জলাতঙ্ক : একটি কামড়ই যখন হতে পারে মৃত্যুর কারণ

ডা: মো: কফিল উদ্দিন চৌধুরী

জলাতঙ্ক হলো রেবডোভাইরাস নামক এক প্রকার ভাইরাস দ্বারা মানুষসহ প্রায় সব স্তন্যপায়ী প্রাণীতে সংঘটিত এক প্রকার সংক্রামক রোগ। সাধারণত মানুষসহ অন্যান্য গৃহপালিত প্রাণীতে এই রোগে আক্রান্ত পশু যেমনÑ কুকুর, বিড়াল, শিয়াল, বেজি, ভালুুক, রেকুনজাতীয় প্রাণীর কামড়, আঁচড় বা লেহনের দ্বারা এই রোগের জীবাণু প্রবেশ করে। পরে এই জীবাণু ওই প্রাণীর লালাগ্রন্থি ও মস্তিষ্কে সৃষ্টি করে তীব্র প্রদাহ। আক্রান্ত প্রাণী বিশেষত মানুষে দেখা দেয় জ্বর, কামড়ের স্থানে অস্বস্তিকর অনুভূতি, উত্তেজনা, প্রলাপ বকা, থুতু ও কামড় দেয়ার প্রবণতা, চিত্তবিভ্রম, অনুভূতি ও চিন্তার বিভ্রান্তি, তীব্র পিপাসা, পানির দর্শনে শ্বসন ও গিলতে সহায়ক মাংসপেশির তীব্র ব্যথাযুক্ত সঙ্কোচন ও তা থেকে উদ্ভূত পানির প্রতি অস্বাভাবিক ভীতি। রোগের চরমপর্যায়ে লুপ্ত হতে পারে সংজ্ঞা। কামড়-পরবর্তী যথাযথ প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা না নিলে এই রোগে আক্রান্ত হয়ে রোগাক্রান্ত ব্যক্তির মৃত্যুর হার প্রায় শতভাগ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এক জরিপে দেখা যায়, আমাদের দেশে এই রোগে আক্রান্ত হয়ে প্রতি বছর প্রায় ২০০০ লোক মারা যায়। আর প্রতিবছর কুকুরসহ অন্যান্য প্রাণী দ্বারা আক্রান্ত হয়ে জলাতঙ্ক রোগের টীকা নেয় প্রায় এক লাখ লোক।
কুকুরের কামড় এবং পরবর্তীতে করণীয় :
জলাতঙ্ক রোগের জীবাণু যেহেতু আক্রান্ত কুকুর ও অন্যান্য মাংসাশী গৃহপালিত ও বন্যপ্রাণীর কামড়, আঁচড় দ্বারা মানুষের ত্বক ও মিউকাস স্তর হয়ে মানবদেহে প্রবেশ করে, তাই ওই রোগাক্রান্ত পশুর দ্বারা আক্রান্ত হওয়ার পরপরই মানবদেহে এই রোগের সংক্রমণ প্রতিরোধকল্পে নিম্নলিখিত ব্যবস্থা নেয়া যেতে পারে।
প্রথমে আক্রান্ত ক্ষত সাবান ও পানি দিয়ে ভালো করে ১৫ মিনিট ধরে পরিষ্কার করে নিতে হবে।
পরিষ্কার-পরবর্তীওই ক্ষতস্থানে বিভিন্ন এন্টিসেপ্টিক ওষুধ যেমনÑ সেভলন, ডেটল, এলকোহল, পভিডন আয়োডিন প্রভৃতি এক বা একাধিক ওষুধের ব্যবহারের দ্বারা এই রোগে আক্রান্ত হওয়ার প্রবণতা অনেক কমে যায়।
আক্রান্ত ক্ষতস্থান সেলাই করা বা ঢেকে না রেখে তা খোলা রাখাই উত্তম।
জীবাণুর সংক্রমণ প্রতিরোধকল্পে চিকিৎসকের পরামর্শ মোতাবেক এন্টিবায়োটিক ব্যবহার করা যেতে পারে।
ক্ষতের দ্বারা ধনুষ্টংকারে আক্রান্ত হওয়ার প্রবণতা প্রতিরোধকল্পে পূর্বে এই রোগের টীকা দেয়া না থাকলে তা যত তাড়াতাড়ি পারা যায় দিতে হবে।
পরে এই জলাতঙ্ক রোগ প্রতিরোধকল্পে প্রয়োজনীয় টীকা ও রোগ প্রতিরোধী ইমিউনোগ্লোবিন দেয়ার জন্য অতিসত্বর একজন অভিজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।
কামড়ের দ্বারা সৃষ্ট ক্ষতে রোগের চিকিৎসায় কোনো অবস্থায়ই মরিচের গুঁড়া, তেল, হলুদ, চুন বা লবণ দেয়া যাবে না।
আক্রান্ত হওয়ার পরবর্তীতে কার জন্য কী চিকিৎসা?
