সৈয়দ রনোর কবিতা নব ফসলের বার্তা

নিরঞ্জন অধিকারী

সাহিত্যিক সৈয়দ রনো বাংলাদেশের সাহিত্যের জগতে নবাগত নন। তাঁর সৃষ্টিসম্ভারে প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা চল্লিশ। বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী তিনি। কবিতা, গল্প, উপন্যাস, নাটক প্রভৃতি ক্ষেত্রে সমানতালে তার বিচরণ। সম্পাদনা করেছেন একাধিক গ্রন্থ। যেমন, মানিকগঞ্জের কবি ও কবিতা। সম্পাদনা করে যাচ্ছেন ‘অন্যধারা’ নামক একটি সাপ্তাহিক পত্রিকা। আবার নাট্য নির্দেশনার কাজেও তিনি ব্রতী হয়েছেন। এরই মধ্যে একজন নিষ্ঠাবান আবৃত্তিকার হিসেবেও তিনি তাঁর দক্ষতা প্রদর্শন করে যাচ্ছেন।
আবার একজন তীক্ষèধী গবেষক হিসেবেও তিনি নিবিষ্ট। ‘লোকসংস্কৃতিতে ধুয়া গান’ শীর্ষক গবেষণাকর্মে নিরত রয়েছেন তিনি তাপসের তন্ময়তায়।
সমাজের বৈষম্য, অর্থনৈতিক অসাম্য তাঁকে ব্যথিত করে। তাই তিনি সমাজসংস্কারে সক্রিয় কর্মী। শিক্ষার প্রসারে উৎসাহী। নিজ গ্রাম হিজুলীয়ায় (মানিকগঞ্জ জেলা) হিজুলীয়া ভিআরএন হাইস্কুলের প্রতিষ্ঠাতা প্রধান শিক্ষক হিসেবে তাঁর কর্মধারা তাঁর শিক্ষাব্রতের এক উজ্জ্বল দৃৃষ্টান্ত।
একজন লেখকের লেখার মূলে থাকে তাঁর নিজস্ব জীবন ও জগৎ-ভাবনা। জীবন ও জগতের প্রতি তাঁর দৃষ্টিভঙ্গিই কবিতার রূপে আত্মপ্রকাশ করে। তবে লেখা শুরুর সাথে সাথেই এ জীবন ও জগৎ-ভাবনা পরিপূর্ণ রূপ পায় না, ধীরে ধীরে তা পরিপক্বতা অর্জন করে। এমনকি লেখকের জীবন ও জগৎ-ভাবনা এবং তার রূপায়ণের প্রকরণ-শৈলীতেও পরিবর্তন ঘটে যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে লেখক নিজেকেই নিজে অতিক্রম করে যানÑ অতিক্রম করতে থাকেন। উদাহরণ হিসেবে আমরা বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাব্যসাধনার প্রতি দিক্পাত করতে পারি। তিনি প্রথম যে ভাবকে যে রীতিতে রূপায়িত করছিলেন, পরে তাতে পরিবর্তন এসেছে। ব্রহ্মবোধ রূপায়িত হয়েছে বিশ্ববোধ ও বিশ্বপ্রেমে, ছন্দে এসেছে মুক্তক ও গদ্যের রীতি।
কবি সৈয়দ রনোর কবিতা বিশ্লেষণ করলে এ উপলব্ধি হয় যে কবি সচেতনভাবেই সমাজমনস্কতাকে কাব্যসাধনার কেন্দ্রে স্থাপন করেছেন, কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য যেমন করেছিলেন। তবে কবিতার আঙ্গিকগত নিরীক্ষাতেও তিনি সমান আগ্রহী। আলোচনার সময় আমরা মনে রাখব, কবি সৈয়দ রনো সম্পর্কে কোনো চূড়ান্ত মন্তব্য করা ঠিক হবে না, কারণ তিনি বয়সের বিচারে চল্লিশের কোটায়Ñ এখনো তিনি গভীরতায় ও তীব্রতায় মণ্ডিত শিল্পসাধনা করে চলেছেন। জীবনের অন্তিম পর্বে এসে রবীন্দ্রনাথ চিত্রশিল্পের সাধনায় নিমগ্ন হয়ে অসাধারণ আমাদের বক্তব্য হবে, তাঁর সাধনালব্ধ সাম্প্রতিককাল পর্যন্ত সঞ্চিত রচনারাজি। কবি রনো সমাজের শোষণ-নিপীড়ন দূর করে একটি সুখী-সুন্দর বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার আকাক্সক্ষাকে উচ্চকিতভাবেই প্রকাশ করেছেন। যাঁরা সমাজ পরিবর্তনের সংগ্রামে আত্মনিবেদিত, সেইসব মুক্তিকামী বীরদের কবি ভালোবাসেনÑ
আমি ভালোবাসি /বাংলা মায়ের সন্তান, আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা
