ঢাকা, বুধবার,১৭ জানুয়ারি ২০১৮

দেশ মহাদেশ

রাশিয়া-ইন্দোনেশিয়া সম্পর্কে নতুন মাত্রা

আনিসুর রহমান এরশাদ

২১ ডিসেম্বর ২০১৭,বৃহস্পতিবার, ০০:০০


প্রিন্ট


সমগ্র বিশ্বের চোখ এখন এশিয়ার দিকে। এশিয়াই আগামী দিনে অর্থনৈতিক ও সামরিক দিক দিয়ে বিশ্বরাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হবে। রাশিয়া বিশ্বের চলমান নতুন মেরুকরণের পথে নিজস্ব বলয় রার্থে অন্য রাষ্ট্রের সাথে সম্পর্ক রার পাশাপাশি উন্নত প্রযুক্তি ও অস্ত্র সরবরাহের মাধ্যমে এশিয়ার দেশগুলোর সাথে নিবিড় সম্পর্ক গড়ে তুলেছে। রাজনৈতিক ও প্রতিরা ইস্যুতে রাশিয়া-ইন্দোনেশিয়ার মধ্যে দৃঢ় সম্পর্ক তারই প্রমাণ।
বাণিজ্যিক খাতেও রাশিয়া-ইন্দোনেশিয়ার সম্পর্ক বর্তমানে অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি গভীর ও জোরদার হয়েছে। ইন্দোনেশিয়া-রাশিয়ার মধ্যে সাইবার নিরাপত্তা ও সন্ত্রাসবিরোধী বেশ কয়েকটি চুক্তি হয়েছে। কৌশলগত প্রতিরা সমরাস্ত্র কিংবা যুদ্ধবিমান থেকে শুরু করে পামতেল ও কফির মতো কৃষিপণ্য বিনিময়ে রুশ রাষ্ট্রায়ত্ত কনগ্লোমারেট রোসটেকের সাথে একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বার করেছে দেশটির রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন বাণিজ্য প্রতিষ্ঠান পিটি পেরুসাহান পেরদাগানগান ইন্দোনেশিয়া। ইন্দোনেশিয়ার বিমানবাহিনী ১৮টি রাশিয়ান এসইউ-৩৫ মাল্টিরোল ফাঙ্কার যুদ্ধবিমান ক্রয় করছে। ইন্দোনেশিয়ার কাছে রাশিয়া যে ডিজেল ইলেকট্রিক সাবমেরিন বিক্রি করছে; সেই সাবমেরিনগুলো আকাশে, ভূমিতে এবং সাগরে সমান দতায় আঘাত হানতে পারে। পরিবহন পরিকাঠামো, পর্যবেণব্যবস্থা, স্যাটেলাইট সম্প্রচার ও খাদ্যবাণিজ্যের ওপর রাশিয়া-ইন্দোনেশিয়া সহযোগিতা প্রকল্প পরিকল্পনাপর্যায়ে রয়েছে।
সামরিক সহযোগিতার পাশাপাশি বাণিজ্য সহযোগিতার েেত্র যা নতুন মাত্রা যোগ করেছে। সামরিক সাজসরঞ্জাম বিক্রির পাশাপাশি অর্থনৈতিক সহযোগিতা বাড়ানোর মধ্য দিয়ে প্রেসিডেন্ট পুতিন শুধু ইন্দোনেশিয়াই নয়, এ অঞ্চলে একসময়কার সোভিয়েত প্রভাবকে আবার ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছেন। বাণিজ্য ও অংশীদারিত্ব সম্প্রসারণের প্রচেষ্টা যেমন চালাচ্ছে রাশিয়া; তেমনি রাশিয়ার সাথে পর্যটন, শিা, জ্বালানি, প্রযুক্তি ও উড়োজাহাজ পরিচালনাসহ বিভিন্ন বিষয়ে অংশীদারিত্ব সম্প্রসারণের ল্য রয়েছে ইন্দোনেশিয়ার। ২০১৬ সালে দুই দেশের মধ্যকার বাণিজ্যের পরিমাণ দাঁড়ায় ২১১ কোটি ডলার। এর মধ্যে রাশিয়ার সাথে ইন্দোনেশিয়ার বাণিজ্য উদ্বৃত্তের পরিমাণ ছিল ৪১ কোটি ১০ লাখ ডলার। অন্য দিকে চলতি বছর জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত ইন্দোনেশিয়ান রফতানি ৫৪ দশমিক ৪৩ শতাংশ বেড়ে ১১২ কোটি ডলারে দাঁড়িয়েছে। ইন্দোনেশিয়ার জ্বালানি ও খনিজ শিল্পে চার শ’ কোটি ডলার বিনিয়োগ করছে রাশিয়া।
