ঢাকা, সোমবার,২২ জানুয়ারি ২০১৮

রংপুর

রংপুর-৫ আসন

আ’লীগ-জাপা অনড় আশাবাদী জামায়াত

সরকার মাজহারুল মান্নান ও শাহীন মণ্ডল মিঠাপুকুর রংপুর

৩০ ডিসেম্বর ২০১৭,শনিবার, ১৬:৫৩


প্রিন্ট
আ’লীগ-জাপা অনড় আশাবাদী জামায়াত

আ’লীগ-জাপা অনড় আশাবাদী জামায়াত

রংপুর-৫ মিঠাপুকুর আসনে মহাজোটভুক্ত জাতীয় পার্টি (জাপা) এবং আওয়ামী লীগ কেউ কাউকে ছাড় দিতে নারাজ। জাতীয় পার্টির একক প্রার্থী হিসেবে দলটির ডাকসাইটে নেতা এস এম ফখর উজ-জামান জাহাঙ্গীর হলেও আওয়ামী লীগে রয়েছে একাধিক প্রার্থী। এই অবস্থায় ২০ দলীয় জোটের একক প্রার্থী হিসেবে এলাকায় সর্বজন নন্দিত অধ্যাপক গোলাম রব্বানীকে বিজয়ী করার ব্যাপারে আশাবাদী বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। দলীয় সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

নির্বাচন কমিশন থেকে পাওয়া তথ্য মতে, ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দেশের মধ্যে সর্ববৃহৎ সংসদীয় আসন রংপুর-৫ মিঠাপুকুর আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছিলেন আওয়ামী লীগ কেন্দ্রীয় কমিটির কোষাধ্যক্ষ এইচ এন আশিকুর রহমান। তার ছেলে রাশেক রহমান মনোনয়নপত্র দাখিল করেও প্রত্যাহার করে নেয়ায় আশিকুর রহমান এমপি হয়ে যান। অন্য দিকে এই নির্বাচনে জাতীয় পার্টির ভাইস চেয়ারম্যান ও উপজেলা জাতীয় পার্টির আহ্বায়ক এস এম ফখর উজ-জামান জাহাঙ্গীর মনোনয়নপত্র তুললেও দাখিল করেননি।

এ ছাড়া তৎকালীন চারদলীয় জোট ভোট বর্জন করেছিল। ২০০৮ সালে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এখানে আওয়ামী লীগ এইচ এন আশিকুর রহমান এক লাখ ২৪ হাজার ৮৯৪ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছিলেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জাতীয় পার্টির ভাইস চেয়ারম্যান এস এম ফখর উজ-জামান জাহাঙ্গীর এক লাখ এক হাজার ২৯ ভোট পেয়ে দ্বিতীয় এবং জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান অধ্যাপক হাফিজুর রহমান ৫৬ হাজার ১৩৩ ভোট পেয়ে তৃতীয় হয়েছিলেন। এই সময়ে মহাজোটভুক্ত হয়েও এই আসনে আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টি পৃথকভাবে ভোটে অংশ নিয়েছিল। আর চারদলীয় জোটের পক্ষ থেকে ছিলেন জামায়াতের প্রার্থী।

অন্য দিকে ২০০১ সালের অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এই আসনে এক লাখ এক হাজার ৯০০ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছিলেন কৃষকলীগ থেকে জাতীয় পার্টিতে আসা শাহ সোলায়মান আলম ফকির। এ সময় তার কাছে হেরে গিয়েছিলেন আওয়ামী লীগের এইচ এন আশিকুর রহমান। তিনি ভোট পেয়েছিলেন ৭৫ হাজার ৬০৮ ভোট এবং জামায়াতে ইসলামীর আবু বকর ওয়াহেদী ৫৩ হাজার ১৭৯ ভোট পেয়ে তৃতীয় ছিলেন।

