বরিশাল-ঢাকা রুটে লঞ্চের কেবিনের টিকিট দালালদের দখলে
বরিশাল-ঢাকা রুটে লঞ্চের কেবিনের টিকিট দালালদের দখলে

বরিশাল-ঢাকা রুট : লঞ্চের যায় কোথায়?

আযাদ আলাউদ্দীন বরিশাল ব্যুরো

ঢাকা-বরিশাল রুটের লঞ্চের কেবিনের টিকিট দালাল ও অসাধু লঞ্চ কর্মচারীদের হাতে চলে যাওয়ায় টিকিট পেতে দক্ষিণাঞ্চলের যাত্রীদের ১২ মাসেই চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। লঞ্চমালিকেরা ইচ্ছেমতো তাদের আত্মীয়স্বজন, শুভাকাক্সক্ষী ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের কেবিনের টিকিট দিয়ে থাকেন। অবশিষ্ট টিকিট চলে যায় লঞ্চের কর্মচারী ও দালালদের হাতে। সাধারণ যাত্রীদের কেবিনের এসব টিকিট কালোবাজারির মাধ্যমে নির্ধারিত দামের অনেক বেশি দিয়ে কিনতে হয়।

একাধিক যাত্রী জানান, লঞ্চের কেবিনের টিকিট পেতে যোগ্যতা লাগে। যোগ্যতা না থাকলে টিকিট মিলছে না। নগরীর প্রভাবশালী ব্যক্তি কিংবা তার আত্মীয়, প্রশাসনের কর্মকর্তা হলে অনায়াসেই মিলছে লঞ্চের টিকিট। এ ব্যাপারে লঞ্চ কর্তৃপক্ষের দাবি, যাত্রীর সংখ্যা অনুযায়ী কেবিন না থাকায় সবাইকে টিকিট দেয়া যাচ্ছে না। যাত্রীদের দাবি, মালিক পক্ষের অবৈধ রোটেশন প্রথার কারণেই লঞ্চের টিকিট নিয়ে দালাল ও লঞ্চ কর্মচারীরা যাত্রীদের জিম্মি করে রেখেছে। এ ছাড়া সরকারিভাবে কোনো মনিটরিং না থাকায় লঞ্চের টিকিট যাচ্ছে দালালের হাতে। ফলে বৈধভাবে সাধারণ যাত্রীরা টিকিট পাচ্ছেন না।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে কেবিনের টিকিট কালোবাজারে বিক্রি করা দালালেরা জানান, লঞ্চ মালিক, প্রশাসন, প্রভাবশালী ব্যক্তি ও সাংবাদিকদের সাথে সম্পর্ক রেখেই তারা দীর্ঘ দিন ধরে এ ব্যবসা করে আসছেন। দালালদের বিরুদ্ধে সব সময় নীরব ভূমিকা পালন করছে নৌপুলিশ। তাদের সামনেই এসব দালাল তাদের ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে।

সূত্র মতে, ঢাকার সাথে দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের যাতায়াতের প্রধান মাধ্যম নৌপথ। বিশেষ করে অসুস্থ রোগী সড়কের পরিবর্তে লঞ্চে বরিশাল থেকে ঢাকায় যাতায়াত করেন। এ কারণেই লঞ্চের টিকিট নিয়ে সক্রিয় রয়েছে একটি শক্তিশালী দালাল চক্র।

ঢাকা-বরিশাল রুটে চলাচলকারী উল্লেখযোগ্য লঞ্চগুলোর মধ্যে অন্যতম মেসার্স রাবেয়া শিপিং কোম্পানির পারাবাত, মেসার্স সুন্দরবন নেভিগেশন কোম্পানির সুন্দরবন, মেসার্স স্টার নেভিগেশন কোম্পানির সুরভী, টিপু কোম্পানির এমভি টিপু এবং সালমা শিপিং লাইনসের এমভি কীর্তনখোলা। এসব লঞ্চের মধ্যে পারাবাত লঞ্চের কেবিনের ৮০ ভাগ টিকিট দালালের হাতে চলে যায় লঞ্চের কেরানি, বুকিং কাউন্টারের বুকিং ক্লার্ক, লঞ্চ ম্যানেজার ও সুপারভাইজারের মাধ্যমে। বাকি কেবিনগুলো প্রশাসন, প্রভাবশালী ব্যক্তি ও মালিক পক্ষের লোকজন পাচ্ছেন।

টিপু ও ফারহান লঞ্চের কেবিনও একইভাবে দালালদের হাতে চলে যাচ্ছে। এসব কেবিনের টিকিট দুই থেকে তিন গুণ বেশি দামে দালালের কাছ থেকে কিনে নিতে হয় সাধারণ যাত্রীদের। এ ছাড়া লঞ্চ স্টাফদের যোগসাজশে বিলাসবহুল সুন্দরবন, সুরভী ও কীর্তনখোলা লঞ্চের কেবিনের টিকিটও মিলছে দালালের কাছে। মাঝে মধ্যে সরকারি-বেসরকারি কোটার কেবিনগুলোও কর্মচারীদের সাথে যোগসাজশ করে কিনে নেয় দালালেরা।

