ঢাকা, বুধবার,১৭ জানুয়ারি ২০১৮

ক্রিকেট

জরিমানায় কত টাকা হাতছাড়া হয়েছে সাব্বিরের

নয়া দিগন্ত অনলাইন

০২ জানুয়ারি ২০১৮,মঙ্গলবার, ১২:২৯ | আপডেট: ০২ জানুয়ারি ২০১৮,মঙ্গলবার, ১২:৫৪


প্রিন্ট
সাব্বির রহমান (ফাইল ফটো)

সাব্বির রহমান (ফাইল ফটো)

সাব্বির রহমানের ওপর কঠোর না হয়ে উপায় ছিল না বিসিবির। একের পর এক নেতিবাচক ঘটনার জন্ম দিচ্ছিলেন তিনি। কখনো নারীঘটিত কারণে, আবার কখনো অ্যাম্পায়ারের সাথে বাজে আচরণ আর সবশেষ দর্শককে মারধর। যার ফল বিসিবির কেন্দ্রীয় চুক্তি থেকে বহিস্কার, ২০ লাখ টাকা জরিমানা এবং ছয় মাস ঘরোয়া ক্রিকেটে নিষিদ্ধ।

এই শাস্তির কারণে নতুন মৌসুমে বাংলাদেশ ক্রিকেট লিগ (বিসিএল) এবং ঢাকা প্রিমিয়ার লিগের খেলতে পারবেন না সাব্বির। এতে বড় অঙ্কের টাকা হাতছাড়া হবে সাব্বিরের। গত দুই বছরে শুধু জরিমানাই গুনেছেন প্রায় সাড়ে ৩৩ লাখ টাকা!

২০১৬ বিপিএলে গুরুতর শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগ উঠেছিল সাব্বিরের বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় বিসিবি তাকে ১২ লাখ টাকা জরিমানা করেছিল। এবার বিপিএলে সাব্বির খেলেছেন সিলেট সিক্সার্সের হয়ে। নিজেদের তৃতীয় ম্যাচ শেষে হাত মেলানোর সময় আম্পায়ার মাহফুজুর রহমানকে গালি দিয়েছিলেন সাব্বির। এ জন্য ম্যাচ ফির ৪০ শতাংশ জরিমানা করা হয়েছিল। জরিমানার অঙ্কটা ছিল প্রায় দেড় লাখ টাকা।

টানা দুই বিপিএলে দুটি বিতর্কিত ঘটনায় সাব্বিরের মোট জরিমানা সাড়ে ১৩ লাখ টাকা। এবার কিশোর পেটানোর জরিমানা যোগ করলে মোট অঙ্ক দাঁড়ায় প্রায় সাড়ে ৩৩ লাখ টাকা। এটা তো শুধুই জরিমানার অঙ্ক, সব মিলিয়ে সাব্বিরের হাতছাড়া হচ্ছে প্রায় কোটি টাকা!

বিসিএলে সাব্বির যদি ছয় ম্যাচও খেলতেন, সেখান থেকে আয় হতো প্রায় দুই লাখ টাকা।

ঢাকা প্রিমিয়ার লিগে এক মৌসুম থেকে আয় করতেন প্রায় ৪০ লাখ টাকা।

বিসিবির কেন্দ্রীয় চুক্তিতে ‘বি’ ক্যাটাগরিতে মাসিক দুই লাখ টাকা বেতন পান সাব্বির। বিসিবির পরবর্তী বোর্ড সভায় কেন্দ্রীয় চুক্তি থেকে ছাঁটাইয়ের সিদ্ধান্ত হলে এক বছরে লোকসান হবে ২৪ লাখ টাকা।

বিসিএল, প্রিমিয়ার লিগ ও কেন্দ্রীয় চুক্তি- সব মিলিয়ে অঙ্কটা প্রায় ৬৬ লাখ টাকা।

এর সাথে গত দুই বছরে সাব্বিরের জরিমানা (প্রায় ৩৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা) যোগ করলে অঙ্কটা দাঁড়ায় প্রায় ৯৯ লাখ ৫০ হাজার টাকা!

