জুডিশিয়াল সার্ভিস বিধিমালা এবং সুপ্রিম কোর্টের ক্ষমতা
জুডিশিয়াল সার্ভিস বিধিমালা এবং সুপ্রিম কোর্টের ক্ষমতা

জুডিশিয়াল সার্ভিস বিধিমালা এবং সুপ্রিম কোর্টের ক্ষমতা

ইকতেদার আহমেদ

বাংলাদেশে ১৯৭২ সালের ১৬ ডিসেম্বর প্রথম সংবিধান কার্যকর হয়। এটি সমধিক পরিচিত বাহাত্তরের সংবিধান নামে। এ সংবিধানে সংসদীয় পদ্ধতির সরকার ব্যবস্থা দিয়ে সরকার পরিচালনার বিধান ছিল। এ ধরনের ব্যবস্থায় প্রজাতন্ত্রের নির্বাহী ক্ষমতা প্রধানমন্ত্রীর মাধ্যমে প্রযুক্ত হয়। এ ব্যবস্থায় রাষ্ট্রপতি রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে রাষ্ট্রের অন্যসব ব্যক্তির ঊর্ধ্বে স্থান লাভ করলেও প্রধানমন্ত্রী ও প্রধান বিচারপতি নিয়োগের ক্ষেত্র ছাড়া রাষ্ট্রপতি তার অপর সব দায়িত্ব প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী সম্পন্ন করে থাকেন। 

১৯৭৫ সালে সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রপতিশাসিত সরকার ব্যবস্থা চালু করা হয়। এ ব্যবস্থায় প্রজাতন্ত্রের নির্বাহী কর্তৃত্ব রাষ্ট্রপতির ওপর ন্যস্ত থাকে এবং রাষ্ট্রপতি প্রত্যক্ষভাবে অথবা তার অধীনস্থ কর্মচারীর মাধ্যমে তা প্রয়োগ করেন।

১৯৯১ সালে সংবিধানের দ্বাদশ সংশোধনী প্রণয়নের মাধ্যমে পুনঃসংসদীয় পদ্ধতির সরকার ব্যবস্থায় প্রত্যাবর্তন করা হয়, যা আজো অব্যাহত আছে। ’৭২-এর সংবিধানে অধস্তন আদালতগুলোর নিয়ন্ত্রণ ও শৃঙ্খলা বিষয়ে সংবিধানের অনুচ্ছেদ নং ১১৬ এ উল্লেখ ছিল- বিচারকর্ম বিভাগের নিযুক্ত ব্যক্তিদের এবং বিচার বিভাগীয় দায়িত্ব পালনরত ম্যাজিস্ট্রেটদের নিয়ন্ত্রণ (কর্মস্থল নির্ধারণ, পদোন্নতি দান ও ছুটি মঞ্জুরিসহ) ও শৃঙ্খলাবিধান সুপ্রিম কোর্টের ওপর ন্যস্ত থাকবে।

সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে সংসদীয় পদ্ধতির সরকার ব্যবস্থার পরিবর্তে রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার ব্যবস্থার প্রবর্তন ঘটলে ১১৬ অনুচ্ছেদ সংশোধন করে অধস্তন আদালতের বিচারকদের নিয়ন্ত্রণ ও শৃঙ্খলা বিধানের দায়িত্ব সুপ্রিম কোর্টের পরিবর্তে রাষ্ট্রপতির ওপর ন্যস্ত করা হয়।
সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনী প্রণয়নের সময় বিচার বিভাগীয় কর্মচারীরা বিচারকার্য পালনের ক্ষেত্রে স্বাধীন থাকাবিষয়ক ১১৬ক অনুচ্ছেদ সন্নিবেশিত হয়। এ অনুচ্ছেদটিতে বলা হয়- সংবিধানের বিধানাবলি সাপেক্ষে বিচারকর্ম বিভাগে নিযুক্ত ব্যক্তিবর্গ এবং ম্যাজিস্ট্রেটগণ বিচার কার্য পরিচালনার ক্ষেত্রে স্বাধীন থাকবেন। অনুচ্ছেদ নং ১১৬ক সংবিধানে সন্নিবেশনের সময় যে অবস্থায় ছিল বর্তমানেও তা একইভাবে অক্ষুণ্ন রয়েছে।

