পর্দা নামাজের মতোই ফরজ

মাকসুদা গাফ্ফার

আজকাল পর্দাকে তেমন কেউ গুরুত্বই দেন না। পর্দা বলতে বোঝায় নিজের শরীরকে সুন্দরভাবে ঢেকে বাইরে যাওয়া। এর জন্য যে বোরকাই পরতে হবে তা কিন্তু নয়। শালীন পোশাক পরে চলাফেরা করা এবং বাইরের সব কাজকর্ম করতে ইসলামে কোনো নিষেধ নেই। আজকাল রাস্তাঘাটে নামমাত্র পোশাক পরে যেভাবে মেয়েদের ঘোরাফেরা করতে দেখা যায়, এটা কারো জন্যই মঙ্গলজনক নয়। এসব নগ্নতার কারণেই সমাজে ব্যভিচার ও ধর্ষণ ছড়িয়ে পড়ছে কি না ভেবে দেখা দরকার। নিজের শরীর কি এতই সস্তা যে কিছু পশুপ্রকৃতির লোকের লোলুপ দৃষ্টির সামনে নিজেকে প্রকাশ করে বেড়াতে হবে? মহান আল্লাহ তায়ালা মানুষ সৃষ্টি করে কিছু বিধিবিধান দিয়েছেন, যাতে মানুষ নিরাপদে থাকে। পর্দাও তেমনি একটি বিধান, যা নারী-পুরুষকে সমাজে সম্মানিতভাবে বেঁচে থাকার পথ প্রদর্শন করে। দেখুন, পর্দা সম্পর্কে পবিত্র কুরআনে কী বলা হয়েছে। এরশাদ হচ্ছেÑ ‘হে নবী, আপনি মুমিন নারীদের বলে দিন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি সংযত রাখে। তাদের লজ্জাস্থানের হেফাজত করে এবং তাদের সৌন্দর্য প্রকাশ না করে, যা নিজে নিজে প্রকাশ হয়ে যায় তা ছাড়া। তারা যেন তাদের বক্ষের ওপর ওড়না ফেলে রাখে। তারা যেন তাদের স্বামী, তাদের পিতা, তাদের শ্বশুর, তাদের স্বামীর (আগের ঘরের) ছেলে, তাদের ভাই, ভাইয়ের ছেলে, বোনের ছেলে, তাদের মেলামেশার মহিলা, তাদের অধিকারভুক্ত সেবিকা, দাসী, নিজেদের অধীনস্থ এমন পুরুষ; যাদের মহিলাদের কাছে কামনা করার কিছু নেই। এমন শিশু, যারা মহিলাদের গোপন অঙ্গ সম্পর্কে কিছুই জানে না।’ এদের ছাড়া তারা যেন সবার সামনে শরীর ঢেকে চলাফেরা করে। পর্দা সম্পর্কে আরো বলা হয়েছে, ‘চলার সময় তারা যেন তাদের পা দিয়ে জোরে শব্দ না করে। যে সৌন্দর্য তারা গোপন করে রেখেছিল তা পায়ের আওয়াজে পুরুষদের যেন দৃষ্টি আকর্ষণ না হয়। হে ঈমানদার ব্যক্তিরা, ত্রুটিবিচ্যুতির জন্য আল্লাহর কাছে তওবা করো। আশা করা যায় তোমরা নাজাত পেয়ে যাবে। (সূরা নূর : ৩১)। আবার মুমিন পুরুষদেরও বলা হয়েছেÑ ‘হে নবী মুমিন পুরুষদেরও বলো তারা যেন তাদের দৃষ্টিকে নিম্নমুখী ও সংযত রাখে এবং তাদের লজ্জাস্থানগুলো হেফাজত করে, এটাই হচ্ছে তাদের জন্য উত্তম পন্থা। কেননা তাদের চোখ ও লজ্জাস্থান দিয়ে যা করে, আল্লাহ তায়ালা পূর্ণাঙ্গভাবে অবহিত রয়েছেন।’ এ সম্পর্কে হজরত আলী রা:-কে রাসূল সা: একটি উপদেশ দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘হে আলী, রাস্তা দিয়ে চলার সময় হঠাৎ করে তোমার দৃষ্টি কোনো মহিলার দিকে পড়ে গেলে তাতে কোনো দোষ নেই। কিন্তু ইচ্ছা করে আবার দৃষ্টি দিলে, সেটি শয়তানের দৃষ্টি। এর জন্য তুমি পাকড়াও হবে। কিন্তু আধুনিকতা ও প্রগতির নামে যদি নগ্নতা প্রকাশ করা হয়, তবে দেশ ও সমাজ থেকে ব্যভিচার ও ধর্ষণের মতো অপরাধ বন্ধ হবে কিভাবে। আল্লাহর বিধান ও ধর্মের নীতি-নৈতিকতা মেনে চললেই সমাজ থেকে