ঢাকা, মঙ্গলবার,১৬ জানুয়ারি ২০১৮

প্রযুক্তি দিগন্ত

তথ্যপ্রযুক্তি খাতে ফিরে দেখা ২০১৭

সুমনা শারমিন

৩০ ডিসেম্বর ২০১৭,শনিবার, ০০:০০ | আপডেট: ৩০ ডিসেম্বর ২০১৭,শনিবার, ০৬:৪০


প্রিন্ট

প্রযুক্তির ছোঁয়া সারা বিশ্বকে যেভাবে বদলে দিচ্ছে, তার প্রভাব রয়েছে আমাদের দেশেও। তথ্যপ্রযুক্তি খাতটি আলাদা করেই গুরুত্ব পেয়ে আসছে গত কয়েক বছরে। সারা বিশ্ব যখন প্রযুক্তি ব্যবহারের সুফল ঘরে তুলছে, তখন আমরা প্রযুক্তি থেকে কতটা সুফল ঘরে তুলতে পারছি, ডিজিটাল বাংলাদেশের পথেই বা কতটা এগিয়ে যেতে পারছি, সেই হিসাব মেলাতে একটু পেছন ফিরে তাকানো প্রয়োজন বটে। চলতি বছর নানা কর্মকাণ্ডে মুখর ছিল দেশের আইসিটি অঙ্গন। ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণের প্রোপটে তথ্যপ্রযুক্তি খাতে নানাবিধ উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। বিশেষ করে চলতি বছর তথ্যপ্রযুক্তি খাতে অবকাঠামো নির্মাণে অগ্রগতি ছিল চোখে পড়ার মতো। এ বছর যশোরে চালু হয়েছে শেখ হাসিনা সফটওয়্যার টেকনোলজি পার্ক। এর পাশাপাশি দেশে তথ্যপ্রযুক্তির সর্বশেষ সংযোজন বিগডাটা, ভার্চুয়াল রিয়েলিটি, অগমেন্টড রিয়েলিটির মতো প্রযুক্তি নিয়েও কাজ হচ্ছে।
বাংলা ডোমেইন চালু
বাংলাদেশের কান্ট্রি কোড টপ লেভেল ডোমেইন (সিসিটিএলডি) ‘ডট বাংলা’ চালু হয়েছে চলতি বছরের জানুয়ারি মাস থেকেই। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গণভবন থেকে ডট বাংলার উদ্বোধন করেন। ডট বাংলা পেতে আগ্রহী গ্রাহককে বিটিসিএলের ওয়েবসাইটে (িি.িনঃপষ.পড়স.নফ) গিয়ে অনলাইন নিবন্ধন ও ফরম পূরণ করে আবেদন করতে হবে। ওয়েব দুনিয়ায় পরিচয় শনাক্ত করার একমাত্র পথ ডোমেইন। ডটকম, ডটনেট, ডটইনফো ছাড়াও প্রতিটি দেশের জন্য রয়েছে ভিন্ন ভিন্ন ডোমেইন। এগুলো সাধারণত দেশের নামের সূচনা অর দিয়ে শুরু থাকে। যেমন ইন্টারনেট দুনিয়া বাংলাদেশকে চেনে ডটবিডি নামে। এবার এসেছে ডটবাংলা। যা ভাষার েেত্র অনন্য পরিচয় পেলো বাংলাদেশ। এখন আর আমাদের সার্চ বারে ইংরেজিতে ডোমেইন নেম লিখতে হবে না। বাংলা অরে লিখলেই চলবে। অবশ্য এ জন্য ডোমেইনকে বাংলায় নিবন্ধন করতে হবে। পৃথিবীর যেকোনো প্রান্ত থেকেই বাংলায় ওয়েবসাইট খুলতে হলে বাংলাদেশ থেকেই অনুমতি নিতে হবে।
জনপ্রিয় অ্যাপভিত্তিক পরিবহন সেবা
চলতি বছর বেশ কিছু স্মার্টফোন অ্যাপভিত্তিক বাহন সেবা চালু হয়েছে। ভিড়ে-ঠাসা বাস আর রিকশা-অটোরিকশাচালকদের দৌরাত্ম্য থেকে বাঁচতে অনেকেই এখন এ সেবা নিচ্ছেন। হাত তুলে আর রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকতে হয় না। স্মার্টফোনের মাধ্যমেই হাতের মুঠোয় চলে এসেছে ভাড়া ট্যাক্সি ও বাইক সেবা। মোবাইল অ্যাপ ভিত্তিক পরিবহন সেবায় এ বছর ভিন্নমাত্রা যুক্ত করছে বাইক সেবা। প্রথম পর্যায়ে শুধু পাঠাও এই সেবা যাত্রা শুরু করে। এখন নারীরাও ভাড়ায় মোটরসাইকেলে যাত্রী বহন করছেন। অনলাইনে পরিবহন সেবায় বিশ্বব্যাপী পরিচিত উবারও চলতি বছরে শুরু করেছে বাইক সেবা। এরপর অবশ্য অ্যাপভিত্তিক পরিবহন সেবায় এসেছে আরো অনেক প্রতিষ্ঠান।
পেপ্যাল নিয়ে হতাশা
