রূপকথা

চারাগল্প
জোবায়ের রাজু

যে শীত পড়েছে, শরীরটা ভালো যাচ্ছে না বারেক মিয়ার। শ্বাসকষ্টের সাথে হাঁপানিটাও আজকাল জেঁকে বসছে। তার সাথে দম ফাটানো কাশির কারণে রাতে ঘুমটাও আর হয় না। স্বামীর এমন অসুখে স্ত্রী মাজেদা বেগমেরও মনমানসিকতার অবস্থা ভালো যাচ্ছে না। বিয়ের পর থেকে দেখে আসছেন মানুষটার সারাটা জীবন গেছে সৎকর্ম আর পরের জমিন বর্গা চষে। মাঘের হাঁড় কাঁপানো সাতসকালে হাঁটুজলে নেমে নিরলস ফসলের পরিচর্চায় নিবেদিত থেকেছেন অনেকগুলো বছর, তবুও শীত তাকে সেভাবে ছুঁতে পারেনি। দামাল শরীর নিয়ে ক্ষেতখামারে নেমেছেন সূর্যদয়ের পরপরই।
এখন বয়স বেড়েছে। সামান্য ঠাণ্ডা পড়লেই অসুস্থ হয়ে ওঠেন। বাড়ি কাঁপানো খক খক কাশি যক্ষ্মায় পৌঁছে গেল কি না কে জানে। স্ত্রীর অনুরোধে গত পরশু দিন ডাক্তার দেখান বারেক মিয়া। স্লিপভর্তি দুনিয়ার ওষুধের সাথে যে ইনহেলারটি লিখে দিয়েছেন ডাক্তার তপন বাবু, সেটার দাম ৭৫০ টাকা। কিন্তু এত টাকায় ইনহেলার কেনার সামর্থ্য নেই বলে মুখ বেজাড় করে বাড়ি ফেরেন। অথচ ইনহেলারটা ভীষণ জরুরি। একবার ভাবলেন ছেলে আকরামের কাছে যাবেন ক’টা টাকার জন্য। কিন্তু স্ত্রী মাজেদা বেগম তেজিগলায় বললেন, ‘প্রয়োজনে পথে নেমে ভিক্ষা করবে। তবু ওই ছেলের কাছে হাত পাততে যাবে না।’
বারেক মিয়া আর মাজেদা বেগমের একমাত্র ছেলে আকরাম। চোখভরা স্বপ্ন আর বুকভরা আশা নিয়ে ছেলেকে বড় করেছেন তারা শেষ বয়সে শান্তিতে দিন কাটাবেন বলে। বাবার অকান্ত শ্রমের পয়সায় উচ্চশিক্ষা লাভের পর জেলা সদরের সব চেয়ে নামকরা রেস্টুরেন্টে ম্যানেজার পদে চাকরি পায় আকরাম। ছেলের ভালো মাইনে দেখে বারেক মিয়ার স্বস্তির নিঃশ্বাস পড়ে। এই বুঝি তার কঠিন কর্মজীবনের ইস্তফা হওয়ার দিন এলো। এরই মধ্যে ঘটা করে আকরামের জীবনে আবির্ভাব হলো শারমিনের।
বিয়ের পর আকরাম বাবা মায়ের চোখে বদলাতে থাকে। শারমিন চায় না আকরাম তার বাবা-মায়ের ভরসার পাত্র হোক। তার একান্ত ইচ্ছা স্বামীকে নিয়ে আলাদা সংসার সাজানোর। এসব ভাবতে গিয়ে শারমিনের মনে কুফন্দি আসে। সে শ্বশুর-শাশুড়ির নামে আজেবাজে বানোয়াট গল্প আকরামের কানে পৌঁছে দেয় রাতের গভীরে। সুন্দরী স্ত্রীর কথা বিশ্বাস করে আকরাম মনে মনে বাবা-মায়ের প্রতি ক্ষুব্ধ হয়। ফলে চতুর শারমিনের সাজানো চালাকির জালে আটকা পড়ে আকরাম একদিন শারমিনকে নিয়ে জেলা সদরের ভাড়াবাসায় চলে যায় সংসার সাজাতে। গ্রামের আধো ভাঙা কুঁড়েঘরে স্ত্রী মাজেদা বেগমকে নিয়ে আশাহত মনে পড়ে থাকেন বারেক মিয়া। তার স্বপ্ন সব মিছে হয়ে গেল।
