দুর্নীতির সর্বজনীন রাহুগ্রাসের সাতকাহন!
দুর্নীতির সর্বজনীন রাহুগ্রাসের সাতকাহন!

দুর্নীতির সর্বজনীন রাহুগ্রাসের সাতকাহন!

গোলাম মাওলা রনি

আমাদের শিক্ষামন্ত্রী নিজ মন্ত্রণালয়ের অধীনস্ত অসৎ কর্মকর্তাদের দুর্বৃত্তায়নে মনে হয় প্রচণ্ড আশাহত হয়ে পড়েছেন। সীমাহীন ঘুষ, দুর্নীতি, লুটপাট, অনিয়ম প্রভৃতি বহু কর্ম সরকারের অন্যান্য দফতরের মতো তার মন্ত্রণালয়কেও জেঁকে ধরেছে। পুলিশ, শুল্কবিভাগ, আয়কর বিভাগ, ভূমি অফিস ও বন্দর প্রভৃতি দফতরের ঘুষ-দুর্নীতি মনে হয় লোকজন মেনে নিয়েছে। কাজেই ওসব বিভাগে কেউ দুর্নীতি না করলে সেটা জাতীয় পত্রিকায় শিরোনাম হয়। শিক্ষা মন্ত্রণালয়, ধর্ম মন্ত্রণালয়, বিচার বিভাগ, দুর্নীতি দমন কমিশন প্রভৃতি সরকারি অফিস সম্পর্কে মানুষ এখনো পুরোপুরি নিরাশ হয়নি। তাই ওসব প্রতিষ্ঠানকে ঘুষ ও দুর্নীতিমুক্ত রাখার জন্য নানা জনে নানা বুদ্ধি পরামর্শ দেয়ার পাশাপাশি বিভিন্ন দাবিনামাও উত্থাপন করে থাকেন।

হাল আমলে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সব স্তরে ব্যাপক দুর্নীতি ও অনিয়ম নিয়ে যেন সমালোচনা হচ্ছে। শিক্ষামন্ত্রী যেহেতু ব্যক্তিগতভাবে সৎ, সেহেতু দুর্নীতির খোঁটাটা আরো বেশি মাত্রায় তাকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়।

বিষয়টি অনেকটা এমন- নিজে সৎ হয়ে লাভ কি, অন্যের দুর্নীতি তো বন্ধ করতে পারছেন না। অথবা শুধু সৎ হলেই হবে না, দক্ষ হতে হবে। কেউ কেউ হয়তো আরো নির্মম সমালোচনা করে হররোজ শিক্ষামন্ত্রীকে বিব্রত করে তোলেন। এরই পরিপ্রেক্ষিতে বিব্রত মন্ত্রী মহোদয় হয় মুখ ফসকে নতুবা নির্মম বাস্তবতা মেনে নিয়ে দুর্বৃত্তদের বিরুদ্ধে খেদোক্তি করে বলেছেন- ঘুষ খান, তবে সহনীয় মাত্রায় খান। তিনি আরো বলেছেন, আমার মন্ত্রণালয়ের কাউকে যদি চোর বলা হয় তবে মন্ত্রী হিসেবে আমিও চোর হয়ে যাই।
শিক্ষামন্ত্রীর বক্তব্যের পর অনেকে নানামুখী সমালোচনা শুরু করেছেন। কেউ বলছেন- এটা কোনো কথা হলো! একজন মন্ত্রী এভাবে কথা বলার আগে তার পদত্যাগ করা উচিত ছিল। একজন প্রভাবশালী মন্ত্রী তো বলেই ফেললেন- নাহিদ সাহেব চোর হতে পারেন- আমরা চোর নই। সমালোচকেরা যে যাই বলুন না কেন, আমি কিন্তু আমাদের শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদের পক্ষে। কারণ, তিনি সত্য কথা নির্ভয়ে বলতে পেরেছেন। অধিকন্তু তার বক্তব্যের মধ্যে যেমন কোনো ছলচাতুরী ছিল না, তেমনি একটি রূঢ় বাস্তব এবং জাতীয় ব্যাধির বিরুদ্ধে তিনি যে কতটা অসহায় তা তার বক্তব্যের মাধ্যমে ফুটে উঠেছে। আমরা যদি তার বক্তব্যকে ইতিবাচক হিসেবে গ্রহণ করে দুর্নীতির বিরুদ্ধে সর্বজনীন জনমত সৃষ্টি করি এবং দুর্নীতিবাজদের ঘৃণা জানানোর পাশাপাশি সামাজিকভাবে বয়কট করতে আরম্ভ করি, তবে হয়তো অদূর ভবিষ্যতে পরিস্থিতির সার্বিক উন্নয়ন ঘটবে।

