ঢাকা, মঙ্গলবার,২৪ এপ্রিল ২০১৮

গল্প

শিউলি

সিরাজুল করিম

২১ ডিসেম্বর ২০১৭,বৃহস্পতিবার, ১৪:৪৬


প্রিন্ট

শিউলীর কথামত বেলা ৪টায় আমি দাঁড়িয়ে রইলাম লাইটপোস্টের নিচে, বেগুনবাড়ির কাছে একটি দোকানের পাশে। দূর থেকে সে আমাকে দেখে নিলো তির্যক দৃষ্টিতে। সে বুঝতে পারল আমি আছি তারই অপেক্ষায়। আমার দৃষ্টি তাকে জনস্রোতে মিশতে দিলো না। সে আমাকে দেখেও না দেখার ভান করল। কিছুটা এগিয়ে সে আলাদা পথে চলল। এমন সময় আমি তার সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম।
অনেক দিন পর আজ আমাদের দেখা। আমাদের চার চোখের মিলন হলো। দেখলাম মুখ তার হাসিতে ভরে গেছে পূর্ণিমার চাঁদের মতো। তার চাঁদমুখ দেখে আমি আশ্বস্ত হলাম।
গায়ে গা লাগিয়ে আমরা পাশাপাশি হেঁটে চলেছি। কিছু দূর গিয়ে আমরা রিকশায় উঠলাম। সে আমার দু’হাত টেনে নিয়ে চেপে ধরে বলল, ‘দেখো, আমার বুকটা এখনো কাঁপছে। আজ বের হতে গিয়ে ধরাই পড়ে গিয়েছিলাম।’
বললাম না এলেই পারতে। এ সময় এত বিপদ মাথায় নিতে নেই। জানো তো আমাদের কেউ নেই সাহায্য করার। সামনে অনেক পথ। চলতে হবে সাবধানে।
সে আমার আদর্শে বিশ্বাসী। আর আমি মাও-সে-তুংয়ের আদর্শে। শিউলী জানত সব সময় আমার পকেটে থাকত লাল মলাটে বাঁধানো বই ‘মাও-সে-তুংয়ের উদ্ধৃতি’। সে সময় কেন জানি তার একটি উদ্ধৃতি আমার বারবার মনে পড়ত, ‘কেবল মাত্র একটা স্ফুলিঙ্গই বিরাট আকারের অগ্নিকাণ্ড ঘটাতে পারে।’ আর মনে মনে গাইতাম ‘পূর্ব দিগন্তে সূর্য উঠেছে, রক্ত লাল রক্ত লাল রক্ত লাল’।
শিউলীর সাথে আমার পরিচয় মাত্র এক বছর আগে মালিবাগের মোড়ে একটি দোকানে। তার মামীই আমাকে পরিচয় করিয়ে দিলো- ‘আমার ভাগিনী শিউলী’ বলে। সেদিন শিউলীকে শিউলী ফুলের মতো লাজুক মনে হলো। যদিও তার গায়ের রঙটা শিউলী ফুলের মতো সাদা নয়, কিছুটা কালো। শিউলী তখন ইডেন কলেজের ছাত্রী অষ্টাদশী, কালো হলেও দেখতে অপরূপ।
গত এক বছরে আমাদের পরিচয় প্রণয়ে পরিণত হলো। কয়েক দিন পরপর আমাদের দেখা হতো। বেশি দিন কেউ কাউকে না দেখে থাকতে পারতাম না।
ভাঙা রাস্তায় রিকশা নৌকার মতো হেলেদুলে এগিয়ে চলে। রাস্তা এতই খারাপ কখনো কখনো আমরা একজন আরেকজনের ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়ি, কখনো হয় মাথায় মাথায় ঠোকাঠুকি। এভাবে কখন যে আমরা রমনা পার্কে এসে পৌঁছি তা বুঝলাম রিকশাওয়ালার কথায়।
