এভাবেই প্রতিনিয়ত দূষণের শিকার হচ্ছে তুরাগ ; ছবি: কামরান রেজা চৌধুরি
এভাবেই প্রতিনিয়ত দূষণের শিকার হচ্ছে তুরাগ ; ছবি: কামরান রেজা চৌধুরি

ভয়াবহ দূষণে রাজধানী

মাহমুদুল হাসান

বাংলাদেশে বায়ু, পানি ও পরিবেশ দূষণে বছরে ক্ষতির পরিমাণ ৪২ হাজার কোটি টাকা, যা আমাদের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ২.৭ শতাংশ। শুধু বায়ুদূষণে ক্ষতি হয় ২০ হাজার কোটি টাকা। দূষণের সবচেয়ে বেশি শিকার হয় শিশুরা। ঢাকায় বিশ্বব্যাংকের এক সমীক্ষার ভিত্তিতে দেখা গেছে, ঢাকার ৫৯টি এলাকায় মাটি ও পানিতে সিসার পরিমাণ স্বাভাবিক মাত্রার চেয়ে বেশি। ঢাকা শহরের ছয় লাখ মানুষ এখন সিসা দূষণের কবলে। ঢাকার পরই নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুর সবচেয়ে বেশি দূষণের শিকার। ফেব্রুয়ারি ও মার্চ মাসে বায়ুদূষণ সবচেয়ে ভয়াবহ আকার ধারণ করে। ইটভাটাগুলো বায়ুদূষণের জন্য সবচেয়ে বেশি দায়ী। বায়ুদূষণের জন্য ইটভাটা ৩৪ শতাংশ এবং মোটরযান ১৮ শতাংশ দায়ী। বাংলাদেশ পরিবেশ সমীক্ষা-২০১৭ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়, অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও শিল্পায়নের ফলে বাংলাদেশের পরিবেশ মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়ছে। শিল্পকারখানাগুলো অপরিকল্পিতভাবে ঢাকার ভূগর্ভস্থ পানি তুলে ফেলছে। ফলে পানির স্তর আশঙ্কাজনক হারে নিচে নেমে যাচ্ছে। ফলে খাল ও নদীসহ অন্যান্য জলাশয়ের পানিও মারাত্মকভাবে দূষিত হচ্ছে।