আক্রান্ত হওয়ার ক্যাটাগরি বা পর্যায় আক্রান্ত হবার তীব্রতা গ্রহণযোগ্য চিকিৎসার অক্ষত চামড়ায় আক্রান্ত পশুর লেহন বা স্পর্শন পুনরায় অতিরিক্ত কোনো চিকিৎসার প্রয়োজন নেই, আক্রান্ত প্রাণীর আঁচড় বা খোঁচন দ্বারা চামড়ায় রক্তপাতবিহীন মামুলি ক্ষত নিতে হবে জলাতঙ্ক রোগের টীকা, আক্রান্ত প্রাণীর দ্বারা মানব দেহের চামড়া ও শরীরে এক বা একাধিক তীব্র ও গভীর ক্ষত কিংবা রক্তপাত যুক্ত ক্ষত অথবা বন্যপ্রাণী কর্তৃক যেকোনো মাত্রার আঁচড় বা ক্ষত ক্ষতের যথাযথ চিকিৎসা, জলাতঙ্কের টীকা দেয়া ও সেই সাথে রোগের প্রতিরোধ বৃদ্ধিকল্পে ইমিউনোগ্লোবিন ওষুধের ব্যবহার
কাদের জন্য কামড় বা আক্রান্ত হওয়ার পূর্ববর্তীপর্যায়ে সতর্কতামূলক জলাতঙ্কের টীকা
জলাতঙ্কের রোগীর চিকিৎসায় নিয়োজিত চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মী।
জলাতঙ্ক রোগ নির্ণয় ও টীকা প্রস্তুতকারক ল্যাবরেটরিতে কর্মরত স্বাস্থ্যকর্মী ও ল্যাব টেকনেশিয়ান।
পশুচিকিৎসক বিশেষত যারা জলাতঙ্কে আক্রান্ত পশুর চিকিৎসায় নিয়োজিত।
সৌখিন পশু বিক্রয়, আমদানি ও রফতানির সাথে জড়িত ব্যক্তি।
বনরক্ষী বিশেষত চিড়িয়াখানা ও বন্য পশুর সংরক্ষণে নিয়োজিত কর্মী।
বন্যপ্রাণী আমদানির সময় সঙ্গ নিরোধ বা কোয়ারেন্টাইন ব্যবস্থাপনার সাথে জড়িত কর্মচারীরা।
জলাতঙ্কমুক্ত অঞ্চল থেকে জলাতঙ্ক প্রবণ অঞ্চলে আগত পর্যটক ও অন্যান্য কাজে নিয়োজিত ব্যক্তিরা।
প্রতিরোধে করণীয় :
যেহেতু জলাতঙ্ক রোগে আক্রান্তের সংখ্যার বিচারে বাংলাদেশ পৃথিবীতে তৃতীয় বৃহত্তম দেশ হিসেবে স্বীকৃত। তাই জলাতঙ্ক রোগের নিয়ন্ত্রণে এর যথাযথ চিকিৎসার পাশাপাশি এর প্রতিরোধে নিম্নলিখিত ব্যবস্থাগুলো নেয়া যেতে পারেÑ
ব্যক্তিপর্যায়ে রাস্তাসহ বনের পশুর হাত থেকে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে চলা বা তাদের বিরক্ত বা কামড়ের জন্য প্ররোচিত না করা।
যাদের গৃহপালিত পশু হিসেবে কুকুর পালনের শখ তাদের পালিত পশুদের পশু চিকিৎসকের পরামর্শ মোতাবেক নিয়মিত বিরতিতে জলাতঙ্ক রোগের টীকা দেয়া।
গৃহপালিত কুকুর বা অন্যান্য বন্যপ্রাণীর কামড় দেয়ার প্রবণতা থাকলে পথচারীদের বা আগত অতিথিদের সতর্ককরণ কল্পে সতর্কতামূলক উক্তি বাড়ি বা গেটে সহজে দৃশ্যমান হয় এমন স্থানে ঝুলিয়ে রাখা। যেমনÑ ‘কুকুর হইতে সাবধান’। প্রয়োজনে ওই পশু যেন সহজে কামড় দিতে না পারে সেজন্য ওই পশুর মুখে মুখবন্ধনী দেয়া যেতে পারে।
জলাতঙ্ক রোধের প্রধান বাহক কুকুরের সংখ্যা ও বংশবিস্তার নিয়ন্ত্রণকল্পে কুকুরের বন্ধ্যাত্বকরণ কার্যক্রম জোরদারকরণ। প্রয়োজনে সময়ে সময়ে কুকুর নিধন অভিযান পরিচালনা।
এই রোগ ও রোগের চিকিৎসা সম্পর্কে ব্যাপক গণসচেতনতা তৈরি।
তৃণমূলপর্যায়ে সস্তায় ও সহজে এই রোগ প্রতিরোধকল্পে সরকারিভাবে টীকার যথাযথ সরবরাহ ও সংরক্ষণ।
বিদেশ থেকে পশু-পাখি বিশেষত বন্যপশু আনার সময় এন্ট্রি পয়েন্টগুলোয় সঙ্গনিরোধ তথা কোয়ারেন্টাইন ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন।
লেখক : মেডিসিন ও মানসিক রোগবিশেষজ্ঞ
চেম্বার : ৩৫০/১ সি, আফনান ভিলা, ফ্ল্যাট নং- ই-২, আহম্মেদ নগর, পাইকপাড়া, মিরপুর-১, ঢাকা। ফোন : ০১৫৫৭৪৪০২৮৭

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.