ইন্দোনেশিয়া-রাশিয়া সম্পর্ক মুসলিম বিশ্বের জন্যও বেশ গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বর্তমানে মুসলিম বিশ্বের অন্যতম পরাশক্তি। ছোট-বড় প্রায় ১৩ হাজারের বেশি দ্বীপের সমন্বয়ে গঠিত ইন্দোনেশিয়া। ২৬ কোটি জনসংখ্যার এ দেশটির ৮৮ শতাংশ মানুষ মুসলিম। ইন্দোনেশিয়ার সামরিক বাহিনী অত্যন্ত আধুনিক। তা ছাড়া ইন্দোনেশিয়ার স্পেশাল ফোর্স বিশ্বের অন্যতম সেরা। গ্লোবাল ফায়ার পাওয়ারে ১২৬টি দেশের মধ্যে ইন্দোনেশিয়ার অবস্থান ১৪তম। সেনাবাহিনী ও বিমানবাহিনীর পাশাপাশি ইন্দোনেশিয়ার নৌবাহিনীও বেশ শক্তিশালী। ইন্দোনেশিয়ার সেনাবাহিনীর আকার বিশাল। সরকার নির্বাচিত সদস্যদের সেনাবাহিনীতে অন্তর্ভুক্তি বাধ্যতামূলক। দুই বছর করে সেনাবাহিনীতে কাজ করতে হয়। রাশিয়ার সাথে সম্পর্ক বাড়ছে শক্তিশালী আরো দুই মুসলিম দেশ তুরস্ক ও পাকিস্তানের।
ইন্দোনেশিয়ায় বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্ভাবনা নিয়ে কাজ করছে রাশিয়া। কেননা বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম জনবহুল দেশ ইন্দোনেশিয়ার অর্থনীতি ধীরে ধীরে শক্তিশালী হয়ে উঠছে। অভ্যন্তরীণ বাজারব্যবস্থাতেও সংস্কার হয়েছে। প্রফেশনাল সার্ভিসেস জায়ান্ট পিডব্লিউসির রিপোর্টে পূর্বাভাস দিয়েছে, বিশ্বের আরেকটি উদীয়মান বাজার অর্থনীতির দেশ ইন্দোনেশিয়া র‌্যাংকিংয়ে ইউরোপের পাওয়ার হাউজ জার্মানি এবং এমনকি রাশিয়াকে ২০৫০ সালের মধ্যে পেছনে ফেলে দেবে। ইন্দোনেশিয়ায় আগামী ৩৪ বছর গড়ে ৩.৫ শতাংশের বেশি হারে প্রবৃদ্ধি হতে থাকবে; যেখানে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, ফ্রান্স, জার্মানি, ইটালি, ব্রিটেন ও জাপানে প্রবৃদ্ধি হবে ১.৬ শতাংশ হারে। ২০১০ থেকে ২০১৫ পর্যন্ত বৈশ্বিক অর্থনীতিতে যে বিপর্যয় এনেছিল তা ইন্দোনেশিয়াকে কিছুটা তিগ্রস্ত করে কিন্তু দেশটি ২০১৬ সালের মধ্যেই অর্থনীতির বিপর্যয় থেকে উঠে এসেছে।
উচ্ছল ও প্রাণশক্তিতে ভরপুর তরুণ জনগোষ্ঠীর সংখ্যাধিক্যের কারণে রাশিয়ার নিয়োগকারীরা ইন্দোনেশিয়ায় বিনিয়োগে উৎসাহিত হচ্ছে। ইন্দোনেশিয়ার জনসংখ্যার গড় বয়স ত্রিশের কম। ৬৭ শতাংশ মানুষ ১৫ থেকে ৬৫ বছরের মধ্যে এবং এদের বেশির ভাগই কর্মম। ইন্দোনেশিয়ায় প্রবৃদ্ধির হার এখন পর্যন্ত যদিও চীন ও প্রতিবেশী মালয়েশিয়ার চেয়ে কম তবু অপোকৃত তরুণ ও মধ্যবিত্ত শ্রেণী এ দেশের প্রবৃদ্ধিকে এগিয়ে নিয়ে যাবে। ইন্দোনেশিয়ার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি দ্রুত হারে বৃদ্ধির জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করে সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে বিনিয়োগপ্রক্রিয়াকে সংস্কার করা হয়েছে। দেশটিতে বিনিয়োগের জন্য সর্বোচ্চ পর্যায় পর্যন্ত চলে যাওয়ার সুযোগ করে দেয়া হয়েছে। ইন্দোনেশিয়া বিশ্বের প্রথম পামওয়েল ও টিন রফতানিকারক দেশ, দ্বিতীয় বৃহত্তম রাবার ও চতুর্থ বৃহত্তম কয়লা রফতানিকারক দেশ।
রাশিয়া-ইন্দোনেশিয়া দ্বিপীয় সমঝোতার েেত্র প্রতিরা সহযোগিতার বিষয়টি সর্বাধিক গুরুত্ব পাচ্ছে। রাশিয়া এবং ইন্দোনেশিয়া প্রায় ১০০ কোটি ডলারের একটি অস্ত্র চুক্তি সই করেছে। রাশিয়ার হেলিকপ্টার, কামান ও ডুবোজাহাজ ইন্দোনেশিয়ার অস্ত্রভাণ্ডারে যেসব ঘাটতি রয়েছে তা মেটাতে সাহায্য করবে। এ ছাড়া আরো কিছু কৌশলগত সামরিক সাজ সরঞ্জাম কিনবে রাশিয়া থেকে। রাশিয়া রাজনৈতিক-সামরিক-বাণিজ্যিক নানা কারণেই ইন্দোনেশিয়ার প্রতি দিন দিন বেশি আগ্রহী হচ্ছে। উভয় দেশের সম্পর্কের নতুন মেরুকরণ দণি-পূর্ব এশিয়ায় যে, দারুণ প্রভাব ফেলবে তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

 

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