১৯৭৫ সালের পর দেশ সামরিক শাসনের কবলে পড়লে দ্বিতীয় ঘোষণাপত্র (পঞ্চদশ সংশোধন) আদেশ, ১৯৭৮ দিয়ে ১১৬ অনুচ্ছেদ সংশোধন করে বিচারকর্ম বিভাগে নিযুক্ত ব্যক্তিদের এবং বিচার বিভাগীয় দায়িত্ব পালনরত ম্যাজিস্ট্রেটদের নিয়ন্ত্রণ ও শৃঙ্খলাবিধানের দায়িত্ব রাষ্ট্রপতির ওপর ন্যস্ত থাকার বিষয়টি অক্ষুণœ রেখে নবতর বিধানের সন্নিবেশ করে বলা হয়- সুপ্রিম কোর্টের সাথে পরামর্শক্রমে রাষ্ট্রপতির মাধ্যমে তা প্রযুক্ত হবে। এ বিধানটি সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে সাংবিধানিক বৈধতা পায়। উচ্চাদালতে সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনী অবৈধ ঘোষণা পরবর্তী পঞ্চদশ সংশোধনী প্রবর্তনের প্রয়োজন দেখা দেয়। কিন্তু পঞ্চদশ সংশোধনের পর দেখা যায় ১১৬ অনুচ্ছেদ সামরিক ফরমান ও পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে যেরূপ লাভ করে, তা পূর্বাবস্থায় অক্ষুণœ রাখা হয়।
’৭২-এর সংবিধানের ১০৯ অনুচ্ছেদে প্রদত্ত ক্ষমতাবলে হাইকোর্ট বিভাগের অধস্তন সব আদালত ও ট্রাইব্যুনালের ওপর ওই বিভাগের তত্ত্বাবধান ও নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা দেয়া হয়। পরে সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীতে ‘ট্রাইব্যুনাল’ শব্দটির বিলোপসাধন করা হলেও তা দ্বাদশ সংশোধনীর মাধ্যমে পূর্বাবস্থায় ফিরিয়ে আনা হয়।

সংবিধানের ১০৯ ও ১১৬ অনুচ্ছেদ বিষয়ে অনেক আইনজ্ঞ, আইন গবেষক ও আইনের শিক্ষকের অভিমত এ দু’টি অনুচ্ছেদ সাংঘর্ষিকভাবে সংবিধানে অবস্থান করছে। এ সাংঘর্ষিকতাকে স্বীকার করে নিয়ে উপরোল্লিখিত দলের অন্তর্ভুক্ত অপর একটি পক্ষের অভিমত তত্ত্বাবধান, নিয়ন্ত্রণ ও শৃঙ্খলা বিষয়ে পৃথিবীর উন্নত গণতান্ত্রিক দেশগুলোতে যে বিধান অনুসৃত হয় তা হলো- উচ্চতর যোগ্যতাসম্পন্নরা নিম্নতর যোগ্যতাসম্পন্নদের তত্ত্বাবধান, নিয়ন্ত্রণ ও শৃঙ্খলাবিধান করবেন। প্রণিধানযোগ্য, বাংলাদেশের উচ্চাদালতের বিচারক নিয়োগ বিষয়ে যে বিধান রয়েছে, তা হলো- ব্যক্তিটিকে বাংলাদেশের নাগরিক হতে হবে এবং সুপ্রিম কোর্টে অন্যূন ১০ বছর অ্যাডভোকেট হিসেবে দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা অথবা বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় সীমানার মধ্যে অন্যূন দশ বছর বিচার বিভাগীয় পদে দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। উপরোল্লিখিত যোগ্যতাগুলোর অতিরিক্ত যে যোগ্যতার বিষয়টি উল্লেখ রয়েছে তা হলো- সুপ্রিম কোর্টে বিচারক পদে নিয়োগ লাভের জন্য আইনের দিয়ে নির্ধারিত যোগ্যতা। বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়ন পরবর্তী ৪৫ বছর অতিক্রান্ত হলেও আজো উচ্চাদালতের বিচারক নিয়োগের যোগ্যতা নির্ধারণী আইন প্রণীত হয়নি।