‘স্যার! আমরা এসে গেছি।’
রিকশাওয়ালার কণ্ঠস্বরে আমরা স্বপ্নের জগত থেকে বাস্তবে ফিরে এলাম।
রিকশা থামতে না থামতেই বাদাম বিক্রেতার উচ্চ কণ্ঠস্বর ‘বাদাম! টাটকা বাদাম! ভাজা বাদাম নেবেন’ বিরক্তির উদ্রেক করল।
তবুও দু’টাকার বাদাম কিনে আমরা রমনা পার্কের ভেতর একটি নিরিবিলি জায়গায় বসলাম। শরতের আকাশ। সাদা মেঘ ভেসে বেড়ায় আকাশের এ-প্রান্ত থেকে ও-প্রান্তে। যেন মেঘ নয় কাশফুলে আকাশ সেজেছে অপূর্ব সাজে। পাশ থেকে ভেসে আসছে শিউলী ফুলের মনমাতানো গন্ধ। সামনে পার্কের চোখ জুড়ানো রূপ। শিউলী বসে আছে ৪৫ ডিগ্রি কোণ এঁকে আমার গায়ে হেলান দিয়ে। দুষ্টুমির ভঙ্গিতে আমি একটু নড়তেই সে আমার গায়ের ওপর গড়িয়ে পড়ে। শিউলীকে সোজা করে বসিয়ে দিয়ে বললাম, তুমি আছো শিউলী নামের ফুল হয়ে সবার কাছে, তাই তোমাকে আজও পেলাম না একেবারে নিজের করে। সে তার দু’হাত দিয়ে আমাকে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে ধরে বলল, ‘এই তো আমি আছি তোমার পাশে শুধুু শরতে নয়, শরতের আগে পরে বছরজুড়ে। এখন যেমন আছি তেমনি থাকব সারাজীবন তোমার পাশে, তোমারই হয়ে।’
এভাবে গড়াতে থাকে দু’জনের ভালো লাগা, ভালোবাসা। বুঝতেই পারলাম না এরপরও দু’বছর কিভাবে কেটে গেল। এ দু’বছরে আমাদের দুই পর্ব- পরিচয় ও প্রণয় পর্ব শেষ হলো। কথা উঠল আমাদের তৃতীয় পর্বÑ পরিণয় অর্থাৎ বিয়ের। কয়েক দিন পরপর শিউলী বলতে থাকে, ‘আর দেরি নয়। বাবা-মার কাছে প্রস্তাব পাঠাও, আমি যে আর পারি না থাকতে।’
এ বিয়েতে আমার বাবা-মা মত দিলেন না। শিউলীর মা রাজি হলেও তার বাবা বেঁকে বসলেন। কর্ণফুলী যেখানে সাগরে মিশেছে সেই মোহনার অদূরে সাগর পাড়ে আমার পিতৃভূমি হলেও মাতৃভূমি আমার বাংলাদেশ। তবুও আমি নাকি বিদেশী- ভিনদেশী। বিদেশীদের বিশ্বাস নেই। তারা একাধিক বিয়ে করে। এ আশঙ্কায় শিউলীর বাবা শঙ্কিত। অবশেষে শিউলীর মামা-মামীর মধ্যস্থতায় তার বাবা রাজি হলেন আমাদের বিয়েতে। একদিন সন্ধ্যার পর কাজী সাহেব এসে আমাদের বিয়ে পড়ালেন।
শহরে শিউলীদের টিনের ঘর। বাসর ঘরে দু’জনের ফিস্ ফিস্ করে কানাকানির কথা টিনের ওপাশে ওঁৎ পেতে থাকা তার বোনদের মধ্যে যদি জানাজানি হয়ে যায়, এ আশঙ্কায় শিউলী শুরু থেকে মুখ ভার করে রইল। যা বললাম কানের কাছে কান, মুখের কাছে মুখ রেখে শুধু আমি। আমার মুখ থেকে কথাই ঝরল কলের জলের মতো হু হু করে।
