ঢাকা, মঙ্গলবার,১৬ জানুয়ারি ২০১৮

দেশ মহাদেশ

ভারতকে ঘিরে ফেলছে চীন

বিশ্লেষণ

আসিফ হাসান

২৮ ডিসেম্বর ২০১৭,বৃহস্পতিবার, ০০:০০


প্রিন্ট
মালদ্বীপে চীনের যুদ্ধজাহাজ

মালদ্বীপে চীনের যুদ্ধজাহাজ

ডিসেম্বরের প্রথম দিকে চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়ং ইয়ি বলেছেন, তার দেশ আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে প্রভাববলয় ধারণা ‘অনুমোদন’ করে না। তবে তিনি ভারতের রাজধানী নয়া দিল্লিতে অনেকটা চাঁছাছোলাভাবেই পাল্টা অভিযোগ করেছেন, ভারত প্রভাববলয় লালন করে যাচ্ছে।
ভারতের ভৌগোলিক অবস্থানটি বেশ অদ্ভুত। বিশ্বের বৃহত্তম পর্বতমালা দিয়ে দেশটি এশিয়া থেকে আলাদা। তবে দেশটি নিজের উপমহাদেশে বিশাল হাতিতুল্য। পাকিস্তানের সাথে আজন্ম বৈরিতার বিষয়টি সরিয়ে রাখলে দেখা যাবে, দেশটি যেভাবে তার ছোট প্রতিবেশীদের ওপর আধিপত্য বজায় রেখেছে, তা অনেকটা আমেরিকা যেভাবে ক্যারিবীয় এলাকায় করছে, তার সাথে তুলনীয়। ছোট ছোট দেশ হয়তো ক্ষুব্ধ, অনেক সময় দাদাগিরিতে তাদের অসন্তোষ প্রকাশও করে; কিন্তু পরিস্থিতির সাথে মানিয়ে নেয়াও শিখে নিয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে ভারতের ওই প্রাধান্যকে বেশ জোরালভাবে চ্যালেঞ্জ করে যাচ্ছে চীন।
গত কয়েক সপ্তাহের ঘটনাই বিবেচনা করুন। ৯ ডিসেম্বর শ্রীলঙ্কার কৌশলগত অতি গুরুত্বপূর্ণ একটি বন্দর চীনা সরকারের নিয়ন্ত্রণাধীন একটি কোম্পানির কাছে ৯৯ বছরের জন্য ইজারা দেয়ার কাজ সম্পন্ন হয়েছে। ওই একই সপ্তাহে নেপালে দুই কমিউনিস্ট পার্টির জোট পার্লামেন্ট নির্বাচনে বিপুল জয় পেয়েছে। দল দু’টি চীনের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রক্ষা করে চলে, আবার ভারতের সাথে তাদের রয়েছে অনেক দূরত্ব। মালদ্বীপে নভেম্বরের শেষ দিকে পার্লামেন্টের ‘জরুরি’ অধিবেশনে বিরোধী দলের অনুপস্থিতিতেই চীনের সাথে একটি বাণিজ্যচুক্তি অনুমোদন করে। পাকিস্তানের পর দক্ষিণ এশিয়ার দ্বিতীয় দেশ হিসেবে মালদ্বীপ অবাধ বাণিজ্য চুক্তি করল চীনের সাথে। ভারত মহাসাগরীয় দেশ মালদ্বীপের অবস্থানটি বেশ গুরুত্বপূর্ণ। তার পাশ দিয়েই প্রতি বছর প্রায় ৬০ হাজার জাহাজ চলাচল করে। এ ছাড়া চীনা একটি প্রতিষ্ঠানকে একটি দ্বীপ ইজারা দেয়া হয়েছে, বেশ কয়েকটি বড় অবকাঠামো প্রকল্পও দেয়া
হয়েছে।
ভারত তার ঐতিহ্যবাহী বলয়ে আগেও চ্যালেঞ্জে পড়েছে। তবে এবারকার চ্যালেঞ্জটি ভিন্ন বলে মনে করেন আমেরিকান থিঙ্ক ট্যাঙ্ক ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের তানভি মদন। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ২০১১ পর্যন্ত মালদ্বীপের রাজধানী মালেতে চীনের দূতাবাস পর্যন্ত ছিল না; কিন্তু ২০১৪ সালে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিন পিং দ্বীপ দেশটি রাষ্ট্রীয়ভাবে সফরও করেন। চীন এখন অত্যন্ত দ্রুততার সাথে মালদ্বীপের সাথে সামরিক, কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদার করছে। মালদ্বীপের ৭০ শতাংশ ঋণ এখন চীনের কাছে। এ তথ্য জানিয়েছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ নাশিদ।