ফ্রিল্যান্সি বা ই-কমার্স ব্যবসার সঙ্গে অর্থ লেনদেন জড়িত। বিশ্বের সঙ্গে এসব লেনদেনকে সহজ করেছে পেপ্যাল। এই মুহূর্তে বিশ্বের ১৯৩টি দেশে পেপ্যাল কার্যক্রম পরিচালনা করছে। বিশ্বের প্রায় ১৩ কোটি ৭০ লাখ মানুষ এ সেবার সুবিধা উপভোগ করছেন। ২৬টি মুদ্রায় এ প্রতিষ্ঠানটি লেনদেন পরিচালনা করে। বাংলাদেশেও গত ১৯ অক্টোবর পেপ্যাল-জুম সার্ভিস উদ্বোধন করেছেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্যপ্রযুক্তি-বিষয়ক উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয়। বিশ্বের ২০৩টি দেশে পেপ্যাল সেবা চালু আছে। এর মধ্যে মাত্র ২৯টি দেশে পেপ্যালের পূর্ণাঙ্গ সেবা চালু আছে। ১০৩টি দেশে শুধু ইনবাউন্ড সেবা চালু রয়েছে। বাংলাদেশও ইনবাউন্ড সেবায় যুক্ত হলো।
ফ্রিল্যান্সারসহ প্রবাসীদের টাকা পাঠানোর সুবিধার্থে চালু হয়েছে ইন্টারনেটভিত্তিক পেমেন্ট সেবা পেপ্যালের ‘জুম’ চালু করা নিয়ে খুব বেশি আশান্বিত হতে পারেনি ফ্রিল্যান্সাররা। অনেকেরই অভিযোগ, পেপ্যালের নামে নতুন করে যেটি উদ্বোধন করা হচ্ছে সেটি আসলে জুম মানি ট্রান্সফার সার্ভিস, যেটি আগে থেকেই চালু রয়েছে। তবে তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক বলছেন এখন থেকে দেশের বাইরে থেকে কেউ চাইলে যেকোনো সময় তার পেপ্যাল অ্যাকাউন্ট থেকে টাকা বাংলাদেশে পাঠাতে পারবেন। প্রাথমিকভাবে সোনালী ব্যাংক, রূপালী ব্যাংক, অগ্রণী ব্যাংক, জনতা ব্যাংক, সোস্যাল ইসলামী ব্যাংক, উত্তরা ব্যাংক, পূবালী ব্যাংক, সিটি ব্যাংক ও ইসলামী ব্যাংকে এ সেবা চালু হয়েছে।
বাংলায় গুগল অ্যাডসেন্স
৪১তম ভাষা হিসেবে জনপ্রিয় সার্চ ইঞ্জিন গুগলের অ্যাড নেটওয়ার্ক ‘গুগল অ্যাডসেন্স’-এ যুক্ত হয়েছে ‘বাংলা ভাষা’। এর ফলে এখন আর বাংলা বিষয়বস্তু (কনটেন্ট) নির্ভর ওয়েবসাইটে বিজ্ঞাপন প্রকাশ এবং তা থেকে আয় করতে আর ইংরেজি ভাষার ওপর নির্ভরশীল হতে হবে না। মূলত অ্যাডসেন্স হলো গুগলের লভ্যাংশ-অংশিদারী বিজ্ঞাপন প্রকল্প। এ প্রকল্পের মাধ্যমে একটি ওয়েবসাইটের মালিক কিছু শর্তসাপেে তার সাইটে গুগল নির্ধারিত বিজ্ঞাপন প্রদর্শনের মাধ্যমে অর্থ উপার্জন করতে পারেন। বর্তমানে বিশ্বের প্রায় দেড় কোটি ওয়েবসাইটে গুগল অ্যাডসেন্স ব্যবহার করা হচ্ছে। ২০১৭ সালের ৬ ডিসেম্বর বাংলায় গুগল অ্যাডসেন্স চালু হয়েছে। এর ফলে এখন আর বাংলা বিষয়বস্তুনির্ভর ওয়েবসাইটে বিজ্ঞাপন প্রকাশ এবং তা থেকে আয় করতে আর ইংরেজি ভাষার ওপর নির্ভরশীল হতে হবে না। ফলে সহজেই গুগল অ্যাডে অংশীদার হতে পারবে বাংলা ভাষায় প্রকাশিত অনলাইন পত্রিকা, ব্লগ, পোর্টাল ও মোবাইল অ্যাপ। এতে করে বাংলাভাষীদের অনলাইন থেকে আয়ের েেত্র ভাষাগত যে বাধা ছিল তা দূর হলো।
অবকাঠামোগত উন্নয়ন
২০১৭ সালেই উদ্বোধন করা হয়েছে যশোরে অবস্থিত শেখ হাসিনা সফটওয়্যার টেকনোলজি পার্ক। সিলিকনভ্যালির আদলে গড়া পার্কটিতে রয়েছে আন্তর্জাতিক মানের সব সুযোগ-সুবিধা। এই পার্কে পাঁচ সহস্রাধিক আইটি প্রফেশনালের প্রত্য কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে বলে আশা করা হচ্ছে। গত ১০ ডিসেম্বর গণভবন থেকে শেখ হাসিনা সফটওয়্যার টেকনোলজি পার্ক ডরমিটরিতে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে পার্কের শুভ উদ্বোধনী ঘোষণা করেন। সফটওয়্যার তৈরি, কল সেন্টার সেবা, ফ্রিল্যান্সিং, গবেষণা ও উন্নয়নসহ বিভিন্ন কাজ হবে এ পার্কে। দণি-পশ্চিমাঞ্চলের জেলাগুলোর তরুণদের ল্য করে এ পার্ক তৈরি করা হয়েছে। এ অঞ্চলের তরুণেরা সফটওয়্যারভিত্তিক কাজ করে নিজেরা স্বাবলম্বী হবে ও দেশকে এগিয়ে নেবে। ২০১৪ সালের এপ্রিলে নাজির শঙ্করপুর এলাকায় দুই লাখ ৩২ হাজার বর্গফুট জমির ওপর ‘শেখ হাসিনা সফটওয়্যার টেকনোলজি পার্ক’ নির্মাণকাজ শুরু হয়।
