নায়ক

জোবায়ের রাজু

দেশের জনপ্রিয় বেশ কয়েকজন নায়কের সাথে আমি বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন জায়গায় ছবি তুলেছি। ফেসবুকে সে ছবিগুলি ক’দিন পর পর আপলোড করছি। বেশ লাইকÑকমেন্টের ছড়াছড়ি সেসব ছবিতে।
তবে এসব ছবির প্রতি বেশ ইন্টারেস্টিং ফিল করে আকরাম। আমার ফেসবুকের নতুন বন্ধু সে। আমি নায়কদের সাথে ছবি তুলছি দেখে তার কৌতূহলের অন্ত নেই। কোথায় দেখা হলো, নায়ক কী ছবির শুটিং করছিল, আমি নায়ককে কী বলে ছবি তুলবার অনুরোধ করেছিÑ এসব জানতে সে ইনবক্সে প্রতিনিয়ত নক করে। আমিও ভদ্রতার সহিত তার প্রশ্নের জবাব দিয়ে যাই। আকরাম এক দিন ইনবক্সে নক করেÑ
Ñভাইয়া, আপনিও দেখতে নায়কের মতো।
Ñজানি।
Ñপাম দিচ্ছি না কিন্তু, সত্যি বলছি।
Ñহুম। আমিও একটা ছবি করেছি। ছবিটি এখনো মুক্তি পায়নি।
Ñওয়াও, সত্যি?
আকরাম আমার চাপামারা কথাটি বিশ্বাস করে ফেলল। এই হলো আকরাম। আমার ফেসবুক ভক্ত। তার বাড়ি কুমিল্লা। সারাক্ষণ ফেসবুকে আমার খবর রাখে। মাঝে মাঝে জিজ্ঞেস করে আমার করা ছবিটি কবে মুক্তি পাবে! মুক্তি ফেলে সে দলবল নিয়ে হলে গিয়ে দেখবে।
Ñভাইয়া, একদিন কুমিল্লা আসেন। আমার এলাকাটি বেশ সুন্দর।
Ñবাহ।
Ñআসবেন?
Ñআচ্ছা।
ভেবে দেখলাম অনেক দিন কোথাও যাওয়া হয় না। আকরাম যেহেতু আবদার করেছে, যাওয়া যায়। রাতে ইনবক্সে আকরামকে নক করে জেনে নিলাম কিভাবে তার বাসায় যাবো! সে আমায় পূর্ণঠিকানা জানিয়ে দিলো। আমি ওর বাসায় আসছি জেনে সে তো আনন্দে আটখানা।
২.
বাসস্ট্যান্ড থেকে আমাকে রিসিভ করতে আকরাম এলো। বাস থেকে নামতেই আকরাম আমাকে দেখে প্রথমে যে কথাটি বললÑ ‘ভাইয়া, আপনি তো বাস্তবে দেখতে সুন্দর। ছবিতে সেভাবে সুন্দর লাগে না।’ আকরামের কথা শুনে আমি মৃদু হাসলাম।
বাড়িতে গিয়ে দেখি ওরা বেশ ধনী। ঘর দোর সব উন্নত। ওর বাবা মা দারুণ আগ্রহ দেখাল আমাকে। আকরামের বাবা বললেন, ‘তুমি নাকি একটা ছবি করেছো বাবা? ছবিতে কবরী আছে? উনি আমার বেশ ফেবারিট।’
আকরাম বলল, ‘কী সৌভাগ্য আমাদের! আমাদের বাড়িতে নায়ক এসেছে।’
শুধু আকরামের বাবা নয়, সে বন্ধুমহলেও জানিয়ে দিয়েছে আমার চাপামারা নায়ক হয়ে মুভি করার ভুয়া খবরটি। ফলে বিকেলে ওর বন্ধুরা নায়ককে এক নজর দেখার জন্য বাড়িতে ভিড় জমায়। একটা ছেলে বলল ‘ভাইয়া, আপনার নায়িকা কে? অপু বিশ্বাস না বুবলি?’
বললাম ‘আমার নায়িকা আলতাবানু।’
আরেকটা ছেলে বলল ‘এ আবার কোন নায়িকা?’