এ দিকে ২০১৪ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি এখানে উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে জামায়াতের প্রার্থী অধ্যাপক গোলাম রব্বানী এক লাখ ২৫ হাজার ৯৩০ ভোট পেয়ে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। এখানে সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক জাকির হোসেন ৯২ হাজার ৪৮৮ ভোট পেয়ে পরাজিত হন। ওই নির্বাচনে জামায়াতের ভাইস চেয়ারম্যান ও মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান প্রার্থীও বিজয়ী হন। তবে ২০১৬ সালে অনুষ্ঠিত ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে মিঠাপুকুরের ১৭ ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের চেয়ারম্যান প্রার্থীরা জয়লাভ করেন। এ সময় জাতীয় পার্টির প্রার্থীরা হেরে যান।

জাতীয় পার্টির স্থানীয় ও কেন্দ্রীয় সূত্রে জানা গেছে, এই আসনে আগামী নির্বাচনে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ মনোনীত প্রার্থী কেন্দ্রীয় দলের ভাইস চেয়ারম্যান ও উপজেলা জাতীয় পার্টির আহ্বায়ক শিল্পপতি এস এম ফখর উজ-জামান জাহাঙ্গীর।

জাপার মিঠাপুকুর উপজেলা সাংগঠনিক সম্পাদক আব্দুল হালিম জানান, ২০০৮ সালের ভোটে আমাদের প্রার্থী এস এম ফখর উজ-জামান জাহাঙ্গীরকে ফলাফল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মাধ্যমে পরাজিত করা হয়েছিল।

বর্তমান তিনি সার্বক্ষণিকভাবে দলীয় নেতাকর্মীদের সাথে যোগাযোগ করছেন। পুরো নির্বাচনী এলাকায় গণসংযোগ করছেন। তিনি নিজের শিল্প কলকারখানায় মিঠাপুকুরের বেকার তরুণ-তরুণীদের চাকরি দিয়ে এবং এলাকার মসজিদ, মাদরাসাসহ অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা এবং বিভিন্ন সামাজিক উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে জড়িত আছেন। তিনি মিঠাপুকুরের রাজনীতিতে সব শ্রেণিপেশার মানুষের কাছে সমাদৃত।

এ বিষয়ে এসএম ফখর উজ-জামান জাহাঙ্গীর নয়া দিগন্তকে জানান, জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান মনোনীত প্রার্থী হিসেবে আমি নির্বাচনে অংশগ্রহণের জন্য সব ধরনের প্রস্তুতি নিয়েছি। এখানে আওয়ামী লীগ নির্বাচন করলেও আমি নির্বাচন করব। তবে আমি চাই ইলেকশন কমিশন যেন একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন নিশ্চিত করে। নির্বাচনে যেন ইনসান ভোট দিতে পারে, কোনো জিন যেন ভোট না দেয়। ইলেকশনের ফলাফল যেন ইঞ্জিনিয়ারিং না হয়।

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, এখানে জামায়াতের প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা দেয়া হয়েছে বর্তমান উপজেলা চেয়ারম্যান অধ্যাপক গোলাম রব্বানীকে। জামায়াতের নেতাকর্মী সমর্থকসহ সবার কাছেই তিনি প্রিয়। অধ্যাপক গোলাম রব্বানী এক লাখ ২৫ হাজার ৯৩০ ভোট পেয়ে উপজেলা চেয়ারম্যান হওয়ার পর থেকেই কারাগারে আছেন। মাঝে তিন মাস তিনি মুক্ত জীবন কাটিয়েছেন।

মিঠাপুকুর উপজেলা জামায়াতের আমির অধ্যাপক এনামুল হক জানান, ২০১৪ সালের ২৭ মার্চ উপজেলা চেয়ারম্যান হিসেবে শপথ নিতে গিয়ে রংপুর বিভাগীয় কমিশনার কার্যালয়ের সামনে থেকে গ্রেফতার হন অধ্যাপক গোলাম রব্বানী।

