বাঘ-বিধবাদের করুণ জীবন
বাঘ-বিধবাদের করুণ জীবন

বাঘ-বিধবাদের করুণ জীবন

বাসস

বিচিত্র কৃষ্টি-কালচারে পরিপূর্ণ এই পৃথিবী। বিচিত্র মানুষের চিন্তা-চেতনা, মনন-বিশ্বাস। সংস্কৃতি ও সংস্কারের বাইরেও কুসংস্কার আছে বিভিন্ন অঞ্চলে। আমাদের দেশও এর ব্যতিক্রম নয়। আধুনিকতা, ধর্মীয় অনুশাসন ও শিক্ষার অভাবে বিভিন্ন কুসংস্কারে আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছে সুন্দরবন সংলগ্ন জনপদ। তেমনই একটি গল্পের প্রধান চরিত্র সোনামনি।

সুন্দরবন সংলগ্ন এলাকার আলোচিত নারী মুখ এই সোনামনি। ভালোই চলছিল স্বামী-সন্তান নিয়ে সংসার। জীবন-জীবিকার তাগিদে স্বামী নিয়মিত ছুটে চলেন সুন্দরবনে। হঠাৎ একদিন স্বামীকে জীবন দিতে হয় বাঘের আক্রমণে। স্বামীর মৃত্যুর কারণে এক মাসের শিশু সন্তানসহ শাশুড়ি তাড়িয়ে দেন সোনামনিকে। পরে দেবর বিয়ে করে তাকে। একদিন বাঘের আক্রমণে মৃত্যু হয় দ্বিতীয় স্বামীরও মৃত্যু হয়।। এর পর থেকেই ‘অপয়া’, ‘অলক্ষ্মী’, ‘স্বামীখেকো’ অপবাদ মাথায় নিয়েই চলছে সোনামনির জীবন।

আরেক ‘বাঘ-বিধবা’ বুলি দাশী। স্বামী অরুণ মণ্ডল সুন্দরবনের নদীতে মাছ ধরতে গিয়ে বাঘের আক্রমণে নিহত হন। স্বামীর মৃত্যুর তাকেই দায়ী করে নির্যাতন করতে থাকেন শাশুড়ি। এক পর্যায়ে স্বামীখেকো অপবাদ দিয়ে বাড়ি থেকেই তাড়িয়ে দেন।

কুসংস্কারেরই একটি প্রতিচ্ছবি ‘বাঘ-বিধবা’ অপবাদ। বিয়ে-জীবন-মৃত্যু সৃষ্টিকর্তার হাতে। অথচ এ জন্য দায়ী করা হয় অসহায়-অবলা নিষ্পাপ স্ত্রীকে।

একুশ শতকের ডিজিটাল যুগে এসেও বাঘের আক্রমণে নিহত ব্যক্তিদের স্ত্রীদের এমনই পরিণতি বরণ করতে হচ্ছে সুন্দরবনের আশপাশের এলাকাগুলোতে। সাতক্ষীরা জেলার শ্যামনগর উপজেলার মুন্সিগঞ্জ এলাকায় গিয়ে এমনই চিত্র দেখা গেছে। কথা হয়েছে কয়েকজন ‘বাঘ-বিধাবা’র সাথে। তারা বলেছেন, অনেক ক্ষেত্রে জীবিত থেকেও মৃতের মতো জীবন কাটাতে হচ্ছে তাদের।

সুন্দরবন নিয়ে কাজ করা ব্যক্তি ও সংস্থাগুলো বলছে, সুন্দরবনকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন ধরনের কুসংস্কার লালন-পালন করে আসা স্থানীয়দের মধ্যে এখন বন্যতা খানিকটা হলেও কমেছে।

সরেজমিন দেখা যায়, সুন্দরবন সংলগ্ন এলাকার আলোচিত মুখ সোনামনির দুই স্বামীকে জীবন দিতে হয়েছে বাঘের আক্রমণে। তার মুখ দেখলে তাই কেউ শুভ কাজে বের হয় না বলে জানান তিনি। সোনামনি বলেন, ‘১৯৯৯ সালে আমার স্বামীকে বাঘে ধরে নিয়ে যায়। সে কারণে কোলের এক মাস বয়সী সন্তানসহ আমার শাশুড়ি আমাকে তাড়িয়ে দেন। তখন আমাকে সন্তান নিয়ে পথে পথে ঘুরতে হয়েছে। পরে আমার দেবর আমাকে বিয়ে করে। ২০০৩ সালে তাকেও বাঘে ধরে। এরপর থেকেই আমাকে ‘অপয়া’, ‘অলক্ষ্মী’, ‘স্বামীখেকো’ অপবাদ মাথায় নিয়ে থাকতে হয়। কোনো অনুষ্ঠানে দাওয়াত দিলেও খেতে দেয় সবার শেষে।’

সোনামনি আরো বলেন, ‘সকালে উঠে যেন আগে আমার মুখ দেখতে না হয়, তাই শাশুড়ি আমাকে শেকল দিয়ে বেঁধে রাখেন। এ জীবন তো মৃত্যুর মতোই। স্বামী গেল বাঘের পেটে, আমাকেও মেরে রেখে গেল।’
আরেক ‘বাঘ-বিধবা’ বুলি দাশী বলেন, ‘আমার স্বামী অরুণ ম-ল ২০০২ সালে সুন্দরবনের নদীতে মাছ ধরতে গিয়ে বাঘের আক্রমণে নিহত হন। এর জন্য আমাকেই দায়ী করে নির্যাতন করতে থাকেন শাশুড়ি। একপর্যায়ে বাড়ি থেকেই তাড়িয়ে দেন। আমার বাবা মারা গেছে অনেক আগেই। তাই ভাইয়ের বাড়ি গিয়ে ওঠি। কিন্তু ভাইও তো গরিব, তাই নদীতে রেণুপোনা ও কাঁকড়া ধরে সংসার চালাতে শুরু করি। এভাবেই ছেলেমেয়েদের বড় করেছি।’

