ঢাকা, বৃহস্পতিবার,২১ মার্চ ২০১৯

শেষের পাতা

সুপ্রিম কোর্ট দিবসে বাণী

হস্তক্ষেপমুক্ত বিচার বিভাগ চান জ্যেষ্ঠ আইনজীবীরা

নিজস্ব প্রতিবেদক

০২ জানুয়ারি ২০১৮,মঙ্গলবার, ০০:০০


প্রিন্ট

সুপ্রিম কোর্ট দিবস পালনের মধ্য দিয়ে নতুন বছর শুরু করছে দেশের সর্বোচ্চ আদালত। অবকাশ শেষে আজ মঙ্গলবার খোলার দিন সুপ্রিম কোর্ট দিবস ২০১৭ পালন করা হবে। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে ভাষণ দেবেন রাষ্ট্রপতি মো: আবদুল হামিদ।
গতকাল গণমাধ্যমকে এ তথ্য জানিয়েছেন হাইকোর্ট বিভাগের স্পেশাল অফিসার মোহাম্মদ সাইফুর রহমান।
তিনি বলেছেন, সংবিধান অনুযায়ী সুপ্রিম কোর্ট ১৯৭২ সালের ১৮ ডিসেম্বর প্রথম কার্যক্রম শুরু করে। এর পরিপ্রেক্ষিতে প্রতি বছর সুপ্রিম কোর্টের প্রথম কার্যদিবসকে সুপ্রিম কোর্ট দিবস হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। ১৮ ডিসেম্বর সুপ্রিম কোর্টের পূর্ব নির্ধারিত ছুটি থাকায় প্রথম কার্যদিবস (ছুটির পরে) ২ জানুয়ারি দিবসটি উদযাপিত হবে।
এতে সুপ্রিম কোর্টের উভয় বিভাগের বিচারপতি, অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি, আইনজীবী ও বিশিষ্ট ব্যক্তির অংশগ্রহণে জাজেস স্পোর্টস কমপ্লেক্সে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হবে। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি রাষ্ট্রপতি। বিশেষ অতিথি থাকবেন আইনমন্ত্রী আনিসুল হক।
এতে সভাপতিত্ব করবেন প্রধান বিচারপতির কার্যভার পালনরত বিচারপতি মো: আবদুল ওয়াহহাব মিঞা। অনুষ্ঠানে আরো বক্তব্য রাখবেন সুপ্রিম কোর্ট দিবস উদযাপনসংক্রান্ত জাজেস কমিটির সভাপতি আপিল বিভাগের বিচারপতি মির্জা হোসেইন হায়দার। শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখবেন অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম, বার কাউন্সিলের ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল বাসেত মজুমদার ও সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি জয়নুল আবেদীন এবং আইনজীবী নেতারা। বেলা ২টায় অনুষ্ঠান শুরু হবে। গত ২৫ অক্টোবর দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি মো: আবদুল ওয়াহহাব মিঞার সভাপতিত্বে সুপ্রিম কোর্টের ফুলকোর্ট সভায় এ সিদ্ধান্ত হয়।
এ দিকে সুপ্রিম কোর্ট দিবস পালনের উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে দিনটিকে স্মরণীয় করে রাখতে বিচার বিভাগের উপরে নির্বাহী বিভাগের আধিপত্য ও হস্তক্ষেপমুক্ত একটি পরিবেশ তৈরির আহ্বান জানিয়েছেন দেশের বিশিষ্ট আইনজীবী ও সংবিধান বিশেষজ্ঞরা। সুপ্রিম কোর্ট দিবস উপলক্ষে গতকাল এক বাণীতে এ আহ্বান জানানো হয়। বাণী দেয়া আইনজীবীরা হলেন সংবিধান প্রণেতা ড. কামাল হোসেন, ব্যারিস্টার রফিক-উল হক, ব্যারিস্টার এম আমীর-উল ইসলাম, সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন, সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল এ এফ হাসান আরিফ ও ফিদা এম কামাল।
বাণীতে বলা হয়, মাসদার হোসেন মামলার রায়ের মাধ্যমে অধস্তন আদালতকে নির্বাহী বিভাগ থেকে পৃথকীকরণের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ আদালতের দিকনির্দেশনা বাস্তবায়নের মাধ্যমে নির্বাহী বিভাগ সংবিধান ও সর্বোচ্চ আদালতে রায়ের প্রতি সম্মান দেখাবেন বলে আশা করেন তারা।
এতে বলা হয়, এমন একটা সময়ে দিবসটি পালিত হচ্ছে যখন এ দেশের বিচার বিভাগের অভিভাবক প্রধান বিচারপতির পদ শূন্য। এ উপলক্ষে আমরা বাংলাদেশের সংবিধানের অখণ্ডতা রক্ষা, সমর্থন ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, এ দেশের নাগরিকদের সব মৌলিক অধিকার বলবৎ করার আদেশ বা নির্দেশ, সব নাগরিকের জন্য আইনের শাসন, মৌলিক মানবাধিকার এবং রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সাম্য, স্বাধীনতা ও সুবিচার প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকারের পাশাপাশি সংবিধানের যেকোনো অংশের সাথে সঙ্গতিহীন কোনো আইন বা সরকারি বিধি বা আদেশ যা সংবিধানের সাথে সাংঘর্ষিক এমন কোনো প্রশ্ন কিংবা জনগুরুত্বপূর্ণ কোনো বিষয়ে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের গুরুত্বপূর্ণ রায় ও ঐতিহ্য গর্বের সাথে স্মরণ করছি।