তার বিরুদ্ধে সাঈদীর ফাঁসির রায়ের দিন মিঠাপুকুরে সংঘর্ষে সাত খুন, মিঠাপুকুর উপজেলা আওয়ামী লীগ অফিসে অগ্নিসংযোগ এবং দু’টি গাছ কাটার মামলা রয়েছে। এই মামলায় ২৯ মাস কারাগারে থাকার পর সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ থেকে জামিন পেয়ে ২০১৬ সালের ২৪ মার্চ মুক্তি পেলে আবারো জেলগেট থেকে তাকে গ্রেফতার করা হয়। পরে তিনি একই সালে ২৪ আগস্ট জামিনে মুক্তি পান।

পরে তাকে আবারো মিঠাপুকুরের গড়ের মাথা থেকে চলতি বছরের ১৩ অক্টোবর গ্রেফতার করে ছয়টি মামলা দেয়া হয়। এসব মামলায় গত ৪ ডিসেম্বর জামিনে মুক্তি পেলেও জেলগেট থেকে আবারো গ্রেফতার করে একটি মামলায় গ্রেফতার দেখায় পুলিশ। এখন তিনি রংপুর কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দী জীবনযাপন করছেন।

জামায়াতের এই নেতা বলেন, অধ্যাপক গোলাম রব্বানী মিঠাপুকুর ডিগ্রি কলেজের গণিত বিভাগের শিক্ষক। তিনি বর্তমানে জেলা জামায়াতের সাংগঠনিক সম্পাদক। তার বাড়ি উপজেলার খোড়াগাছ ইউনিয়নে।

মিঠাপুকুরে জামায়াত নেতাকর্মীদের ওপর যে জুলুম হয়েছে, তার বিরুদ্ধে সব সময় সোচ্চার ছিলেন অধ্যাপক গোলাম রব্বানী। নেতাকর্মী সমর্থকদের কাছে অত্যন্ত প্রিয় হওয়ার পাশাপাশি মিঠাপুকুরের প্রত্যেকটি মানুষের কাছে অধ্যাপক গোলাম রব্বানী একজন আদর্শ, সৎ, মেধাবী ও যোগ্য মানুষ হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছেন। বিপুল ভোটের ব্যবধানে বিজয়ী হয়েও সরকারের রোষানলে পড়ে প্রায় তিন বছর কারাবন্দী থাকায় সাধারণ মানুষ তার প্রতি অধিকমাত্রায় সহানভূতিশীল। এ ছাড়াও তার প্রতি রয়েছে ২০ দলীয় জোটের প্রত্যেকটি নেতাকর্মীর অকুণ্ঠ সমর্থন। এসব কারণে সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য ভোট হলে, ফলাফল ইঞ্জিনিয়ারিং করা না হলে মিঠাপুকুরে অধ্যাপক গোলাম রব্বানীর বিজয় নিশ্চিত ইনশাআল্লাহ।

রংপুর জেলা জামায়াতের আমির এ টি এম আজম খান জানান, অধ্যাপক গোলাম রব্বানী জুলুমের শিকার। তাকে দলমত নির্বিশেষে সবাই ভোট দিয়ে উপজেলা চেয়ারম্যান বানিয়েছিল। কিন্তু জুলুমবাজ সরকার এখনো তাকে চেয়ারে বসতে দিচ্ছে না। তাকে অন্যায়ভাবে বন্দী করে রেখেছে। মিঠাপুকুরের মানুষ তাকে এমপি হিসেবে দেখতে চায়।

আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, আগামী নির্বাচনে এই আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী তালিকায় আছেন বর্তমান এমপি এইচ এন আশিকুর রহমান, তার ছেলে রাশেক রহমান, উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক জাকির হোসেন সরকার। এখানে জাকির হোসেন সরকারের সাথে আশিকুর রহমান এবং তার ছেলের দ্বন্দ্ব প্রকাশ্য রূপ নেয়ায় একক প্রার্থী হওয়া দুরূহ বলে মনে করেন খোদ দলীয় নেতাকর্মীরা। দ্বন্দ্বের কারণ অনুসন্ধান করে জানা গেছে, ইউনিয়ন কমিটি বাতিল এবং নতুন কমিটি গঠনকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিনের চাপা বিরোধ প্রকাশ্য দ্বন্দ্বে পরিণত হয়েছে।

