ঢাকা, বুধবার,১৭ জানুয়ারি ২০১৮

পাঠক গ্যালারি

শত বছরের ফিলিস্তিন সমস্যা

ড. মোহাম্মদ আরিফুর রহমান

২০ ডিসেম্বর ২০১৭,বুধবার, ১৮:৪০


প্রিন্ট
শত বছরের ফিলিস্তিন সমস্যা

শত বছরের ফিলিস্তিন সমস্যা

১৯১৭ থেকে ২০১৭। ক্যালেন্ডারের হিসাবে ১০০ বছর। ভাগ্যহত ফিলিস্তিনিদের জন্য বিগত এই ১০০ বছর দুঃখ কষ্ট আর যন্ত্রণার জীবন্ত ইতিহাস। নিজ দেশে পরবাসী হয়ে অমানবিক জীবন যাপন করছে ফিলিস্তিনি জনগণ। ১৯১৭ সালের ২ নভেম্বর তৎকালীন ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী জেমস আর্থার ইহুদি সম্প্রদায়ের নেতা ব্যারন রথচাইল্ডের কাছে একটি চিঠি লিখেন। এক সপ্তাহ পর ৯ নভেম্বর ১৯১৭ চিঠিটি পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। এ চিঠিতে মি. বেলফোর ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইহুদিদের জন্য রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পক্ষে ব্রিটেনের অবস্থানের কথা ঘোষণা করেন। ইতিহাসে এটি ‘বেলফোর ঘোষণা’ নামে পরিচিত। ওই ঘোষণা অনুযায়ী ব্রিটেন ফিলিস্তিনে ইহুদিবাদী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় সর্বাত্মক প্রচেষ্টার অঙ্গীকার করে। ১৯১৪ সালের ২৮ জুলাই ইউরোপে শুরু হয় প্রথম বিশ্বযুদ্ধ, যা ১১ নভেম্বর ১৯১৮ পর্যন্ত স্থায়ী ছিল। এ যুদ্ধের ফলেই অনেক পুরনো সাম্রাজ্যের পরিবর্তন ও পতন ঘটে ইউরোপিয়ান সাম্রাজ্যের নতুন রূপ নেয়, পৃথিবীর মানচিত্রে ও রাজনৈতিক অঙ্গনে বিরাট পরিবর্তন হয়। বদলে যায় অনেক দেশের ভৌগোলিক সীমারেখা। তবে সবচেয়ে বড় ক্ষতিগ্রস্ত হয় মুসলিম উম্মাহ। অবসান হয় শত শত বছর ধরে চলে আসা মুসলিম খিলাফতের অস্তিত্ব। 

উল্লেখ করা দরকার, যুদ্ধের সময়ে মিত্রবাহিনী বিভিন্ন পক্ষের সাথে কয়েকটি চুক্তি করেছিল। চুক্তিটি মধ্যপ্রাচ্য অংশের মূল কয়েকটি দফা ছিল। যেমন- আরবদের নেতা মক্কার আমির শরিফ হুসেইন বিন আলী যদি তুরস্কের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেন, তাহলে তাকে অখণ্ড আরবের স্বাধীন বাদশাহ করা হবে। উসমানীয় সাম্রাজ্যকে পরাজিত করার পর আরব দেশসহ সাম্রাজ্যের সব ভূখণ্ডকে কিভাবে মিত্রশক্তি তাদের নিজেদের মধ্যে বণ্টন করবে, তা নির্ধারণ এবং ইহুদিদের জন্য পৃথক একটি রাষ্ট্র সৃষ্টি ইত্যাদি।
কিন্তু মিত্রশক্তি তাদের নিজেদের মধ্যকার গোপন চুক্তিতে হোসেন বিন আলীকে আরব বিশ্বের কোনো খলিফা বা শাসক করার কোনো পরিকল্পনাই রাখেনি, বরং তারা আরব ভূখণ্ডকে তাদের মধ্যে ভাগ করে নেয় এবং আরবদের উসমানিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ লাগিয়ে দেয়। ১৯১৬ সালে আরব বিদ্রোহ শুরু হলে তা মধ্যপ্রাচ্য রণাঙ্গনে উসমানীয়দের স্রোত উল্টে দেয়। ১৯১৮ সালের ৩০ অক্টোবর মুড্রোসের যুদ্ধবিরতি স্বাক্ষর হলে লড়াইয়ের অবসান ঘটায় এবং কনস্টান্টিনোপল দখল ও উসমানীয় সাম্রাজ্যের বিভাজনের ঘটনা ঘটে। ১৯২২ সালের ১ নভেম্বর সালতানাত বিলুপ্ত করা হয়। ১৯২৩ সালের ২৯ অক্টোবর তুরস্ককে প্রজাতন্ত্র ঘোষণা করে। শেষ হয় মুসলিম বিশ্বের ঐক্যের শেষ নিশানা উসমানীয় খেলাফত।