এ ক্ষেত্রে সুপ্রিম কোর্টের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি রায় ঐতিহাসিক গুরুত্ব বহন করে, যা আমরা উল্লেখ করতে পারি : (ক) ৭টি বিভাগীয় শহরে হাইকোর্টের স্থায়ী বেঞ্চ গঠনের বিষয়ে প্রণীত সংবিধানের অষ্টম সংশোধনী বাতিল সংক্রান্ত রায়, (খ) সামরিক ফরমান সংক্রান্ত সংবিধানের ৫ম সংশোধনী বাতিলের রায়, (গ) চট্টগ্রাম বন্দর বিদেশী কোম্পানিকে ১০০ বছরের জন্য লিজ প্রদান বাতিল সংক্রান্ত রায়, (ঘ) ২০০৭ সালের ১,৪০,০০,০০০ ভুয়া ভোটার বাতিলসংক্রান্ত রায় এবং (ঙ) সাম্প্রতিক সময়ে সংসদ কর্তৃক সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি অপসারণ সংক্রান্ত সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী অবৈধ ঘোষণা ও বাতিলের রায়সহ জনস্বার্থে দেয়া অসংখ্য রায় বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। উল্লিখিত রায়সমূহের মাধ্যমে এটাই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে যে, জনগণের অধিকার রক্ষার্থে সংবিধানের মৌলিক কাঠামো ও ভারসাম্য কোনো অবস্থাতেই পরিবর্তন ও ব্যত্যয় ঘটানো যাবে না।
সম্প্রতি মাসদার হোসেন মামলার গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তটি পুনঃস্মরণ করতে গিয়ে দেখা যায়, অধস্তন আদালতের ক্ষেত্রে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বিধি প্রণয়নে সংবিধানের মূলধারার বিচ্যুতি ঘটেছে। এটা গুরুতর উদ্বেগের বিষয়। কারণ বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও স্বকীয় অবস্থানের জন্য সংবিধান যে সুরক্ষা দিয়েছে তা সংরক্ষণ/বাস্তবায়ন করা সর্বোচ্চ আদালতের দায়িত্ব। দীর্ঘ ৪৬ বছর কালক্ষেপণের পর এ বিধিগুলো অধস্তন বিচার বিভাগের জন্য সরকার সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১৩৩ অনুযায়ী করেছে, অথচ উক্ত ১৩৩ অনুচ্ছেদে প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিযুক্ত কর্মচারীদের নিয়োগ ও কর্মের জন্য প্রণীত হওয়ার বিষয়টি সংবিধানের কর্ম বিভাগের জন্য প্রযোজ্য।
বাণীতে উল্লেখ করা হয় যে, অধস্তন আদালতে বিচার বিভাগীয় পদে নিয়োগ, নিয়ন্ত্রণ, পদোন্নতি প্রদান ও ছুটি মঞ্জুরিসহ শৃঙ্খলা বিধানসংক্রান্ত বিষয় সংবিধানে দুইটি অনুচ্ছেদ ১১৫ ও ১১৬তে পৃথকভাগে বিচার বিভাগের অংশে প্রণীত আছে। তথাপিও ওই আইন প্রণয়নের মাধ্যমে অধস্তন বিচার বিভাগের বিচারকদের নির্বাহী বিভাগের অধস্তন হিসেবে গণ্য করা হয়েছে, যা ক্ষমতার পৃথকীকরণ নীতির লঙ্ঘন এবং মাসদার হোসেন মামলার রায়ের সাথে সাংঘর্ষিক। ওই আইনসমূহ অস্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় এবং বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের দুইটি বিভাগ (আপিল বিভাগ ও হাইকোর্ট বিভাগ) এর সাথে যথাযথ পরামর্শ ছাড়া প্রণয়ন করা হয়েছে। অধস্তন আদালতে বিচারক নিয়োগ ও বদলি বিষয়ের বিধিমালা দীর্ঘ কালক্ষেপণের পর নির্বাহী বিভাগ ও মন্ত্রণালয় এমন একটি সময়ে স্থানান্তর করেছে যখন বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতির পদ শূন্য এবং এ বিধিমালা সুপ্রিম কোর্টের উভয় বিভাগের সাথে প্রয়োজনীয় অর্থবহ পরামর্শ ছাড়া প্রণয়ন করা হয়েছে।
এ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অধস্তন আদালতকে ১৯৯৯ সালের আগের যুগে নির্ধারিত করার শামিল বলে মন্তব্য করে তারা বলেন, তাহলে সর্বোচ্চ আদালত দিবসে আমরা কী বার্তা প্রেরণ করব? এ বিষয়ে জনগণ ও সুশীল সমাজকে সচেতন করার কোনো বিকল্প নেই।
বাণীতে বলা হচ্ছে, ঐক্যমতের মাধ্যমে দেশের সাংবিধানিক ভারসাম্য রক্ষা করার প্রচেষ্টাকে একত্রিত করে দৃঢ় ও সঙ্কল্পিতভাবে জনগণের অধিকার পুনরুদ্ধার এবং সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর ভিত্তিতে একটি উপযুক্ত স্বাধীন ও পৃথক বিচার বিভাগের ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা ছাড়া কোনো বিকল্প নেই।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