর ধরে বাংলাদেশের আকাশ বাতাস অপহরণ হওয়া বা গুম হওয়া ব্যক্তিদের পরিবার ও আপনজনদের আহাজারিতে ভারাক্রান্ত ছিল। সেসব পরিবারের দীর্ঘশ্বাস যে ঊর্ধ্বমুখী হয়ে, আসমান থেকে প্রতিধ্বনিত হয়ে আবার মাটির বুকে এসে এসব অপহরণ-গুমের রাজনৈতিক নির্দেশদাতাদের ঘাড়ের ওপর পড়ছে না, সেটির কি কোনো গ্যারান্টি আছে?
সতেরো সাল ও রোহিঙ্গা সমস্যা
২০১৭ সালের বৈশিষ্ট্য লিখতে গিয়ে আরো অনেক কথা উল্লেখ করতে পারতাম; কিন্তু করছি না; রোহিঙ্গা প্রসঙ্গটি দিয়ে শেষ করছি। রোহিঙ্গা সমস্যা একটি পুরনো সমস্যা; কিন্তু ২০১৭ সালে এই সমস্যাটি বিস্ফোরিত হয়েছে এবং সেই বিস্ফোরণের বিষবাষ্পে বাংলাদেশ প্লাবিত বা আচ্ছাদিত। আগস্ট মাসের ২৫ তারিখের পর থেকে পরবর্তী চার মাসে সাত লাখের অধিক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। বাংলাদেশ তাদের স্বাগত জানিয়েছে একমাত্র মানবিক কারণে। বাংলাদেশের মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি বিশ্বব্যাপী প্রশংসিত হয়েছে; কিন্তু রোহিঙ্গা সমস্যার প্রসঙ্গে পূর্বপ্রস্তুতি বলতে বাংলাদেশের কূটনীতিতে কিছুই ছিল না। সমস্যা সৃষ্টি হওয়ার পর কূটনৈতিক প্রচেষ্টার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের মারাত্মক দুর্বলতা ফুটে উঠেছে। ৯ বছর ধরে বর্তমান রাজনৈতিক সরকার যে দেশটিকে বাংলাদেশের জন্য বৃহত্তম সর্বোত্তম সর্বাধিক শক্তিশালী সর্বাধিক নির্ভরযোগ্য বন্ধু দেশ হিসেবে প্রচার করেছে, সেই ভারত বাংলাদেশের এত বড় সমস্যায় আমাদের পাশে দাঁড়ায়নি। চীনও দাঁড়ায়নি। ইউরোপীয় ইউনিয়ন দাঁড়িয়েছে। তুরস্ক, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া দাঁড়িয়েছে; পৃথিবীর শতাধিক দেশ দাঁড়িয়েছে। দুস্থ রোহিঙ্গাদের জন্য রিলিফ দেয়া এক বিষয় এবং কূটনৈতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের কৌশলগত স্বার্থকে সমর্থন দেয়া আরেক ব্যাপার। ভারত বাংলাদেশের কৌশলগত স্বার্থকে সমর্থন দিচ্ছে না। এটাও বলতে হবে যে, সরকার কূটনৈতিকভাবে তাদের তৎপরতা বৃদ্ধি করেছে এবং আশা করা যায়, সেই তৎপরতা আরো শক্তিশালী হবে ও সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে প্রভাব ফেলবে।
আঠারো সাল : মন্ত্রিপরিষদ
২০১৮ সালের বৈশিষ্ট্য নিয়ে আলোচনা করা প্রয়োজন, কিন্তু কাজটি কঠিন। অনেক অনিশ্চয়তা নিয়ে বছরটি শুরু। বছরের প্রথম দিনের অনেক খবরের মধ্যে একটি হলো, মৎস্য ও পশুসম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীকে পদোন্নতি দিয়ে পূর্ণ মন্ত্রী করা এবং একজন নতুন ব্যক্তিকে একই মন্ত্রণালয়ে প্রতিমন্ত্রী নিযুক্ত করা। এই খবরের সূত্র ধরেই বলতে চাই, মন্ত্রিপরিষদে পরিবর্তন হবে কি হবে না এটাও একটি অনিশ্চয়তা। মন্ত্রিপরিষদে পরিবর্তন হতেই পারে। সুপ্রিম কোর্টের তিরস্কৃত বা দণ্ডিত বা দণ্ড থেকে ক্ষমা করে দেয়া মন্ত্রীরা এখনো বহাল তবিয়তে দায়িত্ব পালন করছেন। এমনও মন্ত্রী আছেন যারা যেকোনো সভ্য দেশের মানদণ্ডে নৈতিকতার আবহে পদত্যাগ করা উচিত ছিল, কিন্তু করেননি। এমনও মন্ত্রী আছেন যারা দুর্নীতিমুক্ত বলা যাবে না। অতএব, পার্লামেন্ট নির্বাচনের আগের মাসগুলোতে মানুষকে চমক দেয়ার জন্য মন্ত্রিপরিষদে পরিবর্তন আনা হবে না, এমন গ্যারান্টি কেউ দিতে পারবে না।