এ দিকে ব্রিটিশরা এক দিকে ইহুদিদের জন্য খুলে দেয় ফিলিস্তিনের দরজা, অন্য দিকে ব্রিটিশ বাহিনীর সহযোগিতায় ইহুদিরা ফিলিস্তিনদের বিতাড়িত করে নিজেদের অবস্থান সুদৃঢ় করে। বেলফোর ঘোষণার ৩১ বছর পর ১৯৪৮ সালে আমেরিকা ও ব্রিটেনের প্রত্যক্ষ পৃষ্ঠপোষকতায় ১৯৪৮ সালের ১৪ মে ইহুদি নেতা ডেভিড বেন গুরিয়ান একতরফাভাবে ইসরাইল রাষ্ট্রের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। ১৯৪৭ সালের ২৯ নভেম্বর নিউ ইয়র্কে জাতিসঙ্ঘের সাধারণ পরিষদ ফিলিস্তিনকে বিভক্ত করা নিয়ে বিতর্কিত প্রস্তাব ১৮১ গ্রহণ করে। প্রস্তাব অনুযায়ী মোট জনসংখ্যার এক-চতুর্থাংশ হয়েও ইহুদিরা পেল ভূমির ৫৭ শতাংশ আর ফিলিস্তিনিরা পেল ৪৩ শতাংশ, তবে প্রস্তাবিত ইহুদি রাষ্ট্রটির উত্তর-পশ্চিম সীমানা ছিল অনির্ধারিত, যাতে ভবিষ্যতে তারা সীমানা বাড়াতে পারে। প্রস্তাব পাসের সময় ফিলিস্তিনে ছিল ১৩ লাখ আরবের বসতি; বিপরীতে সেখানে ছিল ছয় লাখ ইহুদির বাস। ১৯৪৮ সালে জনসংখ্যার মাত্র ৩০ শতাংশের প্রতিনিধিত্বকারী হয়েও ইহুদি রাষ্ট্রটি ফিলিস্তিনের ৫৪ শতাংশ ভূখণ্ডের মালিক হয়। জবরদস্তিমূলকভাবে ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে আত্মপ্রকাশ করে ইহুদিবাদী রাষ্ট্র ইসরাইল।
৫৩১টি ফিলিস্তিনি গ্রাম ও শহর উচ্ছেদ করে ইহুদিদের জন্য স্বতন্ত্র এ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা হয়। এর পর থেকে দেশ দু’টির প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় অব্যাহতভাবে ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড অধিগ্রহণ করে চলেছে ইসরাইল। মধ্যপ্রাচ্যে আরব অধ্যুষিত ভূখণ্ডে একটি ইহুদি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ঘোষণাকে কোনোভাবেই মেনে নিতে পারেননি আরব নেতারা। সে ঘোষণায় তারা অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন। ফলে ইসরাইল রাষ্ট্র ঘোষণার পর থেকে ১৯৮২ সাল পর্যন্ত আরবদের সাথে ফিলিস্তিন ও তার বাইরে চারটি ব্যাপক যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছে। তাতে পাশ্চাত্য সমর্থনে বলীয়ান ও সামরিক দিক থেকে শক্তিশালী ইহুদি রাষ্ট্র ইসরাইলের কাছে আরবরাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সবচেয়ে বেশি।

ফিলিস্তিনের পেছনের ইতিহাস অনেক দীর্ঘ। ভূখণ্ডটির রয়েছে ধর্ম, সংস্কৃতি, বাণিজ্য ও রাজনীতির এক দীর্ঘ ও আলোড়ন সৃষ্টিকারী ইতিহাস। সপ্তম শতকে (৬৩৭ সালে) খলিফা উমর ইবনুল খাত্তাবের শাসনামলে মুসলমানেরা জেরুজালেম জয় করার মাধ্যমে ফিলিস্তিন অঞ্চল মুসলিম শাসনের অধীনে আসে। উমর ইবন আল-খাত্তাব রা: একাই একটি গাধা এবং এক চাকরকে নিয়ে মদিনা ছেড়ে জেরুসালেমের উদ্দেশে যাত্রা করেন।