দূষণের শীর্ষে বস্ত্র ও চামড়া

৭১৯টি তৈরী পোশাকশিল্পের ওয়াশিং ও ডাইং কারখানার বর্জ্য দূষণের অন্যতম উৎস। এক টন কাপড় উৎপাদন করতে নদীতে বর্জ্য যাচ্ছে ২০০ টন। ইস্পাত কারখানাগুলো থেকে এক লাখ কোটি লিটার এবং কাগজ কারখানাগুলো থেকে ৪৫ হাজার কোটি লিটার দূষিত বর্জ্য পানিতে মেশে। আর এই তালিকায় সবচেয়ে বেশি এগিয়ে চামড়া শিল্প।
বস্ত্র খাতের প্রতিষ্ঠানগুলো কারখানার বর্জ্য পাইপের মাধ্যমে সরাসরি ফেলছে নদীর পানিতে। লালচে রঙের এ পানি নদে পড়েই তৈরি করছে সাদা রঙের ফেনা। তৈরী পোশাক রফতানি থেকে প্রতি বছর প্রায় ২৮ বিলিয়ন ডলারের যে আয় হচ্ছে, তাতে পশ্চাৎ শিল্প হিসেবে বড় ভূমিকা রাখছে এ বস্ত্র খাতই। পরিবেশ দূষণেও এগিয়ে আছে তারাই। সবচেয়ে বেশি দূষণকারী শিল্প হিসেবে দুই দশক আগে বস্ত্র খাতকে লাল শ্রেণীভুক্ত করা হলেও এখনো একই শ্রেণীতে আছে শিল্পটি। দুই দশক ধরে লাল শ্রেণী থেকে বেরোতে পারছে না পরিবেশ দূষণের জন্য বেশি দায়ী আরেক খাত চামড়া শিল্প। যদিও বুড়িগঙ্গা দূষণের ঘটনায় নানা উদ্যোগের পর সাভারের চামড়া শিল্পপল্লীতে স্থানান্তর করা হয়েছে হাজারীবাগের ট্যানারি কারখানা। তার পরও দূষণ থামেনি। বুড়িগঙ্গার পর চামড়া শিল্পে দূষিত হচ্ছে এবার তুরাগ। পরিবেশ দূষণে বড় ধরনের ভূমিকা রাখা এ খাতটি থেকেও প্রতি বছর রফতানি আয় আসছে।
শিগগিরই এ দূষণ নিয়ন্ত্রণে আসতে পারে বলে জানিয়েছেন, বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি শাহীন আহমেদ। তিনি বলেন, সাভারের চামড়া শিল্পনগরীর কেন্দ্রীয় বর্জ্য পরিশোধনাগারের (সিইটিপি) দায়িত্বে আছে একটি চীনা প্রতিষ্ঠান। আমরা বলেছি, কোম্পানি গঠন করে এ দায়িত্ব আমাদের বুঝিয়ে দেয়া হোক। তাহলে আমরা দক্ষতার সাথে সিইটিপি পরিচালনা করতে পারব। তখন ট্যানারির মাধ্যমে পরিবেশ দূষণ অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে আসবে।
পরিবেশ দূষণের জন্য দায়ী শিল্পগুলোকে সবুজ, কমলা-ক, কমলা-খ ও লাল শ্রেণীতে ভাগ করেছে পরিবেশ অধিদফতর। পরিবেশ সংরক্ষণ বিধিমালা ১৯৯৭ অনুযায়ী পরিবেশ দূষণের মাত্রা বিবেচনায় শিল্পের এ শ্রেণী বিভাজন করা হয়। সবচেয়ে দূষণকারী হিসেবে ওই সময় বস্ত্র ও চামড়া শিল্পকে লাল শ্রেণীভুক্ত করা হয়।
পরিবেশ অধিদফতরের বার্ষিক প্রতিবেদনে বলছে, দেশের শিল্পগুলো সবচেয়ে বেশি দূষিত করছে বায়ু ও পানি। পানি দূষণের জন্য দায়ী মূলত বস্ত্র ও চামড়া শিল্প। অধিদফতরের কর্মকর্তাদের মতে, শিল্পে উৎপাদিত বর্জ্য পরিশোধনের পর তা নিষ্কাশনের নিয়ম থাকলেও এ দুই শিল্পে সেটি পুরোপুরি মানা হচ্ছে না। অনেক শিল্প ইউনিটে এখনো বর্জ্য পরিশোধন প্লান্টও (ইটিপি) নেই। থাকলেও সবসময় তা সচল থাকে না।
চলতি বছর জুলাই পর্যন্ত পরিবেশ অধিদফতরের শনাক্ত করা ইটিপি স্থাপনযোগ্য শিল্প ইউনিট ছিল দুই হাজার ১৭টি। এর মধ্যে ইটিপি স্থাপন হয়েছে এক হাজার ৫৭১টিতে। এ হিসেবে ২২ শতাংশ শিল্প ইউনিটে ইটিপি নেই। ইটিপি আছে এমন শিল্প ইউনিটগুলোর মধ্যে এক হাজার ৫৬৫টিতে সেগুলো সচল আছে দাবি করা হলেও তা নিয়ে সংশয় রয়েছে পরিবেশ অধিদফতরের কর্মকর্তাদের। বস্ত্র ও চামড়া শিল্প নিয়েই বেশি সংশয় তাদের।
কেন্দ্রীয় ইটিপি পুরোপুরি কার্যকর হলে চামড়া শিল্পের দূষণ নিয়ন্ত্রণে আসবে বলে মনে করেন পরিবেশ অধিদফতরের মহাপরিচালক অতিরিক্ত সচিব রইছউল আলম মণ্ডল। বস্ত্র খাতের ডায়িং-ওয়াশিংয়ের মতো ক্ষেত্রগুলোয় কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েই গেছে। সবাই যে কমপ্লায়েন্ট, তা বলা যাবে না। কিন্তু খাতটির দূষণ নিয়ন্ত্রণেও অগ্রগতি হচ্ছে। এ খাতের দূষণের মাত্রা আগের চেয়ে কমেছে। এমন কারখানা আছে, যারা শতভাগ পানি পুনরায় ব্যবহারও করছে। তবে সংখ্যাটা অনেক কম, উল্লেখ করার মতো নয়।
বস্ত্র ও চামড়া শিল্পের মাধ্যমে সবচেয়ে বেশি পানিদূষণের বিষয়টি উঠে এসেছে বিভিন্ন গবেষণায়ও। ২০১১ সালে ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (ডিইউইটি) পানিদূষণে নেতিবাচক ভূমিকা রাখা শিল্পগুলোর একটি র্যাংকিং করে। কারখানা থেকে নিষ্কাশিত পানি পরীক্ষা করে দূষণের মাত্রা অনুযায়ী এ র্যাংকিং করা হয়। তাতে দেখা যায়, দেশের পানির ব্যবহারে চামড়া শিল্প এক্সট্রিম বা চরম সীমায় পরিবেশ দূষণ করছে। র্যাংকিংয়ে শিল্পটি দ্বিতীয় অবস্থানে। আর বস্ত্র শিল্পের পানিদূষণ ছিল উচ্চসীমার। শিল্পটি ছিল র্যাংকিংয়ে প্রথম অবস্থানে।
শিল্প থেকে ছেড়ে দেয়া পানি পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে দূষণের মাত্রা অনুযায়ী শিল্প র্যাংকিং করা হয়েছিল গবেষণায়। বর্তমান প্রেক্ষাপটে পরিবেশদূষণে বস্ত্র ও চামড়া শিল্পই এগিয়ে আছে বলে মনে করি। এখন পরিশোধন সক্ষমতার উন্নয়ন হয়েছে; কিন্তু নানাবিধ কারণে সক্ষমতার শতভাগ ব্যবহার নিশ্চিত করা যাচ্ছে না।
পরিশোধন সক্ষমতার শতভাগ ব্যবহার নিশ্চিত করা যাচ্ছে না, এমন তথ্য দাবি করেছে পরিবেশ অধিদফতরও। সংস্থাটির কর্মকর্তাদের মতে, খালি চোখে দেখা যায় যে, শিল্পগুলোর সবাই ইটিপি চালায় না। কিন্তু রাতে বিষয়টি যথাযথ নজরদারি ও পরিদর্শনের জন্য যথেষ্ট সক্ষমতা অধিদফতরের নেই। ইটিপি থাকলেও অনেক কারখানায় কারিগরি দক্ষতাসম্পন্ন কর্মী নেই। এসব কারণেই ইটিপি চললেও নদীর পানি লাল হয়ে যাচ্ছে। আবার ইটিপি সংখ্যায় আছে, তবে বাস্তবে চলছে না।

