ঢাকা, মঙ্গলবার,১৬ জানুয়ারি ২০১৮

ইসলামী দিগন্ত

আসুন শীতার্তদের পাশে দাঁড়াই

ড. মোহাম্মদ আতীকুর রহমান

২৯ ডিসেম্বর ২০১৭,শুক্রবার, ০০:০০


প্রিন্ট

মানুষ মানুষের জন্য, জীবন জীবনের জন্য। মানুষের বিপদের সময় তার পাশে থেকে সাধ্যানুযায়ী সহযোগিতা করাই মানুষের মূল ব্রত হওয়া উচিত। একটু সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিলে যদি একটি প্রাণ বাঁচে, একজন মানুষ বাঁচার স্বপ্ন দেখে তাতেই হয়তো জীবনের সার্থকতা খুঁজে পাওয়া সম্ভব। বিভিন্ন সময় আমাদের সমাজ-রাষ্ট্রে শীত, বন্যা ও খরাসহ নানা ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ নেমে আসে। তখন সমাজের কিছু মানুষ অর্থাভাবে কিংবা সহায়-সম্পত্তি হারিয়ে চরম অসহায় হয়ে পড়ে। ঠিক তখনই তাদের প্রয়োজন হয় সাহায্য-সহযোগিতার।
ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে শীত। কোনো কোনো জায়গায় হাড়কাঁপানো শীত পড়েছে, সামনের দিনগুলোতে স্বাভাবিকভাবেই এর তীব্রতা বাড়ার কথা। তাই এখনই দরকার প্রয়োজনীয় উদ্যোগ ও সৎ চেষ্টা। আর্থিকভাবে সচ্ছল ব্যক্তি শীত নিবারণে শীতবস্ত্র ক্রয় করতে পারলেও তারা একবারও কি ভেবে দেখেছেন, এ শীতে অনাথ পথশিশু, ফুটপাথে রাত কাটানো মানুষগুলো, ভিক্ষুক, অসহায় বয়োঃবৃদ্ধ, বস্ত্রহীন মানুষ ও তাদের অসহায় সন্তানরা কতটা কষ্টে আছে? অনেকে শীত সহ্য করতে না পেরে মারাও যাচ্ছে। এদের প্রতি আমরা কি দায়িত্ব পালন করেছি বা করছি? সর্বোপরি চরম নির্যাতনের মুখে স্বদেশ ত্যাগ করে কেবল জীবন নিয়ে আসা কপর্দকহীন প্রায় ১০ লাখ রোহিঙ্গা মুসলিমের কথা আমরা একবারও কি ভেবে দেখেছি?

