ঢাকা, মঙ্গলবার,১৬ জানুয়ারি ২০১৮

প্রিয়জন

দ্বিপদী

মো: ওবায়দুল হক

২৩ ডিসেম্বর ২০১৭,শনিবার, ০০:০০


প্রিন্ট

আজিজুল ও সাগর। চাচাতো ভাই তারা। বাসের সিটে বসে আছে। বাড়ি ফিরবে। আজিজুল ভাবছে তার প্রিয় কবিকে। সবুজ প্রিয় কবি। দারুণ মানিয়েছিল শাড়িটায়। মুগ্ধতায় রেশ কাটছিল না যেন। মিহি কণ্ঠের কবিতাতে সার্থক আজ হেমন্তের মাঠ! মায়াবতীর সান্নিধ্যে ধন্য যেন সবুজ রঙ।
‘ভাই ও ভাই, এখনো কিন্তু বললে না?’ সাগরের ডাকে ভাবনায় ছেদ পড়ল।
‘কী বলব?’ ‘ভাই তুমি ১০ বছর পর বিদেশ থেকে বলা নেই কওয়া নেই হুট করে চলে এলে কাল রাতে। এসেই আজ সকালে ঢাকা চলে এসেছ।
‘হ, এসেছি, তো?’
‘কবিতা আড্ডা তো এখন মাসে কয়েকটা হয়; সপ্তাহখানেক পর অন্য কোনো আড্ডায়ও তো যেতে পারতে।
‘পারতাম। তবে ওই আড্ডাগুলোতে আমার প্রিয় কবিটা থাকত না।
‘সারা দিন কবিতা আড্ডায় তোমার সাথে ছিলাম, কিন্তু তোমার প্রিয় কবি কে, তাকে তো দেখলাম না।’
‘প্রিয় কবি’র সাথে দেখা হয়েছে, কথা হয়েছে, অটোগ্রাফও নেয়া হয়েছে।’
‘কই। আমি তো দেখলাম না? যা দেখলাম, একটা অপরিচিত মেয়ের সাথে কথা বলছ, অটোগ্রাফ নিয়েছ, ফুল দিয়েছ।
‘ওটাই আমার প্রিয় কবি।’
‘ওই মেয়ে কবি! আবার তোমার প্রিয় কবি?
‘হুম, ওই মেয়ে কবি এবং আমার প্রিয় কবি। বয়স দেখে কবির বিবেচনা করা যায় না। কবির কবিতাই বলে দেবে তার অবস্থান।’
‘তবে ভাই আমি কিন্তু একটা জিনিস ল করেছি?
‘কী সেটা?
‘ফুল দিতে গিয়ে তুমি কিন্তু ইচ্ছে করে মেয়েটার হাতে টাচ করেছ।
সাগরের কথা শুনে আজিজুল চলন্ত বাসের কাচের জানালার দিকে মুখ করে হাসছে! যে হাসিতে মিশে আছে কিছু পূর্ণতার অপ্রকাশিত গল্প!
‘তোমার কবি কিন্তু লজ্জা পেয়েছে! তবে তোমার প্রিয় কবি তো তোমাকে চেনেনি!
আজিজুল তার ফোনটা বের করে সাগরের হাতে দিয়ে বলল, ‘নে, ম্যাসেঞ্জারে ঢুকে দেখ। আমাকে চেনে কি না’?
সাগর ফোনটা হাতে নিয়ে ম্যাসেঞ্জার ওপেন করে পড়তে থাকে মেয়েটার সাথে বলা কথাগুলো। কিছুণ পড়ে জিজ্ঞাসা করেÑ
‘ভাই, তোমার নামের সাথে যে ‘হেমন্ত লেখ, এই নাম তাহলে এই কবি আপার দেয়া?
‘হুম, ওর সাথে এমন বৃষ্টিময় হেমন্ত দিনে আমার প্রথম বন্ধুত্ব হয়। তাই কবি আমার নাম দিয়েছিলেন ‘হেমন্ত’।
‘হ বুঝছি। তুমি পরিচয় দিলে না কেন?’
‘আরে বোকা, পরিচয় দিলে তো খেলাই শেষ।’
সাগর আবার পড়তে থাকে, ‘কখনো কি আপনার সাথে দেখা হবে?’
‘পৃথিবী যখন গোল, আর দুইজন যেহেতু একই পথের যাত্রী, কোথাও দেখা হয়েও যেতে পারে।’
‘তাই। যদি কখনো দেখা হয়, আমি আমার এ হাত থেকে আপনার ও হাতে একমুঠো বকুল ফুল দেবো। কী নেবেন?’
‘ওকে, নেবো। বকুল আমার পছন্দ।’
‘কারো কাছ থেকে কি কখনো ফুল নিয়েছেন?’
‘না। এই প্রথম আপনি দিতে চাইলেন। আমিও নিতে রাজি হলাম।
‘ও তাই ? তাহলে তো আমি মহা ভাগ্যবান; তবে একটা অনুরোধ।’
‘কী?’
‘আমি ছাড়া অন্য কারো কাছ থেকে তত দিন, বকুল ফুল নিতে পারবেন না। যত দিন না আমার ফুলগুলো আপনার হাত স্পর্শ করবে।’
‘কেন?’
‘আমি দ্বিতীয় হতে চাই না, প্রথম হতে চাই।’
‘ওকে, বন্ধু হেমন্তকে কথা দিলাম, হেমন্ত ছাড়া কারো কাছ থেকে অন্তত বকুল ফুল নেবো না।’
‘ধন্যবাদ কবি।’
‘ঠিক আছে।’
‘আচ্ছা ফুল দিতে গিয়ে যদি আপনার হাতটা ধরে ফেলি, তাহলে কী করবেন?’
‘জানি না; আমাদের এখানে বৃষ্টি হচ্ছে, ঝুম বৃষ্টি। লাইনে থাকুন, আমি জানালা দিয়ে বৃষ্টিতে হাত ভেজাব। বৃষ্টির পানি ছুঁতে আমার অনেক ভালো লাগে।’
‘বাহ! তাই?’
‘আমার কিন্তু বৃষ্টি হতে ইচ্ছে করছে...।’
‘বৃষ্টি হতে ইচ্ছে হয় কেন?’
‘কবির হাতটা ছুঁয়ে যাওয়ার জন্য।’
‘আমি যাই, পরে কথা হবে।’
‘ঠিক। আমার বৃষ্টি চাই যে, হাত বেয়ে ঝরে পড়া বৃষ্টি।’
‘বাইরে হাত বাড়ান পেয়ে যাবেন।’
‘এই বৃষ্টি তো সরাসরি আকাশ থেকে পড়ছে, আমার যে কারো হাত বেয়ে ঝরে পড়া পানি চাই, যে হাতটা আমার কবির হাত।’