আঠারো সাল : সুপ্রিম কোর্ট
২০১৮ সালের শুরুতেই যে অনিশ্চয়তা নিয়ে রাষ্ট্র তার জীবন শুরু করল সেটি হলো, সরকারের তিনটি অঙ্গের অন্যতম, বিচার বিভাগের আপেক্ষিক অভিভাবকহীনতা। প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহা তার পদ থেকে পদত্যাগ করার পর নতুন কোনো ব্যক্তি এখনো প্রধান বিচারপতি নিযুক্ত হননি। বিদ্যমান বিচারপতিদের মধ্যে জ্যেষ্ঠতার ক্রম অনুসারে যিনি জ্যেষ্ঠতম অর্থাৎ বিচারপতি আবদুল ওয়াহাব মিঞা ভারপ্রাপ্ত বিচারপতির দায়িত্ব পালন করছেন। বাংলাদেশ সরকারের নির্বাহী বিভাগ প্রধান বিচারপতি নিয়োগের কর্মটি নিয়ে একটি অনিশ্চয়তার নাটক জমজমাট করেছে। সাধারণ নাগরিকদের মনে বহু প্রশ্নের উদ্রেক হওয়া অস্বাভাবিক নয়। বর্তমান রাজনৈতিক সরকার ষোড়শ সংশোধনীর রায়ের বিরুদ্ধে রিভিউ পিটিশন দাখিল করেছে। সেই রিভিউ পিটিশন আপিল বিভাগের ক’জন বিচারপতি শুনবেন বা শুনবেন না সেটিও একটি আলোচিত বিষয়। এর শুনানি করা এবং শুনানির পর নিষ্পত্তি করাÑ এই কাজের সঙ্গে কাকে প্রধান বিচারপতি নিযুক্ত করা হবে এই সিদ্ধান্তের সম্পর্ক থাকতেও পারে, না-ও পারে। উল্লেখযোগ্য যে, ষোড়শ সংশোধনীর শুনানিকালে এবং রায় প্রদানকালে মোট সাতজন বিচারপতি ছিলেন আপিল বিভাগে। সেই সাতজনের মধ্য থেকে একজন, বিচারপতি নাজমুন আরা অবসরে চলে গেছেন স্বাভাবিক নিয়মে এবং প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহা পদত্যাগ করেছেন। বাকি আছেন পাঁচজন। সরকার চাচ্ছে ষোড়শ সংশোধনীর রায়ের গুরুত্বপূর্ণ সংশোধন বা পরিবর্তন বা পরিমার্জন। অতএব, বিচারপতিরা অতি গুরুত্বপূর্ণ।
আঠারো সাল : তিস্তার পানি
২০১৮ সালের অন্যতম অনিশ্চয়তা হচ্ছে, তিস্তার পানি চুক্তি। তবে প্রাচীনকালের বিখ্যাত ভারতীয় পণ্ডিত চানক্যের বিখ্যাত কৌশলের সূত্র ধরে বলা যায় যে, ২০১৮ সালের পার্লামেন্টের নির্বাচনের আগে ভারত এবং বাংলাদেশ তিস্তার পানির বণ্টন নিয়ে একটি চুক্তি স্বাক্ষর করে ফেলবে। এই চুক্তি তথা সম্ভাব্য চুক্তির মূল লক্ষ্য এটা হবে না যে, কতটুকু পানি বাংলাদেশ পাবে; মূল লক্ষ্য হবে ভারতের রাজনৈতিক সরকারের মিত্র বাংলাদেশের রাজনৈতিক সরকারকে একটি রাজনৈতিক সুবিধা দেয়া। নির্বাচনের আগে যদি তিস্তা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, তখন বর্তমান সরকার নির্বাচনী প্রচারণার সময় বলবে, ‘আওয়ামী লীগই পারে বাংলাদেশের জন্য পানি আনতে; আওয়ামী লীগ সমুদ্র জয় করেছে, এখন তিস্তা জয় করল।’
আঠারো সাল : দুর্নীতি