বিচার বিভাগের সর্বনিম্ন পদ সহকারী জজ। ম্যাজিস্ট্রেট নামে স্বতন্ত্র অস্তিত্ববিশিষ্ট কোনো পদ নেই। ১ নভেম্বর, ২০০৭ সালে পূর্ববর্তী প্রশাসন ক্যাডারের অ্যাসিস্ট্যান্ট কমিশনার হতে কমিশনার পর্যন্ত কর্মকর্তারা বিচারিক ম্যাজিস্ট্রেটের দায়িত্ব পালন করতেন। ১ নভেম্বর, ২০০৭ সালে পরবর্তী বিচার কর্ম বিভাগের সহকারী জজ থেকে অতিরিক্ত জেলা জজ পর্যন্ত কর্মকর্তারা বিচারিক ম্যাজিস্ট্রেটের দায়িত্ব পালন করছেন। সহকারী কমিশনার প্রশাসন ক্যাডারের সর্বনি¤œ পদ। সহকারী কমিশনারেরা সাংবিধানিক সংস্থা বাংলাদেশ সরকারি কর্মকমিশনের (বিপিএসসি) মাধ্যমে নিয়োগ পেয়ে থাকেন। জুডিশিয়াল সার্ভিস কমিশন বিধিমালা-২০০৭ প্রণয়ন পূর্ববর্তী সহকারী জজেরা সরকারি কর্মকমিশনের মাধ্যমে নিয়োগ পেতেন। বর্তমানে সহকারী জজদেরকে জুডিশিয়াল সার্ভিস কমিশনের সুপারিশের ভিত্তিতে সুপ্রিম কোর্টের পরামর্শক্রমে রাষ্ট্রপতি নিয়োগ দেন।
সহকারী কমিশনার ও সহকারী জজ নিয়োগ পরীক্ষায় অংশ নিতে হলে নিম্নতম যোগ্যতা হলো- মাধ্যমিক থেকে স্নাতক আইন (সম্মান) অবধি প্রতিটি পরীক্ষায় দ্বিতীয় শ্রেণীতে উত্তীর্ণ হওয়া। স্বভাবতই প্রশ্ন উঠতে পারে, এর নিম্নতম যোগ্যতার কোনো ব্যক্তির উচ্চাদালতের বিচারক হিসেবে নিয়োগ লাভের সুযোগ আছে কি না? উচ্চাদালতের বিচারকদের নিয়োগ বিষয়ে যোগ্যতা নির্ধারণী আইন প্রণীত হওয়ার অনুপস্থিতিতে সহকারী কমিশনার বা সহকারী জজ নিয়োগ পরীক্ষায় অংশ নেয়ার জন্য যোগ্য নন এমন কোনো ব্যক্তির এরূপ পদে প্রবেশ অনাকাক্সিক্ষত, অপ্রত্যাশিত, অনৈতিক ও নীতিজ্ঞান বহির্ভুত বিবেচিত হলেও এরূপ প্রবেশ যে ঘটেনি, তা জোর দিয়ে দাবি করার অবকাশ আছে কী?

অধস্তন আদালতের বিচারক নিয়োগ বিষয়ে ’৭২-এর সংবিধানের ১১৫ অনুচ্ছেদে উল্লেখ ছিল- বিচার বিভাগীয় পদে বা বিচার বিভাগীয় দায়িত্ব পালনকারী ম্যাজিস্ট্রেট পদে সুপ্রিম কোর্টের সাথে পরামর্শক্রমে রাষ্ট্রপতির মাধ্যমে উক্ত উদ্দেশ্যে প্রণীত বিধি অনুযায়ী নিয়োগ লাভ করবেন। উপরোল্লিখিত বিধান বর্তমানেও অক্ষুণœ রয়েছে যদিও সংবিধান প্রণয়নকালীন সুপ্রিম কোর্টের সুপারিশক্রমে রাষ্ট্রপতির মাধ্যমে জেলা বিচারক পদে নিয়োগের বিধান ছিল।
সদ্য প্রণীত বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস (শৃঙ্খলা) বিধিমালা-২০১৭-এ উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের যে সংজ্ঞা দেয়া হয়েছে তাতে উল্লেখ রয়েছে- ‘উপযুক্ত কর্তৃপক্ষ’ অর্থ রাষ্ট্রপতি বা তদকর্তৃক সংবিধানের ৫৫(৬) অনুচ্ছেদ অনুসারে প্রণীত রুলস অব বিজনেসের আওতায় সার্ভিস প্রশাসনের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রণালয় বা বিভাগ।
বিধিটিতে ঊর্ধ্বতন কর্র্তৃপক্ষের সংজ্ঞায় বলা হয়েছে- ‘ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ’ অর্থ প্রযোজ্য ক্ষেত্রে উপযুক্ত কর্তৃপক্ষ, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট এবং সার্ভিস সদস্যের প্রশাসনিক বিষয়ে স্থানীয় নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষ।

