মাহফুজুর রহমান আখন্দের কবিতা সমকালীন জীবনবোধ

আজাদ এহতেশাম

কবিরা সমাজেরই সন্তান। তাই তার লেখনীতে সমকালীন প্রভাব অনস্বীকার্য। সমাজ, দেশ, জাতি, রাষ্ট্র ও সরকার ব্যবস্থাপনায় রাষ্ট্রীয় আচার-আচরণ, রীতিনীতি, ঘটনা-দুর্ঘটনা সবই তার সংবেদনশীল কবিচিত্তে কবিতার উপজীব্য হয়ে শিল্পিত রূপে বাক্সময় হয়ে ওঠে। এ কারণে কোনো শিল্পীর শিল্প, সমকালীন যুগ ও সমাজেরই প্রতিচ্ছবি, চলমান জীবন ও জীবনদর্শনের কাব্যিক প্রতিরূপ। মাহফুজুর রহমান আখন্দের কবিতা এমনই সময়ের সাহসী উচ্চারণ।
মাহফুজুর রহমান আখন্দের কবিতায় সমকালীন জীবন, যুগযন্ত্রণা, পরিবর্তনশীলতা, অসত্য ও অশুভ শক্তির দৌরাত্ম্য, জঙ্গিবাদের তকমায় বিশ্বব্যাপী মুসলিম নিধন, বিকারগ্রস্ত বিশ্বমোড়লের নির্লিপ্ততা, প্রগতিশীলতা ও মুক্তমনার নামে ধর্মের বিকৃতি, ঘুণে ধরা সমাজের অস্থিরতা, মধ্যবিত্তের সঙ্কট, সাম্যবাদ, শ্রমজীবী নি¤œবিত্তের মানুষের প্রতি কবির অকুণ্ঠ সহানুভূতি ও ভালোবাসা, শহুরে নগর সংস্কৃতির আড়ালে কবির গ্রামীণ প্রকৃতির নস্টালজিক স্বপ্ন ও সম্ভাবনা ইত্যাদি বিষয় গ্রন্থটিতে কবির নিপুণ হাতের জাদুস্পর্শে উদ্ভাসিত হয়ে উঠেছে।
বিশ্ব বদলের আবহাওয়ায় এ দেশের দ্রুত বদলে যাচ্ছে সমাজ, সংস্কৃতি এবং মানুষ। দ্রুত আত্তীকৃত হচ্ছে বিদেশী সংস্কৃতি। বদলে যাচ্ছে মানুষ ও মানুষের মন। বদলের আঘাতে প্রেম, ভালোবাসা, সহানুভূতি, মানবিকতার অভাবে নাকাল সমাজের মানুষ। সংখ্যাগরিষ্ঠ হচ্ছে বিবেকবর্জিত মানুষের খোলসধারী অমানুষ। কিন্তু কবির কণ্ঠে সত্য, সুন্দর ও কল্যাণের নিমিত্তে বদলে যাওয়ার আকুতি :
‘বদলাতে দাও, চলুক বদলে যাওয়া
বদল বদলের বাদল ধারায় বয়ে যাক
আত্মশুদ্ধির মৌসুমি হাওয়া।’
(বদলের বদলে যাওয়া)
প্রচলিত সমাজব্যবস্থার পরিবর্তনশীলতায় বিদীর্ণ মানবতা, বিপন্ন অস্তিত্বের সঙ্কটে মানুষ, দেশ ও দেশের রাজনীতি, সরলপ্রাণ নিরীহ মানুষেরা রাষ্ট্রীয় প্রশাসনযন্ত্রের কাছে জিম্মি। মতাদর্শের বৈপরীত্যে ওষ্ঠাগত তাদের জীবনমান ও সম্মান। পরিস্থিতি উত্তরণে কবির প্রগাঢ় আশাবাদ :
‘মেঘের পাঁজরে ওড়ে রক্তের ফিনকি
বক্ষদীর্ণ করে, হেসে ওঠে মনন
উঠে আসে বিজয়ের সূর্য; মুক্তির হেমন্ত দিন।’
(মুক্তির হেমন্ত দিন)
মিত্যাবাদীদের আস্ফালন ও দৌরাত্ম্য আগাছার মতোই ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে সমাজের সর্বত্র। অশিক্ষিত মূর্খদের কালো টাকা ও পেশিশক্তির দাপটে সরলপ্রাণ জ্ঞানীরা অনেকটাই বিপর্যস্ত। তারা ঘুণে ধরা চিঁড়েচ্যাপ্টা সমাজের অন্যায় ও অসত্যের কাছে নির্লিপ্ত বাধ্য হয়েই। কিন্তু এ অবস্থা থেকে পরিত্রাণ দেয়ার জন্য কে শক্তি ও সাহস নিয়ে সত্য প্রতিষ্ঠায় অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবে?
‘মা’র চোখেমুখে কালো কালো ছায়া ভাসে