বাংলাদেশের দুর্নীতি নিয়ে বিশেষত, গত ৯ বছরে বাংলাদেশে দুর্নীতির বিস্তার ও ব্যাপকতা বৃদ্ধি নিয়ে শত শত পৃষ্ঠার বই লেখা যাবে। তার পরেও মাত্র কয়েকটি লাইনে অনুভূতিটি প্রকাশ করছি। ২০১৮ সালে শত অনিশ্চয়তার মধ্যেও একটি বড় অনিশ্চয়তা আছে। সেই বড় অনিশ্চয়তাটি দুর্নীতি প্রসঙ্গে। গত ৯ বছর ধরে টাকা আত্মসাতের যে প্রক্রিয়া চলে এসেছিল সেই প্রক্রিয়াগুলো সমাপ্তির পথে নেয়া হবে। সমাপ্তি বলতে বুঝাচ্ছি আপাতত সমাপ্তিকে। অন্য একটি উদাহরণ দিই। বিভিন্ন বিজ্ঞজনের পরামর্শকে উপেক্ষা করে শুধু রাজনৈতিক বিবেচনায় বাণিজ্যিক ব্যাংকের অনুমোদন দেয়া হয়েছিল। সেই ব্যাংকগুলোর পারফরম্যান্স বা কার্যদক্ষতা এতই নি¤œমানের যে, এখন আমরা উপসংহারে আসতে বাধ্য, ব্যাংকগুলোকে অনুমোদন দেয়া হয়েছিলই দুর্নীতি করার জন্য। নিশ্চিতভাবেই ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের লক্ষ্য ছিল না ব্যাংক স্থাপন করে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলকে অর্থসম্পদ লুণ্ঠন করার সুযোগ দেয়া। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার তালিকায় লুটপাট শব্দটি কখনো ছিল না; কিন্তু ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দেয়া রাজনৈতিক দলটি যে লুটপাটকে স্বাধীনতার চেতনার সমার্থক করে ফেলেছে অর্থাৎ স্বাধীনতা মানে লুটপাট করার স্বাধীনতা। আমি (এই কলামের লেখক) একজন ব্যক্তি; লেখক হিসেবে আমাদের জ্ঞানের ও রেফারেন্স টানার সীমাবদ্ধতা আছে। মাত্র কিছু দিন আগে সংবাদ বের হয়েছিল যে, গত দশ বছরে বাংলাদেশের যে অর্থ বিনিয়োগ হয়েছে, তার থেকে বহু গুণ অর্থ বাংলাদেশ থেকে বিদেশে পাচার হয়ে গেছে। গত দশ বছর কারা ক্ষমতায় ছিলেন, এটা পাঠকমাত্রই জানেন। যেহেতু ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক সরকারের কথাবার্তায় দুর্নীতি দমন প্রসঙ্গে কোনো কথা থাকে না, সেহেতু আমি ধরেই নিচ্ছি দুর্নীতি নামক কর্মযজ্ঞের আরো বৃদ্ধি ঘটবে, আরো ‘পরিপক্বতা’ আসবে, আরো ব্যাপকতা আসবে।
পার্লামেন্ট নির্বাচনের পটভূমি
২০১৮ সালের সবচেয়ে বড় সম্ভাব্য কর্মকাণ্ড হচ্ছে বাংলাদেশের পার্লামেন্ট নির্বাচন। এ প্রসঙ্গে কিছু কথা। পার্লামেন্ট নির্বাচন অতীতেও হয়েছে, ভবিষ্যতেও হবে। ১৯৭৩ সালের মার্চ মাসে বাংলাদেশে প্রথম পার্লামেন্ট নির্বাচন হয়েছিল। এই কলামে স্থানাভাবে ১৯৭৩-এর প্রত্যক্ষ উদাহরণগুলো আনছি না; কিন্তু নির্দ্বিধায় বলতে পারি, ১৯৭৩ সালের তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের আমলের প্রথম নির্বাচনে অনেক পার্লামেন্টারি আসনে ভোট কারচুপি, কেন্দ্র জবরদখল ও ভোটের ফলাফল পাল্টানোর ঘটনা ঘটেছে। এর পরবর্তী বাংলাদেশে সব নির্বাচনেই কম-বেশি এবং বহু উপ-নির্বাচনে, কম-বেশি ভোট কারচুপি, কেন্দ্র জবরদখল ও ভোটের ফলাফল পাল্টানোর ঘটনা ঘটেছে। এরশাদের আমলে ১৯৮৮ সালে বড় কোনো রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণ ব্যতীত শুধু জাতীয় পার্টি ও ‘গৃহপালিত’ কিছু দলকে নিয়ে নির্বাচন হয়েছিল। ১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে তৎকালীন বিরোধী দল নির্বাচনে আসেনি; ক্ষমতাসীন বিএনপি কয়েকটি ক্ষুদ্র দলকে নিয়ে নির্বাচন করেছিল। ২০১৪ সালেও বিরোধী দল নির্বাচনে আসেনি; ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ কয়েকটি ক্ষুদ্র দলকে নিয়ে নির্বাচন করার প্রয়াস পেলেও সফল হয়নি; কিন্তু ২০১৪ সালের জানুয়ারি মাসের ৫ তারিখের নির্বাচনটি বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষ তো বটেই, বিশ্বের সবার দৃষ্টিতে এসেছে। সরকার জোর করে নির্বাচন করিয়েছে এটা যেমন সত্য। তার থেকে বড় সত্য হলো বিশ্রীভাবে, নোংরাভাবে, ‘ন্যাংটোভাবে’, অশোভনভাবে করিয়েছে। বাংলাদেশের সংবিধানের এবং নির্বাচনী বিধিমালার সীমাবদ্ধতার কারণেই ১৫৪ জন অনির্বাচিত এমপির বদান্যতায় সরকার গঠন করে দেশ চালানো হচ্ছে। বাংলাদেশের সংবিধান ও নির্বাচনী বিধিমালা এমনই যে, যদি ৩০০ আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় এমপি নির্বাচিত হন তাহলে সাংবিধানিকভাবে সেটি বৈধ হবে; কিন্তু সেটা অনেক বেশি, সীমাহীনভাবে নোংরা আর ন্যাংটো হবে। ২০১৪ সালে রাজনৈতিক সরকার এবং তৎকালীন বিরোধী দলের মধ্যে উল্লেখযোগ্য আনুষ্ঠানিক সংলাপ হয়নি। কিন্তু শীর্ষতম দ্ইু নেত্রীর মধ্যে সংলাপ হয়েছিল টেলিফোনের মাধ্যমে, যার রেকর্ডকৃত ভার্সন পুরো জাতি শুনেছে সরকারি তৎপরতার কারণে।
চার দশকের নির্বাচনী যন্ত্র ও ষড়যন্ত্র
এখন বিরোধী দলের কথা বলি। একটি আছে কাগজকলমে বিরোধী দল তথা ‘গৃহপালিত’ বিরোধী দল তথা উভচর বিরোধী দলÑ যারা সরকারেও আছে, বিরোধী শিবিরেও আছেন। আরেকটি বিরোধী দল হলো বাস্তবসম্মত বিরোধী দল, জনগণের কাতারের বিরোধী দল, রাজপথের বিরোধী দল। উভচর বিরোধী দল নিয়ে কোনো আলোচনা করছি না; আমি রাজপথের বিরোধী দল নিয়ে আলোচনা করছি। রাজপথের বিরোধী দলের প্রধান শক্তি এবং প্রধান স্তম্ভ বিএনপি। বিএনপিকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে ২০ দলীয় জোট। এই জোটের মধ্যে কিছু আছে নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল এবং কিছু অনিবন্ধিত দল। জন্মলগ্ন থেকেই বিএনপি একটি জনমুখী জনবান্ধব নির্বাচনমুখী রাজনৈতিক দল। বিএনপির সরকারকে হটিয়ে ১৯৮২ সালে মার্চ মাসের ২৪ তারিখ ক্ষমতা দখল করেছিলেন তৎকালীন সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল এরশাদ। তার সরকারকে বৈধতা দেয়ার জন্য ১৯৮৬ সালে আওয়ামী লীগ ও আরো কয়েকটি দল নির্বাচনে অংশ নেয়; বিএনপি যায়নি। ১৯৯৬ সালের মে মাসের ২০ তারিখেও বিএনপি সরকার ক্ষমতায় ছিল না, কিন্তু তাদের মনোনীত প্রেসিডেন্ট ক্ষমতায় ছিলেন। সেই সময় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছিল। সেই তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে বিপদে ফেলার জন্য বা অস্থিতিশীল করার জন্য বা নির্বাচনকে অনিশ্চয়তায় ফেলার জন্য রাজনৈতিক-সামরিক (ইংরেজি পরিভাষায় পলিটিকো-মিলিটারি) প্রেক্ষাপট ও ঘটনাপঞ্জি সৃষ্টি করা হয়েছিল। কিন্তু তৎকালীন প্রেসিডেন্টের দৃঢ় সাংবিধানিক পদক্ষেপের কারণে এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকারের তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টা বিচারপতি মুহাম্মদ হাবিবুর রহমানের কৌশলী ইতিবাচক