ঢাকা, শুক্রবার,১৯ জানুয়ারি ২০১৮

দেশ মহাদেশ

কংগ্রেস নেতৃত্বে রাহুল

আলমগীর কবির

২১ ডিসেম্বর ২০১৭,বৃহস্পতিবার, ০০:০০


প্রিন্ট

তখন কি এ কথা কেউ ভেবেছিলেন, ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের সভাপতির দায়িত্ব নেয়ার ৮৮ বছর পরও একই পরিবারের হাতে থাকবে কংগ্রেসের সভাপতির কর্তৃত্ব। যিনি ১৯২৯ সালে প্রথমবার কংগ্রেসের সভাপতি হলেন, পরবর্তী ৮৮ বছরের এক বিরাট সময়জুড়ে তার পরিবারের হাতেই থাকবে কংগ্রেসের রাসটা। সম্ভবত উত্তরটা হবে, কারোই জানা ছিল না। আজ অবশ্য জানেন এবং বিশ্বাস করেন অনেকে, কংগ্রেসের শীর্ষ পদ আর নেহরু গান্ধী পরিবার প্রায় সমার্থক। ধারাবাহিকতা বহাল রেখেই ১৬ ডিসেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের সভাপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন রাহুল গান্ধী।
রাহুল গান্ধী এমন এক সময় সভাপতি পদে বসলেন, যখন দল এক অভূতপূর্ব সন্ধিক্ষণে। রাহুলের আগে তার পরিবারের তিন প্রজন্ম কংগ্রেসের শীর্ষ পদ সামলেছে। কিন্তু জওয়াহেরলাল নেহরু, ইন্দিরা গান্ধী, রাজিব গান্ধী প্রত্যেকেই এমন এক সময়ে দলের দায়িত্ব হাতে নিয়েছিলেন, যখন দল শাসনমতায় আসীন। সোনিয়া গান্ধী অবশ্য বিরোধী আসনে থাকা কংগ্রেসের দায়িত্বই হাতে পেয়েছিলেন। কিন্তু সে কংগ্রেসও আজকের মতো দুর্বল ছিল না এবং পরে টানা এক দশক মতাসীন কংগ্রেসকেও হাতে পেয়েছেন সোনিয়া।
রাহুল গান্ধী কখন হাতে পেলেন কংগ্রেসের সভাপতিত্ব? যখন প্রায় গোটা দেশে বিজেপি অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠেছে। যখন দেশের প্রায় সব বড় রাজ্যে মতার কেন্দ্র থেকে কংগ্রেস বহু দূরে ছিটকে গেছে। যখন আসমুদ্র হিমাচল ভারতে বিজেপিবিরোধী শক্তিগুলো কয়েকটি বিচ্ছিন্ন দ্বীপে সীমাবদ্ধ হয়ে গেছে। যখন স্বাধীন ভারতের ইতিহাসে প্রথমবার সংসদের দুই কইে কংগ্রেস সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারিয়েছে। যখন দেশের নানা প্রান্তে নানা স্তরের নির্বাচনে কংগ্রেসের ব্যর্থতা সাফল্যের চেয়ে অনেক বেশি।
অতএব যে মুকুট রাহুল গান্ধী পরেছেন, তা যে কাঁটার মুকুট, সে নিয়ে কোনো সংশয় নেই।
নেহরু গান্ধী পরিবারের সদস্য হিসেবে রাহুলই যে সবচেয়ে কঠিন সময়ে কংগ্রেস সভাপতিত্বে আসীন হলেন, তা নিয়েও কোনো দ্বিমত থাকার কথা নয়।
নেহরু গান্ধী পরিবারের বাইরে কংগ্রেস সচরাচর কোনো সভাপতি খুঁজে পায় না, এ কংগ্রেসের অভ্যন্তরীণ দুর্বলতা হতে পারে। সে দুর্বলতা কাটানোর প্রয়োজন কংগ্রেস বোধ করে কি না তা কংগ্রেসকেই চিন্তা করতে হবে।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে এ নিয়ে বিশদ আলোচনার অবকাশ নেই। আলোচনার অবকাশ এখানে রাহুল গান্ধীর সাফল্য বা ব্যর্থতার সম্ভাবনা নিয়ে। রাজনীতিতে অনেক বছরই কাটিয়ে দিয়েছেন রাহুল। কিন্তু দলের মুকুটে উল্লেখযোগ্য সাফল্যের পালক তিনি সংযোজন করতে পেরেছেন, এমন নজির নেই। সভাপতি হওয়ার পরে কি কিছুটা বদলে দিতে পারবেন তিনি পরিস্থিতি? রাজনৈতিক শিবিরে চর্চা এখন তা নিয়েই।
