ঢাকা, সোমবার,২৫ মার্চ ২০১৯

প্যারেন্টিং

অকালে জন্ম শিশুর বিশেষ যত্ন

ডা: প্রণব কুমার চৌধুরী

১৮ ডিসেম্বর ২০১৭,সোমবার, ২০:৩০


প্রিন্ট
অকালে জন্ম শিশুর বিশেষ যত্ন

অকালে জন্ম শিশুর বিশেষ যত্ন

পূর্ণ ৩৭ সপ্তাহ গর্ভকালের আগে যে শিশু জন্ম নেয় তাকে বলে অকালে জন্ম নেয়া শিশু। তেমনিভাবে দুই হাজার ৫০০ গ্রাম বা আড়াই কেজির কম ওজন নিয়ে জন্মানো শিশুকে স্বল্প ওজন নবজাতক হিসেবে ধরা হয়। বাংলাদেশে প্রায় প্রতি তিনটি শিশুর একজন স্বল্প ওজনে জন্ম নেয়। এর কারণ হিসেবে মায়ের অপুষ্টি কিংবা মায়ের অল্প বয়সে, স্বল্প বিরতিতে বা বারবার গর্ভধারণ ও ধূমপান বহুলাংশে দায়ী।

এদের প্রধান অসুবিধা
১. শরীরের তাপমাত্রা ঠিক না রাখতে পারা
২. খাবারে অসুবিধা
৩. ইনফেকশনের প্রবণতা
৪. শ্বাসকষ্টজনিত সমস্যা
৫. বাড়তি কিছু খাদ্যপ্রাণসহ বিশেষ পুষ্টির অভাব।
৬. ব্রেইনের বিকাশঘটিত কিছু জটিলতা।

ইনকিউবেটর যত্ন
এসব শিশুর যত্নে ‘ইনকিউবেটর’ ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তা অনেকখানি বিশেষত শিশুর ওজন দুই হাজার গ্রামের কম হলে। এই বিশেষ ব্যবস্থায় শিশুর তাপমাত্রা সঠিক পর্যায়ে সুরক্ষা করা, ৪০ থেকে ৬০ শতাংশের মধ্যে আর্দ্রতা বজায় রেখে প্রয়োজন অনুযায়ী অক্সিজেন সরবরাহ করা হয়। সঙ্গে অন্যান্য বিধিব্যবস্থা শিশুবিশেষজ্ঞ নির্ধারণ করে দেন।

তাপমাত্রা বজায় রাখার বিকল্প পদক্ষেপ
ইনকিউবেটরের ব্যবস্থা না করা গেলে শিশুর তাপমাত্রা বজায় রাখার জন্য কিছু পদক্ষেপ নিতে হবে। রেডিয়েন্ট হিটার, ল্যাম্প জ্বালিয়ে ঘর গরম রাখার চেষ্টা করা যায়। তবে তুষের আগুনে জ্বালিয়ে তা যেন কখনো না করা হয়। বদ্ধ ঘরে তুষের ধোঁয়া শিশুর জন্য ভয়াবহ পরিস্থিতি সৃষ্টি করবে। খেয়াল রাখতে হবে দরজা-জানালা যেন খোলা থাকে, বিশুদ্ধ বাতাস চলাচলের উপযোগী হয়ে থাকে শিশুর থাকার ঘর। সেই সাথে শিশুর মাথায় টুপি পরিয়ে তার জন্য হাত-পায়ের মোজা ব্যবহার করে; কম্বল কিংবা তুলোর বান্ডিলে ঢেকে শিশুর শরীর থেকে নিরাপদ দূরত্বে গরম জ্বলের ব্যাগ রেখে শিশুর জন্য কাক্সিক্ষত তাপমাত্রা বজায় রাখতে হয়।