সমাজের বিত্তবান ও মানবিক বোধসম্পন্ন ব্যক্তিরা যদি দুর্দশাগ্রস্ত মানুষগুলোর পাশে এসে না দাঁড়ায় তাহলে তারা কী জবাব দেবে মহান আল্লাহর কাছে? অসহায় মানুষের প্রতি সহযোগিতার হাত বাড়ানোর পরামর্শ দিয়ে মহানবী সা: বলেছেন, মহান আল্লাহ বিচারের দিন বলবেনÑ হে আদম সন্তান, আমি পীড়িত ছিলাম; তুমি আমার সেবা করোনি; আমি ক্ষুধার্ত ছিলাম তুমি আমাকে আহার্য দাওনি; আমি তৃষ্ণার্ত ছিলাম তুমি আমাকে পানি পান করাওনি। তখন বান্দা বলবেÑ ইয়া রব, আপনি সব কিছুর মালিক। আপনি কিভাবে পীড়িত হয়েছিলেন, কিভাবে ক্ষুধার্ত ও তৃষ্ণার্ত হয়েছিলেন? আর আমি আপনার বান্দা কিভাবে আপনার খিদমত করব, সেবা করব, খাদ্যপানীয় দেবো? আপনিই তো সমগ্র সৃষ্টিজগতের প্রতিপালক। তখন আল্লাহ বলবেন, আমার অমুক বান্দা পীড়িত হয়েছিল। তুমি তার সেবা করোনি, আমার অমুক বান্দা ক্ষুধায় কাতর হয়ে তোমার কাছে আহার্য চেয়েছিল, তুমি তাকে খেতে দাওনি। আমার অমুক বান্দা তৃষ্ণার্ত ছিল, তুমি তাকে পানি দাওনি। যদি তুমি সেই পীড়িতের সেবা করতে, ক্ষুধার্তকে আহার দিতে ও তৃষ্ণার্তকে পানি দিয়ে সাহায্য করতে তাহলেই আমাকে সেবা করা, আহার্য দেয়া ও পানি পান করানো হতো।
ঋতুর পালাবদলে শীত আসে, শীত যায়। হাড়কাঁপানো শীতে অসহায় মানুষের অসহায়ত্ব আরো প্রকট হয়ে ওঠে। এ মুহূর্তে প্রয়োজন একজন মানুষ হিসেবে অপরের প্রতি দয়া প্রদর্শন করে আল্লাহর ভালোবাসা লাভ করা। আল্লাহর ভালোবাসা লাভের এ সুবর্ণ সুযোগ প্রাপ্তির কথা উল্লেখ করে মহানবী সা: বলেছেন, তোমরা ক্ষুধার্তকে খাদ্য দাও, রুগ্ন ব্যক্তির সেবা করো ও বন্দীকে মুক্ত করো অথবা ঋণের দায়ে আবদ্ধ ব্যক্তিকে ঋণমুক্ত করো (বুখারি)।
নিঃস্বার্থভাবে বিপদগ্রস্ত মানুষের সাহায্য ও সেবা করা মহৎ ও পুণ্যময় কাজ। অসহায় মানুষের দুর্দিনে সাহায্য-সহযোগিতা, সহানুভূতি ও সহমর্মিতার মনমানসিকতা যাদের নেই, তাদের ইবাদত আল্লাহর দরবারে কবুল হওয়ার সম্ভাবনা নেই। কাজেই নামাজ, রোজা, হজ ও জাকাত আদায়ের সাথে সাথে কল্যাণের তথা মানবিকতা ও নৈতিকতার গুণ অর্জন করাও জরুরি। কেননা মানবিক গুণ অর্জনের মাধ্যমে ব্যক্তি মুত্তাকি হওয়ার পথে এগিয়ে যেতে পারে। মহান আল্লাহ বলেন, যারা আল্লাহ প্রেমে আত্মীয়স্বজন, পিতৃহীন, অভাবগ্রস্ত, পর্যটক, সাহায্যপ্রার্থীকে ও দাসমুক্তির জন্য অর্থ দান করে, সালাত কায়েম করে এবং প্রতিশ্রুতি দিয়ে তা পূর্ণ করে, অর্থসঙ্কটে, দুঃখ-কেশে ও সংগ্রাম সঙ্কটে ধৈর্য ধারণ করেÑ তারাই সত্যপরায়ণ এবং তারাই মুত্তাকি (সূরা বাকারা : ১৭৭)।
শীতার্ত বস্ত্রহীন মানুষকে উপকারে পরকালীন পুরস্কার প্রাপ্তির কথা ঘোষণা করে মহানবী সা: বলেছেন, এক মুসলমান অন্য মুসলমানকে কাপড় দান করলে আল্লাহ তাকে জান্নাতে পোশাক দান করবেন। ক্ষুধার্তকে খাদ্য দান করলে আল্লাহ তাকে জান্নাতের সুস্বাদু ফল খাওয়াবেন। কোনো মুসলমানকে তৃষ্ণার্ত অবস্থায় পানি পান করালে আল্লাহ তাকে জান্নাতের সিলমোহরকৃত পাত্র থেকে পবিত্র পানি পান করাবেন (আবু দাউদ)।
শীতার্তদের শীত নিবারণসহ অসহায় মানুষের দুর্দশা লাঘব মানুষের নৈতিক দায়িত্ব। রাসূল সা: বলেছেন, যে ব্যক্তি কোনো মুমিনের পার্থিব একটি মুসিবত দূর করবে, আল্লাহ কিয়ামতের দিন তার মুসিবতগুলো দূর করে দেবেন। আর যে ব্যক্তি কোনো অভাবী মানুষকে সচ্ছল করে দেবে, আল্লাহ তাকে ইহকালে ও পরকালে সচ্ছল করে দেবেন এবং আল্লাহ বান্দার সাহায্য করবেন যদি বান্দা তার ভাইয়ের সাহায্য করে (মুসলিম)।
লেখক : প্রবন্ধকার

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