ঢাকা, মঙ্গলবার,১৬ জানুয়ারি ২০১৮

আমার ঢাকা

বিজয় আলোয় আলোকিত রাজধানী

মাহমুদুল হাসান

২৬ ডিসেম্বর ২০১৭,মঙ্গলবার, ০০:০০


প্রিন্ট

ডিসেম্বর আমাদের বিজয়ের মাস। আমাদের গর্ব ও গৌরবের মাস। একটি গর্বিত জাতি হিসেবে সগর্বে মাথা উঁচু করে স্পর্ধা অর্জন করেছিলাম আমরা এ মাসেই। সীমাহীন ত্যাগ-তিতিক্ষা এবং আত্মদানের মধ্য দিয়ে আত্মপ্রতিষ্ঠায় সরল রাজপথে আমরা প্রবেশ করেছি এ ডিসেম্বরেই। তাই জাতির কাছে ডিসেম্বর বিজয়ের মাস। সারা বাংলাদেশের পাশাপাশি রাজধানীতে ৪৬তম বিজয় দিবস উদযাপন উপলক্ষে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা সেজেছিল লাল-সবুজের আলোকসজ্জায়। ১৬ ডিসেম্বর হাতে-মাথায় জাতীয় পতাকা এবং বিজয়ের পোশাকি আমেজে অনেকেই নেমে এসেছিলেন রাস্তায়। লিখেছেন
মাহমুদুল হাসান