তথ্য সংরণ ও ডিজিটাল সেবা সবার দোরগোড়ায় পৌঁছে দেয়ার ল্েয দেশেই তৈরি হচ্ছে বিশ্বের ষষ্ঠ বৃহত্তম ডাটা সেন্টার। গাজীপুরের কালিয়াকৈরে বঙ্গবন্ধু হাইটেক সিটিতে সাত একর জমির ওপর গড়ে উঠছে এই ফোর টায়ার ডাটা সেন্টারটি। এর মাধ্যমে দেশের সব অফিস, আদালত, শিাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, যানবাহন, টেলিকমিউনিকেশন, ভূমি ব্যবস্থাপনা, বিদ্যুৎ বিভাগ থেকে শুরু করে সব কিছুই প্রযুক্তির অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে। বিশালাকার এই ডাটা সেন্টারে থাকছে উচ্চমতাসম্পন্ন ৬০৪টি র‌্যাক। এতে আরো থাকছে ৯ এমভিএ লোডের রিডান্ডেন্ট লাইনসহ নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সংযোগের ব্যবস্থা।
বছরে ২৫ থেকে ৩০ লাখ ইউনিট হ্যান্ডসেট উৎপাদনের ল্য নিয়ে যাত্রা শুরু করেছে দেশীয় কোম্পানি ওয়ালটনের স্মার্টফোন কারখানা। প্রায় ৫০ হাজার বর্গফুট জায়গাজুড়ে গড়ে তোলা হয়েছে ওয়ালটন ডিজিটেক ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড। এখানে রয়েছে হ্যান্ডসেটের ডিজাইন ডেভেলপ, গবেষণা ও উন্নয়ন বিভাগ, মান নিয়ন্ত্রণ বিভাগ ও টেস্টিং ল্যাব। এখান থেকেই তৈরি হচ্ছে মেড বাই বাংলাদেশ স্মার্টফোন।
তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর আয়োজন
ডিসেম্বর মাসে বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে অনুষ্ঠিত ডিজিটাল ওয়ার্ল্ডের পঞ্চম আসর ছিল অনেক ব্যতিক্রমধর্মী আয়োজন। এ আয়োজনে যোগ দিয়েছিল সৌদি সরকারের নাগরিকত্ব পাওয়া রোবট সোফিয়া। ডিজিটাল ওয়ার্ল্ডের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সোফিয়া বাংলাদেশে তার ভ্রমণ সম্পর্কে বলে, বাংলাদেশে এসে আমার দারুণ লাগছে। আমি যে পোশাকটি পরে আছি তার নাম জামদানি। এটি তোমাদের ঐতিহ্যবাহী পোশাক। শুধু তাই নয়, এর পেটেন্টও তোমাদের। বুদ্ধিদীপ্ত চাহনি, মুখভঙ্গি আর সরস জবাবে তথ্যপ্রযুক্তির উন্নয়নের আগমনী বার্তা দিতে এসেছিল সোফিয়া। নতুন এই প্রযুক্তি থেকে জ্ঞান আহরণ করে দেশের রোবট তৈরির েেত্র উল্লেখযোগ্য উন্নয়ন সাধনই ছিল সোফিয়াকে নিয়ে আসার মূল উদ্দেশ্য। এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলের তথ্যপ্রযুক্তি খাতের বৃহত্তম সংগঠন এশিয়া প্যাসিফিক আইসিটি অ্যালায়েন্স (অ্যাপিকটা)। এই অঞ্চলের তথ্যপ্রযুক্তি খাতের উন্নয়নের পাশাপাশি অ্যাপিকটা সম্ভাবনাময় ও সফল উদ্যোগ, সফটওয়্যার ও তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর সেবার স্বীকৃতি দিতে প্রতি বছর অ্যাপিকটা অ্যাওয়ার্ডের আয়োজন করে। চলতি বছরের অ্যাপিকটা অ্যাওয়ার্ড অনুষ্ঠিত হলো ঢাকায়।

 

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