অপো

চারাগল্প
তারেকুর রহমান

হুইল চেয়ারে চলাফেরা করেন শফিক সাহেব। বয়সের ভারে ন্যুব্জ শরীর। হুইল চেয়ারটাকে কোনো রকম টেনেটুনে বটগাছের নিচে বসে আছেন তিনি। নির্বাক দৃষ্টিতে চেয়ে আছেন। বিশাল বটবৃরে নিচে বসে থেকে নিজেকে বড়ই নিঃসঙ্গ লাগল শফিক সাহেবের। চোখগুলো ভিজে আসে। চোখের সামনে ভেসে ওঠে ১৯৭১ সালের উত্তাল দিনগুলোর কথা। এই সেই বটগাছ, যার একটা ইতিহাস রয়েছে।
১৯৭১ সাল। যুদ্ধের দামামা বেজে উঠল। গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে সে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ল। মৃত্যুর মিছিলে প্রতিদিন যোগ দিচ্ছেন নতুন কেউ। দেশের এ অবস্থায় বসে থাকা ঠিক নয়। গ্রামের সাহসী দুই যুবক শফিক আর রূপম মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিতে মনস্থির করলেন। রূপম বেশ উত্তেজিত হয়ে বললেন,
Ñ এভাবে আর মেনে নেয়া যায় না। ওরা আমাদের ওপর অত্যাচার করবে আমরা তা মেনে নেবো না। আমাদেরকেও প্রতিরোধ করতে হবে।
Ñ ঠিক বলছোস। এ কথা বলেই রূপমকে বাহবা দিলেন শফিক।
Ñ শোন শফিক, আমরা যদি এ দেশ স্বাধীন করতে না পারি তাহলে আগামী প্রজন্মকে ওদের দাস হয়ে থাকতে হবে। তা আমরা হতে দেবো না। আমরা বিশ্বের বুকে মাথা তুলে দাঁড়াবোই।
Ñ হুম, আমাদের আর বসে থাকা যাবে না। দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
Ñ সিদ্ধান্ত একটাইÑ কাল আমরা মুক্তিবাহিনীতে যোগ দেবো।
Ñ কালই? আরো কয়েক দিন পরে দিলে হবে না?
Ñ না, কালই দেবো। শোন শফিক, আমাদের আরো সাহসী হতে হবে। এ দেশকে শত্রুমুক্ত করতে হলে আমাদেরই ভূমিকা রাখতে হবে।
Ñ হুম, ঠিক বলছোস।
ভোরে ব্যাগ গুছিয়ে মুক্তিবাহিনীতে যোগ দিতে প্রস্তুত হয়ে আছেন রূপম আর শফিক। গ্রামে জানাজানি হয়ে গেল তাদের মুক্তিবাহিনীতে যোগ দেয়ার কথা। তাদের বিদায় দেয়ার জন্য গ্রামবাসী উপস্থিত। সবাইকে বিদায় দিয়ে শফিক আর রূপম গ্রামের সবচেয়ে পুরনো বটগাছের নিচে উপস্থিত। দু’জন একটু পর আলাদা হয়ে যাবেন। এত বছরের বন্ধুত্ব অথচ দু’জন এক মুহূর্তের জন্যও আলাদা হননি। চোখ বেয়ে পানি পড়ছে তাদের। শফিককে বুকে জড়িয়ে ধরে রূপম বলতে লাগলেনÑ
Ñ কাঁদিস না, আমরা দেশ স্বাধীন করেই ফিরব। ঠিকই আবার দেখা হবে।
Ñ অবশ্যই দেশ স্বাধীন করে ফিরব।
দীর্ঘ ৯ মাস যুদ্ধ করার পর বাংলাদেশ স্বাধীন হয়। যুদ্ধ শেষে আহত অবস্থায় শফিক ফিরলেও রূপমের কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। মুক্তিযুদ্ধে যারা শহীদ হয়েছেন, তাদের লাশ ফেরত এলেও তাতে রূপমের লাশ ছিল না। রূপম বেঁচে আছেন নাকি মরে গেছেন কেউ জানে না।
শফিক সাহেবের কেন যেন মনে হয় রূপম বেঁচে আছেন। তিনি মরতে পারেন না। রূপমকে যেখান থেকে বিদায় দেয়া হয়েছে, সেই পুরনো বটগাছের নিচে প্রতিদিন বিকেলে অপোয় প্রহর গোনেন শফিক সাহেব। তার বিশ্বাস, একদিন ঠিকই রূপম ফিরবেন। ফিরে এলে তাকে জড়িয়ে ধরবেন।
মিরপুর, ঢাকা

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.