ব্যাটিংয়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অসাধারণ কোনো কীর্তি না থাকলেও শৃঙ্খলাভঙ্গে একটি রেকর্ড আছে সাব্বিরের। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে প্রথম ‘ডিমেরিট পয়েন্ট’ পাওয়া ক্রিকেটার তিনিই। নামের পাশে তিন ডিমেরিট পয়েন্ট পাওয়া সাব্বির এ বছরের অক্টোবরের মধ্যে আরেক পয়েন্ট পেলেই নিষিদ্ধ হতে পারেন নির্দিষ্টসংখ্যক ম্যাচে। এ নিষেধাজ্ঞা থেকে কিন্তু জরিমানা দিয়েও পার পাবেন না সাব্বির!

সাব্বিরের জন্য কঠোর শাস্তির সুপারিশ

সাব্বিরের জন্য বেশ কঠোর শাস্তির সুপারিশ এসেছে বিসিবির কাছে। বারবার সর্তক করার পরও ক্রিকেটাররা যখন বিষয়গুলো আমলে নেন না তখন বিসিবিকে কঠোর হতে হলো। বিসিবির কেন্দ্রীয় চুক্তি থেকে বহিষ্কার, কুড়ি লাখ টাকা জরিমানা ও ৬ মাস ঘরোয়া ক্রিকেট থেকে বাদ। একজন কিশোর দর্শককে লাঞ্ছিত করার অপরাধে এমন শাস্তির সুপারিশ তার জন্য। এটা শুধু সাব্বিরের জন্য শাস্তিই নয়, অন্য ক্রিকেটারদের জন্যও দৃষ্টান্ত। খেলা চলাকালে গ্যালারিতে মারধরের মতো অপরাধ আরো বড় ক্রিকেটারও ঘটিয়েছেন। তাদেরও বিষয়গুলো মিটমাট হয়েছে অন্যভাবে। এমন বড় শাস্তি তাদের হয়নি। তবে বারবার এমন ঘটনায় বিরক্ত বিসিবিও। ফলে অমন কঠোর মনোভাব দেখালেন তারা এবার।

সাব্বিরকে অমন শাস্তির পাশাপাশি মৌখিকভাবে যে সতর্ক বার্তা তার জন্য সেটি হলো এরপর আবারো এমন হলে আজীবনের নিষেধাজ্ঞা পেতে হবে তাকে। বিসিবির আগামী বোর্ড সভায় বিষয়গুলোর অনুমোদন মিললে সুপারিশকৃত শাস্তি শুরু হয়ে যাবে। তবে বিসিবি ডিসিপ্লিন কমিটির সিদ্ধান্তকে যেহেতু ফেলে দেবে না, তাই ধরেই নেয়া যায় শাস্তি তার বহাল থাকবে ওই সভাতেও।

তবে সাব্বির এবার যা করেছেন, তা একজন ক্রিকেটারের জন্য ঔদ্ধত্যপনা ছাড়া আর কিছু নয়। খেলা চলাকালে আম্পায়ারের কাছ থেকে বিশ্রামের কথা বলে মাঠের মধ্যে বসেই দর্শক লাঞ্ছিত। এরপর ওই ঘটনার জের ধরে আম্পায়ারকে শাসানো ও ম্যাচ রেফারিকে হুমকি-ধমকি। শাস্তি যথাযোগ্যই হলো।

দর্শকের অভাবে ফুটবল আজ শেষ হয়ে যেতে বসেছে। হকিসহ অন্য কোনো খেলাতেই দর্শকেরা মাঠে যায় না। এটা ওইসব খেলার জন্য ‘অভিশাপ’স্বরূপ। সেখানে ক্রিকেট মাঠে দর্শক আসার অর্থ ক্রিকেটের জন্য আশীর্বাদও। জনপ্রিয়তার জন্যই স্পন্সর আসছে। আগ্রহ বাড়ছে, কদর বাড়ছে ক্রিকেটের। ক্রিকেট এগিয়ে যাওয়ার পেছনে দর্শকদের ভূমিকা অনেক। সে দর্শককে মাঠেই লাঞ্ছিত করা ক্রিকেটকেই অসম্মানস্বরূপ। বিসিবি বিষয়টি উপলব্ধি করেই শাস্তির অনুমোদন দিয়েছে। গতকাল সভাপতি নাজমুল হাসান পাপন নিজেই জানান দেন এ তথ্য।