দালালদের দাবিÑ বর্ষা মওসুম, এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার সময় লঞ্চের কেবিনের চাহিদা থাকে কম। ওই সময় তারা লঞ্চের কেবিন বিক্রি করে লঞ্চ মালিকদের সহায়তা করে থাকেন। এ কারণেই মূলত মালিক পক্ষ তাদের লঞ্চের কেবিন দিয়ে থাকেন। তবে তাদের এ দাবি অস্বীকার করেছেন লঞ্চ মালিকেরা।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, লঞ্চের টিকিট কালোবাজারিদের মধ্যে অন্যতম লেদু (দালাল)। তিনিই মূলত লঞ্চের টিকিট কালোবাজারি শুরু করেছেন। এরপর এ কাজের সাথে যুক্ত হয়েছেন দালাল হাসেম, পারাবাত লঞ্চের স্টাফ সাগর, কলম্যান জসিম, সেলিম, বসির, কলম্যান ফজলা, খোকন, কালামখান লঞ্চের কলম্যান আলাউদ্দিন, মোশাররফ, জাহাঙ্গীর ও ইমাম, টিপু লঞ্চের কলম্যান দুলাল, খালেক, সুন্দরবন লঞ্চের কলম্যান জাহিদ, কবির হোসেনসহ অনেকে। তবে লেদু, হাসেম, জসিম ও সেলিমই বর্তমানে এ চক্রটি নিয়ন্ত্রণ করছেন।

দালাল হাসেম জানান, তাদের কাছ থেকে পুলিশ প্রশাসন থেকে শুরু করে সবাই টিকিট নিয়ে থাকেন। তারা সবাইকে খুশি করেই লঞ্চঘাটে এ কাজ করছেন।

সূত্র মতে, এসব দালাল টিকিট কালোবাজারি করে বরিশাল লঞ্চ টার্মিনাল এলাকায় বসে। এদের কাছে কাউকে পাঠিয়ে দিলেও পাওয়া যায় লঞ্চের কেবিনের টিকিট নামের সোনার হরিণ।
সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, লঞ্চ কর্তৃপক্ষ সিঙ্গেল কেবিনের টিকিটের মূল্য নির্ধারণ করেছে ৯০০ থেকে এক হাজার টাকা আর ডাবল কেবিন ১৮০০ থেকে দুই হাজার টাকা। কিন্তু সেই টিকিট দালালের কাছ থেকে সিঙ্গেল কেবিন দুই থেকে দুই হাজার ৫০০ টাকা ও ডাবল তিন হাজার থেকে চার হাজার ৫০০ টাকায় কিনতে হচ্ছে সাধারণ যাত্রীদের।

নগরীর ফজলুল হক এভিনিউ এলাকায় মেসার্স সুন্দরবন নেভিগেশন কোম্পানির টিকিট বুকিং কাউন্টারের সামনে একাধিক যাত্রী বলেন, লঞ্চের কেবিনের টিকিট পেতে হলেও যোগ্যতা লাগে। যোগ্যতা না থাকলে টিকিট মিলবে না। নগরীর প্রভাবশালী ব্যক্তি কিংবা তার আত্মীয়, প্রশাসনের কর্মকর্তা না হলেও বুকিং কাউন্টারগুলো থেকে সাধারণ যাত্রীরা লঞ্চের কেবিনের টিকিট পাচ্ছেন না। তাই বাধ্য হয়েই দালালের কাছে ধর্ণা দিতে হচ্ছে সাধারণ যাত্রীদের।

গত শনিবার কেবিনের একটি টিকিট হন্য হয়ে খুঁজছিলেন লঞ্চ টার্মিনালে আসা ব্যবসায়ী রেজাউল। তিনি বলেন, বরিশাল থেকে তার স্বজনেরা ঢাকায় যাবেন। তাই কেবিনের টিকিটের জন্য দুই দিন আগে থেকে কাউন্টারগুলোতে ঘুরেও টিকিট মেলেনি। বুকিং কাউন্টারগুলো থেকে জানিয়ে দেয়া হয়েছে, সব টিকিট বিক্রি হয়ে গেছে। তিনি আরো বলেন, কালোবাজারি হাসেমের কাছে ডাবল এবং সিঙ্গেল দুই শ্রেণীর কেবিনের টিকিটই পেয়েছি। কিন্তু একটি সিঙ্গেল কেবিনের টিকিটের দাম নিয়েছে তিন হাজার টাকা।

অপর দিকে ঢাকা-বরিশাল রুটে রোটেশন পদ্ধতির বিষয়ে রয়েছে যাত্রীদের নানা অভিযোগ। এ পদ্ধতি বাতিলের দাবিতে বিভিন্ন সময় মানববন্ধন থেকে শুরু করে বিভিন্ন কর্মসূচি পালিত হলেও বিআইডব্লিউটিএ সমস্যা সমাধানে কার্যকরী কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করেন নি বলে এ রুটে নিয়মিত চলাচলকারী যাত্রীরা অভিযোগ করেন।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে লঞ্চ মালিক সমিতির একাধিক সদস্য জানান, রোটেশন পদ্ধতি সম্পূর্ণ বিআইডব্লিউটির ব্যাপার। যদি তারা আমাদের ডাকে তবে অবশ্যই আমরা তাদের সাথে বসে এ সমস্যা সমাধান করব। এ ব্যাপারে বিআইডব্লিউটির বরিশাল জোনের উপপরিচালক আজমল হোসেন মিঠু সরকার বলেন, কালোবাজারিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেয়া হবে। বরিশাল নৌপুলিশের এএসপি মোতালেব হোসেন বলেন, দালালের বিরুদ্ধে লিখিত কোনো অভিযোগ পেলে অবশ্যই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.