অনেক পর শিউলী মুখ খুলল। ‘এতক্ষণ, শুধু তুমিই কথা বলেছ। এবার আমাকে বলতে দাও। আমার কথা তোমাকে শুনতেই হবে। মাত্র ক’দিন আগেই বিয়ে হয়েছে আমার এক বান্ধবীর। বর একজন ইঞ্জিনিয়ার। বান্ধবী এ বিয়েতে রাজি ছিল না। তার অমতে বিয়ে। কারণ তার আশৈশব ভালোবাসা তারই গ্রামের দূর সম্পর্কের এক আত্মীয়ের সাথে। বান্ধবীর বিয়ে হওয়াতে ছেলেটি এখন পাগল হয়ে গেছে। আমার বান্ধবীর এখন কী করা উচিত?
বাসর রাতে বাসর ঘরে শিউলীর এ প্রশ্নে আমি চমকে উঠি। তার প্রশ্নে আমি বিব্রত বোধ করি, কোনো উত্তর না পেয়ে বোবার মতো নিরুত্তর থাকি। উল্লেখ্য, আমি একজন বিএসসি পাস ইঞ্জিনিয়ার। শিউলীর অমতে আমি বিয়ে করিনি। হিসাব মেলাতে না পেরে ঘূর্ণায়মান পাখার মতো আমার মাথা ঘুরতে থাকে।
আমার উত্তরের অপেক্ষায় না থেকে শিউলী বলল, ‘তাহলে আমার বান্ধবীর কি উচিত নয় স্বামীকে ছেড়ে সে ছেলের কাছে ফিরে যাওয়া, যে এখনও বসে আছে তার আশায়?’
এটা বলতে গিয়ে শিউলীর গলা ধরে এলো। অন্ধকারেও আমি টের পেলাম শিউলী কাঁদছে। শিউলীর চোখে পানি। তার গালে হাত দিয়ে আমি তা বুঝতে পারলাম। বুঝতে পারলাম বাসর রাতের এ কান্না তার বান্ধবীর জন্য নয়। এ কান্না শিউলীর নিজের। এ কান্না তার নিজের জন্যই। মনে পড়ল মাও-সে-তুংয়ের সে উদ্ধৃতি। ‘কেবল মাত্র একটা স্ফুলিঙ্গই বিরাট আকারের অগ্নিকাণ্ড ঘটাতে পারে’।
দরজা খুলে আমি বাইরে আকাশের দিকে তাকালাম। শ্রাবণের আকাশ কালো মেঘে ছেয়ে গেছে। আমার মাথায় যেন সে আকাশ ভেঙে পড়ল। আমি ভাঙা আকাশ যেন মাথায় নিয়ে হাঁটার চেষ্টা করলাম। পাশের মসজিদ থেকে ভেসে আসছে মুয়াজ্জিনের সুউচ্চ কণ্ঠস্বর ‘আল্লাহু আকবার’ ‘আল্লাহু আকবার’- আল্লাহই মহান, আল্লাহই শ্রেষ্ঠ। শিউলীকে একা রেখে বাইরে থেকে ভেতরের ছিটকিনি ফেলে দিয়ে আমি এগিয়ে গেলাম অদূরে রেললাইন ধরে সামনের দিকে। আমার পাশ দিয়ে হুইশেল দিতে দিতে তীব্র গতিতে চলে গেল একটি ট্রেন। ট্রেনের নিচে ঝাঁপিয়ে পড়ার সময় পেলাম না। ট্রেন কোথায় গেল জানি না। তবে ট্রেন গেল যেন পথ হারিয়ে আমার বুকের ওপর দিয়ে বুকটাকে খণ্ড বিখণ্ড ও হাড়গুলোকে চূর্ণবিচূর্ণ করে দিগি¦দিক এদিক-সেদিক আঁকাবাঁকা এলোমেলো পথে।

 

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