ঘটনা ঘটেছে গত ২২ ডিসেম্বর জাতীয় ক্রিকেট লিগের খেলায় রাজশাহী ও ঢাকা মেট্রোর মধ্যকার ম্যাচে। সাব্বির মাঠে নামার সময় তার ঘোলাটে চোখ উদ্দেশ করে একজন দর্শক ‘মিঁয়াও’ সম্বোধন করেন। সাব্বিরের কানে সে শব্দ যাওয়ার পর থেকে কিশোর ওই দর্শককে চোখে চোখে রাখেন তিনি। খেলার মাঝেই এক ওভারের জন্য বিশ্রাম চেয়েই ফিরে ওই দর্শককে ডেকে এনে সাইট স্ক্রিনের পাশে লাঞ্ছিত করেন সাব্বির।

জানা গেছে, সাব্বির তাকে চড়থাপ্পড় মেরেছেন। এমন ঘটনা আম্পায়ারদের কানে যায় এবং ম্যাচ রেফারিও অবহিত হন। একই সময়ে ড্রেসিং রুমের সামনে বসে মোবাইল ফোনে কথা বলেন সাব্বির। খেলাচলাকালে যেটিও নিষিদ্ধ একজন ক্রিকেটারের জন্য। সব ঘটনার ব্যাপারেই ম্যাচ রেফারি তাকে তলব করলে সেখানে আম্পায়ার ও ম্যাচ রেফারিকে হুমকি-ধমকি দেন তিনি। বিষয়টি লিখিত আকারে বিসিবির ক্রিকেট পরিচালনা বিভাগে জানানোর পর সেটা ডিসিপ্লিনিারি কমিটিতে যায়। সেখান থেকেই অমন শাস্তির সুপারিশ যায় বিসিবির কাছে। বিসিবি যা অনুমোদন করে দেয়।

সাব্বিরের জন্য এমন ঘটনা নতুন নয়। আগের দুই বিপিএলেও একবার আম্পায়ারের সাথে বিবাদে জড়ানো ও আরেকবার নারীঘটিত কারণে বিপুল অর্থ জরিমানা গুনতে হয়েছিল; কিন্তু এরপরও তার বোধোদয় না হওয়ায় বিসিবি এবার কঠোর হয়েছে। ডিসিপ্লিন কমিটি থেকে এবারই তার জন্য শেষ সুযোগ বলেও জানিয়ে দিয়েছে। পরের বার এমন ঘটনা মানেই আজীবনের জন্য নিষেধাজ্ঞার কবলে পড়বেন বলে সুপারিশে উল্লেখ করা হয়েছে।

সাব্বিরের নামের পাশে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটেও তিনটি ‘ডিমেরিট’ পয়েন্ট রয়েছে। অখেলোয়াড়সুলভ আচরণের জন্য অমন পয়েন্ট পেতে হয় ক্রিকেটারদের। ঘরোয়া ক্রিকেট থেকে ছয় মাসের নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হলে সাব্বির বিসিএল ও প্রিমিয়ার ডিভিশন ক্রিকেট লিগ খেলতে পারবেন না। সেখানেও বিশাল আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়বেন এ ক্রিকেটার। ক্যারিয়ারের জন্যও এটা বিশাল চ্যালেঞ্জ। কারণ জাতীয় দলের স্থান কারো জন্য স্থায়ী নয়। তুমুল প্রতিযোগিতা। সাব্বির যদি এ কারণে একবার পেছনে চলে যান, তাহলে ওই স্থানে ফিরতে তাকে অনেক কাঠ-খড় পোড়াতে হবে। সব মিলিয়ে সাব্বিরের জন্য বিষয়টি হয়ে গেল বড় এক দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