জেরুসালেমে সম্রাট সফ্রোনিয়াস তাকে স্বাগত জানান। মুসলিমদের খলিফা ও তৎকালীন বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর ব্যক্তি উমর রা: ছিলেন খুব সাধারণ বুননের পোশাকে। তাকেও ভৃত্যের মধ্যে কে উমর তা আলাদা করা যাচ্ছিল না। এ অবস্থা দেখে সফ্রোনিয়াস খুবই বিস্মিত হন। তিনি শহরের বাসিন্দাদের নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি দিয়ে চুক্তিবদ্ধ হন। সফ্রোনিয়াস খলিফা উমরকে স্বাগত জানান। ১০৯৯ সালে প্রথম ক্রুসেডের সময় ইউরোপীয় খ্রিষ্টান সেনাবাহিনী জেরুসালেম দখল করে এবং ১১৮৭ সালের ২ অক্টোবর সুলতান সালাহউদ্দিন আইয়ুবির বিজয় লাভের আগ পর্যন্ত এতে তাদের কর্তৃত্ব বহাল ছিল। রোমান সাম্রাজ্য, ক্রুসেড কত ঝড়ই না বয়ে গেছে এ শহরের ওপর। ধর্ম আর রাজনীতি একে অপরের সাথে জড়িয়ে তৈরি হয়েছে দীর্ঘ ঘটনাপ্রবাহ। যে প্রবাহ অনেক রক্ত ঝরিয়েছে।

যা হোক, ১৯৪৮ সালে জাতিসঙ্ঘের মাধ্যমে ইসরাইল প্রতিষ্ঠা আনুষ্ঠানিকভাবে চূড়ান্ত হলেও উপেক্ষিত থেকে যায় ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ। বিশ্বরাজনীতির কূটকৌশলে জিতে গিয়ে ইহুদিরা হত্যা সন্ত্রাসের পাশাপাশি ফিলিস্তিনিদের উচ্ছেদ করার উদ্দেশে তাদের বাড়িঘরে গ্রেনেড নিক্ষেপ, জমি দখল ও নির্যাতন করে মৃত্যু বিভীষিকা সৃষ্টি করে। ফলে লাখ লাখ আরব বাধ্য হলো দেশ ত্যাগ করতে। ক্ষুব্ধ আরব দেশগুলো পুরো ফিলিস্তিনকে নিয়ে একটি একক, গণতান্ত্রিক ও স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের ডাক দেয়। আরবদের দাবি, ১৯৪৭ সালে জাতিসঙ্ঘ দ্বারা প্রস্তাবিত ফিলিস্তিন বিভাগ যেভাবে প্রস্তাবিত হয়েছিল, তাতে জেরুসালেমকে ঘোষিত ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের রাজধানী আখ্যা দেয়া হয়েছিল।

এ দিকে ২০১৭ সালের নভেম্বর মাসে বেলফোর ১০০ বছর পূর্ণ হলো এবং ফিলিস্তিনকে বিভক্ত করে দু’টি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় জাতিসঙ্ঘের গৃহীত ঐতিহাসিক প্রস্তাবের ৭০ বছর পূর্তির এ বছর। ১৯৪৭ সালে জাতিসঙ্ঘের যে প্রস্তাব অনুসারে আজকের ইহুদি রাষ্ট্র ইসরাইলের প্রতিষ্ঠা, সেই একই প্রস্তাব অনুযায়ী একটি স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার কথা থাকলেও অধরাই রয়ে গেছে ফিলিস্তিনের স্বাধীনতা। গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের প্রবক্তার দাবিদার পশ্চিমা বিশ্ব ফিলিস্তিনিদের ন্যায্য অধিকার তথা স্বাধীনতার বিষয়ে নানা ছলচাতুরীর আশ্রয় নিয়ে ফিলিস্তিনি জনগণের মৌলিক অধিকার চরমভাবে ক্ষুণ্ন করে যাচ্ছে এবং স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র গঠনের বিষয়ে অহেতুক কালক্ষেপণ করছে। এর মাধ্যমেই পশ্চিমা বিশ্বের গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের স্বরূপটি উন্মোচিত হয়েছে।

সম্প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সেই উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে আরো ইন্ধন জোগালেন। জেরুসালেমকে ইসরাইলের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে তিনি আগুনে ঘি ঢেলে দিলেন। আবার রাস্তায় নেমেছে ফিলিস্তিনিরা শুরু করেছে আন্দোলন। অপর দিকে ইসরাইলও তা প্রতিরোধে নেমেছে। আবারো বয়ে যাচ্ছে রক্তের বন্যা। ইতোমধ্যে প্রাণ হারিয়েছে অনেক নিরীহ মানুষ। বিশ্বজুড়ে চলছে প্রতিবাদ বিক্ষোভ। এ অবস্থার অবসানের জন্য মুসলিম উম্মাহর ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করাই সময়ের দাবি। গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের প্রবক্তার দাবিদার পশ্চিমা বিশ্বের উচিত হবে আর কালক্ষেপণ না করে ফিলিস্তিনিদের স্বাধীনতার জন্য ইতিবাচক ভূমিকা পালনা করা।

লেখক : প্রাবন্ধিক ও গবেষক
arif09ctg@gamil.com

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