শিক্ষামন্ত্রীর বক্তব্যের সূত্র ধরে আমরা যদি বাংলাদেশের দুর্নীতির চালচিত্র মূল্যায়ন করি তবে লক্ষ করব যে, দুর্নীতিবাজেরা রীতিমতো স্বরাজ কায়েম করেছে। দেশের সর্বত্রই তাদের দুর্দান্ত দাপট এবং সীমাহীন প্রভাব প্রতিপত্তি হাড়ে হাড়ে টের পাওয়া যায়। তারাই এখন কারাগার থেকে দেবালয় অথবা বিনোদনকেন্দ্র থেকে সচিবালয় নিয়ন্ত্রণ করছেন। তাদের লাঠি, পিস্তলের গুলি এবং পেটোয়া বাহিনীর হুঙ্কারে নীরিহ জনগণের প্রাণ প্রায় ওষ্ঠাগত। তারা নিজেরা দুর্নীতি করছেন এবং অপরকে দুর্নীতিবাজ বানিয়ে নিজেদের দল ভারী করার চেষ্টা করছেন। তারা চরিত্রবান ও সৎ লোকদের নানাভাবে নাজেহাল করে তাদের চেয়েও বড় দুর্নীতিবাজ সাজানোর অপচেষ্টা করে সমাজ থেকে সুধীজনকে নির্বাসনে পাঠাচ্ছেন।

এখনকার দুর্নীতিবাজদের হৃদয় বলে কিছু নেই। তারা দুর্নীতির স্বার্থে মা-বাবাকেও হত্যা করতে কুণ্ঠিত নয়। নিজ স্ত্রী-কন্যাদের সম্ভ্রম বিক্রি তাদের নিকট নস্যি। রাষ্ট্রের স্বার্থ বিক্রি, আত্মমর্যাদা বিসর্জন দিয়ে পশুর মতো নোংরা জীবনযাপন এবং পাপিষ্ঠ হওয়ার প্রতিযোগিতায় শয়তানের নিকৃষ্টতাকে ম্লান করে দেয়ার অদম্য চেষ্টা নিয়ে দুর্নীতিবাজরা নিত্যনতুন দুর্নীতির ফন্দিফিকির আবিষ্কার করেই চলেছে। তারা দুর্নীতির ওপর সাঙ্কেতিক ডিগ্রি অর্জন করে দুর্নীতিকে রীতিমতো নান্দনিক শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে গেছে। ফলে অতীতকালে যেমন দুর্নীতিবাজদের মানুষ ঘৃণা করত এবং তাদের সাথে কোনো আত্মীয়তার সম্পর্ক করত না, তেমনটি এখন আর নেই। এখনকার বাস্তবতা হলো দুর্নীতিবাজদের সভামঞ্চে বসিয়ে পুষ্পমাল্যে ভূষিত করার পাশাপাশি তাদের নিয়ে নানা প্রশংসা ও স্তুতিবাক্য সংবলিত মানপত্র রচনা ও তা পাঠ করার মধ্যে অনেক মানুষ তাদের মনের জন্মের সার্থকতা খুঁজে বেড়ান।