বুলি দাশী আরো বলেন, ‘আমার মতো এমন অনেক মেয়ে আছে, যাদের স্বামী বাঘের হাতে মারা যাওয়ার পর তাদের অপয়া বলে তাড়িয়ে দেয়া হয়েছে। আমার স্বামীর ছোট ভাইও বাঘের আক্রমণে মারা যায়। তার বউ দিপালীকেও বাপের বাড়ি তাড়িয়ে দেয়া হয়েছে।’

শাহিদা খাতুন নামে আরেক ‘বাঘ-বিধবা’ জানালেন, তাকেও তাড়িয়ে দেয়া হয়েছে শ্বশুর বাড়ি থেকে। নদীতে জাল টেনে আর অন্যের বাড়িতে ঝিয়ের কাজ করে সংসার চালান এই নারী।

সুন্দরবনের আশপাশের এলাকায় বসবাসরত ‘বাঘ-বিধবা’দের সামাজিক মর্যাদা ও পুনর্বাসন নিয়ে কাজ করছে অনির্বাণ, দুর্জয়, জাগ্রত বাঘ বিধবা, নারী সংগঠন লিডার্স প্রভৃতি। এসব সংগঠনও বলছে, তারা বিধবাদের নিয়ে কাজ করলেও তাতে পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে খুবই ধীরে।

বেসরকারি সংস্থা লিডার্সের তথ্য অনুযায়ী, ২০০১ সাল থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত ১০ বছরে বাঘের আক্রমণে মারা গেছে পাঁচ শতাধিক বন জীবী। ২০১২ সাল থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত বাঘের আক্রমণে কারো নিহত হওয়ার খবর পাওয়া যায়নি। অন্যদিকে ২০১৭ সালে তিনজন নিহত ও একজন আহত হওয়ার খবর জানা গেছে। আর সুন্দরবন সংলগ্ন এলাকায় প্রায় এক হাজার ৫০০ ‘বাঘ-বিধবা’ নারী রয়েছেন বলে জানিয়েছেন লিডার্সের কর্মকর্তা মোহন কুমার মণ্ডল।

তবে সরকারি হিসাবে সুন্দরবনে বাঘের হামলায় প্রাণ হারানো মানুষের সংখ্যা অনেক কম। কারণ হিসেবে সুন্দরবন নিয়ে কাজ করা সংস্থাগুলো বলছে, মধু সংগ্রহ বা মাছ ধরার মতো কাজে যারা সুন্দরবনে যান, তাদের অনেকে সরকারি নিয়ম অনুসরণ করেন না। অনেকেই অন্যের পাস ব্যবহার করে প্রবেশ করেন সুন্দরবনে। তারা সুন্দরবনে বাঘের আক্রমণে মারা গেলেও তাদের নাম সরকারি হিসাবে ওঠে না।
সুন্দরবন বিশেষজ্ঞ পিযুশ বাউলিয়া পিন্টু বলেন, ‘সুন্দরবনে প্রবেশের আগে বনজীবীরা বন বিবির পূজা করে। এর বাইরেও তাদের মধ্যে আরো অনেক কুসংস্কারই আছে। যেমন- কারো স্বামী সুন্দরবনে গেলে সেই নারী অন্য পুরুষের সাথে কথা বলতে পারেন না, চুল আঁচড়াতে পারেন না, শরীরে তেলও মাখতে পারেন না। বিভিন্ন ধরনের সচেতনতা কার্যক্রমে এসব কুসংস্কার অনেকটা কমেছে। তবে এখনো অনেক পরিবার এসব কুসংস্কার মেনে চলে।’

পিন্টু আরো বলেন, ‘বাঘের হামলায় নিহত হলে পারিবারকে এক লাখ টাকা ও আহত হলে চিকিৎসার জন্য ৫০ হাজার টাকা দেয়ার সরকারি নিয়ম আছে। কিন্তু অনেকেই অন্যের নামের পাস নিয়ে বনে যান। তাদের জন্য সরকারি কোনো সুবিধা নেই।’

তবে ‘বাঘ-বিধবা’দের পরিস্থিতি খানিকটা বদলেছে বলে জানালেন স্থানীয় মুন্সিগঞ্জ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. আবুল কাশেম মোড়ল। তিনি বলেন, ‘আমাদের এলাকার মানুষের শিক্ষার হার অনেক কম ছিল। আগে স্বামীকে বাঘে ধরলে তার দোষ স্ত্রীর ওপর চাপিয়ে তাকে বাধ্যতামূলকভাবে শ্বশুর বাড়ি থেকে বের করে দেয়া হতো। এখন পরিস্থিতি অনেকটাই বদলেছে। এমন ঘটনার কথা এখন আর শোনা যায় না।’
সবশেষে বলতে হয়, ধর্মীয় অনুশাসন মেনে না চলা ও শিক্ষার অভাবে কুসংস্কার দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। সামাজিক সচেতনতা ও আধুনিক জীবন যাপনে অভ্যস্থ হয়ে ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চললে কুসংস্কার থেকে বেরিয়ে আসা সম্ভব।
আলম শামস

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.