কবে যে উঠবে চন্দ্র সূর্য ভোর
কবে যে খুলবে সাহসের নয়া দোর
কবে যে আবার সাহসের নায়ে সত্যের জয় আসে।’
(মায়ের কান্না)
কবির চিন্তা জগতের প্রবহমানতায় প্রেম ও ভালোবাসাই সৃষ্টি করে জাগরণ; কবি তখন লাভ করে গভীর অন্তর্দৃষ্টি ও অন্বিষ্ট জগৎ সম্পর্কিত সংবেদনশীলতা। কখন যে নারীর বিরহ ও নারীর মিলনাকাক্ষা কবির কাব্যভূমে কবিতার বারিরূপে পতিত হতে থাকে অঝোর ধারায় কবি তা নিজেই জানে না।
‘কেউবা তোমাকে হৃদয়ভূমিতে রাখি
তুমি তো জীবনে স্বপ্ন দোয়েল পাখি
তুমি যে হৃদয়ে মনকাড়া লাল শাড়ি
ভালোবাসা মাখা সুখের ঠিকানা, বাড়ি
নারী।’
(নারী কাব্য)
আধিপত্য প্রতিষ্ঠার জন্য দখলদার আগ্রাসী সন্ত্রাসী বাহিনী প্রতিনিয়ত দুর্বল মানুষের ওপর চালাচ্ছে হত্যা নির্যাতন অগ্নিসংযোগের মতো জঘন্য ঘটনা। ইরান, ইরাক, সিরিয়া ও মিয়ানমারে নির্বিচারে চলছে মুসলিম নিধন। মানবতার ধ্বজাধারী বিশ্বমোড়লেরা নির্বিকার কেননা তাদের বিবেচনায় মুসলিম নিধনে মানবতার বিপর্যয় ঘটে না। তাদের চণ্ডনীতি ও কূটকৌশলের কাছে মুসলিমরা বিপর্যস্ত ও নিরুপায়Ñ একমাত্র সৃষ্টিকর্তাই তাদের শেষ ভরসা, তাদের বাঁচা-মরার একমাত্র সহায়। কবির বিক্ষুব্ধচিত্তের প্রতিধ্বনি :
‘ও জাতিসঙ্ঘ! কোথায় তোমার মানবতাবোধ;
ওরা মুসলিম, তাই বলে নিজভূমে অধিকার নেই মাথা গুঁজাবার!
হায় আমেরিকা, কোথায় তোমার দয়ার্দ্র হাত!
বাপের ভিটেতে পরবাসী করে, এ ক্যামন নীতি! এটা কী বুদ্ধাচার!
হায়রে নেত্রী, নোবেলের সুরে তুমিও নিখোঁজ!
কোথায় তোমার গণতন্ত্রের অতন্দ্র সুর!’
(আরাকানের কান্না)
একবিংশ শতাব্দীর বিজ্ঞাননির্ভরতা মানুষকে জীবন ও কর্মের গতিশীলতা বৃদ্ধির সাথে সাথে মানুষকে দিয়েছে আরাম-আয়েশ ও স্বাচ্ছন্দ্য কিন্তু হরণ করে নিয়েছে অন্তরজাত নিটোল সুখের তৃপ্তিময় হাসি। প্রেম-ভালোবাসা, ¯েœহ-মায়া, আবেগ-বিহ্বলতা, মানবিকতা, সহানুভূতি ইত্যাদি মানবীয় গুণাবলি এখন স্বার্থের করপোরেট ফ্রেমে বন্দী। কলুষিত পৃথিবী এখন বাসের অযোগ্যÑ এ থেকে পরিত্রাণ ও বাঁচার করুণ আকুতি।
‘হৃদয়ের বেলাভূমিতে ভৌতিক কৌতূহলের সুরেলা বাঁশি
চাঁদের কলঙ্ক অস্তাচল সূর্যের মুখে, ¤্রয়িমাণ পৃথিবীর হাসি
আত্মার কোনায় কোনায় বীভৎস আর্তনাদ, বাঁচাও বাঁচাও
ফিরিয়ে দাও বিশুদ্ধ আকাশ, সোনালি আলো, বাসযোগ্য পৃথিবী।’
(ফিরিয়ে দাও)
মাহফুজুর রহমান আখন্দের কবিতা সমকালীন জীবন ও সমাজের নানা ঘাত-প্রতিঘাতে সৃষ্ট মানবতার বিপর্যয়ের পূর্ণ প্রতিভাস। বৈশ্বিক পরিবর্তনের হাওয়ায় মানুষের মনুষ্যত্ব পরিবর্তনে সৃষ্ট নানা অভিঘাতে কবির চিত্ত ব্যথিত। সমাজ, দেশ, জাতি ও দেশের মানুষের একান্ত সুহৃদ বিবেচনায় তার স্বীয় দায়বদ্ধতাকে সমীহ না করে পারা যায় না।

 

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.