কৃষক-শ্রমিক-মজুর খেটে খাওয়া অবহেলিত মানুষ
দারিদ্র্যের নির্মম কশাঘাত হতে মুক্তিকামী মহান বীরদের
আমি ভালোবাসি।
[আমি ভালোবাসি]
সার্বিক মুক্তিকামী বলেই অর্থ-বিত্ত-ক্ষমতার প্রাচুর্যে দাম্ভিক ও নিপীড়কদের বর্বরতা তাঁকে ব্যথিত করে। কবি আর্তনাদ করে ওঠেন স্বপ্নবিনষ্টির বেদনায়Ñ
দুর্বলের প্রতি সবলের অনিয়ম অবিচার/ যুগ যুগ ধরে চলছে।
সভ্যযুগে এ কোন বর্বরতা /প্রতিবাদ করার কেউ কি নেই সারা বিশ্বে?/ এত ভয় এত কষ্ট যন্ত্রণা নিয়ে/ মাথা গুঁজবার কোথাও বিন্দুমাত্র জায়গা নেই।/ বড় সাধ জাগে পৃথিবীতে বেঁচে থাকার
আদর সোহাগ নিয়ে জীবন উপভোগ করার/ বোমা হামলায় ক্ষত-বিক্ষত হয় সকল স্বপ্ন।
[চারিদিকে যুদ্ধ]
সমাজের নির্মম বাস্তবতার জনারণ্যে মানুষ বড় একা। সামষ্টিক কল্যাণচিন্তার পরিবর্তে ব্যক্তিস্বার্থের প্রতিই দৃষ্টি নিবদ্ধ। ব্যক্তিমালিকানামূলক আর্থসামাজিক অবস্থায় এ পরিস্থিতি অনিবার্য। তাই ব্যক্তিস্বার্থকেন্দ্রিক মানুষেরা অপরের দুঃখ-দুর্দশার প্রতি প্রায়ই উদাসীনÑ
কেউ কারো দুঃখ দুর্দশা হতাশা বেদনা অপমান ধিক্কার
লাঞ্ছনা মর্মে মর্মে উপলব্ধি করা কাহিনী শোনাতে চাইলে
সযতেœ পাশ কাটিয়ে চলে যায়/ সান্ত¡না বাক্য ব্যয়ের
কারো সময় নেই।
[কারো সময় নেই]
কবি সৈয়দ রনো প্রেমের কবিতাও লিখেছেন। কিন্তু তাঁর প্রেমের কবিতাগুলোর বেশির ভাগই বিরহাক্রান্ত, অতৃপ্ত আত্মার হাহাকার সেখানে ধ্বনিতÑ
আরতির আগমনে আম্রকাননে
ফুল ফুটে সৌরভে পূর্ণতা পেয়েছিল।
দিনমান সময় ছিল সদা প্রফুল্লতায় ভরা
সান্নিধ্য দর্শনে আকাশের মতো মনটা ব্যাকুলতা নিয়ে
অধীর আগ্রহে তটস্থ থাকতÑ
কখন আসবে আরতি! কখন আসবে আরতি!
[অভিশপ্ত ভালোবাসা]
তবে কবির বক্তব্য প্রকাশের ঋজুতা কাব্যিক প্রকাশ পরোক্ষতাকে বহু স্থলে ব্যাহত করেছে। এটা কবি রনোর কবিতার শিল্পমানের ক্ষেত্রে একটি ঋণাত্মক দিক বলে আমাদের কাছে প্রতিভাত হয়েছে।
কবি রনোর কবিতায় গ্রামবাংলার পরিবেশের অনুপুঙ্খ চিত্র পাই, যেগুলো তাঁর কবিতার ঐশ্বর্য। সেখানে শস্যে ভরা ধান-কাউনের মাঠ, ঝিঁঝি পোকার শব্দ, চিল-শালিকের ডানা ঝাপটানো কিংবা শৃগালের ডাক যেমন গ্রামবাংলার নিসর্গ পরিবেশকে চিহ্নিত করে, তেমনি খেয়া পারের যাত্রী, দাঁড়টানা মাঝি, কৃষকের কাঁধে লাঙল-জোয়াল গ্রামজীবনের চিত্রকে প্রকাশ করে অনন্যকুশলতায়। অন্য দিকে, নাগরিক জীবনের কূটাভাস, বঞ্চনা ভণ্ডামির প্রকাশেও তিনি দক্ষÑ
নিরীহ মানুষের রক্তে রঞ্জিত দুহাত/প্রসারিত করে শান্তি আহ্বান জানাতে/ লজ্জা নেই ওদের।
[চারিদিকে যুদ্ধ]
এই নির্লজ্জ শোষকের শোষণের বিরুদ্ধে, এদের অমানবিক আচরণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী সমাজমনস্ক কবি সৈয়দ রনো। এই প্রতিবাদী চেতনা ও মানবিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দীর্ণ বুকে ধরন করে রক্তাক্ত হতে কবি কাব্যযুদ্ধ করে চলেছেন। এ যুদ্ধে তাঁর সঙ্গে আমাদেরকেও অবতীর্ণ হওয়ার আহ্বান জানাতে জানাতে চলেছেন। এ আহ্বানের আকুতিই সৈয়দ রনোর কবিতার প্রেরণা ও প্রাণ। ।

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.