হেসে বলি ‘আলতাবানু নবাগতা। আমাদের দুজনেরই এটা প্রথম মুভি। মুভির নাম ‘স্বামী কেন ল্যাংড়া!’
সোহেল নামের একটা ছেলে বললÑ ছবিটি কবে মুক্তি পাবে?
Ñফেব্রুয়ারির ৩০ তারিখে।
Ñকিন্তু ভাইয়া ফেব্রুয়ারির তো ৩০ তারিখ হয় না। ২৮ দিনে ফেব্রুয়ারি মাস।
চাপা মেরে ভারি লজ্জা পেলাম। লজ্জা কাটতে বললাম ‘ও স্যরি, ফেব্রুয়ারির প্রথম দিকে ছবিটি মুক্তি পাবার কথা আছে।’ তারপর একে একে সবাই আমার সাথে ছবি তুলল ফেসবুকে আপলোড করতে।
৩.
Ñতোমাদের এখানে দর্শনীয় স্থান কী কী আছে আকরাম?
Ñউল্লেখযোগ্য কিছু নেই। তবে একটা পাগলাগারদ আছে। ওখানে নানান কিসিমের পাগলে ভরা। চলুন দেখতে যাই।
ভাবলাম জীবনে তো অনেক স্থানে ঘুরলাম। কখনো পাগলাগারদ দেখিনি। আকরাম যেহেতু বলেছে, তাহলে পাগলাগারদ পরিদর্শন করা যায়। আকরামকে বললাম, ‘তো চলো, যাওয়া যাক।’
পাগলাগারদে এসে আমি তো অবাক। দেশে এত পাগল! বিনা অনুমতিতে আমরা পাগলাগারদে ঢুকেছি দেখে কর্তৃপক্ষ রেগেমেগে আগুন। বারবার স্যরি বলার পরও বেটার মন নরম হচ্ছে না।
Ñওই মিয়া, তোমরা কার অনুমতিতে এখানে ঢুকেছো?
Ñস্যরি।
Ñস্যরি টরিতে কাম হবে না। ৫০০ টাকা জরিমানা দাও।
Ñমানে কী?
Ñবেশি কথা কইয়ো না। বেশি কথা কইলে টাকা বাড়বে।
বুঝলাম বেটা ধান্ধাবাড়ি করছে। বিনা অনুমতিতে এখানে ঢুকার অজুহাত দেখিয়ে টাকার ধান্ধা! এদের একটা শিক্ষা দিলে ভালো হতো। আকরামকে নিচু গলায় বললাম ‘এসব ধান্ধাবাজদের পুলিশে ধরিয়ে দেয়া দরকার।’
আকরাম নরম গলায় বলল ‘আমার আব্বুর বন্ধু কামাল আঙ্কেল পুলিশ অফিসার। তার নম্বর আছে, কল দিই?’
আকরাম তার বাবার বন্ধু পুলিশ অফিসারকে কল দিয়ে মোবাইলটা আমার হাতে দিয়ে বলল, ‘আপনি কথা বলুন ভাইয়া।’
রিং হতেই রিসিভ হলো।
Ñহ্যালো।
Ñহ্যাঁ কে?
Ñআমি পাগলাগারদ থেকে সিনেমার নায়ক বলছি।
Ñওই পাগল, তুই আমার নাম্বার পাইলি কই?
Ñকী যা তা বলছেন?
Ñনায়ক হলে তুই পাগলাগারদে থাকবি কেন?
Ñসত্যি আমি নায়ক বলছি। একটা মুভি করেছি। এখনো মুক্তি পায়নি।
Ñজানি। পাগলরাই নিজেদেরকে নায়ক-হিরো ভাবে। আর কল করবি তো পিটিয়ে বিস্কুট বানিয়ে ফেলব।
বলেই ওপার থেকে লাইন কেটে দেয়া হলো। নার্ভাস হলাম আমি। শেষে উপায় না পেয়ে বিনা অনুমতিতে পাগলাগারদের ভেতরে ঢোকার অপরাধে ৫০০ টাকা জরিমানা গুনে বেরিয়ে এলাম।
আকরাম প্রশ্ন করলÑ পুলিশ আংকেল কী বলেছে ভাইয়া?
কিছুক্ষণ নীরব থেকে বললামÑ উনি এখন ব্যস্ত। হাজতে কোনো আসামিকে নাকি পেটাচ্ছেন।

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.