বিজয়ক্ষণ অর্থাৎ ১৬ ডিসেম্বরের প্রথম প্রহরে বিজয়ধ্বনির মাধ্যমে উৎসবের শুভসূচনা হয়। প্রাচ্যের অক্সফোর্ড ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ও পিছিয়ে ছিল না এ আয়োজনে। টিএসসির আকাশে দেখা গেছে আতশবাজির মহড়া। বিজয় দিবস ছিল সরকারি ছুটির দিন। সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হয়। রাজধানীর প্রধান সড়ক ও সড়কদ্বীপ জাতীয় পতাকায় সজ্জিত করা হয়। রাতে গুরুত্বপূর্ণ ভবন ও স্থাপনায় করা হয় আলোকসজ্জা। হাসপাতাল, কারাগার ও এতিমখানাগুলোতে উন্নত মানের খাবার পরিবেশন করা হয়।
সকাল ১০টায় তেজগাঁও পুরাতন বিমানবন্দরে জাতীয় প্যারেড স্কয়ারে সম্মিলিত বাহিনীর বর্ণাঢ্য কুচকাওয়াজ এবং বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রমভিত্তিক যান্ত্রিক বহর প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়। রাষ্ট্রপতি এতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে কুচকাওয়াজ পরিদর্শন ও সালাম গ্রহণ করেন। প্রধানমন্ত্রীও কুচকাওয়াজ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। বিজয় দিবস উপলক্ষে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি, বাংলা একাডেমি, জাতীয় জাদুঘর, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর, বাংলাদেশ শিশু একাডেমিসহ বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক আলোচনা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, শিশুদের চিত্রাঙ্কন, রচনা ও ক্রীড়া প্রতিযোগিতা এবং মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শনের আয়োজন করে।
এ ছাড়া, বীর মুক্তিযোদ্ধা এবং শহীদ পরিবারের সদস্যদের সংবর্ধনা দেয়া হয়। বাংলাদেশ ডাক বিভাগ স্মারক ডাকটিকিট প্রকাশ করেছে। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে দেশের শান্তি ও অগ্রগতি কামনা করে বিশেষ দোয়া ও উপাসনার আয়োজন করা হয় এবং এতিমখানা, বৃদ্ধাশ্রম, হাসপাতাল, জেলখানা, সরকারি শিশুসদনসহ অনুরূপ প্রতিষ্ঠানগুলো উন্নত মানের খাবার পরিবেশন করা হয়। দেশের সব শিশুপার্ক ও জাদুঘরগুলো বিনা টিকিটে উন্মুক্ত রাখা হয়।
১৭ ডিসেম্বর বিকেল ৩টায় বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এতে সভাপতিত্ব করেন। ১৮ ডিসেম্বর সন্ধ্যা ৬টায় রাজধানীর রবীন্দ্র সরোবরে মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
ছায়ানট এ বছর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগিতায় বিজয় দিবস উদযাপন করছে। ১৬ ডিসেম্বর বিকেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শারীরিক শিক্ষা বিভাগের খোলা মাঠে অনুষ্ঠান আয়োজন করেছে তারা। সম্মিলিত কণ্ঠে গান এবং মানবপতাকা উপস্থাপনের মাধ্যমে দিনটি উদযাপন করবে ছায়ানট। এ ছাড়া ঢাকার সামরিক জাদুঘর, বিমানবাহিনীর জাদুঘর এবং ঢাকা সদরঘাটে নৌবাহিনীর যুদ্ধজাহাজ দুপুরের পর সবার জন্য উন্মুক্ত ছিল।
বিজয় দিবসে রাজধানীর হাতিরঝিলে উদ্বোধন করা হয় এমফি থিয়েটার। এর ফলে হাতিরঝিলে বসে উপভোগ করা যায় হাতিরঝিলের দৃষ্টিনন্দন নানা রঙের জলের খেলা। ছিল আতশবাজি এবং কনসার্ট।
বিকেলে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে আয়োজন করা হয়েছে বিজয় কনসার্ট, একই উদ্যানে স্বাধীনতা জাদুঘরের সামনে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে সেক্টর কমান্ডার্স ফোরাম।
বর্ণিল পুরান ঢাকা
১৬ ডিসেম্বর ‘লাল-সবুজ’ বাঙালির অস্তিত্বে মিশে থাকা চেতনার নাম। বিজয় দিবসকে ঘিরে লাল-সবুজের আয়োজন চোখে পড়ে সবখানে। তবে পুরান ঢাকার অলিগলি যেন বিজয়ের আনন্দে ভাসছে আপন রঙে। প্রায় প্রতিটি গলিতেই দেখা যায় লাল-সবুজের পতাকার অভিধান। রাজধানীর পুরান ঢাকার লালবাগ, আরমানিটোলা, শাঁখারিবাজার, লক্ষ্মীবাজার, বংশাল, মালিটোলা, গেণ্ডারিয়া ও সদরঘাটসহ সব এলাকার অলিগলিতে লাল-সবুজের পতাকার সাজ চোখে সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করার মতো।
পুরান ঢাকার অলিগলিতে বিজয় আনন্দের কথা ব্যক্ত করেছেন তরুণেরা। পুরান ঢাকার বাসিন্দা রফিকুল ইসলাম বলেন, বিজয় দিবস বাঙালি জাতির এক সাগর রক্তে পাড়ি দেয়া বিজয়ের নাম। দীর্ঘ ৯ মাস শ্বাসরুদ্ধ করা যুদ্ধের বিজয়ের নাম। এ দিনটি পুরো জাতির জন্য মহা আনন্দের দিন। তাই আমরা প্রতিটি পাড়া ও অলিগলি চেষ্টা করেছি পতাকা দিয়ে সাজাতে ও বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে আমাদের নতুন প্রজন্মকে তার সাথে অনেক ভালো করে উপস্থাপন করতে।
পুরান ঢাকার পতাকা বিক্রেতা জামিল মিয়া বলেন, ‘পাঁচ বছর ধইরা পতাকা বিক্রি করতাছি। এই দিনডা আইলেই আমাগো মনের মইধ্যে এক ধরনের আনন্দ লাগে। যুদ্ধের কথা মনে ধরে। আমাগো অনেক বন্ধুবান্ধবও যুদ্ধ করছে। অনেকে যুদ্ধ থ্যাইকা ফিরে নাই, জীবন দিছে দেশটার লাইগা। এহন যখন ১৬ ডিসেম্বরে পতাকা বিক্রি করি তহন মনে হয় ওগো জীবন সফল হইসে।’
১৬ ডিসেম্বর রাত ১২টা বাজার পরপরই শোনা যায় আতশবাজি শব্দ ও বিজয়ের গান। পুরান ঢাকা মুখরিত বিজয়ের উল্লাসে। রাস্তা-ফুটপাথ থেকে শপিংমল সবখানেই বসেছে লাল-সবুজের আয়োজন। পুরান ঢাকার মেয়েদের আনন্দ যেন অন্য রকমই লাল-সবুজ শাড়ির সাথে মেয়েদের কপালের জ্বলজ্বলে লাল টিপটি আমাদের বিজয়ের নতুন রবির মতোই উজ্জ্বল। বিজয় রঙের খাদি পাঞ্জাবি পরে তরুণদের দীপ্ত ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে থাকা যেন আমাদের মুক্তির আত্মবিশ্বাস। লাল-সবুজ আমাদের মুক্তির রঙ, আমাদের বিজয়ের রঙ।
সব কিছু মিলিয়ে বিজয় দিবসের আনন্দ পুরান ঢাকার সব প্রজন্মের মধ্যে ছড়িয়ে দেয়ার চেষ্টা ছিল চোখে পড়ার মতো। পুরান ঢাকাবাসী সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছে বিজয়ের রঙে পুরান ঢাকাকে রাঙাতে। তারা আয়োজন করেছি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, রচনা প্রতিযোগিতা ও মুক্তিযুদ্ধের চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতার।