দুর্নীতি এখন আমাদের জাতীয় নীতিতে পরিণত হয়েছে। এটি এখন বেশির ভাগ মানুষের প্রধান খাদ্য। একই সাথে এটি তাদের মাথার মুকুট ও পরিধেয় বস্ত্রের মর্যাদা লাভ করেছে। এটি যেমন তাদের বাহনে পরিণত হয়েছে, তেমনি তাদের বিশ্রাম, বিনোদন এবং মর্যাদার প্রতীকে রূপান্তরিত হয়েছে। এটি বলবর্ধক, সৌন্দর্য সৃষ্টিকারী এবং মেদ ও গোশত বৃদ্ধিকারী এক আজব মাহৌষধের মর্যাদা লাভ করেছে। এটি নারী-পুরুষের কমনীয়তা ও কামভাব বাড়িয়ে তোলে, সমাজ ও রাষ্ট্রকে নিয়ন্ত্রণ করে এবং দুর্নীতিবাজদের প্রাণভ্রমরা হিসেবে কাজ করে। এটির ধ্বংসাত্মক ক্ষমতা যে কোনো মারণাস্ত্র অথবা জীবাণু অস্ত্রের চেয়েও মারাত্মক। ফলে কেউ ইচ্ছে করলেই দুর্নীতি ও দুর্নীতিবাজদের প্রতিহত, পরিহার অথবা বর্জন করতে পারেন না। সময়ের বিবর্তনে দুর্নীতি হয়েছে যুগোপযোগী, আধুনিক এবং শিল্পসম্মত। দুর্নীতিতে যেমন উন্নয়নের ছোঁয়া লেগেছে, তেমনি এখানে সর্বোচ্চ প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করা হয়েছে। ফলে আগের মতো হাত পেতে ঘুষ নেয়া, নগদ লেনদেন কিংবা বালি, তোশক ও জাজিমের মধ্যে দুর্নীতির টাকা লুকিয়ে রাখার দিন শেষ। এখনকার দুর্নীতি হয় ইথারে, টাকা চলে যায় পাতালে এবং পাতাল থেকে ফাইবার অপটিকে ভর করে দুর্নীতির টাকা কৃত্রিম উপগ্রহের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে আকাশে। তারপর দুর্নীতিবাজ তার নিকট রক্ষিত মাইক্রোচিপসের মাধ্যমে আকাশের টাকা বাতাসের মাধ্যমে ছড়িয়ে ছিটিয়ে দেন

লন্ডন-আমেরিকা-জেদ্দা-রাশিয়া, বান্দরবন থেকে ভুটানের খাসিয়াঅবধি।
আধুনিক সভ্যতার ছোঁয়ায় দুর্নীতি এখন ছড়িয়ে পড়েছে সর্বত্র। ছেলে-বুড়ো সবাই দুর্নীতির সুধারসে নেশাগ্রস্ত হয়ে পড়েছেন। টেলিভিশনের টকশো, নাটক, সিনেমা, যাত্রাপালা থেকে শুরু করে মোবাইলের কথাবার্তার মধ্যেও দুর্নীতি ঢুকে পড়েছে। বালক-বালিকারা দুর্নীতিতে মজে মোবাইলে লুকিয়ে লুকিয়ে কথা বলছে এবং পর্নো দেখছে। একপা কবরে এবং এক পা দুনিয়ায় এমন বৃদ্ধ-বৃদ্ধারাও পরকীয়ার নেশায় নিজের জীবন সঙ্গী বা সঙ্গীনীর সাথে দুর্নীতি করছেন। রিকশাওয়ালা, মাছ বিক্রেতা, চাল, মরিচ বা কলা বিক্রেতা কেউই আজ দুর্নীতিমুক্ত নয়। এমনকি রাস্তার মোড়ের ভিক্ষুকটি দেদার দুর্নীতি করছেন। গৃহবধূ, স্কুল-কলেজের ছাত্রছাত্রী থেকে শুরু প্রাইমারি স্কুলের পিয়ন-চাপরাশি একে অপরের সাথে পাল্লা দিয়ে দুর্নীতিতে নিমজ্জিত হয়ে পড়ছেন। দুর্নীতির রাজ্যে সবাই যেন রবি ঠাকুরের গানের মতো- আমরা সবাই রাজার তথ্য অনুসরণ করে চলছেন।