দ্বীপমালার ব্যয়
চীনের সাথে মালদ্বীপের আকস্মিক মুক্ত বাণিজ্যচুক্তিটির ব্যাপারে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় মাত্র এটুকু কোনোমতে বলতে পেরেছিল : ‘আমাদের প্রত্যাশা’, ‘ভারতের প্রথম’ নীতির কথাটি মাথায় রেখে ঘনিষ্ঠ ও বন্ধুপ্রতিম দেশ হিসেবে মালদ্বীপ আমাদের উদ্বেগগুলো বুঝবে। মালদ্বীপ তো ভারতীয় স্বার্থ সমুন্নত রাখার প্রতিশ্রুতি নতুন করে বলেইনি, বরং মালদ্বীপ সরকার হঠাৎ করেই পূর্ব অনুমতি না নিয়ে ভারতীয় রাষ্ট্রদূতের সাথে সাক্ষাৎকারী তিন স্থানীয় কাউন্সিলকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করেছে। অতীতে চার লাখ জনসংখ্যার মালদ্বীপ কখনো এত দ্বিধাহীনভাবে তার বৃহৎ প্রতিবেশী দেশকে অগ্রাহ্য করতে পারত না। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি যখন নির্বাচনে বাজিমাত করার জন্য পেশিশক্তির পররাষ্ট্রনীতির আশ্রয় নিচ্ছেন, তখন এ ধরনের ঘটনা বেশ অপমানজনক।
নেপালেও চীনা ড্রাগন অনেক দূর অগ্রসর হয়েছে। সেই ১৯৫০-এর দশকেও নেপালি শাসকেরা ভারতের সাথে ভারসাম্য বিধানের জন্য চীনের দ্বারস্থ হয়েছিল। ভারতবেষ্টিত নেপাল তখন ছিল রাজতন্ত্র শাসিত। তখন দেশটিতে গণতন্ত্রের ব্যবস্থা করার জন্য চাপ সৃষ্টি করা হয়েছিল। ওই সময় কয়েক বাক্স হুইস্কি ছাড়া আর কিছুই লাভ করতে পারেনি চীনের কাছ থেকে।
কয়েক দশক পর নেপালের রাজা আবারো চীনের দরবারে হাজির হন। এবার ভারতের ১৮ মাসের অবরোধের ফলে রাজা বহুদলীয় গণতন্ত্র দিতে বাধ্য হন। ১০ বছর গৃহযুদ্ধের পর ২০০৮ সালে নেপালি মাওবাদীরা যখন সরকার গঠন করল, তারা চীনের কাছে গিয়েছিল; কিন্তু ফিরেছিল খালি হাতে। চীন তাদের বলেছিল, ‘দুই পক্ষের মধ্যে একটি পর্বত রয়েছে; তোমরা এক পক্ষে।’ অর্থাৎ বলে দেয়া হলো, ভারতীয় আধিপত্য নেপালিদের মেনে নেয়া উচিত।
এখন নেপাল একটি প্রজাতন্ত্র। ২০১৫ সালে নতুন সংবিধান হয়েছে। কাজটিকে ঠিক মনে করেনি ভারত। আর তা-ই সে তার শক্তি বোঝাতে চাইল নেপালকে। অঘোষিত অবরোধ আরোপ করে নেপালে পণ্য সরবরাহ বন্ধ করে দিলো ভারত; কিন্তু এবার ফল হলো বিপরীত। ভারতের কাছে নতি স্বীকার না করে নিজের স্বাধীনতা প্রকাশ করার জন্য চীনের শরণাপন্ন হলো। চীনের সাথে এবার তারা কয়েকটি চুক্তি করে ফেলল। সেই সুফল সদ্যসমাপ্ত নির্বাচনে বিপুলভাবে পেয়েছে কমিউনিস্ট পার্টি। পানি, বিদ্যুৎ, রাস্তা, রেলওয়ে ইত্যাদি অনেক খাতেই চীনের কাছ থেকে বিপুল বিনিয়োগের আশ্বাস পেয়েছে।