এ কথা ঠিক যে, অতীতের রাহুল গান্ধী এবং সাম্প্রতিক রাহুল গান্ধীর মধ্যে কিছু দূরত্ব চোখে পড়েছে। বারবার ‘পাপ্পু’ সম্বোধনে যে রাহুলের রাজনৈতিক প্রজ্ঞাকে নেতির আলোকে দেখানোর চেষ্টা করে তার বিরোধীরা, গুজরাট বিধানসভা নির্বাচনে কিন্তু সেই রাহুলকে দেখা যায়নি। তার মধ্যে অনেক পরিণত এক রাজনীতিককে দেখা গেছে গুজরাটে। বেফাঁস মন্তব্য করে বিজেপির হাতে অস্ত্র তুলে দেননি তিনি। বেফাঁস মন্তব্য দেখেই মণিশঙ্কর আইয়ারের মতো প্রবীণ নেতার বিরুদ্ধেও তৎণাৎ পদপে নিয়েছেন। হার্দিক, অল্পেশ, জিগ্নেশের মতো পরস্পরবিরোধী নেতাদের এক ছাতার তলায় এনেছেন। গুজরাটে সম্পূর্ণ নতুন এক সামাজিক কৌশলের জন্ম দিয়েছেন। কংগ্রেস রাজনীতির বহু বছরের অভিমুখ তিনি ঘুরিয়ে দিয়েছেন, সংখ্যালঘুর অধিকার নিয়ে সরব হননি, আশ্রয় নিয়েছেন কৌশলের, মন্দিরে মন্দিরে ঘুরে গুজরাটে নরম হিন্দুত্বের বার্তা দিতে চেয়েছেন। গোটা ভারতে যখন দুর্নিবার গতি বিজেপির, তখন নরেন্দ্র মোদির নিজের রাজ্যে বিজেপিকে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছেন। অর্থাৎ সভাপতি পদে আসীন হওয়ার প্রাক-মুহূর্ত থেকেই এক অন্য রাহুল দেখা দিতে শুরু করেছেন।
গুজরাট নির্বাচনে জয় পায়নি কংগ্রেস, কিন্তু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ যে হয়ে উঠতে পেরেছে অনেক বছর পরে, এ নিশ্চয়ই রাহুল গান্ধীর কৃতিত্ব। রাহুল গান্ধী অবশ্য বলেছেন, গুজরাটে নৈতিক জয় পেয়েছে কংগ্রেস।
গুজরাট বিধানসভার ভোটের ফল গত সোমবার প্রকাশ হয়েছে। ১৮২ আসনের বিধানসভায় ৯৯ আসন পেয়ে বিজেপি ষষ্ঠবারের মতো সরকার গড়ার সুযোগ পেয়েছে। হাড্ডাহাড্ডি লড়াই শেষে কংগ্রেস পায় ৮০ আসন। ফল প্রকাশের পর রাহুল জয়ী বিজেপিকে অভিনন্দন জানিয়েছিলেন। অভিনন্দন জানিয়েছিলেন কংগ্রেসের কর্মী ও সমর্থকদেরও।
রাহুল অবশ্য প্রবল সমালোচনা করেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির। ফল প্রকাশের পর কংগ্রেসের সমালোচনা করে মোদি বলেছিলেন, বিজেপি বিকাশ ও উন্নয়নকে ভোটের ইস্যু করেছিল, কংগ্রেস ভোটে লড়তে এসেছিল জাতপাতকে আঁকড়ে। এসব উল্লেখ করে রাহুল বলেন, ‘মোদিজির দাবি, গুজরাটের জয়ের অর্থ নোট বাতিল ও জিএসটি সিদ্ধান্তে জনতার অনুমোদন। মোদিজি এখন উন্নয়নের কথা বলছেন। অথচ নির্বাচনী প্রচারে তিনি একটিবারের জন্যও উন্নয়নের কথা বলেননি। জিএসটির কথা বলেননি। তোলেননি নোট বাতিলের প্রসঙ্গ।’ এরপরই রাহুল বলেন, ‘এই ভোট মোদিজির বিশ্বাসযোগ্যতার ওপরই প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। সত্যি বলতে কি, মোদিজির বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে সমস্যাও রয়েছে।’
তবে এটা ঠিক, এই নির্বাচনে না জিতেও রাহুল প্রবল পরাক্রমী রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে কাঁপিয়ে দিতে পেরেছেন। এটা নিঃসন্দেহে কংগ্রেসের জন্য ইতিবাচক।
বিজেপির বিরুদ্ধে যে রাজনৈতিক প্রবাহ ভারতে, সে প্রবাহের চালিকাশক্তি যে কংগ্রেসের হাতেই থাকছে এবং কংগ্রেস যে ঘুরে দাঁড়ানোর লড়াইটাও শুরু করে দিয়েছে, গুজরাট নির্বাচনে কংগ্রেসের অপোকৃত ভালো ফলে সেটাই প্রমাণিত হয়েছে। রাহুল গান্ধী নিজেও সম্ভবত এটার জন্য অপেক্ষা করছিলেন।

 

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