এসব অন্যায় কাজ দূর হবে বিশ্বাস করলেই মঙ্গল। শুধু সংস্কৃতিচর্চার মাধ্যমে এগুলো দূর হচ্ছে কই? বিশুদ্ধ গান, সংস্কৃতিচর্চাতে অবশ্যই মনের আনন্দ আছে। আজকাল সংস্কৃতিচর্চা তো অনেক বেড়ে গেছে। কিন্তু দেহ ব্যবসা, পরকীয়া, সামান্য কারণে বিয়ে বিচ্ছেদ লেগেই আছে। ৯৬ শতাংশ মুসলমানের দেশে ধর্ষণ হয় কিভাবে? পৃথিবীর সব ধর্মেই ব্যভিচার ও ধর্ষণের মতো অপরাধকে নিষেধ করেছে ও মহাপাপ বলা হয়েছে। পবিত্র কুরআন ও হাদিসে এর মন্দ পরিণতি সম্পর্কে সাবধান করা হয়েছে। আবদুল্লাহ ইবনে ওমর রা: বর্ণনা করেছেন, ‘নবী সা: বলেছেন, এমন কতগুলো মন্দকাজ আছে যেগুলোতে জড়িয়ে পড়লে তোমাদের পরিণতি হবে ভয়াবহ। সেগুলো হচ্ছেÑ ১. ব্যভিচার বা ধর্ষণ। এ পাপ যদি কোনো সম্প্রদায়ের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে, তবে তাদের মধ্যে এমন রোগ দেখা দেবে, যা আগে কোনো দিন ছিল না। ২. মাপ এবং ওজনে কম দেয়াÑ এ মন্দকাজ যদি কোনো জাতির মধ্যে জন্ম নেয়, তবে আল্লাহ তাদের ওপর অনাবৃষ্টি, অতিবৃষ্টি চাপিয়ে দেন এবং তারা অত্যাচারী শাসকের শিকারে পরিণত হয়। ৩. জাকাত না দেয়াÑ এই মন্দকাজ যাদের মধ্যে দেখা দেয়, তাদের ওপর আকাশ থেকে বৃষ্টি হওয়া বন্ধ হয়ে যায়। আর ওই এলাকায় যদি পশুপাখি না থাকে তবে আদৌ বৃষ্টি হয় না। আল্লাহ ও রাসূল সা:-এর সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করাÑ এ মন্দ চিন্তা বা বিশ্বাস যখন কোথাও দেখা দেয়, তখন আল্লাহ পাক তাদের ওপর ইসলামের শত্রুদের চাপিয়ে দেন। যারা তাদের অনেক কিছু কেড়ে নিয়ে যায়। ৫. যদি মুসলিম শাসক আল্লাহর কিতাব অনুযায়ী দেশ শাসন না করেন, তবে আল্লাহ পাক মুসলিম সমাজে ভাঙন সৃষ্টি করে দেন এবং তারা পরস্পরের সাথে লড়াই ও খুনখারাবি শুরু করে দেয়। (বায়হাকি, ইবনে মাজা)।
আমি জ্ঞানীগুণী পাঠক, বুদ্ধিজীবী ও সুশীলসমাজকে সবিনয় অনুরোধ করছিÑ আপনারা দেশী-বিদেশী অনেক মনীষীর বই পড়াশোনা করেন, আমিও পড়ি। কিন্তু পবিত্র কুরআন অধ্যয়ন করে জেনেছি, পরকালের সব সমস্যার সমাধান একমাত্র পবিত্র কুরআনেই আছে। কারণ, এই পবিত্র কালাম মহান সর্বশক্তিমান আল্লাহ তায়ালার কাছ থেকে এসেছে। কারণ তিনিই একমাত্র সৃষ্টিকর্তা, যিনি তার সব সৃষ্টির প্রতি নির্ভুল ও পক্ষপাতশূন্য। তাই আমরা কুরআন অধ্যয়ন করলেই সব কিছুর কল্যাণ উপলব্ধি করতে পারব। নবী সা: তাঁর বিদায় হজের ভাষণে বলেছেন, ‘আমি তোমাদের জন্য দুটো জিনিস রেখে যাচ্ছিÑ ১. আল্লাহর কিতাব ও ২. আমার সুন্নাহ ও শরিয়ত। তোমরা যদি তা শক্তভাবে ধরে থাকো ও মেনে চলো তবে কখনো গোমরাহ বা পথভ্রষ্ট ও বিপর্যস্ত হবে না।’ সংস্কৃতিচর্চার সাথে ইসলামি মূল্যবোধ না থাকলে কোনো দিন সমাজ থেকে অন্যায়-অপরাধ দূর হওয়া সম্ভব নয়। মহান আল্লাহ পাক আমাদের সবাইকে সঠিক পথে চলার ও অন্যায়-অপরাধকে ঘৃণা করার অনুভূতি সৃষ্টি করে দিন, এই কামনা রইল।
লেখক : প্রবন্ধকার

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.