অবশ্য ভারতের সাথেও তাদের সম্পর্ক বেশ জোরাল। লাখ লাখ নেপালি কাজ করে ভারতে। দেশটি নেপালের বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার, দুই দেশের সেনাবাহিনী ঐতিহাসিক বন্ধনে আবদ্ধ। ভারত যখন এই প্রভাব বহাল রাখার চেষ্টা করছে, তখন নেপালি সাংবাদিক ও শিক্ষাবিদদের জন্য স্কলারশিপ, থিঙ্ক ট্যাঙ্ক ইত্যাদির ব্যবস্থা করে দিচ্ছে। অথচ মাত্র ৫০ বছর আগেও নেপাল প্রশ্নে ভারতের কাছে টিকতেই পারত না চীন। এখন চীনের চাপের পাল্টা চাপ দিচ্ছে ভারত; কিন্তু চীনও ছেড়ে দিচ্ছে না। এ রকমই একটি ঘটনা ঘটেছে ভারতীয় বলয়ে থাকা আরেক ছোট্ট দেশ ভুটানকে নিয়ে। চীনের একটি রাস্তা তৈরির কাজ বন্ধ করে দিয়েছে ভারত। ভুটান এখনো ভারতের ওপর প্রবলভাবে নির্ভরশীল। আর এ কারণেই দেশটির সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি চীন। ভুটানকে অনেক আগে থেকেই ভূমি বিনিময়ের মাধ্যমে সীমান্ত বিরোধ মিটিয়ে ফেলার প্রস্তাব দিয়ে আসছে চীন; কিন্তু ভারতের ইঙ্গিতে এতে রাজি হচ্ছে না ভুটান। ভারতের মনে হচ্ছে, তা করতে পারলে চীনের সামরিক অবস্থান মজবুত হয়ে ভারতকে নাজুক পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দেবে।
এই স্থানে হয়তো চীনের সাথে সমানভাবে লড়তে পারছে ভারত। ভুটানে যাতে চীনা প্রভাব না বাড়ে, সে জন্য ভারত আগে থেকেই অনেক পরিকল্পনা গ্রহণ করে আসছিল। বিশেষ করে চীনগামী কোনো রাস্তা বানানো হয়নি; কিন্তু এখন ওই পরিস্থিতিও পাল্টে গেছে। সীমান্তবর্তী প্রতিটি দেশে পর্যন্ত বিশাল বিশাল অবকাঠামো নির্মাণ করেছে চীন।
এমন অবস্থায় ভারতের পক্ষে তার প্রভাববলয় টিকিয়ে রাখাটা কঠিন বলে মনে হচ্ছে। ভারতের অর্থনীতি চীনের মাত্র এক-পঞ্চমাংশÑ ফলে চীনের মতো অনেক কাজ ভারত করতে পারে না। সেই সাথে ভারতের তালগোল পাকানো গণতন্ত্রও অনেক কাজ করতে নয়া দিল্লিকে দেরি করিয়ে দিচ্ছে, সমস্যায় ফেলছে। আবার প্রাতিষ্ঠানিক সমস্যায়ও রয়েছে ভারত। ভারতের পুরো কূটনৈতিক বিভাগে মোট কর্মী ৭৭০ জন। অথচ আমেরিকার এই সংখ্যা ১৩ হাজার ৫০০। সরকারি খাতের কোম্পানিগুলোর দুর্বলতার কারণে প্রতিবেশী দেশগুলোতে সহায়তাও ঠিকমতো দিতে পারছে না ভারত। এই কিছু দিন আগে পর্যন্ত চীনা সম্প্রসারণবাদে একই রকম উদ্বিগ্ন অন্য দেশগুলোর সাথে কাজ করতে আগ্রহী ছিল না ভারত। এখন অবশ্য এই পরিস্থিতির পরিবর্তন হয়েছে। ভারতীয় হাতি হয়তো শিখতে দেরি করছে, তবে তার নড়নচড়ন বেশ কষ্টকর।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