সুপ্রিম কোর্টের পরামর্শের কার্যকারিতা বিষয়ে বিধিটিতে উল্লেখ রয়েছে- উপযুক্ত কর্তৃপক্ষ সুপ্রিম কোর্টের পরামর্শ অনুসারে এ বিধিমালায় নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ নেবে এবং উপরিউক্ত উপবিধিতে বর্ণিত উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের প্রস্তাব ও সুপ্রিম কোর্টের পরামর্শ অভিন্ন না হলে সে ক্ষেত্রে সুপ্রিম কোর্টের পরামর্শ প্রাধান্য পাবে।

সংবিধান দেশের সর্বোচ্চ আইন। দেশের অপর কোনো আইন সংবিধানের সাথে সাংঘর্ষিক হলে ওই আইনের যতটুকু সাংঘর্ষিক তা অকার্যকর বা বাতিল হবে। বিধির অবস্থান আইনের নি¤েœ। কোনা আইনে বিধি প্রণয়নের ক্ষমতা দেয়া থাকলে সরকারের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতির অনুমোদনক্রমে তা প্রণীত হয় এবং গেজেট বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের তারিখ থেকে তা কার্যকর হয়। বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস (শৃঙ্খলা) বিধিমালাটি ১১ ডিসেম্বর, ২০১৭ তারিখে গেজেটে প্রকাশিত হয় এবং উক্ত তারিখ হতে এটি কার্যকর করা হয়।

আমাদের সংবিধানে অনুচ্ছেদ নং ১১৫ ও ১১৬ এর বর্তমান যে অবস্থান তা বিবেচনায় নেয়া হলে রাষ্ট্রপতির কর্তৃত্বের কোনোরূপ হানি ঘটিয়ে উভয় অনুচ্ছেদে বর্ণিত বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টকে এককভাবে ক্ষমতা দেয়ার সুযোগ অনুপস্থিত। সংসদীয় পদ্ধতির সরকার ব্যবস্থায় রাষ্ট্রপতির দু’টি বিষয় ছাড়া অপর সব বিষয়ে নির্বার্হী ক্ষমতা প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী কার্যকর হওয়ার কারণে কার্যত এ ব্যবস্থায় সংবিধানের ১১৫ ও ১১৬ অনুচ্ছেদে এ বর্ণিত সমুদয় কার্যাবলি প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শক্রমে রাষ্ট্রপতি কার্যকর করেন। সুতরাং অধস্তন বিচার বিভাগে দায়িত্ব পালনরত বিচারক ও ম্যাজিস্ট্রেটদের নিয়ন্ত্রণ ও শৃঙ্খলা বিষয়ে সামরিক ফরমান দ্বিতীয় ঘোষণাপত্র (পঞ্চদশ সংশোধন) আদেশ, ১৯৭৮ দিয়ে চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে হরণ করা ক্ষমতার আংশিক প্রদান পরবর্তী তা অব্যাহত থাকার কারণে পূর্বাপর এ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্ট যে ক্ষমতা প্রয়োগ করে আসছে তা গেজেট বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ পরবর্তী চেতনাগত দিক হতে সমরূপ থাকায় সুপ্রিম কোর্টের ক্ষমতা খর্ব হয়েছে এরূপ দাবির অবকাশ ক্ষীণ।

লেখক : সাবেক জজ, সংবিধান, রাজনীতি ও অর্থনীতি বিশ্লেষক
E-mail: iktederahmed@yahoo.com

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.