দেশেই পাওয়া যাচ্ছে থ্রিডি প্রিন্টার

প্রযুক্তি দুনিয়ার নিত্যনতুন উদ্ভাবন প্রতিনিয়ত পাল্টে দিচ্ছে আমাদের জীবনধারা। একসময় প্রিন্টারের নাম শুনলেই আমাদের চোখের সামনে ভেসে উঠত কাগজের ওপর কালি দিয়ে কোনো তথ্য প্রিন্ট করার দৃশ্য। আর এখন প্রযুক্তির কল্যাণে থ্রিডি প্রিন্টার দিয়ে যেকোনো বস্তু বাস্তবে তৈরি করা সম্ভব। থ্রিডি প্রিন্টারের বর্তমান প্রেক্ষাপট নিয়ে লিখেছেন নাজমুল হোসেন

থ্রিডি প্রিন্টারের ধারণাটি আমাদের কাছে নতুন হলেও এ নিয়ে গবেষণা চলছে বেশ কয়েক দশক ধরে। ১৯৮৪ সালে থ্রিডি সিস্টেমস কর্পের চাক হাল প্রথম থ্রিডি প্রিন্টার তৈরি করেন। এটি এমন একটি ব্যবস্থা যেখানে কোনো একটি ত্রিমাত্রিক বস্তুর প্রস্থচ্ছেদের নমুনা তৈরি করার পর এটিকে বাস্তবে রূপান্তর করা যায়। একে থ্রিডি প্রিন্টিং বা থ্রিডি লেয়ারিং ছাড়াও স্টেরিওলিথোগ্রাফি বলা হয়ে থাকে। একবিংশ শতাব্দীর শুরু থেকেই এ নিয়ে গবেষণা এগিয়ে চলছে। বর্তমানে দেশেই থ্রিডি প্রিন্টার পাওয়া যাচ্ছে।
দেশের বাজারে থ্রিডি প্রিন্টার বিপণন করছে টেকনোনিডস নামে তরুণ উদ্যোক্তাদের একটি প্রতিষ্ঠান। তরুণ উদ্যোক্তাদের এই প্রতিষ্ঠানটি থ্রিডি প্রিন্টার বিক্রির পাশাপাশি থ্রিডি প্রিন্টিং সেবাও দিচ্ছে। টেকনোনিডস তাইওয়ান থেকে আমদানি করছে পাঁচটি মডেলের প্রিন্টার। এগুলোর দাম ৯৫ হাজার টাকা থেকে শুরু। এসব প্রিন্টারে আছে এক বছরের সার্ভিস ওয়ারেন্টি।
উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে চার বন্ধু শুরু করেন টেকনোনিডস। ইমরান আহমেদ ও আরিফুল হক খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফার্মেসিতে অধ্যয়ন শেষে থ্রিডি প্রিন্টিং নিয়ে কাজ শুরু করেন। সাথে দুই বন্ধু আমির জুবায়ের ও খালিদ সালাউদ্দিন যুক্ত হন তাদের সাথে। জুবায়ের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং আর খালিদ সালাউদ্দিন সিএসই নিয়ে পড়ালেখা করেছেন। তিনটি ভিন্ন বিষয় নিয়ে পড়ালেখা করে আসা চার বন্ধু একত্র হয়ে শুরু করেন টেকনোনিডস। তাদের লক্ষ্য দেশেই নতুন ধরনের প্রযুক্তিসামগ্রী, বিশেষ করে ফার্মাসিউটিক্যালসের প্রয়োজনীয় ইলেকট্রিক্যাল ও ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতি তৈরি করা। নিজেদের ডিজাইন করা নতুন ধরনের পণ্য তৈরির উদ্দেশ্যেই দেশে থ্রিডি প্রিন্টার বাজারজাত শুরু করেছেন তারা। দেশে থ্রিডি প্রিন্টিংয়ের সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে কাজ করছে টেকনোনিডস।
ইমরান আহমেদ জানিয়েছেন, থ্রিডি প্রিন্টিংয়ের ধাপ দু’টি। প্রথমত, যা প্রিন্ট করতে চান তার একটি থ্রিডি মডেল আপনার কাছে থাকতে হবে। যেকোনো থ্রিডি মডেল সফটওয়্যারে এটি তৈরি করে নেয়া যায়। থ্রিডি মডেলিং না জানলেও হতাশ হওয়ার কিছু নেই। ইন্টারনেটে অসংখ্য থ্রিডি মডেল বিনা মূল্যেই পাওয়া যায়। যেভাবে গান অথবা ছবি ইন্টারনেট থেকে ডাউনলোড করা হয়। সেভাবে এই মডেলগুলো ডাউনলোড করে নিতে পারবেন। এরপর থ্রিডি প্রিন্টার সফটওয়্যার দিয়ে ওপেন করে প্রিন্ট দিলেই প্রিন্টারে কমান্ড বা নির্দেশনা চলে যাবে। এর পর স্তরে স্তরে প্রিন্ট করে সম্পূর্ণ বস্তুটি তৈরি করে দেবে প্রিন্টার।