জারের পানিতে মলের জীবাণু

নিরাপদ হিসেবে দেশের বাজারে থাকা সব জারের পানিতেই রয়েছে মাত্রাতিরিক্ত মলের জীবাণু। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের এক গবেষণায় এমন তথ্য উঠে এসেছে। অথচ সেই পানিই কিনে খাচ্ছেন সাধারণ মানুষ। যা ছড়াচ্ছে আমাশয়, টাইফয়েড, কলেরা, ইউরিন ইনফেকশন ও জন্ডিসসহ অনেক জীবনঘাতী রোগ। তাই রাস্তাঘাটের এসব দূষিত পানি না কিনে, ফোটানো পানি পান করার তাগিদ বিশেষজ্ঞদের। পথে ঘাটে, রাস্তার পাশের দোকানপাটে বিশুদ্ধ পানির নামে এভাবেই জারের পানি পান করেন সাধারণ মানুষ। এজন্য গ্লাসপ্রতি এক টাকা গুনতে হয় তাদের। কিন্তু এসব পানি কতটা বিশুদ্ধ জানা নেই কারো।
ঢাকার কয়েকটি পানি উৎপাদন কারখানা ঘুরে দেখা যায়, কেউ ময়লা পানি দিয়ে জারে ভরছে। কেউবা সরাসরি ওয়াসার লাইনের পানি জারে ভরে বিশুদ্ধ বলে বিক্রি করছে। তবে পানি নিয়ে এই প্রতারণা বন্ধে নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে শাস্তি দেয়া হচ্ছে বলে জানায় বিএসটিআই।
জারের পানি নিরাপদ তো নয়ই, বরং তা স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। এমন তথ্যই দিচ্ছে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল। তাদের গবেষণা বলছে, দেশের বাজারে থাকা সব কোম্পানির জারের পানিতে মাত্রাতিরিক্ত পরিমাণে মিলেছে মানুষ ও বিভিন্ন প্রাণীর মলের জীবাণু কলিফর্ম। ঢাকার ২৪টি স্থানসহ দেশের সব বিভাগের বিভিন্ন জেলা থেকে ২৫০টি নমুনা সংগ্রহ করে এই নিরীক্ষা করে সরকারি সংস্থাটি।
কলিফর্ম জীবাণু মূলত প্রাণীর মলের মাধ্যমে মাটিতে মিশে। এরপর পানির মাধ্যমে মানুষের শরীরে প্রবেশ করে। গবেষকেরা বলছেন, কলিফর্ম জীবাণুর তালিকায় থাকা ইকোলাই আমাশয় ও ইউরিনের ইনফেকশনের প্রধান কারণ। টাইফয়েড ও ডায়রিয়া ছড়ায় সালমোনেলা। এ ছাড়াও জন্ডিসসহ বিভিন্ন প্রাণঘাতী রোগের বিস্তারে সহায়তা করে কলিফর্ম। এক বিশ্ব এক স্বাস্থ্য, এই নীতিতে যখন সারা পৃথিবী এগিয়ে যাচ্ছে, তখন দেশের প্রতারকেরা এক টাকার পানিও রাখছে অনিরাপদ। তাই অর্থনীতিবিদরা বলছেন, দেশের স্বাস্থ্য অর্থনীতি টেকসই করতে হলে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতে সরকারকে হতে হবে আরো কঠোর।

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.