শারমিন একসময় মা হয়। পুত্রসন্তানের বাবা হয়ে আকরাম মিষ্টি নিয়ে বাবা-মাকে দেখতে আসে। বারেক মিয়া দাদা হওয়ার আনন্দে কেঁদে ফেললেও নাতিকে দেখার সৌভাগ্য হয় না তার। জেলা সদর দূরের পথ, এই অজুহাত দেখিয়ে আকরাম বাবাকে সান্ত্বনা দেয়। ছেলের এমন অনৈতিক আচরণে মনে মনে আন্দোলিত হন মাজেদা বেগম। নাড়ির টান আছে বলে আকরাম দু-এক মাস পরপর বাড়ি আসে বাবা-মাকে দেখতে। কিন্তু প্রতিবার বাবা-মায়ের অসুস্থতার কথা শুনতে শুনতে তার এখন আর ভালো লাগে না। বারেক মিয়া আগ্রহী গলায় নাতির কথা জানতে চান। আকরাম মোবাইল বের করে মা-বাবাকে ছেলে সাইফের ছবি দেখায়।
২.
আজ আকরাম বাড়ি এসেছে বাবা-মাকে সদরে নিতে। আগামীকাল সাইফের প্রথম জন্মদিন বেশ জাঁকজমকভাবে পালন করা হবে। শারমিনের সব বান্ধবী আসবে। বেশ আনন্দ হবে।
Ñমা, আমি কিছু শুনতে চাই না। কাল তোমাদের নাতির জন্মদিন। তোমরা এখনই যাবে আমার সাথে।
Ñতোর বাবার শরীরটা ভালো নারে। শ্বাসকষ্ট ভীষণ।
Ñএসব শুনতে চাই না মা। তোমরা এখনই যাবে।
Ñকিভাবে সম্ভব বল?
Ñবাবা ওষুধ খাচ্ছে না?
Ñসেভাবে টাকা নাইরে। ওষুধের যা দাম। একটা ইনহেলার কেনার টাকা নেই বলে তোর বাবা...।
Ñমা, এসব রূপকথা বন্ধ করো তো। এখানে এলে তোমাদের ‘নাই নাই’ ছাড়া আর কোনো ভালো কথা কানে আসে না।
Ñরূপকথা?
Ñহ্যাঁ, রূপকথাই এসব।
মাজেদা বেগমের চোখে পানি চলে এলো। কী বলছে আকরাম! অর্থসঙ্কটের গল্প তার কাছে রূপকথা মনে হচ্ছে! তিনি মনে মনে বলেন, ‘তোরও একদিন এমন পরিণতি হবে। তখন সে পরিণতিকেও তোর ছেলের কাছে রূপকথার মতো মনে হবে।’
বারেক মিয়া কাশতে কাশতে ছেলের কাছে এসে বলেন, ‘কই আমার নাতির ছবি দেখা।’ আকরাম মোবাইল বের করে সাইফের ছবি দেখিয়ে খুশি গলায় বলল, ‘ও আমাকে ছাড়া কিচ্ছু বোঝে না বাবা।’ বারেক মিয়া হেসে বলেন, ‘আমার নাতিকে গরম কাপড় পরিয়ে রাখিস, যা শীত পড়ছে। বুকে যেন ঠাণ্ডা না লাগে।’
আমিশাপাড়া, রাজু ফার্মেসি, নোয়াখালী

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.