ঢাকা, মঙ্গলবার,১৬ জানুয়ারি ২০১৮

অবকাশ

লেখা আছে ডায়েরিতে

চারাগল্প

জোবায়ের রাজু

৩১ ডিসেম্বর ২০১৭,রবিবার, ০০:০০


প্রিন্ট

বালক বেলা থেকে ডায়েরি লেখার স্বভাব আমার। এই স্বভাবটা পেয়েছি আম্মার কাছ থেকে। তিনি বলতেন জীবনজুড়ে নানান ঘটনাপ্রবাহ ডায়েরিতে লিখে রাখা ভালো কাজ। তারপর অনেক দিন পর কিংবা বার্ধক্য বয়সে সেসব ডায়েরির পাতা চোখের সামনে মেলে ধরলে মনে হবে ফেলে আসা লম্বা জীবনটা বড়ই সুন্দর ছিল। আম্মার কথার যুক্তি আছে। সে যুক্তির দায় থেকে ডায়েরি লেখা শুরু করেছি অনেক দিন আগে। ২০১৭ সালের ডায়েরিতে কিছু দৈনন্দিন জীবনের কথামালা সংক্ষেপে তুলে ধরলাম।
১৭-১-২০১৭ : আজ সোমবার। সকালে ছোট্ট একটি ভুলবোঝাবুঝির কারণে আব্বার সাথে আমার মনকষাকষি। ক্ষোভের তোড়ে আব্বা বললেন, ‘আমার বাড়ি থেকে বের হ গুণ্ডা’। ভারি রাগ হলো আমার। আমি গুণ্ডা? থাকব না আর এই বাড়িতে। চলে যাব অচিন ঠিকানায়।
বাড়ি থেকে বের হয়ে ফোনটা বন্ধ করে চলে এলাম পদিপাড়া বাজারে। বাজারের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্তে অবাধ হাঁটছি। পেটে রাজ্যের ক্ষুদা। দুপুর-বিকেল পার হয়। বেলা পড়ার সাথে সাথে রাগের বরফ গলতে লাগল। সন্ধ্যার পর সব অভিমান ভুলে ঘরমুখী হতে দেখি সারা ঘরময় শোকের এক নীরব মাতম। আমাকে দেখে আম্মা ছুটে এসে পাগলের মতো বললেন, ‘সারা দিন কই ছিলি বাপ? তোর বাবা তোরে কল দিয়ে পায় না। ফোন বন্ধ। চিন্তায় তার প্রেসার বেড়েছে। মাথায় পানি ঢেলেছি দুইবার।’
পাশের ঘর থেকে আব্বা এলেন আমার সামনে। তার কাতর দুটি চোখের নীরব চাহনি আমাকে স্তব্ধ করে দিলো। আব্বার চোখের ভাষায় ঝরে পড়ছে ক্ষমা চাওয়ার এক নির্বাক আকুতি। তার চোখ কেবলই ভিজে আসার আগেই বললেন, ‘আয়, আমার বুকে আয়।’
২০-২-২০১৭ : কাল ২১ ফেব্রুয়ারি। ভাষাদিবস। সন্ধ্যার পর আমার বাগানের সব ফুল চুরি হলো। এটা পাড়ার দুষ্ট ছেলেদের কাজ। ভাষাসৈনিকদের স্মরণে শহীদ মিনারে তারা ফুল দিতে আমার বাগানে হামলা চালিয়ে অপকর্ম করেছে। না না, এ অপকর্ম নয়। এটা সুকর্ম। আমার বাগানের ফুল দেয়া হবে শহীদ মিনারে। ফুল চুরি করে ছেলেগুলো চোর হয়েছে সত্য, কিছু কিছু চোরকে কখনো ঘৃণা করতে নেই।