খাওয়ানোর পদ্ধতি
সাধারণভাবে ৩৪ সপ্তাহ গর্ভকালের কম নবজাতক শিশুটির মধ্যে শ্বাস-প্রশ্বাস ক্রিয়া, চোষা ও গিলতে পারা- এ তিনের সমন্বয় গড়ে ওঠে না। এ ক্ষেত্রে এবং অত্যাধিক কম ওজন নবজাতক যার জন্মকালীন ওজন এক হাজার ৫০০ গ্রামের কম তাদের নাকে নল দিয়ে গলানো বুকের দুধ খাওয়ানোর ব্যবস্থা নিতে হয়। প্রিম্যাচিউরড অর্থাৎ অকালজাত শিশুর জন্য বুকের গলানো দুধই শ্রেষ্ঠ। শিশুর ওজন ও বয়স হিসাব করে শিশু বিশেষজ্ঞ তা নির্দিষ্ট করে দেন। শিশুর চুষে খেতে পারার বিষয়ে সামান্যতম সংশয় থাকলে শিশুবিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন।

ইনফেকশন প্রতিরোধে কারণে এ সময় শিশুর জন্য বিপজ্জনক একটি ইস্যু হলো- ইনফেকশন হওয়া রোগ প্রতিরোধক ক্ষমতা অত্যধিক থাকে। এসব সন্তানকে বিশেষ করে জন্মের প্রথম মাস মা ছাড়া অন্য কারো সংস্পর্শ থেকে দূরে রাখা উচিত। মায়ের উচিত একমাত্র তিনিই যেন নবজাতকের পরিচর্যার ভার নেন। বহু আকাঙ্ক্ষার ধন হিসেবে শিশুসন্তান লাভের পর সবাই তাকে নিয়ে উল্লাসে মেতে ওঠেন। শিশুবিশেষজ্ঞের নিষেধ সত্ত্বেও নতুন বাবা-মা কাউকে কিছু বলতে পারেন না। অথচ বয়স্ক ব্যক্তির সংস্পর্শ শিশুসন্তানটিকে সংক্রমিত করে দিতে পারে, যা তাকে মৃত্যুর কাছাকাছি পৌঁছে দেয়। শিশুকে ধরাছোঁয়ার আগে ভালোভাবে সাবান দিয়ে হাত ধুয়ে নিতে হবে। তার কাপড়-চোপড় ও ঘরের পরিচ্ছন্ন পরিবেশ বজায় রাখা অবশ্য কর্তব্য।

বাড়তি ভিটামিন
দুই সপ্তাহ বয়সে পৌঁছলে প্রিম্যাচিউরড শিশুর জন্য বাড়তি কিছু ভিটামিনের প্রয়োজন দেখা দেয়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে- ভিটামিন-ডি, ভিটামিন-সি, এক হাজার ৫০০ গ্রামের কম ওজন নবজাতক শিশুর জন্য ভিটামিন-ই অপরিহার্য এবং তা শিশুর ওজন দ্বিগুণ হওয়া পর্যন্ত চালিয়ে যাওয়া হয়। ঠিক এ সময়ে অত্যন্ত সূক্ষ্ম হিসাবের মাধ্যমে শিশুর প্রেসক্রিপশনে রাখতে হবে আয়রন সিরাপ।

শিশুর ভবিষ্যৎ
স্বল্প ওজনের নবজাতক শিশুর মগজ বৃদ্ধি ও বিকাশে ত্রুটি দেখা যেতে পারে। সে জন্য এসব শিশুসন্তানকে শিশুবিশেষজ্ঞের তত্ত্বাবধানে রেখে তার বেড়ে ওঠা ঠিকঠাক হচ্ছে কি না তা লক্ষ রাখা দরকার। তা বলে এদের নিয়ে তেমন ঘাবড়ানোর কিছু নেই। নিউটনের জন্ম হয়েছে তিন পাউন্ড ওজন নিয়ে। উইনস্টন চার্চিল ও পাবলো পিকাসো সময়ের বেশ আগেই পৃথিবীর মুখ দেখেছিলেন। অর্থাৎ সঠিক যত্নের সাহায্যে অকালপ্রজ ও অল্প ওজনের নবজাতক শিশুও বিশ্ববরেণ্য হওয়ার ক্ষমতা রাখতে পারে।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