ইমরান বলেন, রোবট নিয়ে যদি কেউ কাজ করতে চান তারও দরকার এই প্রিন্টার। শুধু প্লাস্টিক দিয়ে তৈরি বস্তুই নয়, থ্রিডি প্রিন্টারে প্রিন্ট করানো যাবে খাবার। এগুলো থ্রিডি ফুড প্রিন্টার। খাবারের উপাদান এতে যুক্ত করবেন সুন্দরভাবে আপনাকে সেই খাবার প্রিন্ট করে দেবে ফুড প্রিন্টার। আগামী দিনে দেশের বাজারে এই প্রিন্টার বিক্রি শুরু করবে টেকনোনিডস। টেকনোনিডসের সেবা সম্পর্কে বিস্তারিত জানা যাবে এই (িি.িঃবপযহড়হববফং.পড়স) ওয়েবসাইটে।
ইমরান আহমেদ আরো জানান, থ্রিডি প্রিন্টারে একের পর এক স্তর তৈরি করে একটি বস্তু নির্মাণ করা হয়। এই প্রিন্টার দিয়ে যে বস্তুটি প্রিন্ট করা হবে তার প্রস্থচ্ছেদ করে এসব স্তর তৈরি করে তা জুড়ে দেয়ার নির্দেশ দেয়া হয় থ্রিডি প্রিন্টারে।
বর্তমানে ফটোটাইপ, আর্কিটেকচারাল মডেল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্বাস্থ্য উপকরণ, খেলনা, মডেল টাউন, রেপ্লিকা, মাইক্রোবায়োলজিকার ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র ভাইটেরিয়া, ভাইরাসের মডেল তৈরিসহ অসংখ্য কাজে এটি ব্যবহৃত হচ্ছে থ্রিডি প্রিন্টার। আমাদের দেশে রোবটিক্স নিয়ে যারা কাজ করছেন তাদের জন্য আশীর্বাদ হতে পারে থ্রিডি প্রিন্টার। রোবটের শারীরিক কাঠামো তৈরি করতে থ্রিডি প্রিন্টার আশীর্বাদ হতে পারে।
বর্তমানে চিকিৎসা ক্ষেত্রে এই প্রযুক্তির প্রচুর ব্যবহার হচ্ছে। কৃত্রিম অঙ্গ ও হাড় তৈরিতে এটি ব্যবহৃত হচ্ছে। মানব অঙ্গ তৈরিতেও এতে সাফল্য আসছে, থ্রিডি প্রিন্টারের কল্যাণে আগামী দিনের চিকিৎসাবিজ্ঞানের জগৎটা একদমই পাল্টে যাচ্ছে।
ধরুন আপনার মাইক্রোওয়েভ ওভেনের একটি পার্টসের জরুরি প্রয়োজন হলে আপনাকে বাজারে যেতে হবে, পছন্দ করতে হবে, দরদাম করে তার পর কিনতে হবে। অনেক সময়ের ব্যাপার। আবার পার্টসটি খুঁজে নাও পেতে পারেন। এ ক্ষেত্রে আপনার ঘরে থাকা থ্রিডি প্রিন্টারের মাধ্যমে চাইলেই আপনি তৈরি করতে পারবেন পার্টসটি।
স্বাভাবিক প্রিন্টিং মেশিন কাগজের ওপর প্রিন্ট করার জন্য বানানো হয়েছে। কাগজের পৃষ্ঠতল দ্বিমাত্রিক। সময়ের পরিবর্তনের সাথে সাথে নতুন প্রযুক্তির আগমন ঘটে। প্রিন্টিংয়ের ক্ষেত্রে নতুন প্রযুক্তি হিসেবে আগমন ঘটেছে থ্রিডি প্রিন্টিং মেশিনের, যা কি না খুব সাধারণভাবে তিন অক্ষে (ীুু) প্রিন্ট করে থাকে। আমাদের শুধু সলিড ওয়ার্কের মতো একটি সিএডি (ঈঅউ) সফটওয়ারকে তথ্য দিতে হবে। সলিড ওয়ার্কে নকশা করা বস্তুর বাস্তব রূপ দেবে এই থ্রিডি প্রিন্টার।
ব্যবহারকারী কম্পিউটারে সফটওয়্যারের মাধ্যমে কোনো বস্তুর ত্রিমাত্রিক মডেল তৈরি করেন। এরপর একে কয়েকটি স্তরে বিন্যস্ত করেন। প্রতিটি স্তর সম্পর্কে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে সফটওয়্যারে তথ্য প্রবেশ করান। প্রিন্টার এ তথ্য আবার বিশ্লেষণ ব্যবহারকারীর নির্দেশিত পথে একের পর এক স্তর তৈরি করে। এভাবে সব স্তর সম্পন্ন হলে তৈরি হয় কাক্সিক্ষত বস্তু। ব্যাপারটা অনেকটা ইটের গাঁথুনি দিয়ে বাড়ি বানানোর মতোই।
এরই মধ্যে থ্রিডি প্রিন্টার নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। থ্রিডি প্রিন্টার কপিরাইট বা মেধাস্বত্ব নীতির ওপরও হুমকিস্বরূপ হলেও এটি অস্বীকার করার উপায় নেই যে, থ্রিডি প্রিন্টিং মানুষের জীবনে নিয়ে আসতে পারে যুগান্তকারী পরিবর্তন।

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.