‘ভাই, ও ভাই। আজিজুল ঘুম ঘুম চোখে তাকাল সাগরের দিকে।’
‘আবার কী হলো?’
‘ভাই, মেয়েটাকে তুমি অনেক ভালোবাস তাই না?’
‘ভালোবাসি কি না জানি না, শুধু এটুকু জানি; ওকে না ভেবে আমার বেলা যায় না।
ও যদি আমার রিপ্লাই দিতে দেরি করে, সে সময়টা অস্থিরতায় পাগল হয়ে উঠি।
পৃথিবীর সব উদাসীনতা যেন খামচে ধরে বুকের পাঁজর। ফেসবুকে ও যখন ওর ছবি আপলোড করে, তখন আমার অনেক খারাপ লাগে।
আমি খুন হয়ে যাই তখন, ওর ছবিগুলোতে যখন মানুষ লাইক কমেন্ট করে।’
‘তুমি মেয়াটাকে বলো ফেসবুকে যেন ছবি না ছাড়ে।’
‘দ্যাখ, আমি চাই না। আমার কোনো ভুল ব্যবহার কিংবা ভুল আবেগে ওর সাথে আমার পরিচয়টা নষ্ট হয়ে যাক।
তা ছাড়া আমি কে যে তাকে নিষেধ করব? সামান্য ফ্রেন্ড, তাও আবার ফেসবুক ফ্রেন্ড। সাগর আজিজুলের কথা শুনে বলল, বাসায় গিয়ে শুনব তোমার কথা, এই বলে আবার পড়াতে থাকে।’
‘এই, আপনার হাতটা একটু দেবেন?’
‘কেন? আমার হাত দিয়ে কী করবেন?’
‘একটু ছুঁয়ে দেখব।’
‘আজকাল দেখছি আমার হাত ছোঁয়ার ইচ্ছেটা আপনার বেড়েই চলছে। এতই যখন হাত ধরতে ইচ্ছে হয়, তাহলে দেশে এসে বিয়ে করে বৌয়ের হাত ধরুন।’
‘আরে কবি, বিয়ে করলে তো ওটা হবে বউয়ের হাত, আমার বউ তো আর কবি হবে না।’ আমি তো ছুঁতে চাই কবির হাত। কবির হাত ছুঁয়ে দেখতে চাই আমার কল্পনা আর বাস্তবতার তফাত।’
‘আমি আপনার সাথে কোনো দিনও দেখা করব না।’
‘তাহলে আমার স্বপ্নের ফুলগুলোর কী হবে?’
‘আপনার সাথে দেখাই হবে না। আর বকুল ফুল তো অনেক দূরের কথা।’
‘দেখা করবেন না কেন? আমার অপরাধ?’
‘আপনার ভাবনাগুলোতে পোকা ধরেছে, ছোঁয়াছুঁয়ির পোকা।’
‘এভাবে বলতে পারলেন?’
‘হুম পারলাম।’
‘একটা কথা।’
‘কী কথা?’
‘আমি যে করে-ই হোক, একদিন না একদিন আপনার হাত ছুঁব-ই, এটা আমার প্রতিজ্ঞা।’
‘আমিও প্রতিজ্ঞা করলাম, আপনার একমুঠো বকুল ফুল আমি কখনো নেবো না। আমার হাতও আপনাকে ছুঁতে দেবো না।’
মেসেজ পড়া শেষ করে সাগর আজিজুলের দিকে তাকিয়ে মিটি মিটি হাসে। ‘ভাই, এবার তাহলে জিতল কে?’
কুয়ালালামপুর, মালয়েশিয়া

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