৯-৫-২০১৭ : আজ আমাদের বাড়িতে ভিখারিদের উৎপাত বেড়েছে। সকাল থেকে ভিখারিদের ক্ষণ পরপর আসা দেখে একসময় বিরক্ত হয়ে এক মাঝ বয়সের বৃদ্ধকে বললাম ‘চলে যান। খয়রাত দিবো না।’ মুখ বেজাড় করে সে বৃদ্ধ যখন চলে যাচ্ছে, আব্বা ডাকলেন ‘এই যে আসুন এ দিকে’। বৃদ্ধ প্রবীণ পায়ে আব্বার কাছে আসতেই আব্বা তার ভিক্ষার টুকরিতে দু’মুঠো চাল দিলেন। বৃদ্ধ চলে যাওয়ার পর আব্বা আমায় ডেকে বললেন, ‘ওদেরকে কখনো খালি হাতে ফেরাবে না। একদিন ওদের মতো আমিও ছিলাম। ওদের তো ভিক্ষা রাখার একটি টুকরি আছে, আমার তাও ছিল না। অথচ আজ আমার সব হয়েছে। জিরো থেকে হিরো হওয়া মানুষ আমি।’
১৫-৬-২০১৭ : আমার সদ্য তরুণী বোন রিম আজ বিকেলে নানান পদের সবজি দিয়ে পিঠা বানিয়েছে। পিঠার নাম সবজি পিঠা। দারুণ সুঘ্রাণ। মুখে দিতেই সবজি পিঠার সুঘ্রাণে আমার শৈশব মনে পড়ে গেল। মনে হলো এই সুঘ্রাণ আমার পেছনের কোনো এক শৈশবেও পেয়েছি। কিন্তু মনে পড়ছে না কিসে সে সুঘ্রাণ ছিল। আজকাল আমি অতীতের প্রেক্ষাপট মনে করতে পারছি না। এটা কি বয়সের কারণ?
১১-৭-২০১৭ : ভরদুপুরে আজ মাইকে যে মৃত মানুষটার নাম বলা হলো, তিনি আমার পরম শ্রদ্ধার। আমার প্রিয় লোকমান স্যার। হৃদরোগে উনি ঢাকার কোনো এক হাসপাতালে মারা গেছেন। গ্রামে লাশ আনতে রাত হয়ে যাবে। লোকমান স্যার সব সময় বলতেন, ‘খুব যতœ করে কাঁদানোর জন্য আপন মানুষগুলোই যথেষ্ট’। স্যারকে স্যালুট চিরন্তন এই সত্য কথাটি আমাকে সুন্দর করে বলে দেয়ার জন্য।
‘হে আল্লাহ, তুমি লোকমান স্যারকে জান্নাতে ভালো একটি জায়গা দিয়ো।’
১৯-৮-২০৭ : নাহিদ আমাদের মহল্লার ছেলে। যতটুকু জানি, ও অনেক ভালো ছেলে; কিন্তু আমার ধারণাকে সামান্য বদলে দিয়ে সে ইতোমধ্যে সিগারেট ধরেছে। প্রকাশ্যে নয়, খুব গোপনে সিগারেট টানে নাহিদ। আজ বিকেলে আলনূর হোটেলে গেলাম চা খেতে। গিয়ে দেখি সেখানে মহিলা কেবিনে বসে নাহিদ আনমনে সিগারেট টানছে। আমাকে দেখে খুব গোপনে সিগারেট ফেলে দিয়ে জুতা পরা পায়ে চলে গেল। আমিও না দেখার ভান করে প্রস্থান করি।
আমার কাছে খুব ভালো লাগল। নাহিদ সিগারেট খাচ্ছে, এই জন্য নয়। সে যে আমায় দেখে সম্মান করে সিগারেট ফেলে দিয়েছে, এ কারণে। আমার মনে হলো আমি পৃথিবীতে যত সুন্দর দৃশ্য দেখেছি, তার মধ্যে অন্যতম একটি সুন্দর দৃশ্য হলো আমাকে দেখে নাহিদের গোপনে সিগারেট ফেলে দেয়ার মুহূর্তটি।
ভাই নাহিদ, এই ক্ষতিকর বিষপান করিস না ভাই। ক্যান্সার হবে। তোকে হারাতে চাই না। কষ্ট হবে আমার।
আমিশাপাড়া, রাজু ফার্মেসি, নোয়াখালী

 

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