হাতিরঝিলে জনস্রোত
বিজয় দিবস উদযাপনে পিছিয়ে ছিল না রাজধানীবাসী। বিজয় দিবসের ছুটির দিনটিকে বিভিন্নভাবে উদযাপন করছেন রাজধানীবাসী। লাল-সবুজ শাড়ি ও পাঞ্জাবি পরে সব বয়সের মানুষ আজকের দিনটিকে উদযাপন করার জন্য ভিড় জমিয়েছেন রাজধানীর বিনোদন কেন্দ্রগুলোতে।
বিজয় দিবস উপলক্ষে রাজধানীর বিনোদন কেন্দ্রগুলোর মধ্যে সব থেকে বেশি ভিড় দেখা যায় হাতিরঝিল এলাকায়। বিজয় দিবস উদযাপন সব ধরনের ব্যবস্থাও দেখা যায় হাতিরঝিল এলাকায়। ১৬ ডিসেম্বর সরেজমিন দেখা যায়, হাতিরঝিলের প্রতিটি ব্রিজেই দর্শনার্থীদের উপচে পড়া ভিড়। এ ছাড়া ওয়াটার ট্যাক্সি ও চক্রাকার বাসেও বিজয় দিবস উপলক্ষে হাতিরঝিল ভ্রমণের বিশেষ ব্যবস্থা করা হয়েছিল।
হাতিরঝিলে আসা বিনোদনপ্রেমীদের মধ্যে সব থেকে বেশি উপস্থিতি দেখা যায় তরুণ-তরুণীদের। লাল-সবুজের রঙে বিভিন্ন পোশাকে তারা হাজির হয় রাজধানীর হাতিরঝিলে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মারিয়া জান্নাত ও তারা বন্ধুরা বিজয় দিবস উপলক্ষে বেড়াতে এসেছিলেন। তারা বলেন, আজকে আমাদের মুক্তির দিন। আজকের দিনের আকাশ বাতাস ও প্রকৃতির সৌন্দর্যই আলাদা। তাই রাজধানীর অন্যতম এই বিনোদন কেন্দ্রে বিজয় দিবস উদযাপন করতে এসে অনেক ভালো লাগছে। শুধু তরুণ-তরুণীরাই নয়, ছেলেমেয়ে ও স্ত্রী নিয়েও হাজির হয়েছেন রাজধানীর অনেক বাসিন্দা। বিজয় দিবসের আনন্দ উপভোগ করতে তারা কোনো কমতি রাখছেন না।
রামপুরার বাসিন্দা হেদায়েত উল্লাহ বলেন, ছেলে ও স্ত্রীকে নিয়ে রামপুরা থেকে হাতিরঝিলের ওয়াটার ট্যাক্সিতে উঠছেন। তিনি বলেন, সকালে পরিবার নিয়ে প্যারেড গ্রাউন্ডে গিয়েছিলাম কুচকাওয়াজ দেখতে। এখন বিকেল বেলায় এসেছি হাতিরঝিল ঘুরতে। আমাদের সবার অনেক ভালো কাটছে বিজয় দিবস। বিজয় দিবসে উপলক্ষে হাতিরঝিলজুড়ে করা হয়েছিল আলোকসজ্জার আয়োজন। সব মিলিয়ে বিজয় দিবসে ভালো সময় কেটেছে রাজধানীবাসীর।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