আগেকার দুর্নীতির সুনাম, সুখ্যাতি এবং নীতি-নৈতিকতা এখন আর নেই। আগেকার দুর্নীতিবাজ ও ঘুষখোরেরা নিজেদের কুকর্মের জন্য অনুতপ্ত হতো এবং মাথা নিচু করে চলত। বর্তমানের দুর্নীতিবাজরা উল্টো দম্ভ করে বেড়ান এবং বুক ফুলিয়ে কোমর দুলিয়ে হেলেদুলে চলেন। আগে ঘুষ নিয়ে কাজ করা হতো কিন্তু বর্তমানে ঘুষ নিয়ে কাজ করে দেবে এমন কোনো গ্যারান্টি নেই। আগেকার দিনে হয়তো একজনের কাছ থেকে ঘুষ গ্রহণ করা হতো এবং বিশ্বস্ততার সাথে ঘুষখোর ঘুষদাতার পক্ষে কাজ করতেন। কোনো কারণে কাজ না হলে অতি গোপনে ঘুষের টাকা ফেরত দিত। ঘুষ লেনদেনও হতো অতি গোপনে। ঘুষখোর কর্মকর্তা অতি বিনময়ের সাথে মুচকি হেসে আকার ইঙ্গিতে তাকে ঘুষ দেয়ার জন্য প্ররোচিত করতেন। ঘুষদাতা দীর্ঘ সময় নিয়ে চিন্তাভাবনা করতেন, তিনি আদৌ ঘুষ প্রদা দেবেন কি, দেবেন না। তারপর ঘুষ দেয়া জরুরি হলে ঘুষের পরিমাণ নিয়ে দরদাম করতেন এবং কয়েকটি কিস্তিতে ঘুষ পরিশোধ করতেন। অনেক ক্ষেত্রে বাকিতেও ঘুষ লেনদেন হতো।

আবহমান বাংলার সাবেকী ঘুষ লেনদেনে এখন অদ্ভুত এক আধুনিকাতার ছোঁয়া লেগেছে। কিছু কিছু ঘুষ ও দুর্নীতির অঙ্ক দরদামের পরিবর্তে উন্মুক্ত টেন্ডারের মাধ্যমে সর্বোচ্চ দরদাতাকে ঘুষ প্রদানের সুযোগ করে দেয়া হয়। দুর্নীতিবাজেরা এখন আর বাকি বা কিস্তির দুর্নীতিতে বিশ্বাস করেন না। সব কিছুই এখন নগদ, অগ্রিম এবং ইন্টারনেট ব্যাংকিং, বিকাশ, মোবাইল ব্যাংকিং অথবা অফসোর ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে লেনদেন হচ্ছে। এখন দুর্নীতিবাজরা একাধিক লোকের কাছে থেকে ঘুষ নেন এবং ইচ্ছেমাফিক কাজ করে দেন একজনের। কখনো পরিস্থিতি এমন দাঁড়ায়, যখন অনেকের কাছ থেকে ঘুষ নেয়ার পরও তাদের কারো কাজ করে দেয়া হয় না। বরং চমক সৃষ্টির জন্য এমন একজনের কাজ করে দেয়া হয় যিনি আসলে কোনো ঘুষ প্রদান করেননি।

ঘুষ ও দুর্নীতির বিষয়ে সাম্প্রতিক সংস্কৃতি হলো একবার ঘুষের টাকা গৃহীত হলে তা কোনোমতে ফেরত দেয়া যাবে না। কেউ ফেরত চাইলে তাকে মারধোর-জুলুম নির্যাতন করে তার বাবার নাম ভুলিয়ে দেয়া হবে। এতেও যদি কাজ না হয় তবে গুম-হত্যা, অপহরণ ও ধর্ষণের মতো ঘটনা ঘটিয়ে ঘুষদাতাকে শায়েস্তা করতে হবে। ঘুষ লেনদেন হবে প্রকাশ্যে এবং সর্বোচ্চ ঘুষ গ্রহীতা জাতীয় বীরের মর্যাদায় সমাজে দাপিয়ে বেড়াবেন। ঘুষখোর সম্পূর্ণ স্বাধীন ও সার্বভৌম ক্ষমতা নিয়ে ঘুষের পরিমাণ নির্ধারণ, ঘুষ আদায়, বিতরণ, সংরক্ষণ ও ভোগদখল করবেন। তার এই একচ্ছত্র ক্ষমতায় কেউ ভাগ বসাতে পারবে না। তাদের পথে ঘাটে, হাটে-বাজারে এবং সভা-সমিতিতে বিশেষ মর্যাদা দান লোকজনকে বাধ্য করার জন্য ঘুষখোররা যখন দাবি আদায়ের সংগ্রামে অবতীর্ণ হওয়ার কথা ভাবছেন, তখন আমাদের অসহায় শিক্ষামন্ত্রী সহনশীল মাত্রায় ঘুষ নেয়া পরামর্শ দিয়ে সত্যিই কোনো মহাভারত অশুদ্ধ করে ফেলেছেন?

 

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.