এ ব্যাপারে জাকির হোসেন সরকার জানান, আওয়ামী লীগের তৃণমূল এবং মূলধারারা নেতাকর্মীদের সাথে আমি বহু বছর ধরে সম্পৃক্ত। এ ছাড়াও সাধারণ মানুষের পাশে আমি আছি। তাদের সুখে-দুঃখে আমি আছি। আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা আমাকে প্রার্থী হওয়ার জন্য চাপ দিচ্ছেন। বিষয়টি আমি কেন্দ্রে জানিয়েছি। আমি মাঠে কাজ করছি। নেত্রী যদি আমাকে মনোনয়ন দেন, তবে এখানে বিপুল ভোটে আমি বিজয়ী হবো।

অন্য দিকে বর্তমান এমপি এইচ এন আশিকুর রহমান জানান, আমি মিঠাপুকুরকে বিএনপি ও জামায়াত-শিবিরমুক্ত করেছি। আগের চেয়ে মিঠাপুকুরে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক অবস্থানও শক্তিশালী। তা ছাড়া আমি এই আসনে পাঁচবারের এমপি। এই সময়ে আমার নির্বাচনী এলাকায় যে উন্নয়ন হয়েছে, তা অন্য কোনো সময়ে হয়নি। আমার বিরুদ্ধে অনিয়ম, দুর্নীতি, সন্ত্রাস ও স্বজনপ্রীতির কোনো অভিযোগ নেই। আশা করি নেত্রী আমাকেই মনোনয়ন দেবেন। আমি বিপুল ভোটে বিজয়ী হবো।

আশিকুর রহমানের অভিযোগ, উপজেলা নির্বাচনে জাকির হোসেন সরকার চেয়ারম্যান পদে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীর কাছে বিপুল ভোটে হেরেছিলেন। এখন তিনি দলের বিরুদ্ধে নানা অপতৎপরতা শুরু করেছেন। তার সাথে দলের নেতাকর্মীরা নেই। বিভিন্ন শিাপ্রতিষ্ঠানে অনিয়ম ও দুর্নীতির জন্য তিনি আওয়ামী লীগ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছেন।

এ দিকে আরেক মনোনয়নপ্রত্যাশী কারমাইকেল কলেজ ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি এবং রংপুর জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মোতাহার হোসেন মণ্ডল মওলা জানিয়েছেন, অভ্যন্তরীণ নানা বিষয়ের কারণে মিঠাপুকুরের মানুষ আওয়ামী লীগ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। মানুষ এখন পরিবর্তন চাইছে। তারা নতুন নেতৃত্ব প্রত্যাশা করছে। আমি মিঠাপুকুরের নেতাকর্মী ও জনসাধারণের সাথে যোগাযোগ অব্যাহত রেখেছি। আমিও নেত্রীর কাছে মনোনয়ন চাইব।

এ দিকে বিএনপির কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ২০০১ সালে জাতীয় পার্টি থেকে নির্বাচিত শাহ সোলায়মান আলম ফকির রংপুর জিলা স্কুল মাঠের জনসভায় বেগম খালেদা জিয়ার হাতে ধানের শীষ তুলে দিয়ে বিএনপিতে যোগদান করেন। তিনি বিএনপির প্রার্থী হওয়ার জন্য চেষ্টা তদবির চালাচ্ছেন। এ ছাড়াও স্বেচ্ছাসেবক দলের রুহুল্লা জুয়েলও বিএনপির প্রার্থী হওয়ার জন্য জনসংযোগ ও চেষ্টা চালাচ্ছেন। তবে এখানে ২০ দলীয় জোটের একক প্রার্থী হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি বলে মনে করেন স্থানীয় বিএনপি নেতাকর্মীরা।

 

  • সর্বশেষ
  • পঠিত
সকল সংবাদ

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