অনুঘটকীয় ভূমিকার কারণে প্রেসিডেন্ট সাংবিধানিকভাবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পেরেছিলেন। ২০০৬ সালের অক্টোবরে বিএনপির রাজনৈতিক সরকার স্বাভাবিকভাবে অবসরে গেলেও প্রেসিডেন্ট ক্ষমতায় থেকে যান। বিএনপির স্বাভাবিক বিদায়ের পরে তৎকালীন প্রেসিডেন্টের কিছু বিতর্কিত পদক্ষেপের কারণে অথবা বিএনপিবিরোধী রাজনৈতিক-সামরিক কর্মকাণ্ডের প্রেক্ষাপটে ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি বিখ্যাত বা কুখ্যাত ঘটনাটি ঘটে। বিএনপির মনোনীত প্রেসিডেন্ট দৃঢ় সাংবিধানিক পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হন এবং ইতিবাচক অনুঘটকীয় ভূমিকা পালনের জন্য সাংবিধানিকভাবে তার দক্ষিণহস্ত স্বরূপ কেউই না থাকার কারণে, তৎকালীন সেনাবাহিনী প্রধান মইন ইউ আহমেদ ১১ জানুয়ারি ২০০৭ বাস্তবে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখল করেন। জেনারেল মইন ইউ আহমেদের ক্ষমতা গ্রহণের মাধ্যমে পরবর্তী এক বছর সাড়ে এগারো মাস বাংলাদেশ একটি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে চলেছে। সেই জেনারেল মইনের সরকারকে তৎকালীন বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক নেতা এবং বাংলাদেশের বর্তমান (২০০৯-১৭) প্রধানমন্ত্রী বলিষ্ঠ সমর্থন ও উৎসাহ দিয়েছেন। এই বর্ণনার মাধ্যমে উপস্থাপন করছি যে, অতীতের ঘটনাবলিকে মূল্যায়ন করেই রাজপথের বর্তমানের বিরোধী দলকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক কাঠামো কী রকম হবে, তখন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি কী রকম হবে, আগামী দিনের বাংলাদেশের প্রতিরক্ষানীতি কী রকম হবে ইত্যাদি অনেক কিছুই নির্ভর করছে আগামী দিনের পার্লামেন্টের রাজনৈতিক গঠনের ওপর। বাংলাদেশের জনগণের অর্থনৈতিক ভাগ্য, বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনের বর্তমান বিরোধী দলগুলোর ভবিষ্যতের পথরেখা, ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের সম্ভাব্য গন্তব্যস্থল ইত্যাদি নির্ভর করছে পার্লামেন্ট নির্বাচনের ফলাফলের ওপর। অতএব, আগামী পার্লামেন্ট নির্বাচনটি সব মহলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
আঠারো সালের পার্লামেন্ট নির্বাচন
২০১৪ সালের ঘটনাবলিকে নিয়ে আলোচনা-সমালোচনায় পূর্ণ শক্তি ও মনোযোগ দেয়ার সাথে সাথে ভবিষ্যতের দিকে নজর দেয়াটা ও এখন প্রয়োজন। আগামী পার্লামেন্ট নির্বাচনটি সুন্দর শোভন এবং গ্রহণযোগ্য হওয়া বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্য এবং ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের জন্য জরুরি। বেশ কিছু দিন আগে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একটি উক্তি পত্রিকায় শিরোনাম হয়েছিল। সেই উক্তিটি ছিল অনেকটা এ রকম : ‘আগামী পার্লামেন্ট নির্বাচন যেন গ্রহণযোগ্য হয় (তথা যেন অগ্রহণযোগ্য না হয়), আওয়ামী লীগ সেটিই চায়।’ এটা তো গেল দেশ ও সরকারের কথা। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর মুখের কথা ও সরকারের কর্মকাণ্ড এ দুয়ের মধ্যে আকাশ-পাতাল অসামঞ্জস্য আছে। সরকার প্রশাসনের বেশির ভাগ এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বেশির ভাগ অংশকে সরকারের অনুকূলে রাজনীতিকরণ করে ফেলেছে। বর্তমান রাজনৈতিক সরকার, বিরোধী দলকে স্বাধীনভাবে মুক্তভাবে বিভিন্ন অনুষ্ঠান করায় বাধা দিচ্ছে। অর্থাৎ রাজনৈতিক মাঠ ও মিডিয়ার মাধ্যমে প্রচারণা একান্তভাবেই সরকারের কুক্ষিগত।
২০ দলীয় জোটের নির্বাচনী চিন্তা
এই অনুচ্ছেদের বক্তব্য আনুষ্ঠানিকভাবে জোটের বক্তব্য নয়; কলাম লেখকের ব্যক্তিগত মূল্যায়ন মাত্র। ২০০৮ সালে বিএনপি দেশব্যাপী নির্বাচন করেছিল; কিন্তু বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টি ওই পার্লামেন্ট নির্বাচনে ৩৬টি আসনে মাত্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিল। ২০ দলীয় জোটের অন্তর্ভুক্ত অন্যান্য নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলও বিভিন্নসংখ্যক আসনে নির্বাচন করেছিল। কল্যাণ পার্টির নাম নিই বা অন্য কোনো নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের নাম নিই, প্রত্যেকেরই রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ আছে। আমরা ২০ দলীয় জোটের শরিক দলগুলো জোটের প্রতি অনুগত। ২০১৪ সালে নির্বাচন পূর্বকালীন সপ্তাহগুলোতে আমরা আনুগত্যের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছি। আমরা, নিশ্চিতভাবে ভবিষ্যতেও উত্তীর্ণ হবো বলে বিশ্বাস এবং অনুভব করি। কিন্তু একটি রাজনৈতিক কথা প্রচলিত আছে। কথাটি ইংরেজিতে এ রকম : ‘বিজনেস পার্টনারশিপ, পলিটিক্যাল কো-অপারেশন অ্যান্ড ম্যারিটাল রিলেশনশিপ ডিমান্ডস টু-ওয়ে লয়েলটি অ্যান্ড গিভ অ্যান্ড টেক অ্যাকটিভিটি।’ অর্থাৎ ‘ব্যবসায়িক অংশীদারত্বের ক্ষেত্রে, রাজনৈতিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে এবং স্বামী-স্ত্রীর বৈবাহিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে উভয়মুখী বা দ্বিমুখী আনুগত্য প্রয়োজন এবং পারস্পরিক দেয়া-নেয়া প্রক্রিয়াটিই বাস্তবসম্মত।’ তবে এটাও উল্লেখ্য, রাজনৈতিক ক্ষেত্রে সব সময় সব কিছু খোলামেলা বলা যায় না বা উচ্চারণ করা যায় না। বিএনপি একটা আন্দোলনমুখী ও নির্বাচনমুখী দল এবং ২০ দলীয় জোট একটি আন্দোলনমুখী ও নির্বাচনমুখী জোট। আন্দোলনের উদ্দেশ্য, সুষ্ঠু গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের ক্ষেত্র আদায় করা। সে আন্দোলনে রাজপথের নেতৃত্ব অবশ্যই বিএনপির হাতে। বিএনপি চেয়ারপারসন ও জোটনেত্রী বেগম জিয়া এই মুহূর্তে বাংলাদেশের সর্বাধিক জনপ্রিয় ও সর্বাধিক ক্যারিশমেটিক নেত্রী। আমাদের দৃঢ়বিশ্বাস, তিনি অতীতের অভিজ্ঞতাকে ভবিষ্যতের প্রয়োজনের বাস্তবতায় সিক্ত করে একটি গ্রহণযোগ্য মিশ্রণ তৈরি করবেন।
লেখক : মেজর জেনারেল (অব:); চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টি
www.generalibrahim.com

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.